অপেক্ষার ব্যালকনি

আমার পূবের জানালা থেকে শারমিনদের ব্যালকনি দেখা যায়। খুব বেশি কাছাকাছি ও নয় আবার দূরে ও নয়। যদিও আমি আজই ওর নাম জেনেছি। ওর বড় বোন ডাকছিলেন।
– শারমিন, লাইটিং এর লোকেরা এসেছে। ব্যালকনিটা দেখিয়ে দে।
আজ শারমিনের বিয়ে। ওদের বাসা চার তলায়। শুধু ব্যালকনি লাইটিং হবে। কারন দুপাশেই বাড়ি রয়েছে। ভালই হয়েছে, খরচ বেঁচে গেছে। খরচের ভয়ে কালকের গায়ে হলুদটা একেবারে ঘরোয়া ভাবে হয়েছে। মেয়েটার মাত্র মাস্টার্স শেষ হয়েছে। কোথায় এখন একটা ভাল চাকরির খোঁজ করবে,তা না করে এখনই একরকম জোর করে ওর বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু শারমিন কি করবে। ও তো একটা মেয়ে। একটা মেয়ের আর কি বা করার থাকতে পারে। আর ছেলে ওর খালাত ভাই এর বন্ধু। ভাই এর সাথেই ইটালি থাকে, গত ১৭ বছর। বয়েসটা একটু বেশি। পড়াশুনায় তেমন ভাল নয়। তবে বেশ টাকা পয়সার মালিক। মাথায় সামান্য চুল কম। তাতে কি আসে যায়। ছেলের টাকা আছে তাই ওর মা আর ছেলেটাকে হাত ছাড়া করতে চায় নি।
শারমিনের প্রচণ্ড মন খারাপ। কিন্তু কাউকে বুঝতে দিচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর পার্লারে যাবে। এই সময়ে মন খারাপ করলে ওরই ক্ষতি। এই ছেলে টাকে ওর বেজায় অপছন্দ। যে দিন বিয়ে ঠিক হয় ওই দিন রাতেই মাসসেঞ্জার এ খোলা বুকের ছবি চেয়ে ছিল। যদিও ও দেয়নি। তবু সে কি জোড়াজুড়ি। বলে কিনা, বিয়ের পর তো সব তারই। ওই লোকটার কথা যত বারই মনে পড়ছে, মেজাজ গরম হচ্ছে। ততবারই রাসেল এর কথা মনে পরে মনটা আর বেশি খারাপ হচ্ছে।
রাসেল।।
ওর সব থেকে ভাল বন্ধু। ওরা দুজনই দুজনকে অনেক ভালোবাসে, তবে কখন ও কেউ কাউকে বুঝতে দেয় নি। গত ৫ বছর পাশাপাশি থেকেছে। শুধু যখনই বিয়ে ঠিক হওয়ার কথা রাসেলকে বলেছে। ও বলেছিল অন্তত একটা বছর সময় দে, তারপর সিধান্ত নে। কিন্তু পাত্র হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে, বাবা মা দেরি করতে চাইল না। সেদিন থেকে গাধাটার ফোন বন্ধ। কোন বন্ধুরাও ওর খবর জানে না। গত পনের দিন অনেক খুজেছে। একদিকে রাসেলের নিরুদ্দেশ অন্য দিকে মায়ের জোড়াজুড়ি। কিই বা করার আছে। এমন অনেকটা এলোমেলো ভাবনা ভাবতে ভাবতে ব্যালকনির দিকে যেতেই, খুব পরিচিত একটা গলা …
– তো বিয়েটা করেই ফেলছিস ? দাওয়াত টাও দিলি না।
– তুই এখানে ??!
– ভাবলাম, তোর বিয়ে আর আমি আসব না। তাই তো বুদ্ধি খাটিয়ে এদের সাথে ঢুকে গেছি। যদিও এদের দুজনকে ৩০০ টাকা দিতে হয়েছে।
– তোর ফোন বন্ধ কেন ?
– খোলা রেখে লাভ কি হত ? বিয়ের দাওয়াত দিতি ?
– আমার আর কি করার ছিল?তুই হাওয়া,বাসার চাপ।
– তো,সব ঠিক ঠাক ? চোখ ছলছল কেন? জানিস তো,পার্লারে যাবার সময় মন খারাপ করতে নেই তাতে মেকাপ খারাপ হওয়ার সম্ভবনা আছে। আর মানুষের মন খারাপ মেকাপ দিয়ে ঢাকা যায় না।
– এই সময়েও তোর ইয়ার্কি করতে ইচ্ছা করে !!
– বুঝতে পারছি না। কি করা উচিত!
– কেন এসেছিস ?
– তোকে ফেরাতে।
– এত দিন আসিস নি কেন ?
– হাতে টাকা ছিল না।
– এখন আছে ?
– হুম।
– কত টাকা ?
– ৩৫০০।
– কই পেলি।
– মোবাইল বিক্রি করেছি।
– কেন ?
– তোকে বিয়ে করব, তাই।
– বিয়ে করে খাওয়াবি কি ?
– দুইটা টিউশনি জোগাড় হয়েছে। হাজার দশেক হবে। বাকিটা পরে দেখা যাবে।
– বের হব কিভাবে ? পার্লারে যাবার সময় আপু যাবে সাথে।
– তো ?
– পার্লার থেকে আসার পর কিছু একটা করতে হবে ।
– হুম। যেভাবেই হোক!!! এখন বের হই। অনেক কাজ আছে। বন্ধুদের খবর দিতে হবে। তুই কিন্তু ঠিকঠাক হয়ে থাকিস।
– সাবধানে যাস। আর হ্যাঁ,ওরা আসার আগে আসবি। ওরা কিন্তু সাড়ে নয়টার মধ্যে এসে পরবে।
– আচ্ছা। আর, ভয় পাবি না ।
রাত ৮.৩০ বাজে। যদিও বাসার মধ্যে খুব বেশি লোক নেই। কিছু ছোট বাচ্চারা ছুটোছুটি করছে। ছাদে প্যান্ডেল করা হয়েছে ছোট করে। একটা বোরখা জোগাড় হয়েছে। কেমন একটা উত্তেজনা কাজ করছে। পারবে তো ? বাবা ফোন দিয়েছে বর পক্ষকে। ওরা রওনা দিয়েছে। এক ঘণ্টার পথ। তবে রাস্তায় বেশ ভালই জ্যাম আছে। পৌঁছুতে কিছু দেরি হতে পারে। মাঝে মাঝে ঢাকার জ্যাম অনেক কাজে দেয়। ও কয়েকবার উঠে ব্যালকনিতে গিয়েছে। মাকে বলেছে, বসতে বসতে ওর পা ব্যথা করছে। তাই একটু হাঁটাহাঁটি করছে। ওর মায়ের ওর দিকে খেয়াল নেই। মেয়ের বিয়ে। অনেক দায়িত্ব।
আজ শারমিনের বিয়ে। শারমিন একটু পর পর ব্যালকনি দিয়ে রাস্তায় উঁকি দিচ্ছে। গাধাটা আসছে না কেন? আমিও বারবার আমার জানালা দিয়ে ব্যালকনিতে উকি দিচ্ছি। শারমিনের চোখ রাস্তায়, আমার চোখ ব্যালকনিতে। কি অদ্ভুত, আমরা দুজন এই মুহূর্তে একই ভাবনা ভাবছি।
গাধাটা আসছে না কেন ?
কখন আসবে ?
আসবে তো ????
রিয়াদ রানা