আপনকিয়া

আপনি বারবার ভুল নম্বরে ফোন করছেন! নম্বরটা ঠিক করে কল করুন প্লিজ। কথাগুলো বলেই লাইনটা কেটে দেয় সাজ।

আজেবাজে এসব ফোন মেজাজটাই খিঁচড়ে দেয়।
ওপাশে ঠোঁটের কোণে মৃদুহাসি। আবারো কল করে রিমন। ইচ্ছে করেই বিরক্ত করছে সাজকে। কল্পনায় দেখতে পাচ্ছে সাজের বিরক্তিকর চেহারাটা।সাজকে জ্বলিয়ে কি যে মজা পায় রিমন!

একই ব্যাচের তারা। কিন্তু কেউ কাউকে চিনতো না। মফস্বলে লেখাপড়া শেষ করে ঢাকায় এসেছে রিমন। আর সাজ ছোটবেলা থেকেই ঢাকাতেই বড়। একবার এক কনসার্টে দেখা। বন্ধুর বন্ধু… উপবন্ধু তবে।
প্রথমে সাজকে খুব অহংকারী মনে হয়েছিল রিমনের। আর রিমনকে তেমন নজরকাড়া লাগেনি সাজেরও।
এরপর একটু একটু কথা… ভাললাগা…. হয়তো ভালবাসা….

কিন্তু দু’জনই জানে… এই ভালবাসার পরিণতি হয়তো মিলনে নয়! তবুও ভালবাসা আসে মৃদুতালে….
সাজকে না দেখলে রিমনের দিন কাটে না। সাজ এমন করে টানে…
রিমনের সাথে কথা বলা মানেই নিজেকে নতুন করে চেনা… এত সুন্দর করে কথা বলে ছেলেটা! খুব সাধারণ কথাটাও রিমনের বলার ভঙ্গীতে কেমন অন্যরকম!

নিজের জীবনটা তো আগেই গুবলেট হয়ে আছে। সাজ কথা বলার জন্য আঁকুপাকু করে। কথার পর কথা সাজায় প্রতিদিন।কিন্তু ব্যবসায়ী স্বামীর একদম সময় নেই এতসব কথা শোনার…. মেহরাবকে ভালবেসেই বিয়ে করেছিল সাজ। তারপর এক বিশাল কাহিনী… বাহির থেকে কিছুই বোঝা যায় না! সাজ প্রতিদিনই একাকীত্বের কবর খোঁড়ে নিঃশব্দে। মেহরাব তার খবরও জানে না।

বাবা মায়ের পছন্দে বিয়েটা করেছিল রিমন। সিঁথি মেয়েটা খুব দুঃখী। ছোটবেলায় বাবা মাকে হারিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। মেয়েটার জন্য ভালবাসার বদলে একরাশ করুণা জাগে রিমনের মনে। রিমনের ভাব বোঝেনি সিঁথি কখনো। রিমনের মনটা কেবলই মন খোঁজে,মনের মত মন।

বেশদূরে এগিয়ে এসেছে রিমন আর সাজ। এগুবার পথ জানা নেই।আর ফিরবার পথ… সেটাও যে অচেনা!
রিমন এভাবে যে টানে… সাজ এড়াতে পারে না। একটা অপরাধবোধ ঘিরে রাখে দুজনকে।
ভালই চলছিল সব। সমাজ,পরিবার সবাইকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এগিয়ে চলে ভালবাসা।
পরকীয়া লেবাসটা আর পছন্দ নয় সাজের! রিমনের অবশ্য তাতে আপত্তি নেই।
সাজ এবার আপনকিয়ার কথা বলে…
রিমন পিছলে যায় আর পিছলে যায়…

আর কতদিন রিমন এভাবে? সাজের গলায় একটা ঝাঁজ। এভাবে তুমি আর এসো না প্লিজ। কিছু একটা করো! মেহরাব তো আর সব মেনে নেবে না!
সেই বিখ্যাত হাসি দিয়ে রিমন কথা পাল্টায়। আরেহ সিঁথিও তো ছাড়ছে না! চলুক না…
আমরা তো আমাদের মত ভাল আছি। এসো তো এবার… শব্দগুলো আর পথ পায় না। সাজ হারায় আর হারায়…

এই সময়টা হুটহাট বৃষ্টি নামে। বলা নেই, কওয়া নেই হঠাৎ মেঘ সাজে। সাজকে আজকের মত মানানো গেলো। রিমন জানে কেমন করে ভেজাতে হয় সাজকে।
চলো আজ এলিফ্যান্ট রোডে মালঞ্চতে ফুচকা খাবো। রিমনের প্রস্তাবটা লুফে নেয় সাজ। রিকশাটা ফুলার রোড,নীলক্ষেত পেরিয়ে চলছে। আসবে আসবে করে এসেই গেলো বৃষ্টিটা। ভিজতে খুব পছন্দ সাজের। যদিও রিমন এমন ভিজতে চায় না!
এই বৃষ্টিতে একটা মেয়ে কদমফুল বিক্রি করছে। সিগন্যালে রিকশাটা দাঁড়ানো।
স্যার ফুল নেবেন? কদম ফুল?
সাজ তীব্র ভালবাসা নিয়ে রিমনকে দেখে।
এক গোছা কদমফুল নিয়ে নেয় রিমন।
সাজের চোখের কোণে জল জমে। এমনটা কতদিন ভেবেছে সে… বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল”
মেহরাব এসবের মানেই বোঝে না। সাজও শেষতক হাল ছেড়ে দিয়েছে। শুধু শুধু অশান্তি করে কি লাভ?
এজন্যই তো রিমনকে এত ভাল লাগে।কেমন করে ছুঁয়ে যায় সাজের চরাচর!

ফুচকার টকটা ঝাল! সাজের খুব মজা লাগছে। রিমন একদমই ঝাল খেতে পারে না। একটু ঝাল খেলেই হেঁচকি ওঠে। রিমনের এখন হেঁচকি উঠছে!
সিঁথির ছবিটা মোবাইল স্ক্রিনে ভেসে ওঠে।
হ্যালো রিমন! কোথায় তুমি? অনেক বৃষ্টি বাইরে! এরমধ্যে বের হয়ো না।
.. আরেহ আমি তো অফিসে। এসি রুমে কি আর আকাশের ভাব বুঝি! আসতে দেরী হবে সিঁথি।অনেক কাজ…

সাজের চটপটির স্বাদ বিস্বাদ লাগে। ঝালও আর টের পায় না। মুখটা থমথম।
রিমন বিষয়টা আঁচ করতে পারে। মেয়েরা একটুতেই অযথা অস্থির হয়!
… রিমন আমি আজই মেহরাবকে সব বলতে চাই।তুমিও সিঁথিকে বলো। এভাবে দূরে থাকতে আর ভাল্লাগে না। এখনই তুমি আর আমি সমান্তরাল পথে চলে যাবো।
… রিমন গানের সুর ভাজছে। ডিফরেন্ট টাচের বিখ্যাত সেই গানটা।
বললেই তো বলা হয়ে গেলো! সেই হাসি! বলার তো সময় আছেই সুন্দরী! রয়ে রয়ে বলবো,কেমন! এই যে বলবো, বলছি… এই আমেজটুকু শেষ হয়ে যাবে। আরেকটু গুছিয়ে নেই আমরা! রিমনের হাত তখন সাজের আঙুল ছুঁয়ে… না বলা কথাগুলো স্পর্শ হয়ে ধরা দেয়!

সাজ একদম ভিজে চুপচুপা। শাড়ী দিয়ে কোনোমতে জড়িয়ে পেঁচিয়ে আছে। রিমনের টি শার্টটাও ভিজে গেছে।
… চল উঠি আজ। ঠান্ডা লেগে যাবে।
রিমন হাঁচি দিচ্ছে। সাজও অস্থির হয়। বাসায় যেয়ে জলদি পাল্টে নিও।

রাতে সবুজ বাতিটা নেই। রিমন কখন থেকে বসে আছে। সাজ অফ লাইনে.. তবে কি শরীর খারাপ হলো? সবুজ আলোর সাথে অভ্যস্থতার এই সখ্যতা…. এ তো আর একদিনের নয়!

সিঁথি মুড়ি চানাচুর মাখিয়ে নিয়ে এসেছে। বৃষ্টির রাতে আজ বারান্দায় বসে একসাথে মুড়ি চানাচুর খাবে।
আজই সুযোগ। সিঁথি রিমনকে পললের কথাটা বলে দেবে। এভাবে লুকিয়ে রাখতে মন সায় দেয় না। পলল সিঁথির সাথেই চাকরী করে। বাউন্ডেলে স্বভাবের, আউলা ঝাউলা একটা ছেলে।

বৃষ্টির একটা ঘ্রাণ আছে.. তাই না! সিঁথি শুরু করে কথা। চারিদিকে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক। ব্যাঙেরাও ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর করছে। আকাশটা এখন একটু একটু করে কালো ছাড়িয়ে নীল সাদা বুননে ব্যস্ত।
রিমন মুড়ি চানাচুর খেতে খেতে বলে.. হুম।
সিঁথি রিমনকে প্রভুর মত ভয় পায়। বিয়ের পর থেকেই দেখে আসছে মৃদুভাষী একটা মানুষ। কিন্তু প্রচন্ড রাগী। পুরুষতান্ত্রিক মতবাদে বিশ্বাসী রিমন। ঘরের বউকে বেশী আস্কারা দিলে বানরের মত মাথায় ওঠে।
সিঁথি রিমনের প্রভুত্বকে মেনে নেয় কিন্তু মনে নিতে পারে না।

মাস ছয়েক হলো পলল এসেছে অফিসে। ছেলেটা সিঁথির থেকে বয়সে ছোট। কেমন আউলা ঝাউলা ছেলেটা। গভীর চাহনীতে কি এক সম্মোহনী আবেগ। অনর্গল কথা বলে। সুন্দর বাঁশী বাজায়। অকপটে বলে যায় সব কথা। এমন আত্মভোলা অথচ মানবিক একটা মানুষের স্বপ্নই বোধ হয় ছিল সিঁথির।
পলল যেন ছু্ঁয়ে যায় সিঁথিকে… এটা কি মোহ নাকি ভালবাসা!
সিঁথি অফিসে এসেই বুঝে.. খুব অচেতনে সে পললকে খুঁজছে।
আজই তো পলল তার ডুরে শাড়ীটা দেখে বলে উঠলো… দাঁড়াও দাঁড়াও একটু! তারপর একটার পর একটা ক্লিক। কিছুক্ষণ পরেই ইনবক্সে ছবিগুলো…
সিঁথি ভাবাচ্ছন্ন হয়ে আছে সেই থেকে। পলল কেমন করে গ্রাস করে নিচ্ছে তার সমস্ত স্বত্তা!
সিঁথি না চাইলেও ভাবনার বন্দরে পলল এসে ভীড় করছে!
রিমনকে বলা হলো না। এমন কত কথাই তো বলা হয় না!
… ঘুমোবে চলো! রিমনের গলায় একটা আধিপত্য।

মোবাইলে সবুজ বাতিটা এখনো নেই। সাজ কি তবে…. রিমনের মনটা অস্থির। কাল সকালেই প্রথমে সাজের অফিসে যাবে। মেয়েটা একটুতেই অসুস্থ হয়ে যায়।

রাত হলেই কলিং বেলের আওয়াজে দোলা বুঝতে পারে… কে এলো! গত দুদিন মেহরাব আসেনি। মেহরাব আসবে… দোলা সেটা খুব ভাল করেই জানে।
বিমানবালার চাকরীসূত্রে মেহরাবের সাথে পরিচয়। লালমাটিয়ার ফ্ল্যাটটা মেহরাবের। এখানেই থাকে দোলা। মেহরাব আসে আবার চলও যায়। ডিভোর্স হবার পর আর কোনো বাঁধনে জড়ায়নি দোলা। মেহরাব তো তাকে ভরে রেখেছে ভালবাসা আর একটা সীমানায়। দোলা জানে তার গতিপথ… কতটুকু সীমাবদ্ধতা! তবুও এমন আয়েসী জীবন আর মেহরাবের আহ্বান… উপেক্ষা করার মত শক্তি আর নেই।
মেহরাব খুব করে কাছে আসে। দোলার গভীরে আন্দোলিত হয় মেহরাবের সকল চাওয়া। এত সুখ দিতে পারে মেয়েটা!
সাজ এমন নয়! সাজ বড় বেশী বাস্তববাদী।
দোলা যেভাবে সাড়া দেয়,সাজ কখনো সেভাবে সাড়া দেয়নি।
মেহরাব দোলার কাছে এলেই শান্তির ঠিকানা খুঁজে পায়।
একটু একটু করে হাত বুলোয় দোলা মেহরাবের চুলে। মিহিদানা সুখে ঘুমিয়ে যায় মেহরাব।

সকালে একটা মিটিং আছে। মেহরাব আলতো আদরে দোলাকে ছুঁয়ে রওনা হয়। গাড়ীতে বসেই মনে একটা কি জানি বোধ হানা দেয়। দোলার টেবিলে একটা ঘড়ি! ওটা তো চেনা নয়!
মোবাইলটা হাতে নিয়ে লিয়াকতকে ফোন দেয়। লিয়াকত ঐ বাসার দারোয়ান।
… লিয়াকত কে এসেছিল বাসায়?
… স্যার! আমতা আমতা করে লিয়াকত! দুই দিন একজন স্যার এসেছিলেন সকালের দিকে।
মেহরাবের একটা তেতো বোধ হয়! ইচ্ছে হয় গাড়ী ঘুরিয়ে…. না থাক! মিটিংটা জরুরী।

বাসায় ফিরেই সাজকে শুয়ে থাকতে দেখে মেজাজটা আরো চড়ে যায়। একটু জ্বরেই এত কাহিল… মেয়ে মানুষের অসুখ বিসুখ মেহরাবের একদম পছন্দ নয়।
তৈরী হতে হতে সাজকে ডাক দেয়। সাজের কপালে হাত দিয়ে টের পায় জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।
সাজ ভেবেছিল সেদিন ভেজার ফল এটা। রিমনের সাথে রিকশায় হুড ফেলে কি আনন্দেই না ভিজেছিল!
বৃষ্টির এই সময়টাতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। বাসায় ডাক্তারকে কল দিয়ে মিটিং এ চলে যায় মেহরাব।
ডাক্তার পরীক্ষা করে ডেঙ্গু শনাক্ত করেন।
হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ এবং চিকিৎসা দিয়ে গেছেন তিনি।
মেহরাব অফিস থেকেই এম্বুলেন্স খবর দেয়। সাজ এখন একশ এক নম্বর কেবিনে…
সাদা বিছানায় অসহায়ের মত একটা মেয়ে…
স্যালাইন চলছে। ডাক্তার, নার্স… আপনজন খোঁজে সাজ।

রিমন আজ সাজের অফিসে গিয়ে শুনলো.. গত ক’দিন সাজ আসেনি। ছুটির একটা দরখাস্ত কেউ দিয়ে গেছে। রিমনের মনে রাজ্যের আশংকা! মেয়েটা তো কেমন করে যে দখল নিয়ে নিয়েছে তাঁর মনের!
হঠাৎ করেই কেমন জানি ফাঁকা ফাঁকা লাগে! পুরো ঢাকা শহরটা শ্মশানের মত মনে হয়!
সাজ কেন অন লাইনে আসছে না? সবুজ বাতিটা কেন জ্বলে না?
অস্থির রিমন হাতিরঝিলে একা একা ঘুরে। আকাশটা গুমোট। তার সাথে রিমনের মনটাও…

সকালে অফিসে এসেই সিঁথির কেমন জানি খারাপ লাগছে শরীরটা। পলল একটা বাঁশীর ক্যাসেট নিয়ে এসেছে।
…. তোমার কি শরীর খারাপ? পললের কথায় চমকে ওঠে সিঁথি। রাতে রিমন তো টের পায়নি? এই কারণেই পলল তাকে এমন ছুঁয়ে যায়! ছেলেটা মনে হয় পড়তে পারে! এমনটাই পড়াপাতা হতে চেয়েছিল সিঁথি। রিমন তাকে পড়তেই জানে না। একটা দীর্ঘশ্বাস গলার কাছে কুন্ডলী পাঁকায়.

রিমনের অস্থিরতা ছাই চাপা আগুনের মত। অনবরত পোড়ায়। ঢাকা শহরটা কেমন ফাঁকা। সাজকে কিছু কথা বলার ছিল। একবার সাজের সাথে দেখা হওয়াটা খুব জরুরী।
সিঁথিকে না জানিয়েই ট্রেনে চেপে বসে রিমন। নিজের জন্মভুমি টানছে। ওখানে গেলে যদি একটু স্বস্তি পাওয়া যায়।অফিসে তিনদিনের ছুটি নিয়েছে। বাড়ী ডাকছে.. ঐ ঘর,ঐ উঠোন,ঐ নদীর কুল,ঐ মহুয়াতলা… ডাকছে।
ট্রেনটা ঝুঁকে ঝুঁকে রওনা হয়। টঙ্গী স্টেশন,জয়দেবপুর ছাড়িয়ে চলছে রিমন। চারপাশে দেখতে দেখতে যায় সে… কিন্তু মাথার পোকাটা কিছুতেই নামছে না!
সদানন্দপুরর স্টেশনে নেমে নলকার পথ ধরে রিমন। ঘনিয়ে আঁধার রাত নেমেছে আগেই। সিএনজি টা রাতকে ভ্রুকুটি দেখিয়ে এগিয়ে চলে।

মেহরাব কেবিনে ঢুকতেই চমকে যায়। সাজকে এত ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে! কেমন নেতিয়ে গেছে মেয়েটা। মেহরাব একটা চাপা মায়া বোধ করে খুব গহীনে।
সাজ ঘুমোচ্ছে। মেহরাব ওকে জাগায় না।
দোলার ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছেই না মেহরাব। দোলার জন্য কত কিছুই না করেছে সে!
মেবাইলটা বেজে ওঠে। লিয়াকত ফোন করেছে।
… স্যার আমি লিয়াকত। দোলা ম্যাডাম একটু আগে ঐ স্যারের সাথে বাহিরে গেলেন। আপনি জানাতে বলেছিলেন, তাই….
মেহরাব ফোনটা কেটে দেয়।

রিমনের এমন দোনোমনা ভাব সাজের পছন্দ হয়নি। দু নৌকায় পা দিয়ে নদী পাড় হওয়া যায় না। সাজ সূতলী গুটোয়। নিজেকে একটা ভোকাট্টা ঘুড়ি মনে হয়। জ্বরের ঘোরে সাজ একটা মায়াময় হাত খোঁজে।খোঁজে অপার নির্ভরতা। খুব আপনজন খোঁজে সাজ।

সিঁথি রিমনকে ফোন করে। পেটে ভীষন ব্যথা। আজ অফিস থেকে চলে এসেছে আগে। রিমন অনেকক্ষণ পর ফোনটা ধরে। সিএনজির শব্দে টের পায় নি।
… আমি একটু বাড়ী যাচ্ছি। তোমাকে বলে আসা হয়নি।কালই ফিরবো। সিঁথি প্রভুত্বকে সমীহ করে। নিজের শরীর খারাপের কথা বলা হলো না। কেন গেছো… এটা জানতে চাওয়াও যে ধৃষ্টতা! রিমন তো তাঁর কাছে মনিবের

বিক্ষিপ্ত মনটা কিছুতেই শান্ত হয় না। রিমনের কোথায় এত জ্বালা… হাঁতড়ে খুঁজেও বুঝতে পারে না। রাতে আবার ফোন।সিঁথি অসহায়ের মত বলে… চলে আসো তুমি! রিমন বেশ অবাক হয়। সিঁথি তো তাকে বিরক্ত করতে চায় না! তবে….
সারারাত অসহ্য ব্যথা। সিঁথি পাশের বাসার ভাবীকে ফোন করে। রুমি ভাবী তাঁকে ভীষন আদর করেন। রুমি ভাবী সিঁথিকে দেখে আঁতকে উঠলেন। মেয়েটার ঠোঁটগুলো এত সাদা হলো কেন? সিঁথি কুঁকড়ে কুঁকড়ে যায় ব্যথায়।
শেষরাতে রুমি ভাবীই রিমনকে ফোনটা করেন। সিঁথিকে নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছি।ওকে দেখে আমার ভাল মনে হচ্ছে না। তুমি রওনা দাও এখুনি।
বাসটা কড্ডার মোড়, যমুনা ব্রীজ, এলেঙ্গা হয়ে ছুটে চলে। রিমনের মাথায় তখন ভীষন ঝড়! মনে চলে সুনামি।

ডাক্তার বল্লেন,রক্ত লাগবে। ডোনার তৈরী রাখুন। আজই অপারেশন। সিঁথি কেন রিমনকে খবরটা দেয়নি? সিঁথি কি নিজেও বুঝতে পেরেছিল? একটোপিক প্রেগনেন্সি। ভেতরে ক্রমাগত রক্তক্ষরণ। ভয়াবহ এক আতংকে রিমন সিঁথির হাত চেপে ধরে।
… ভয় পেয়ো না। ডোনার খবর দিয়েছি। সব ঠিক হয়ে যাবে। সিঁথি ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে রিমনকে দেখে।

অফিসে খবরটা পৌঁছে গেছে। ব্লাড গ্রুপ এবি পজিটিভ। পললের ব্লাড গ্রুপও তাই। পলল রক্ত দিতে আসে। আসে আরো কতজন!
স্ক্রীনিং করে পললকে নিষেধ করা হলো। পললের রক্ত নেওয়া যাবে না। পললকে ডাক্তার দেখানোর পরামর্শ দিয়ে ডাক্তার অন্য ডোনারের ইতিহাস নিচ্ছেন।

নেশা তো কত আগ থেকেই পললের সঙ্গী। কত ধরণের নেশা… কিন্তু পলল জানতেও পারেনি হেপাটাইটিস সি ভাইরাস তারই রক্তে ঘাপটি মেরে বসে আছে। লিভার সিরোসিস শুরু হয়ে গেছে। পলল একবার সিঁথিকে দেখতে চায়। ততক্ষণে সিঁথি অপারেশনের টেবিলে….

একটা কালো শাড়ী, লাল পাড়… মেয়েটা তরুণী। প্রথম সাজকে শাড়ী পরা দেখেই মেহরাবের চোখটা আটকে গিয়েছিল। বয়সে ছোট মেয়েটা… কি আদুরে! মেহরাব সাজের সেই চেহারাটা আজও মনে করতে পারে। এতদিন কেমন একটা ঘোরে সময় চলে গেলো! অবহেলা আর নিজস্ব সম্পত্তি… এই দুই ভাবনায় সাজকে একটু একটু দূরে নিয়ে গেছে সময়। দোলার শরীরটা চুম্বকের মত টেনে নিয়ে গেছে… সাজের থেকে অনেকদূর।
শূন্যস্থান পূরন তো কতভাবেই হয়! কোনো স্থান কি শূন্য থাকে? সাজের শূন্যস্থান তবে কি রিমন পূরণ করতে এসেছিল!

বিছানার কাছে চেয়ারটা এগিয়ে নিয়ে বসে মেহরাব। হঠাৎ ভেতরটা হু হু করে ওঠে। সাজকে খুব আদরে জড়িয়ে ধরে মেহরাব।
ঘুমটা ভেঙে গেলো সাজের। এত নির্ভরতার একটা শ্বাস খুব কাছে…
মেহরাব ছুঁয়ে দেয় সাজের যাবতীয় ব্যথা। সাজের চোখে তখন অনেকদিনের জমানো কান্না….
ডেঙ্গু একেবারে ভেঙেচুরে দিয়ে গেছে সাজকে…

পাখীর কলতানে দিনের আলো ফোটে। সূর্যটা ধীরে ধীরে পাঁপড়ি মেলে।
সিঁথির রক্ত পরিসঞ্চালন চলছে। বেঘোর ঘুমে..
হাসপাতালের বিল মিটিয়ে মেহরাব সাজকে নিয়ে বাসার পথে…

 

-ফারহানা নীলা