অনুধাবন ( ২৭তম পর্ব )

(নাজমা)

শহরে লম্বা সময় থাকা মানুষের গায়ে, চলনে বলনে একটা অন্যরকম ব্যাপার আছে। গ্রাম থেকে উঠে আসা লোকে চাইলেও সেই রকম সহসা হতে পারেনা। তারপরও যতটা পারা যায় ততটা চেষ্টা অবশ্যই থাকে নয়তো খাপ খাইয়ে চলা যে দুষ্কর হয়ে যায়। আমার পরিবর্তনটুকু হয়েছে ও রকমই। আমার গত তিনমাসের ঘটে যাওয়া বিবর্তনে আপাত দৃষ্টিতে আমাকে গ্রাম্য বলে মনে না হলেও কিছুক্ষণ কথা বললে অবশ্যই আমার শহর সম্পর্কিত অজ্ঞতাটুকু ঠিকই বোঝা যায়। সে যাই হোক দিনগুলো কাটিয়ে নিতে পারছি সেটাই আমার আপাতত মূল লক্ষ্য। রুমমেট নিপা আপা আর রুবাই সাহেবের প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষ সাহায্যটুকু অবশ্যই আমার পাশেই ছিল। তারপরও নিজে নিজের বুদ্ধি বিবেচনায় নিজেকে খানিকটা আধুনিক করার চেষ্টা করতে যেয়ে হাস্যস্পদই শুধু হয়েছি। দমে যাইনি যদিও।

আমার কলেজের দুদিকে দুটো মার্কেট। কি দারুন সব কাপড় চোপড় জিনিসপত্র পাওয়া যায়। একদিন ব্যাংকে যেয়ে আমার সঞ্চিত অর্থের পরিমাণ ও দেখে এসেছি। যেহেতু এখানে থাকতে হবে কাজেই নিজের বেশভূষা আগে পাল্টানো জরুরী মনে হলো। হোস্টেলে এসে শাড়ি পরে থাকলেও ক্লাসে শাড়ি পরে গেলে সবাই পেছনে হাসাহাসি করে সেটা বেশ বুঝতে পারছিলাম। আগে কখনো টাকা পয়সার হিসেব আমার করতে হয়নি বা বলা চলে আমার টাকা আসবেই বা কোথা থেকে যে হিসেব করবো। তালুকদার সাহেব মানে আমার শ্বশুর আমার পুরো বছরের হোস্টেলের খরচের পাশাপাশি আমার হাতখরচের টাকাটা ব্যাংকে আলাদা করেই দিয়েছেন। রুবাই সাহেব বললেন বুঝে শুনে খরচ করলে আমি নির্দ্ধিধায় দুবছর নাকি এই অর্থে চলে যেতে পারব। একদিন একা একা মার্কেটে গিয়ে আমার মনে হলো সে ধারনা সম্পূর্ণ ভুল। আমার মনে হলো মেয়েলোক আর পুরুষ লোকের খরচের ধরনটাই পুরো ভিন্ন ধাঁচের।

যা বলছিলাম মার্কেটে যাওয়ার কথা, দুটো জামা খুব পছন্দ হলো। কিন্তু দাম শুনে আমার মাথায় হাত দেয়ার যোগাড়। প্রায় আমার পুরো মাসের হাতখরচের সমান দাম। কিন্তু না কিনেই বা উপায় কি? ক্লাসে সবার হাসাহাসি সহ্যও হচ্ছেনা। অনেক ভেবেচিন্তে একটা জামা কিনে হোস্টেলে ফেরত এলাম। নিজেকে বেশ দিগ্বিজয়ী মনে হচ্ছিলো। একা একা বিশাল কাজ করে ফেলেছি। পুরো জামাতে জরিবুটি আর আয়না বসানো কি ঝলমলে যে দেখতে। নিজে একা একা পরে আয়নায় নিজেকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম, কি সুন্দর শহুরে মেয়ে লাগছে আমাকে। অন্যদিন ঘুমিয়ে পরলেও আজ রাতে নিপা আপা আসা পর্যন্ত বসে রইলাম নতুন জামা দেখাবো বলে। “নিপা আপা দেখেন না, সুন্দর হয়েছে না জামাটা?” “হুম সুন্দর হয়েছে নাজমা। কিন্তু তুমি কি এটা পরে কাল ক্লাসে যাবে?” “হুম সেজন্যই তো কিনলাম।” “আমার মনে হয় এটা পরে ক্লাসে না গেলেই ভালো হবে। এ জাতীয় কাপড় পরে লোকে বিয়ে টিয়ে বা দাওয়াতে যায়। আমি জানিনা তোমাকে বোঝাতে পারলাম কি না।”

আমার কি যে মন খারাপ হলো কতগুলো টাকা দিয়ে জামাটা কিনে আনলাম আর উনি এইটা কি বললো? নিশ্চয়ই ওনার হিংসা লেগেছে। থাক যে যা খুশী বলুক, আমি কাল এটা পরেই কলেজে যাব।

………………

বোরকা শাড়ি পরা আমাকে নিয়ে যতোটা না হাসাহাসি হয়েছে তার চেয়েও বেশী লোকে বুঝি আমার আজকের জামা দেখে হাসলো। রাগে দুঃখে ক্লাস শেষ না করেই চলে এলাম সেদিন। প্রথমবারের মতো আমি ক্লাস ফাঁকি দিয়ে রুমে চলে এসেছি। তার ওপর ক্লাসে বলেছে সামনের মাসেই পরীক্ষা। আমি চারদিকের ভাব বোঝা নিয়ে, নিজেকে কেমন দেখা যায় তা নিয়ে এতোই ব্যস্ত ছিলাম যে আমার উদ্দেশ্য যে আসলে পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো তাই বেমালুম ভুলতে বসেছিলাম। জোর পায়ে হেঁটে হোস্টেলে ফিরে আসতেই দারোয়ান জানালো আমাকে অফিসে যেতে বলেছে। অফিসের মহিলাটা আমার সাথে বেশ নরম হয়ে কথা বললেও আমার কেন যেন তাকে খুব ভয় ভয় লাগে। মনে হয় কোন ভুল করলেই না বলে বসে কাল থেকে আর হোস্টেলে থাকা চলবে না। পায়ে পায়ে কখন যে তার ডেস্কে এসে দাঁড়িয়েছি নিজেও বুঝিনি।”এই যে নাজমা, ভালো আছেন? সব ঠিকঠাক চলছে?” “জ্বি ভালো আছি। সব ঠিকঠাক। কোন সমস্যা? দারোয়ান চাচা বললো আপনি আসতে বলেছেন।” “ও হ্যা আপনার একটা রেজিস্ট্রি চিঠি এসেছে, আমি সাইন করে রেখে দিয়েছি।”

চিঠিটা হাতে নিয়ে এক লহমায় কয়েক মাস আগের স্মৃতিতে ফিরে গেলাম। ‘ঠিক তিন মাসের মাথায় ল’ইয়ারের চিঠি পাবে। সাইন করে পাঠিয়ে দেবে।’ এটাই কি সেই চিঠি? ঐ বাড়ির সাথে সম্পর্ক তো চুকিয়েই এসেছি। কাগজে কলমে পুরোপুরি চুক্তি সমাপনের দলিল; আমার ডিভোর্স লেটার?
চিঠিটা হাতে নিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলতে পারলাম, একটা ফোন করতে পারি আমার লোকাল অভিভাবকের বাসায়?

লোকে বলে সুখের খবর একলা একাকী এলেও দুঃখের খবরগুলো পরিবার পরিজন নিয়ে আসে সবসময়। কি একটা বাজে দিন যে আজ আমার জন্য। এতগুলো টাকা গচ্চা দিয়ে কেনা জামা নিয়ে সবার হাসাহাসি, হুট করে পরীক্ষার তারিখ দেয়া যেখানে আমার পড়ার অবস্থা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি, আর দিনশেষে উকিল নোটিশ; একটা দিনে এরচেয়ে বেশী খারাপ খবর বোধ করি আর কিছুই হতে পারেনা। রুবাই সাহেব আসবেন বলেছেন এটাই শান্তি। অন্তত কারো কাছে একটু মনের কথা না বলতে পারলে আমি বোধহয় বুক ফেটেই মারা যাব। রুবাই সাহেবের একটা খুব চমৎকার ব্যাপার আছে যেটা আমার খুবই ভালো লাগে। উনি যে কোন কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শোনেন। আমি ওনার কেউই তো হইনা বরং দফায় দফায় কাজে সাহায্য করতে ডাকি তারপরও উনি কখনোই বিরক্ত না হয়ে আমার সমস্যাটুকু বোঝার চেষ্টা করেন। বলতে দ্বিধা নেই যতদূর পারেন সাহায্যও করেন। চিঠির খাম খুলে একটু একটু করে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়লাম। ‘আমাদের দুজনের যৌথ মতামতে পারস্পরিক আলোচনা ও সম্মতির ভিত্তিতে আমরা বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ মনের অজান্তেই একটু বুঝি হেসে ফেললাম। বরং যদি লেখা থাকতো, আমি তালুকদারের নির্দেশে ওরা দুজনেই ডিভোর্স নিতে বাধ্য হয়েছে তাহলে বোধহয় ভালো শোনাতো। আচ্ছা আমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে বা কষ্ট পাওয়া উচিত? নিজের মনকেই প্রবোধ দিলাম সাথে খানিক দোয়া আমার প্রায় হয়ে যাওয়া প্রাক্তন শ্বশুরের জন্য অজান্তেই বুঝি করলাম। উনি এভাবে উদ্যোগ না নিলে জীবনের এই অংশের দেখাতো আমি কখনোই পেতাম না। একটা জীবন মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেই যে কেটে যেত। কতক্ষণ চিঠিটা নিয়ে বসেছিলাম জানিনা। সম্বিৎ ফেরে রুমের দরজার টোকায়, আমার ভিজিটর এসেছে। সব খারাপের একটা ভালো দিকও আছে। আমার নিজের বেশভূষা পাল্টানো নিয়ে, নিজেকে দর্শনধারী করতে আমি এতো বেশী মনোযোগী ছিলাম যে আমার জীবনের লক্ষ্যরা যেন পথ হারাতে বসেছিল। আজকে এমন একটা দিন না এলে বোধহয় আমার হুঁশ ফিরতে আরো বেশ কয়েকমাস এভাবেই কেটে যেত। ভিজিটর রুমের এক কোণের সোফায় বসেছিলেন রুবাই সাহেব, সেই একই গেঞ্জি আর প্যান্ট পরনে। ওনার কি আর কোন কাপড় নেই? পরক্ষণেই আমার মনে হলো, ওনার অবস্থাও তো আমারই মতো। উনিতো ওনাকে দেখতে পাওয়া নিয়ে এত বিচলিত ভাব কখনোই দেখাননি। একটু বোধহয় আনমনেই ছিলেন, আমি সামনে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাই টের পাননি। “কি ম্যাডাম, এতো জরুরী তলব? কোন সমস্যা?” ” এখানেই কথা বলবো না বাইরে দাঁড়াবো।” গেটের বাইরে বেরিয়ে এলাম দুজনে। “রুবাই ভাই চলেন আপনাকে আমি চা খাওয়াব, দুপুরে কিছু খাইনি আজ। ” হোস্টেলের পাশেই এই হোটেলটা। হোস্টেলের খাবার ভালো না লাগলে অনেকে এখান থেকে খাবার নিয়ে খায়। আমার অবশ্য হোস্টেলের খাবারই অমৃতের মত লাগে। নিজে রাঁধতে হচ্ছেনা, খরচ দিতে হচ্ছেনা ; তার ওপর নাক তুলব আমি তো আর সেরকম রাজকন্যা নই। “আপনার কি মন খারাপ ভাইয়া?” ছেলেদেরকে আহ্লাদ করে ভাইয়া ডাকতে হয় এটা শিখেছি কলেজ থেকে। সাথের মেয়েগুলো দেখি এভাবেই সিনিয়রদের ডাকে। আমার সম্বোধন নাকি গলার স্বরে রুবাই সাহেব চমকে তাকান। “হুম না মানে একটু মন খারাপ আছে। বাদ দেন। আপনার কি সমস্যা বলেন। ” “আপনাকে কেন যেন বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে। যদিও আমাকে বলা হয়েছে এ কথা আর কাউকে না বলতে তবু কেন যেন কারো সাথে না বলে মনে স্বস্তিটুকু পাচ্ছিনা। আপনি সেদিন জানতে চেয়েছিলেন, কে আমাকে এতো টাকা দিল ঢাকা শহরে থাকা খাওয়ার। কিছু না বলে এড়িয়ে গেছি। আজকের পর বললে বোধহয় আর কোন সমস্যা হওয়ার কথা না। তালুকদার নামের ভদ্রলোক আমার শ্বশুর ছিলেন।” “আপনি বিবাহিত? তা ছিলেন বলছেন কেন, উনি কি মারা গেছেন? আর আপনার স্বামীই বা কোথায়?” “সে এক বিরাট ইতিহাস, আজ আর বলতে ইচ্ছেও করছেনা। আজ ঐ বাড়ি থেকে ডিভোর্সের কাগজ পাঠানো হয়েছে। সাইন করে দিতে আমি বাধ্য কারণ আমার এই জীবনটুকুর বিনিময়ে তারা শুধু ডিভোর্সটুকুই চেয়েছিলেন। আমি ভালো আছি জানেন। বলতে পারেন বেহেশতে আছি। তারপরও কেন যে মনের কোণে থেকে থেকে শুধু উঁকি দিচ্ছে একটাই কথা, এই পৃথিবীর কোথাও আমার আর কোন আত্মীয় নেই, কোন স্বজন নেই; পুরো পৃথিবীতে আমি সম্পূর্ণ একা একজন মানুষ। কাঁদতে কাঁদতে আর কোন কথা বলতে পারিনি। না রাসেল বা তালুকদার বাড়ি না শুধু পুরো একাকী হয়ে যাওয়ার কষ্টই বুঝি আমায় বড় বেশী পোড়াচ্ছিল। “নাজমা কাঁদবেন না প্লিজ। পুরো পৃথিবীতে প্রতিটা মানুষই একা। আমাকে দেখেন, আমার তো আরো অনেক আগেই দুমড়ে মুচড়ে যাওয়ার কথা, তাইনা? কই আমি তো দিব্যি পৃথিবীর বুকে হেঁটে বেড়াচ্ছি। যে জীবন পেয়েছেন তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেন। মানুষকে একটাই জীবন দেয়া হয়েছে। অক্ষমতায় ভেঙে গুঁড়িয়ে যায় ভীতু লোকজন। নিজের মনে সাহস রাখুন।”

……………

নিজ নিজ ভুবনে পুরোপুরি একাকী দুজন মানুষ জলভেজা চোখে বাইরের পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে পার করে দিল অনেকটা সময়। সময়, ভাগ্য তাদের কোথায় নিয়ে যাবে তারা কেউই জানেনা। কিন্তু বেঁচে থাকতে হবে নিজের আপন শক্তিতে নিজের যোগ্যতায় এই কথাটাই বুঝি যার যার মনে বারবার অনুরণিত হচ্ছিল সেই বিকেল বেলায়।

-ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস

চলবে….