অপেক্ষা (১ম পর্ব)

ভূমিকাঃ

রচনা কালঃ জুলাই ২০০৮ ( সময়ের ব্যবধানে বিষয়বস্তুর প্রাসংগিকতা হয়তো বদলে গেছে, কিন্তু গল্পে রস আস্বাদনে বেগ পেতে হবে না। তাছাড়া অনেক সময় পুরনো গল্প শুনতেও ভাল লাগে। সেই ভরসায় শেয়ার করলাম পাঠকদের জন্যে। আশাকরি আপনাদের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটবে না।)

শুরুঃ

সায়াহ্নের আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। সূর্যটা ডুবে যাচ্ছে খুব দ্রুত। চারিদিকে অন্ধকার নেমে আসছে। দমকা বাতাস বইতে শুরু করেছে। যেকোন সময় শুরু হবে ঝমঝম বৃষ্টি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত শহর শিকাগোর একটি উপশহরের লেক সংলগ্ন দোতলা, বাংলো টাইপের সুন্দর পরিচ্ছন্ন একটি বাড়ির ড্রাইভওয়েতে একটি গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত ভেতরে প্রবেশ করল যে ব্যাক্তিটি তার নাম শরীফুল আলম।

শরীফুল আলম আমেরিকায় আছে গত প্রায় বিশ বছর ধরে। পেশায় একজন সফল ইঞ্জিনীয়ার। সময়ের ব্যবধানে ইতিমধ্যেই জীবন থেকে সাতচল্লিশটি বসন্ত চলে গেছে। দীর্ঘদিন একাকীত্বের জীবন কাটিয়ে সে অনুধাবন করে, তার জীবনে এখন একজন সঙ্গী দরকার। অবশেষে দেশে গিয়ে শরীফ বিয়ে করেছে চব্বিশ বছর বয়সের রুবিনাকে।

রুবিনা আমেরিকায় এসেছে মাত্র চার মাস হলো। এখনো সবকিছু নতুন তার কাছে। তবে স্মার্ট মেয়ে রুবিনা অতি দ্রুত সবকিছুর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেবার চেষ্টা করছে।

রাত বাড়ার সাথে সাথে বাতাসের বেগ বাড়তে থাকল। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে ঘন ঘন। মাষ্টার বেডরুমের বিছানায় বসে রুবিনা টিভির দিকে তাকিয়ে আছে। টিভিতে ঝড়ের সতর্কবানী দিচ্ছে। পাশে শুয়ে আছে শরীফ, নির্বিকার। খবরে তার কোন আগ্রহ নেই। রুবিনা তার দিকে ঘুরে ভীত কন্ঠে বলল, ‘আমার ভয় লাগছে।’

খোলা জানলা দিয়ে হাওয়া ঢুকে পর্দা নাড়িয়ে দিচ্ছিল। শরীফ উঠে গিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। তারপর জানালা বন্ধ করে এসে আবার শুয়ে পড়ল। রুবিনার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভয়ের কিছু নেই। টর্নেডো, টুইষ্টার এগুলো কিছুই না। সামান্য বাতাস বইছে আর তাতেই টিভিতে একেবারে সতর্কবাণীর ঝড় বইয়ে দিচ্ছে। সবকিছুতেই এদের বাড়াবাড়ি।’

শরীফ রিমোটটা নিয়ে টিভি বন্ধ করে দিল। তারপর বেডসাইড টেবিলে রাখা এলার্ম ঘড়িতে সকাল ছ’টায় এলার্ম সেট করে রুবিনার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এসো ঘুমিয়ে পড়ি।’ বলেই শরীফ বেডলাইটের সুইচ বন্ধ করে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল এবং প্রায় সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়ল।

রুবিনার চোখে ঘুম নেই। সে তাকিয়ে থাকে অন্ধকারে। ডিজিটাল ঘড়িতে সময় জ্বলজ্বল করছে। রাত মাত্র দশটা।

আমেরিকায় আসার পর থেকেই রুবিনার ঘুমের সমস্যা দেখা দিয়েছে। প্রথমে ভেবেছিল রাত দিনের পার্থক্য তাই এমন হচ্ছে। কিন্তু একদিন একদিন করে চার মাস হয়ে গেল, রুবিনা ঘুমাতে পারে না। রাত যখন প্রায় শেষ হতে থাকে তখন তার অবসাদ গ্রস্থ ক্লান্ত শরীর ঘুমে আক্রান্ত হয়, আর ঠিক তখনই ঘড়ির এলার্ম বেজে উঠে। শরীফের অফিসে যাবার সময় হয়ে যায়।

রুবিনা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত এগারটা বেজে পঞ্চাশ মিনিট। গত প্রায় দু’ঘন্টা ধরে সে বিছানায় বসে রয়েছে। অনেকবার শরীফের দিকে তাকিয়ে দেখেছে, স্বামীর সাইনবোর্ড ধারী মানুষটি কেমন নির্লিপ্ত ভাবে ঘুমাচ্ছে। সে উঠে গিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে দিল। বাইরে তাকিয়ে দেখল ঝড়ের তীব্রতা অনেকটা কমে গেছে। তবে বৃষ্টি হচ্ছে মুষলধারে। রুবিনা তাকিয়ে থাকে অকম্পিত দৃষ্টিতে সমুখপানে রাতের প্রহরজুড়ে। জীবনের মোড় কীভাবে ঘুরে যায় তা কেউ কখনো কল্পনাও করতে পারে না। রুবিনাও পারেনি।

কত সময় পাড় হয়েছে সে নিজেও জানেনা। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল ঘড়ির দিকে। ভোর পাঁচটা। ঝড়ের তীব্রতা আরো খানিকটা কমে গেছে। বৃষ্টিও থেমে গেছে অনেকক্ষন হয়। রুবিনা ধীর পায়ে শরীরটাকে প্রায় জোড় করেই টেনে নিয়ে গেল বিছানায়। নরম বিছানায় নিজেকে এলিয়ে দিয়ে আস্তে করে ব্লাঙ্কেটের খানিকটা টেনে নিল শরীফের গা থেকে। তারপর একসময় ক্লান্তিতে শিথিল হয়ে এলো তার শরীর। চোখ দুটি বন্ধ হয়ে এলো ঘুমে।

ঘন্টার কাঁটা সকাল ছ’টায় স্পর্শ করতেই তীক্ষ্ণ শব্দে এলার্ম বেজে উঠে। শরীফ চোখ না খুলেই ক্ষিপ্রতার সাথে এলার্মে সুইচ বন্ধ করে দেয়। কিছুক্ষন শুয়ে থেকে অলসতা কাটানোর চেষ্টা করে। তারপর বিছানা ছেড়ে হাই দিতে দিতে দ্রুত ঢুকে পড়ে মাষ্টার বেডরুমে লাগোয়া বাথরুমের ভিতর। ঢুকেই বেসিনের কল ছেড়ে দেয় সে। শব্দ করে মুখ ধোয়। শুকিয়ে যাওয়া কাশি উপরে টেনে নিলে যেমন শব্দ হয়, ঠিক সেইরকম একধরনের অদ্ভুদ শব্দ করে শরীফ। শেভ করার সময় রেজার দিয়ে বেসিনে খট খট করে রেজার পরিষ্কার করে। সবশেষে টয়লেটের কাজ শেষ করে ফ্ল্যাশ টেনে শরীফ বাথরুম থেকে বেড় হয়ে দেখে রুবিনা তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। এই রুটিনেই শুরু হয় প্রতিটা সকাল। আজকেও তার কোনো ব্যতিক্রম হলো না।

বাথরুম থেকে বের হয়ে একটু লজ্জা পেয়ে শরীফ বলল, ‘এইরে দিলাম বুঝি ঘুম ভাঙ্গিয়ে।’

‘সে তো রোজই দাও।’ বলতে বলতে ব্লাঙ্কেট সরিয়ে উঠে বসল রুবিনা।

‘তুমি আবার উঠছ কেন? তোমাকে এখন উঠতে হবে না। সকালে ঘুমটা হচ্ছে মেয়েদের বিউটি স্লীপ। শরীরটা বরং একটু পুরুক।’

রুবিনা কোন উত্তর না দিয়ে চুপচাপ বসে থাকল।

শরীফ অফিসের পোশাক পড়তে পড়তে বলল, ‘শরীরটা একটু চাঙ্গা হওয়া দরকার। দেশে থাকতে কি খাওয়া দাওয়া করতে না নাকি? ডায়েট করে তো শরীরের বারোটা বাজিয়েছ।’

রুবিনা কোন উত্তর না দিয়ে ঢুকে পড়ল বাথরুমে। কিছুক্ষন আয়নায় দিকে তাকিয়ে নিজেকে দেখল। তারপর সেখান থেকেই উত্তর দেল, ‘আমার শরীরের তুমি খারাপ দেখলে কোথায়?’

‘আরে মেয়েদের শরীর একটু নাদুস-নুদুস না হলে কি ভাল লাগে? একটু হালকা মেদ থাকলে শরীরের সৌন্দর্য অন্যরকম হয়।’

রুবিনা বাথরুম থেকে বেড় হয়ে এসে আবার ব্লাঙ্কেট টেনে শুয়ে পড়ল।

শরীফ বলে চলল, ‘আজকাল বাংলাদেশের মেয়েরা না খেয়ে যে কি সব করে ডায়েট ফায়েট করে। সিস্টেমের বারোটা বাজিয়ে ফেলে। আর এদেশের মেয়েদেরকে দেখ, নিয়মিত জিমে যায়, এক্সারসাইজ করে। না খেয়ে শুকনো কাঠি হয়ে থাকে না। এতে গ্ল্যামার নষ্ট হয়ে যায়।’

রুবিনা চুপচাপ শরীফের বক্তৃতা শুনতে থাকে। শরীফ তার কাজের ব্যাগটা কাধে ঝুলিয়ে কথা শেষ করে, ‘এনিওয়ে, আই বেটার গেট গোয়িং। আই নীড টু বিট দ্য ট্রাফিক।’ বলেই সে দ্রুত বের হয়ে গেল।

রুবিনা ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে শরীফের গমন পথের দিকে।

ঘুম থেকে একটু দেরী করেই উঠে রুবিনা। সকালের নাস্তা শেষে তেমন কিছু করারও থাকে না তার। বেশীর ভাগ সময় বসে থাকে লিভিং রুমে টিভি সেটের সামনে। শরীফ বলেছে টিভি দেখে ইংরেজী শিখতে। কিন্তু টিভি আর কতক্ষনই বা ভাল লাগে। চ্যানেল ঘুরাতে ঘুরাতে এক সময় টিভি বন্ধ করে দেয় সে।

প্রতিদিন দুপুরে মেইল বক্স খুলে চিঠি আনা রুবিনার প্রিয় কাজের একটি। সারাদিনে এই একটি কাজকেই তার সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। চিঠিগুলো এনে খুব আগ্রহ নিয়ে একটার পর একটা খাম সে খুলে দেখে।

দুপুর ১২টার মধ্যেই সাধারনত মেইলম্যান মেইল ডেলিভারী দিয়ে যায়। তাই লাঞ্চের আগেই রুবিনা গেল বাসার সামনের ড্রাইভওয়ে সংলগ্ন মেইল বক্স থেকে চিঠি আনতে। মেইল বক্স খুলে একগাদা এনভেলাপ বের করে দ্রুত চোখ বুলায় প্রেরকের ঠিকানার দিকে। না নেই। আজো আসেনি তার প্রত্যাশিত সেই চিঠি। মুঠো ভর্তি করে চিঠি গুলো নিয়ে সে ভিতরে আসল। সোফায় বসে আবারো একটি পর একটি ঠিকানা দেখল। তারপর হতাশ হয়ে বসে থাকল।

হঠাৎ করে ফোন বেজে উঠল। ফোনের শব্দে রুবিনা সম্বিত ফিরে পায়। অলস ভঙ্গিতে সাইড টেবিলে রাখা ফোনটার দিকে তাকাল। ধরতে ইচ্ছে করছে না। ফোন বেজেই চলেছে। উঠে গিয়ে কর্ডলেস ফোনটি ধরে বিরক্ত কন্ঠে বলল, ‘হ্যালো?’

‘মেইল চেক করেছো?’ ফোনের ভেতর থেকে একটা পুরুষ কন্ঠ শোনা গেল। কন্ঠটি রুবিনার চেনা। তবে সেটি শরীফের কন্ঠ নয়।

‘করেছি। প্রতিদিনই করছি। আজকেও আসেনি। চার মাস হয়ে গেল। কিছু বুঝতে পারছি না।’

‘ইমিগ্রেশন অফিসে কল দিয়ে একটা খোজ নাও না বাবা। অনলাইনেও তো চেক করতে পারো। তোমার তো দেখি কোন আগ্রহই নেই’।

‘আগ্রহ নেই মানে? কি বলছো তুমি? একটি রাতও আমি ঘুমুতে পারছি না টেনশনে আর তুমি কিনা বলছো আমার কোন আগ্রহ নেই? আশ্চর্য!’ রুবিনার কন্ঠে রাগ ঝরে পড়ল।

‘আহা, এত রিয়্যাক্ট করছো কেন? এক কাজ করো না প্লীজ, কেস নাম্বারটা নিয়ে একটা ফোন করে দেখো।’

‘দেখি।’ বলেই ফোন কেটে দিল রুবিনা।

শরীফের সাথে রুবিনার কথাবার্তা তেমন একটা হয় না। সামান্য যেটুকু হয় তা ঐ রাতে খাবার টেবিলে। রুবিনার মনটা আজ অস্থির। খেতে ইচ্ছে করছে না। প্লেটে খাবার নিয়ে শুধু নাড়াচাড়া করছে, মুখে দিচ্ছে না।

শরীফ সেটা লক্ষ্য করে বলল, ‘কি ব্যাপার খাচ্ছো না যে?’

‘খেতে ইচ্ছে করছে না।’

‘না খেলে তো চলবে না। তোমার শরীরের যা অবস্থা!’

রুবিনা কিছুটা ইতস্তত করে জানতে চাইল, ‘আচ্ছা, কার্ডটা এখনো আসছে না কেন? চার মাস হয়ে গেল আমি এসেছি। তুমি না বললে এক-দেড় মাসের মধ্যেই চলে আসবে?’

‘এত অস্থির হচ্ছো কেন? চলে আসবে। আজকাল সবকিছুতেই সময় লাগে। যা কড়াকড়ি অবস্থা।’

রুবিনা কোন কথা বলল না। চুপচাপ খাবার প্লেটের দিকে তাকিয়ে থাকল।

শরীফ খেতে খেতেই বলল, ‘তাছাড়া তুমি তো আর জব খুঁজছো না যে কার্ড ছাড়া চলবে না। আর যদি কোন কারনে প্রয়োজন পড়েই, পাসপোর্ট দেখালেই চলবে। পাসপোর্টে এলিয়েন নাম্বার স্ট্যাম্পড করা আছে, কাজেই কোন সমস্যা হবে না।’

এরপর কথাবার্তা আর এগোয় না। কিছুক্ষন চুপ করে বসে থেকে রুবিনা উঠে গিয়ে বেসিনে প্লেট রেখে আবার ফিরে আসল। শরীফের খাওয়া তখনও শেষ হয়নি।

আবার একটি দীর্ঘ রাতের শুরু।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে, হাতের কিছু কাজ শেষ করে শরীফ বিছানায় এসে শুয়ে পড়ল।

রুবিনা টেবিল থেকে খাবার গুলো ফ্রিজে তুলে রেখে কিচেনে গেল। বেসিনে রাখা প্লেট ধুয়ে, রান্না ঘরটা পরিষ্কার করে সে যখন বিছানায় এলো, শরীফ তখন গভীর ঘুমে।

শরীফের কোন চাহিদা নেই। না শরীরের, না মনের। ওদের মধ্যে কোন ভালবাসার কথা হয় না। কোন ভালবাসাবাসি হয় না। এভাবেই কেটে যায় দিনগুলি। এভাবেই দুটি মানুষ বাস করছে একই ছাদের নীচে। আলাদা ভাবে।

আরেকটি দীর্ঘ রাত কাটাবার জন্যে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ধীর পায়ে বিছানায় এসে ঘুমন্ত শরীফের পাশে আলতো করে শুয়ে পড়ল রুবিনা। তারপর সেই অসহ্যকর নীরবতা। নির্ঘুম রুবিনা অপলক তাকিয়ে থাকে শূণ্যে, অন্ধকারে।

আরেকটা দিন চলে গেল জীবন থেকে। আরেকটা অপেক্ষার প্রহর নামছে।

(চলবে…)

ফরহাদ হোসেন
লেখক-নির্মাতা
ডালাস,টেক্সাস