অপেক্ষা ( ৫ম এবং শেষ পর্ব)

আহমেদ মামা নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত বাংলা পত্রিকা ‘সাপ্তাহিক ঠিকানা’র পুরনো কয়েকটা সংখ্যা সাথে করে নিয়ে এসেছেন। তিনি পত্রিকা থেকে গ্রীনকার্ড সংক্রান্ত কিছু খবর বের করে শরীফকে দেখিয়ে বললেন, ‘স্বামীর স্পন্সর নিয়ে আমেরিকায় এসে গ্রীনকার্ড হাতে পেয়ে স্ত্রীর চলে যাবার ব্যাপারে এখানে বেশ কয়েকটা প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। এখান থেকে একটির কিছু অংশ আমি তোমাকে পড়ে শোনাচ্ছি। ইন্টারেষ্টিং ইনফরমেশন। আই থিঙ্ক, ইউ উইল ফাইন্ড ইয়োর আনসার।’

মামা পড়া শুরু করলেন–
‘দীর্ঘদিন প্রবাসে থেকে দেশে গিয়ে একেবারেই অপরিচিত কাউকে বিয়ে করা, বয়সে অনেক কম মেয়েকে বিয়ে করা, ছেলের চেয়ে মেয়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা বেশি হওয়া, বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে আসার আগে স্বামীর জীবন-যাপন সম্পর্কে যে ধরনের ধারনা থাকে বাস্তবে তার মিল খুঁজে না পাওয়া ইত্যাদি অনেক কারনে ইমিগ্রান্ট হয়ে আমেরিকায় আসার পর পরই স্ত্রীর চোখ-কান খুলে যায় কিংবা নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখা পুরুষের জন্যে হৃদয়টা আকুলি বিকুলি করে।’

মামা একটা বিরিতি নিয়ে কফির কাপে চুমুক দিলেন। শরীফ কিছুটা বিরক্ত আবার কিছুটা আগ্রহ নিয়েই মামার পড়া শুনতে থাকল। মামা আবার শুরু করলেন, ‘আবার উল্টোটাও ঘটেছে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতেও যায়নি, কিংবা কালচার সম্পর্কে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারেনি—এমন নিউলি ম্যারেড হঠাৎ করে আমেরিকান কালচারে এসে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারে না। আমেরিকানদের মত হতে চায়। এ কারনেও স্বামীর সাথে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়। স্বামীর বন্ধুর প্রতি দৃষ্টি পড়ে। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরনের জন্যে দেশে গিয়ে হুট করে বিয়ে করা কিংবা টেলিফোনে বিয়ে করার মনোভাব পরিবর্তন করা উচিত।’

আরেক দফা পড়া থামিয়ে মামা কফির কাপে আরেকটা চুমুক দিয়ে শরীফের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কিছু বুঝলে?’

শরীফ বোঝার চেষ্টা করল। অন্তত দুটো কারনে রুবিনা ওকে ছেড়ে চলে যেয়ে থাকতে পারে। অনেক্ষন চুপ থেকে অন্যমনষ্ক ভাবে সে নিজের মনেই জিজ্ঞেস করল, ‘আমি এখন কি করব?’

মামা যেন ওর মনের কথা বুঝতে পেরেই বলল, ‘অপেক্ষা।’

‘জ্বি?’

‘এখন তোমার অপেক্ষা করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।’

শরীফ ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকাল মামার দিকে।

মামা ব্যাখ্যা করে বললেন, ‘রুবিনা যদি ফিরে আসে, তাহলে সে আর কোনোদিনও তোমাকে ছেড়ে যাবে না। হান্ড্রেড পার্সেন্ট। আর যদি ফিরে না আসে, তবে তোমাকে তোমার ভাগ্যকেই মেনে নিতে হবে।’

এরপরে মামা আরো অনেক কথা বললেন। যুক্তি দিয়ে বোঝালেন। আহমেদ মামা অনেক ভাল যুক্তি দিয়ে বোঝাতে পারেন। অভিজ্ঞতারও একটা ব্যাপার আছে। উনি যুক্তি দিয়ে একপর্যায়ে শরীফকে প্রায় বুঝিয়ে ফেলেছিলেন যে রুবিনাকে ওর ডিভোর্স করাই উচিত।

‘আমার কথা গুলো ভেবে দেখো।’ যাবার সময় শরীফকে মনে করিয়ে দিলেন।

‘জ্বি মামা, ভেবে দেখব। অবশ্যই ভেবে দেখব। আপনার একটা কথাও ফেলে দেবার মত না।’

মামা খুশী হয়ে বললেন, ‘এনি হেল্প, জাস্ট লেট মি নো। ডোন্ট হেজিটেট টু কল মি।’

‘আমি অবশ্যই কল করব। আপনি ভাববেন না।’

মামাকে বিদায় দিয়ে ফিরে এসে শরীফ আবার ব্যাকইয়ার্ডের ছাতার নিচে এসে বসল। হঠাৎ লক্ষ্য করল পত্রিকা গুলো মামা নিয়ে যেতে ভুলে গেছেন। নিশ্চয়ই এগুলো ফেরত নিতে উনি আরেকবার আসবেন। হয়ত ইচ্ছে করেই ফেলে গেছেন। ভাবতে ভাবতেই শরীফ একটি পত্রিকা খুলে মামার পড়ে শোনানো প্রতিবেদন গুলো খুঁজে খুঁজে আবার পড়ল।

রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে শরীফ অনেক কিছুই ভাবল। রুবিনাকে একবার ফোনও করল। রুবিনা অবশ্য ফোন ধরেনি।

নিজের সংগে অনেক বোঝা পড়া করেও শেষ পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারল না সে। একবার ভাবল, ঠিক আছে আমি অপেক্ষাই করব। দেখি সে ফিরে আসে কিনা। আবার পরক্ষনেই ভাবল, যে চলে গেছে তাকে নিয়ে আর ভেবে কি লাভ।

শরীফ আপন মনেই ভেবে চলল, ‘আমি জানি তুমি ভাল থাকতে পারবে না। আমি যদি তোমাকে ক্ষমা করেও দেই, আমার প্রতিটা দীর্ঘশ্বাস তোমাকে কখনোই ক্ষমা করবে না রুবিনা। এটা কোনো অভিশাপ না, এটাই প্রকৃতির হিসাব। কাউকে কষ্ট দিয়ে কেউ ভাল থাকতে পারে না। তুমিও পারবে না।’

তারপরেই সে ভাবল, ‘রুবিনা তো আমাকে ভালবাসে না। ওর ভালবাসার মানুষ আছে। কে জানে এখন হয়ত সে তার ভালবাসার মানুষটির বাহু বন্ধনেই ঘুমিয়ে আছে। তবে কেন শুধু শুধু অপেক্ষা? শুধু শুধু তার কথা ভেবে নিজেকে কেন কষ্ট দেয়া। ওহ গড, গিভ মি সাম স্ট্রেনথ !’

শরীফ আর কিছুই ভাবতে পারে না। তার কষ্ট গুলো নিরবে গুমরে কাঁদে।

সোহেল আজ দিনের শিফটে ক্যাব চালাচ্ছে। দুপুরের দিকে সে একজন প্যাসেঞ্জার নিয়ে লাগোর্ডিয়া এয়ারপোর্ট অভিমুখে যাচ্ছিল, তখন রুবিনার ফোন এলো। সে ফোন ধরতেই রুবিনা বলল, ‘এই শোন, আমার রান্না প্রায় শেষ। তুমি কিন্তু তাড়াতাড়ি চলে এসো। একসাথে খাবো। আজ তুমি আমাকে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখাতে নিয়ে যাবে বলেছিলে। মনে আছে?’

‘হ্যাঁ মনে আছে। আমি তাড়াতাড়ি চলে আসব।’

‘কতক্ষন লাগবে?’

‘এই তো সব মিলিয়ে ঘন্টা খানেক।’

‘ফেরার পথে আবার কোনো প্যাসেঞ্জার তুলো না কিন্তু।’

সোহেল হেসে দিয়ে বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে।’

লাগোর্ডিয়া এয়ারপোর্টে প্যাসেঞ্জার নামিয়ে দিয়ে সোহেল তার ক্যাবের উইন্ডশিল্ডে ‘নট ফর হায়ার’ সাইনটি লাগিয়ে দিল। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে সে যখন বাসার দিকে ফিরে আসছিল ঠিক তখনই আরেকটা ক্যাব সোহেলের এপার্টমেন্টের সামনে এসে থামল। ক্যাব থেকে নেমে আসল একজন হিস্প্যানিক শ্বেতাংগিনী। ছোট্ট একটা ট্রাভেল ব্যাগ নিয়ে সে ঢুকে পড়ল এপার্টমেন্ট বিল্ডিং এর সদর দরজা দিয়ে।

সোহেলের আসতে যেহেতু ঘন্টা খানেক দেরী আছে, এই ফাঁকে রুবিনা গোসলটা সেরে নিল যাতে সে তৈরী হয়ে থাকতে পারে। কাপড় বদলে বাইরে যাবার জন্যে তৈরী হয়ে রুবিনা যখন বেডরুম থেকে বের হয়ে আসবে ঠিক তখনই সে শুনতে পেল দরজা খোলার শব্দ। সে অবাক হয়ে ভাবল সোহেল এত তাড়াতাড়ি চলে এলো? এখনও তো আধ ঘন্টাও হয়নি। সে খুশি মনে রুমের বাইরে এসে দেখল সুন্দর মুখের একটি অপরিচিত মেয়ে লিভিং রুমে দাঁড়িয়ে আছে।

‘কে আপনি? এখানে কিভাবে এলেন?’ কিছুটা থতমত খেয়ে রুবিনা জিজ্ঞেস করল।

‘Excuse me!’ অপরিচিত মেয়ে না বোঝার দৃষ্টিতে তাকাল রুবিনার দিকে।

রুবিনা বুঝতে পারল যার সংগে সে কথা বলছে সে হয়ত বাংলা বুঝে না। সে বাঙ্গালী নয়। চেহারা এবং বেশভূষায় আমেরিকার শ্বেতাঙ্গদের মতই দেখতে। তাই সে এবার ইংরেজীতে জানতে চাইল, ‘Who are you? How did you get in here?’

‘I’m Gabie. Gabriela.’

‘So, Gabie- let me ask you again, how did you get in here?’

‘With my key!’

‘With your key? You’ve a key of this apartment?’

‘It’s my apartment.’

‘What?’

‘I live here. I share this apartment.’

‘What are you talking about?’

রুবিনা আর কোন কথা বলতে পারল না। আকাশ পাতাল চিন্তা তার মাথায় ভেঙ্গে পড়ল। কিছুতেই সে মেলাতে পারছে না। কি হচ্ছে এসব?

‘You didn’t tell me your name. Who are you?’

গ্যাব্রিয়েলার প্রশ্ন শুনে রুবিনা তার দিকে কিছুক্ষন ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, ‘I’m nobody!’

এক ধরনের অস্বাভাবিক চিন্তা রুবিনাকে গ্রাস করল। আকাশ-পাতাল ভাবছে সে। গ্যাব্রিয়েলার সাথে কিসের সম্পর্ক সোহেলের। সম্পর্ক যাই হোক, সোহেল কেন তাকে কিছুই জানায়নি। গ্যাব্রিয়েলা বলছে সে এপার্টমেন্ট শেয়ার করে, এ কথার মানে কি?

রুবিনা তো তার কোন কথা কখনোই লুকায়নি। তাহলে সোহেল কেন বলল না?

এর পর একটা দীর্ঘ সময় কেটে গেল এক ধরনের অস্বস্তিকর নীরবতায়।

ইতমধ্যেই সোহেল ফিরে এলো। সে রুমে ঢুকেই দেখল, গ্যাব্রিয়েলা দাঁড়িয়ে আছে।

রুবিনা সোহেলের দিকে তাকাল অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে।

গ্যাব্রিয়েলা ছুটে এসে সোহেলকে জড়িয়ে ধরে গভীরভাবে চুম্বন দিল। ‘I missed you honey. I missed you so much!’

উচ্ছস্বিত গ্যাব্রিয়েলা রুবিনার উপস্থিতিকে পাত্তা না দিয়ে আবারো সোহেল কে কয়েকবার চুমু দিল।

সোহেল অপ্রস্তুত ভাবে গ্যাব্রিয়েলাকে ছাড়িয়ে নিল। তারপর অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল রুবিনার দিকে।

রুবিনা নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। সে বুঝতেও পারল না কিছু। তার হৃদপিন্ডের কম্পন বেড়ে গেল। মুহুর্তেই দুনিয়াটা যেন তার অন্ধকারে ঢেকে গেল।

কিচ্ছুক্ষন চিন্তা করার পর রুবিনা সিদ্ধান্ত নিল যা করার তাকে এখনই করতে হবে। সে দ্রুত বেডরুমের ভেতরে ঢুকে গেল।

সোহেল রুবিনার পিছে পিছে যেতে চাইলে গ্যাব্রিয়েলা তাকে জড়িয়ে ধরেই জিজ্ঞেস করল, ‘Is that your cousin sister you told me about? She seems upset. Where’s her husband?’

সোহেল কিছু বলার আগেই রুবিনা তার স্যুটকেস নিয়ে বের হয়ে আসল।

সোহেল অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘Where are you going?’

রুবিনা সে কথার কোন উত্তর না দিয়ে এপার্টমেন্টের দরজা খুলে বের হয়ে গেল।

সমস্ত ঘটনা এত দ্রুত ঘটল যে কিছু বুঝে উঠার আগেই সোহেল দেখল রুবিনা নেই। সে দৌঁড়ে নিচে নেমে গেল রুবিনাকে থামানোর জন্যে।

রুবিনা নিচে নেমেই দেখল একটা ক্যাব দাঁড়িয়ে আছে। সম্ভবত গ্যাব্রিয়েলা যে ক্যাব নিয়ে এসেছিল–চালক তাকে নামিয়ে দিয়ে পরের প্যাসেঞ্জার ধরার জন্যে অপেক্ষা করছিল।

রুবিনা এগিয়ে যেতেই সোহেল তার পথ আগলে দাঁড়িয়ে বলল, ‘রুবিনা, প্লিজ গিভ মী এ চ্যান্স টু এক্সপ্লেইন।’

‘এক্সপ্লেইন? কি এক্সপ্লেইন করবে তুমি সোহেল? তোমাকে আর কিছুই এক্সপ্লেইন করতে হবে না।’

‘এটা খুবই স্বাভাবিক। তুমি বুঝতে ভুল করছ।’

‘আমি আর কিছুই বুঝতে চাই না। আমার যা দেখার দেখেছি, যা বোঝার বুঝেছি, এবং যা শোনার শুনেছি। নিজের চোখকে তো আর অবিশ্বাস করতে পারব না।’

সোহেল রুবিনার হাত ধরার চেষ্টা করল।

রুবিনা তাকে কঠিন কন্ঠে বলল, ‘ইয়্যু আর এ লায়ার। আমার ভাবতে কষ্ট হচ্ছে।’ তারপর হতাশ কন্ঠে বলল, ‘আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম, সোহেল!’ বলেই রুবিনা দ্রুত অপেক্ষারত ক্যাবে চড়ে বসল।

রুবিনার কন্ঠে এমন কিছু ছিল যে সোহেল আর কিছুই বলতে পারল না। সে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

ক্যাব চালক ঠিকানা চাইলে রুবিনা কিছু বলতে পারল না। তার দুচোখ ছল ছল করছে। নিউইয়র্কের ক্যাব চালকরা এমন দৃশ্যের সাথে খুবই পরিচিত। চালক কোনো কথা না বলে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল বড় রাস্তার দিকে। তারপর হারিয়ে গেল ব্যস্ত নগরীর ব্যস্ত রাস্তার ভীড়ে।

হঠাৎ করেই আকাশে মেঘ করেছে। যেকোন সময় বৃষ্টি নামতে পারে। নিজের দুই চোখে হালকা জ্বালা অনুভব করছে রুবিনা। বাঁধ ভাঙ্গা এক বুক কষ্ট যেন বের হয়ে আসতে চাইছে তার বুকের ভিতর থেকে। চিৎকার করে সেই জ্বালা মিটাতে ইচ্ছে করছে। দুচোখ বেয়ে নেমে আসল নোনা জলের ধারা।

নিউ ইয়র্কের আকাশে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আজ জমাট বাঁধা সব কষ্ট যেন আকাশের কান্না হয়ে ঝরে পড়ছে। অঝোর ধারায়, নোনাজলের ধারায় হারিয়ে যাচ্ছে জলে জলে মিতালি করে। সেই সাথে ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে রুবিনার অন্তরে লুকিয়ে থাকা সকল নোংরা-আবর্জনা।

কিছু স্বপ্ন হারিয়ে যায়, এভাবেই!

কিছু অপেক্ষার অনন্ত প্রহর কখনই শেষ হয় না।

(শেষ হলো অপেক্ষা’র গল্প)

 

ফরহাদ হোসেন
লেখক-নির্মাতা
ডালাস,টেক্সাস