অনুধাবন ( ২৯তম পর্ব )

কাল সারারাত বলা চলে অঘুমেই কেটেছে ওয়াদুদের। অনেক চেষ্টা করেও তালুকদারের সেই মেয়ে ঘটিত কাহিনীটির পুরো ঘটনা মনে করতে পারছিল না মাথা। অথচ মেয়েটাকে তুলে আনতে ওয়াদুদই লোক পাঠিয়েছিল। আড়তের কাজে নানা পদের লোক লাগে। ওরা কেউই লম্বা সময় ধরে আড়তে কাজ করেনা। অনেকটাই ভাসমান মানুষের মতো। আসে যায় আসে যায় এরকম। তারপরও খোঁজ লাগালে হয়তো পুরোনো ঐ দুজনের কাউকে না কাউকে পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু তার তো আড়তের ত্রি সীমানায় যাওয়া নিষেধ। কি করা যায় তাহলে? অন্যদিকে কোন বাড়িটা যে ছিল ঐ মেয়েদের তাও মনে পড়ছেনা। অনেক ভেবে মনে হলো আজিজ মিয়ার এখনকার বাড়ির কাছাকাছি কোথাও ছিল বাড়িটা। কাল বাজারের চারদিক ঘুরে দেখবে পুরোনো ঐ লোকদের যদি পাওয়া যায় নয়তো আজিজ মিয়ার সাথেও কথা বলে দেখা যায়। কিছু একটু খুঁজে পেলেই এবার নাটক শুরু করে দেয়া যাবে ইকবালকে দিয়ে। মেয়ের জামাই মেয়েকে শ্বশুরের কুকীর্তি নিয়ে দুটো কথা শোনালেই মেয়ে সুড়সুড় করে বাপের বাড়ি দৌঁড়াবে। কথামত জমি বা সম্পদ না লিখে দিলে সব গোমর ফাঁস করে দেয়া হবে সাথে তালাক এই হবে শর্ত। ভাগ্নে ইকবাল আবার মামার দারুন ভক্ত। ছেলে কথা শুনবে বলেই ওয়াদুদের বিশ্বাস। এই ফাঁকে জমির কাগজ গুছিয়ে উকিলকে দিয়ে একটা মামলা ঠুকে দেয়া। ব্যস এরপর তালুকদার নিজেই দৌঁড়াবে। রতনটা পায়ে পায়ে পিছু সরে না গেলে ব্যাপারগুলো হয়তো আরেকটু সহজ হতো। আসলামের কি অবস্থা কে জানে? থানার মাইর তো মারাত্মক হওয়ার কথা। ঐ বেটা একটু গাধা টাইপ আছে। একটা কাজও যদি ঠিকমত করতে পারে? এতক্ষনে বসে নির্ঘাত শ্বশুরের পায়ে তেল মালিশ করছে।

ঘুম না আসাতে কয়দিন আগে তুলে আনা পশ্চিম পাড়ার জমিগুলার দলিল একটু উল্টে পাল্টে দেখবে ভাবলো ।এই জমিটাই এখন ফাঁকা আছে বিক্রি করার মত। জুয়ার ঠেকে জমে যাওয়া টাকা পরিশোধ না করলে বিপদ হয়ে যাবে। ওদের সাথে ড্রাগওয়ালা লোকগুলোর হাত আছে যারা বেশ বিপজ্জনক লোক। টাকার জন্য মাথা নামিয়ে দিতে এক সেকেন্ড চিন্তা করবেনা। যেরকম একটা সুন্দর প্ল্যান নিয়ে সামনে এগোচ্ছিল ওয়াদুদ তার অনেকটাই তালুকদারের টাকা আর বুদ্ধির মারপ্যাঁচে বানচাল হয়ে গেলেও ওয়াদুদ ছেড়ে দেয়ার পাত্র নয়। এর শেষ ও দেখেই ছাড়বে। বাপের মৃত্যুর পর প্রায় পথে বসা থেকে বাঁচাতে ভূমিকা রাখলেও ওদের ভাগের জমিগুলো তালুকদারের নিজের করে নেয়ার ব্যাপারটা কিছুতেই যে মেনে নেয়া যায়না। -আপনে কি কোথাও বাইর হইতেসেন? -হ একটু বাজারের দিকে যামু। কিছু লাগবো? -হ। ঘরে সদাই পাতি নাই কিছুই। কালকাও কইসি। আপনে লাগে ভুইলা গেসেন। কিন্তু আজকা বাজার না করলে ভাতের লগে খাওনের কিছু নাই। তালুকদারের সাথে সারাদেশে ব্যবসার কাজে ঘোরাঘুরি করায় ব্যস্ত থাকায় বিয়ে শাদীর ব্যাপারটা মাথায়ই ছিলনা ওয়াদুদের। আর তাই বিয়ে করতে একটু বেশ দেরীই হয়েছিল তার। কিন্তু তার বয়সের চেয়ে ঢের কচি মেয়েই পেয়েছিল। তার বৌ বাজার সদাই ছাড়া তেমন একটা বিরক্ত তাকে করেইনা বলতে গেলে। বৌয়ের দিকে তাকিয়ে হঠাৎই ওয়াদুদের মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল আরে এর বাড়ি মানে তার শ্বশুরের বাড়িতো আজিজ মিয়ার কাছাকাছি ছিল। তার বৌ তো ঐ ব্যাপারে জানতেই পারে। সেই সময় ঐ ঘটনা নিশ্চয়ই ওদের গ্রামে আলোড়ন তুলেছিল। -হাসি, তোমারে একটা কথা জিগাই। অনেক দিন আগে তা ধর প্রায় পনের ষোল বছর আগে তোমাগো গ্রামে একটা বিয়াত্তা মাইয়ারে কারা যেন তুইলা নিয়া গেসিল বিয়ার আগে আগে। পরে তারা গ্রাম ছাইড়া চইলা যায়। তোমার কিছু মনে আছে বা শুনছিলা এমন কিছু? স্বামী ওয়াদুদ দারুন ব্যস্ত মানুষ। এতো বছরের বিবাহিত জীবনে কখনোই প্রয়োজনীয় কথার বাইরে তেমন কোন কথা হাসির কাছে আগে জানতে চায়নি। স্বামী তালুকদারের ডানহাত হওয়াতে নিজেদের আশেপাশের বাড়ির বৌ ঝি রা ও হাসিকে বেশ সমীহ করে যেটা হাসি বেশ উপভোগই করে। স্বামীর হঠাৎ এমন প্রশ্নে খানিক চমকে গেলেও নিজেকে সামলে নেয় দ্রুতই। স্বামী নিজে থেকে কিছু জানতে চেয়েছে এই খুশীতেই প্রগলভ হয়ে ওঠে হাসি। যা বলার তো বলে পারলে দু কথা বেশী বলে আর কি। -হ মনে আছে। কিন্তু সে তো ম্যালাদিন আগের কথা। আমরা ছোট আছিলাম দেইখা আমগো সামনে কেউ তেমন কিছু কইতো না। ওনার নাম আছিল খুব সম্ভবত আমেনা। ওনারা শহরে গেছিল গা তারপরে। গ্রামের মাইনষে নানা কথা কইতো। উনি পরে নাকি ফাঁস নিছিলো শহরে। -তার বাপ মা কেউ কই আছে কিছু কইতে পারো? -তা তো পারুম না। আমার বাপের বাড়ির কয়েক ঘর পরেই আছিল তাগো ঘর। পরে বেঁইচা দিসিলো শুনসি। তয় আপনের লগে যে কাম করে আজিজ মিয়া ওনার কেমন কেমন জানি আত্মীয় লাগে ওনারা। সম্ভবত ওনার শ্বশুর পক্ষের আত্মীয় তারা। ওনারে জিগাইলেই হদিশ পাইবেন লাগে। কিন্তু এতোদিন বাদে ওনাগো দিয়া কি কাম? -তা যদি তুমি বুঝতা হাসি, তাইলে তো হইসিলো ই। বলে আর এক মুহূর্ত ঘরে দাঁড়ায় না ওয়াদুদ। যা করার দ্রুত করতে হবে, তালুকদার নতুন কোন প্যাঁচে ফেলার আগেই। নিজের ঘরের মধ্যে এতো খবর রেখে রাজ্যের মানুষকে খুঁজতে বের হইসিলো ভেবে নিজের মনেই হেসে ওঠে ওয়াদুদ। বাজারে না গিয়ে একবার আজিজ মিয়ার বাড়ি ঘুরে যাওয়াটাই মনস্থ করে। আজিজ মিয়া অবশ্য খুব সকালেই কাজে চলে যায়। সেটা একদিকে ভালোই হবে। তার বৌয়ের সাথে কথা বলে দেখা যায় কিছু বের করা যায় কি না?

আজিজ মিয়া বয়সে তার অনেক বড় হলেও তার বৌ কে ভাবি ডাকাটাই যুক্তিযুক্ত মনে হলো ওয়াদুদের। বাড়ির উঠোন থেকেই হাঁক দিল ওয়াদুদ। -আজিজ ভাই বাড়িত আছোনি? আমি ওয়াদুদ।গতদিন শহর থেকে ফেরার পর থেকেই আজিজ মিয়ার শরীর খারাপ। আজ তাই আর কাজে যাওয়া হয়নি। বাইরে ওয়াদুদের গলা শুনে একটু অবাকই হলো।নিজে তালুকদারের ডানহাত হওয়াতে ওয়াদুদ সবসময় একটু ভাবেই চলতো। বাকিদের তেমন একটা পাত্তা দিয়ে কথা কখনোই বলতো না। তালুকদার ছাঁটাই করে দেয়াতে বুঝি কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। কোনরকমে গায়ে পাঞ্জাবীটুকু গলিয়ে বাইরে বেরোতে বেরোতে আজিজ মিয়া সিদ্ধান্ত নিলেন ওয়াদুদকে কোনরকম পাত্তাই উনি দেবেন না। -আরে ওয়াদুদ যে। এই অবেলায় আমার বাড়িতে? তুমি জানলা কেমনে আমি আইজ বাড়িতে? -আন্দাজেই যে এসেছে সেটা লুকিয়ে রেখেই জবাব দিল ওয়াদুদ। -মনের টান গো ভাই, মনের টান। আপনে এই বেলা বাড়িত কেন সেইটা কন, শরীর খারাপ? -এই আছি আর কি। তা কি কারণে আসছো ওয়াদুদ? কোন সমস্যা? -না তেমন কিছুনা। এই পথে যাইতাসিলাম ভাবলাম দেখা করি। আইজ আসি তাইলে। আজিজ মিয়ার শরীরী অবয়বে কিছু একটা ব্যঙ্গ ছিল যা এতোদিন মানুষ চরানো ওয়াদুদ খুব ভালোই বুঝতে পারে। এখান থেকে কোন কথা বের করতে পারবে না বুঝেই বেরিয়ে এসে রওয়ানা দেয় তার শ্বশুরবাড়ির দিকে।

তালুকদার বাড়িতে আজ সকালবেলা সবাই একসাথে দীর্ঘদিন পর নাস্তা খেলেও তালুকদারের মন পড়ে ছিল অন্যখানে। খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছিলেন নতুন কোন ফন্দি অবশ্যই আঁটছে ওয়াদুদ। ও কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওর নামে কেইস না দিয়ে দিতে পারলে অন্য কোনদিক থেকে ঝামেলা হাজির হতে দেরী হবেনা। আসলামের সরিয়ে নেয়া হিসাবের কাগজ রতনের হাতে দিলেও দিনশেষে ওয়াদুদ কাগজগুলো তার কাছে নেয় পরবর্তীতে কাজে লাগবে বলে। রতন এ কথা জানানোর পরেই তালুকদার ভাবলেন আপাতত কেস শুরু করে দেওয়ার জন্য এটা একটা ভালো বুদ্ধি হতে পারে। মূল্যবান কাগজ ও নথি সরানোর মামলাতে ওয়াদুদকে আপাতত জেলে ঢুকানোর চিন্তাই তিনি করলেন। থানার লোকজনতো ওনার পক্ষেই আছে কাজেই খুব একটা ঝামেলা হওয়ার কথা না। নাস্তা শেষ না হতেই রতনকে নিয়ে তিনি ছুটলেন তাই থানার পথে। থানায় অবশ্য ওনার জন্য আরেকটা খবর অপেক্ষায় ছিল। অফিসার জানালেন, তদন্তে তালুকদারের ব্যক্তিগত অফিসে প্রবেশের দরজা কেউ খোলার চেষ্টা করেছিল এরকম একটা ব্যাপার ও আছে। রতন গুদামের কাছাকাছি, আসলাম তালুকদারের বাসায় থাকলে তৃতীয় ব্যক্তি যে এই ওয়াদুদ তা খানিকটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে তালুকদার সাহেবের আজকের অভিযোগে। রতনের কপালও কুঁচকে যায় কারণ এ ধরনের কোন কথা ওয়াদুদ তাকে জানায়নি।

শ্বশুরবাড়ি থেকে প্রয়োজনের বেশী তথ্য নিয়েই ফেরে ওয়াদুদ। এখন পালা শহর থেকে আমেনার বাবা মা কে খুঁজে বের করা। আজ রাত বাড়ি থেকে কাল সকালেই বৌ বাচ্চাকে শ্বশুরবাড়ী নামিয়ে দিয়ে নিজে শহরে যাবে এ ধরনের পরিকল্পনা করতে করতে ব্যাপক খুশী মনে বাড়ি ফেরে ওয়াদুদ। রাতের খাবার শেষ না হতেই ঘরের দরজায় করাঘাত। দরজা খুলে এঁটো হাতেই বেরিয়ে আসে ওয়াদুদ। তার যে জানা ছিলনা বাইরে ওয়ারেন্ট হাতে পুলিশ দাঁড়ানো। আরো একবার তালুকদারের বুদ্ধির কাছে হেরে যেতে হলো ওয়াদুদকে।

-ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস

চলবে……