অক্ষমতা

আজ আমাদের বিয়ের দিন। এইদিনে আমাদের বিয়ে হয়েছিল। ঠিক কত বছর আগে? ত্রিশটা বছর চলে গেছে। আমরা এই একই ছাদের নীচে, একই বিছানায়- আমাদের দিন কাটে ব্যস্ততায়। আমাদের দেখা হয় রাতে। তাতে আমাদের কোনো মন খারাপ নেই। আমরা সুখী হতে,সুখী থাকতে আপ্রাণ চেষ্টা করি।


এই যে মানুষটার উদোম বুকে আমি মাথা দিয়ে শুয়ে৷ আছি। আজকের তারিখটা তাঁর মনে নেই আমি জানি। এও জানি কিছুক্ষণ সময়ের মধ্যে আমিই মনে করিয়ে দেবো।

আলাভোলা এই মানুষটাকে আমি ভালবাসি। খুব ভালবাসি। আমাদের ছেলে মেয়ে বড় হয়ে গেছে। চাকরি করে। ওরা আমাদের এই নির্ভরতার কথা জানে। কখনো কখনো হাসাহাসি করে।

— মা তুমি কী বাবার প্রেমে পড় রোজ? আমি হাসি। বড় মধুর সেই হাসি। সত্যি আমি রোজ প্রেমে পড়ি আজও।

বাবাকেও ওরা নাড়াচাড়া করে।

— বাবা এই এক মানুষের প্রেমে তুমি আর কতকাল কাটাবে? আধুনিক যুগের ছেলেমেয়ে এরা। বাবা মা তাদের বন্ধুর মতো।

আজ আকাশে চাঁদ নেই। এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেলো। জানালার পর্দা সরিয়ে দিয়েছি। মেঘগুলো কোথায় জানি ভেসে যায়?
আমরা কোনো কথা বলি না। অথচ আমরা অনেক কথা বলছি।

— আজ কত তারিখ বলো তো? কোন মাস? আমার প্রশ্ন শুনে সে মোবাইলে তারিখ দেখে। তারপর অপরাধীর মতো তাকিয়ে থেকে আমার কপালে আলতো আদর করে। জানোই তো আমার ভুল হয়ে যায়। সারাদিন একবারও মনে পড়েনি। তুমি কেন সকালেই মনে করিয়ে দাওনি? তাঁর কথা শুনে আমি হাসি আর আবারও প্রেমে পড়ি।


আমাদের শুরুটা বড় অদ্ভুত ছিল। আমরা তখন কেউ কাউকে চিনি না।

কলেজে পড়ার সময় বাবার অসুখ হলো। হার্টের অসুখ। বাবার বদ্ধমূল ধারণা আর সময় নেই। বিয়ে যোগ্য মেয়ে ঘরে। বাবার ঘুম হয় না। বাবার প্রেশার কমে না।
একদিন বাবা আমাকে ডেকে বলল- তোর অনেক সম্বন্ধ আসছে। আমি তো ঠিক করতে পারি না কাকে পছন্দ করব?

আচ্ছা এ কেমন কথা? আমিও কি জানি কে কেমন?

বিয়ের বিষয়ে আমার কোনো ওজর-আপত্তি করার সুযোগ নেই। বাবাকে কোনো রকম দুশ্চিন্তায় ফেলা বারণ।

আমি নখ খুঁটতে খুঁটতে চুপচাপ বসে থাকি।


আমাকে দেখতে এসেছে পাত্রপক্ষ। বাসায় তোড়জোড় আয়োজন। আমি সেজে-গুজে বসে আছি। কখন ডাকবে? আমার ভয় লাগে। অচেনা মানুষকে বিয়ে করতে আমার ভয় লাগে।


পাত্র মাঝারি উচ্চতার। রঙ অবশ্য ফর্সা। আমার রঙ অত ফর্সা নয়।
সবার সামনে আমি মাথা নিচু করে বসে আছি। আমার গোলাপি শাড়িতে টুপটাপ জল পড়ে।

পাত্র ব্যবসায়ী। বাবার অনেক সম্পত্তি। অবশ্যই এই পাত্রের বাজারদর ভালো।

— আমাদের মেয়ে পছন্দ হয়েছে। খাবার দাবার শেষ করে পাত্রের মামা জানালেন।

বাবা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। মায়ের মুখে খুশির ঝলক।

বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হলো। হলুদের কথাও হলো।

আর পনেরো দিন পরে বিয়ে।

আমাদের বাড়ির সবাই ব্যস্ত। একটা বিয়ে মানে তো অনেক কাজ।
পাত্রের সাথে আমার কোনো কথা হয়নি। তবে পাত্রের বাবা আমার অনামিকায় একটি আংটি পরিয়ে গেছেন।

আংটিটা আমি দেখি। আমার বন্ধনের আংটি।


বিয়ের পর যথারীতি আমি শ্বশুর বাড়িতে। সম্পূর্ণ নতুন জায়গা। ততদিনে নাম জেনেছি আমি। নামটা মিঠু। তবে আমি মিঠু নামে ডাকি না। স্বামীর নাম মুখে ডাকতে নেই।

ওহহো আমার নাম তো বলিনি। আমি মালতী। সে অবশ্য আমাকে নাম ধরেই ডাকে।

বিয়ের রাতে তাকে প্রথম দেখি। তেমন কোনো কথা হয় না আমার সাথে। তবে সে যে স্বামী সেটা বুঝে যাই। আমার প্রচণ্ড ব্যথা লাগে,ভয় লাগে। মনে হলো ভেতরে কিছু ছিঁড়ে যাচ্ছে। কিন্তু কিছু বলতে পারি না। বিয়ে মানেই বোধ করি একটা সার্টিফিকেট – বউয়ের সাথে রাতের খেলা।


মানুষটাকে আমার নির্দয় মনে হয়। ভীষণ মেজাজি। কথা বললেই ফোঁস করে। আমার ভয় লাগে।

আমার কলেজে ক্লাস চলছে। আমি কলেজে যাই। বাসায় এসে পড়তে বসা হয় না। শ্বশুরবাড়িতে পড়াশোনা ফাঁকে ফাঁকে করতে হয় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে আমাকে।

রাতে পড়ার অভ্যাস আমার সবসময়। এখন তো রাত স্বামীর দখলে। একবার নয় শুধু দফায় দফায় তার ক্ষুধা মেটাতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ি।

মাসিক হয় আমার। সে আমাকে জন্মনিয়ন্ত্রণ করার ওষুধ খাওয়ায়। তাতেও রক্ষে নেই। সে কীসব ছবি দেখে আর নিত্য নতুন পন্থায় ক্ষুধা মেটায়।

মাসিকের দিনগুলোতে রেগে থাকে সে। কার কাছ থেকে শিখে এলো আরো নতুন পন্থা। আমার উগড়ে বমি আসে।
আমি শাশুড়ির ঘরে লুকিয়ে থাকি। শাশুড়ি আমাকে ঘরে ফেরত পাঠান। ছেলের রাগ তিনিও ভয় পান।

আজকাল সে তৃপ্ত না হলে গায়েও হাত তোলে। তাকে সুখ দিতে না পারায় আমি অভিযুক্ত হই।

আমার মাসিক বন্ধ দুইমাস। সারা শরীর গুলিয়ে আসে। নিশ্চয়ই ওষুধের গড়বড় করেছি। ডাক্তারের কাছে যাই লুকিয়ে।

পেটে বাচ্চা! আমার সব অন্ধকার লাগে।

— এই ওষুধগুলো খাবেন। পরীক্ষা করে রিপোর্ট নিয়ে আসবেন। আর প্রথম চারমাস স্বামী স্ত্রী মেলামেশা করবেন না। ডাক্তারের কথাগুলো আমার মাথায় ঢোকে না।
আমি দেখতে পাই আমার রাতের চেহারা।

আস্তে ধীরে বলি কথাগুলো। শোনা মাত্রই রেগে যায় সে। তারপর তার নৈমিত্তিক কাজ শুরু।
একদিন রাতে ভীষণ পেটে ব্যথা করে গলগল রক্ত ভাঙে তার খিদে মেটানোর পর।

আমি হাসপাতালে ভর্তি। বাচ্চাটা নেই। ভেতরে ওয়াশ করে দেয় ডাক্তার।

আমার আর ঐ অমানবিক মানুষের কাছে ফেরার মতো মন নেই।

বাবার অসুখের কথা ভেবে এতদিন সহ্য করেছি। আর নয়,একদম আর নয়।

আমি আমার বাড়িতে ফিরে আসি। বাবা মা প্রথমে না বুঝলেও পরে বোঝে।

আমি লেখাপড়া শেষ করি। এরমধ্যে ওরা অনেকবারই নিতে চেয়েছে আমাকে। আমার কোনো রাগ নেই। কিন্তু ঘেন্নায় আমার গা রিরি করে।

মুখের ভেতর আমি সেই উত্থিত লিঙ্গের নড়াচড়া টের পাই। ওয়াক বমি আসে।


ডিভোর্স পেপার আমিই পাঠিয়ে দেই। চাকরি করছি। কোনো পুরুষকে দেখলেই আমার ভীষণ ঘেন্না লাগে।

বাবা চলে গেলেন। মা আর আমি সংসারে। আমার কোনো ভাই বোন নেই।

আবার বিয়ের সম্পর্ক আসে। মা আমাকে বোঝায়। জীবন এমন চলে না। মেয়েদের একা চলা খুব কঠিন এই সমাজে।

মায়ের কথাটা ইতিমধ্যে আমি বুঝতে শুরু করেছি। ডিভোর্স একটা বিষয়- একটা তকমা। সমাজের তর্জনী উঁচু করে আমাকে বারবারই বলে।


অফিসে তখন আমাকে নিয়ে কানাঘুষা চলে। এসব শুনে একদিন সিরাজ নামের একজন আমাকে কিছু কথা বলতে চায়। আমি পাত্তা দেই না।

একদিন সকালে আমার টেবিলে সিরাজের একটা চিঠি পেলাম। মনোযোগ দিয়ে পড়ছি চিঠিটা।

শারীরিক অক্ষমতার জন্য তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেছে। মোদ্দা কথা এটাই।

শারীরিক অক্ষমতা? বিষয়টি নিয়ে আমি ভাবি।

সিরাজের সাথে টুকটাক কথা হয়। আমার বাড়িতে প্রস্তাব আসে আবার।

শারীরিক অক্ষমতা যার তাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেই আমি।


আমার আবার বিয়ে হলো। সিরাজ আমার স্বামী। বাসর রাতে সিরাজ তার সমস্ত ঘটনা বলে। আমি শুনি।কিন্তু আমার কথা জানতে চায় না। আমাকে ছুঁয়ে ঘুমিয়ে যায়। আমি সারারাত জেগে থাকি।

মাস খানেক পর একদিন আমিই সিরাজকে আমার সব কথা বলি। ততদিনে সিরাজ আমার বন্ধু হতে শুরু করেছে। আমি কাঁদছি। সিরাজের বুকে মুখ লুকিয়ে আমি কাঁদছি। কতদিন কাঁদিনি আমি?

ধীরে ধীরে বরফ গলে। আমরা উষ্ণতা টের পাই। আমাদের দুজনের চাওয়া এক হয়।
সিরাজ তো অক্ষম নয়!
আর আমারও তো ভয় কেটে গেছে!

আমাদের সন্তান আসে পৃথিবীতে। প্রতিদিন আমরা ভালোবাসায় বাঁচি।

আমি পেছনের কথা মনে করতে চাই না। সিরাজই আমাকে মনে করতে দেয় না। মনে হয় আমার কোনো অতীত নেই,কোনো অতীত ছিল না আমার!

সিরাজের কোনো অতীত নেই,কখনোই ছিল না।

আমরা খুব করে বর্তমানে বাঁচি।

ফারহানা নীলা