উত্তরাধিকার (১০ম পর্ব)

নুরা বসে আছে আরামদায়ক সোফায়। সে আছে ফুরফুরে মেজাজে। আজ সে এসেছে অনেক প্রস্তুতি নিয়ে। তার ধারণা সে শাহরিয়ার সাহেব সম্পর্কে এখন মোটামুটি জানে। আজ সে বাসায় ঢোকার সময় বেশ ভাব নিয়ে ঢুকেছে। সাদা পাজামা পাঞ্জাবীতে তাকে কাকের ময়ূর সাজার মতো লাগছে। তার চেহারায় রয়েছে চির ধূর্ততার ছাপ। সে জানে না এখন শত চেষ্টা করলেও তার চেহারার ছাপে কোন পরিবর্তন আসবে না। মাথার উপর চলছে ফ্যান। ফ্যানের পাখার মতো তার মন ঘুরছে তেপান্তরে। অপেক্ষায় আছে কখন আসবে শাহরিয়ার সাহেব। সে নিজের জগতে এতোটাই মশগুল ছিল যার ফলে বুঝতেই পারে নি তার সামনে দিয়ে সুন্দরী মহিলা বের হয়ে যায়। হিলের শব্দে যতক্ষণে তাকায় ততক্ষণে বের হয়ে গিয়েছে সুন্দরী মহিলা। সে তার চেহারা দেখার সুযোগ পায় নি। দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে নুরা অবাক বিস্ময়ে।

– কি খবর নুরা?
চমক ভেঙ্গে বাস্তবে ফেরে নুরা। তার সামনে দাড়িয়ে আছে সেদিনের সেই সাহেব। নুরা বসা থেকে উঠে দাড়ায়।
– জ্বী স্যার।
– কেমন আছো তুমি?
– জ্বী স্যার। আমরা থাহি কোন রহম।
– তোমার তো আরো আগে আসার কথা ছিল। এলে না কেন?
– স্যার, কিছু কাম আছিল।
– এবার বলো, আমার জমি কেনার কি হলো?
– স্যার, আপনে কতটুক জমি কিনতে চান?
– আমার একসাথে কমপক্ষে এক একর জমি লাগবে।
– এতো জমি দিয়া কি করবেন?
– সেটা তোমার না জানলেও হবে।
– স্যার, জমি কিনতে অইলে জমির মালিককে বলতে অইব। না হইলে দাম নিয়া ঝামেলা করব।
– আমি তোমাকে বলেছি দাম কোন ব্যাপার না।
– জ্বী স্যার, কইছেন। তয় আপনে যেই জমির দাগ দিছিলেন হেই জমিন তো বেচব না।
– কেন বিক্রি করবে না কেন?
– হেই জমিতে ঘরবাড়ি অইয়া গেছে গা।

নুরার কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে রিয়াদ। যেন হঠাৎ মনে হয়েছে এমনি করে বলে উঠে,
– ওহো তোমাকে চা দিতে বলি।
– না স্যার লাগব না।
রিয়াদ তীক্ষ্ণ নজরে তাকায় নুরার চেহারায়। তার চেহারায় ফুটে উঠে হতাশা। নুরার খুব আশা ছিল আজও তাকে রাজকীয় নাস্তা দেয়া হবে। কিন্তু রিয়াদ ঠিক করে রেখেছে আজ নুরাকে নাস্তা খাওয়াবে না। বেয়ারাকে ডেকে চা দিতে বলে। রিয়াদ পূর্বের আলোচনায় ফিরে আসে।
– যাদের বাড়িঘর হয়েছে, তাদের কি জমির কাগজপত্র আছে?
– আমি ত জানি না।
– তোমাকে জেনে আসতে বলেছিলাম।
– চেষ্টা করছিলাম তো।
– কি চেষ্টা করেছ?
এবার নুরার উত্তর দেবার সাহস হয় না। মনে যে ফুরফুরে ভাব ছিল তাতে চির ধরে। বদুর বিধ্বস্ত   চেহারাটা মনে পড়ে যায়। তার সামনে দাড়ানো সাহেব খুব বেশি সহজ সরল নয়। নুরা তাকে বুঝতে ভুল করেছে।

রিয়াদ নুরার অভিব্যক্তিতে ভীতি দেখতে পেয়ে নিরব উল্লাস উপভোগ করে। তার বাবার স্বপ্ন বাস্তবায়নে নুরার পরিবার শুরু থেকে বিরোধিতা করে এসেছে। বাবার ব্যথাতুর মুখটি মনে পড়লে নুরাদের মতো পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে মন চায়। শুধু এই একটা কারণে সে পড়াশোনা করেও বাবার ইচ্ছেয় বিসিএস না দিয়ে ব্যবসায় মন দিয়েছে। ক্ষমতার পাশাপাশি টাকার শক্তি প্রয়োজন আছে। তার আপু দুলাভাই এডমিন ক্যাডারে চাকরি করছে। তার সহধর্মিনী পুলিশ ক্যাডারে আছে। সে পজেটিভলি এ ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে। নুরাদের মতো মানুষকে ছারপোকা ভিন্ন কিছু মনে হয় না। ব্যবসা করার কারণে ক্রিটিক্যাল লোকদের সাথে মিশে তাদের সাথে যুদ্ধ করার ক্ষমতা অর্জন করেছে। তার সামনে বসা লোকটিকে ধারাবাহিক অপমান করতে ইচ্ছে করছে তার।

রিয়াদ নুরাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
– তুমি কি আমায় হয়ে কাজ করবে নাকি করবে না?
– কেন করমু না?
– উত্তর দাও। কোন প্রশ্ন করবে না।
– জ্বী স্যার, কন।
– তুমি কি জান ঐ জমিগুলোর আসল মালিক কে?
– যারা বাড়িঘর করছে তাগোই জমি।
– তুমি কি বলতে চাও, তুমি কিছুই জান না?
এ প্রশ্নে থমকে যায় নুরা। সাহেবকে দেখে মনে হচ্ছে না তার অভিজ্ঞতার ভান্ডার সমৃদ্ধ নয়। রিয়াদ নুরাকে বলে,
– তোমাকে আমি কিছু বলতে চাই, মন দিয়ে শোন।
– হ স্যার কন।
– তুমি কি মাহফুজ সাহেবকে দেখেছ?
– জী না স্যার, তিনি আমার জন্মের আগে মারা গেছেন।
– চমৎকার, চিনতে পারছ বলে তোমাকে ধন্যবাদ।
– স্যার, তিনি কি আপনের আত্মীয়?
– বলতে পার। তবে আমি তার পরিবারের পক্ষ থেকে কাজ করছি।

নুরা সাহেবকে প্রশ্ন করার সাহস পাচ্ছে না। আসার সময় যে পরিমাণ সাহস নিয়ে এসেছিল তা সাহেবের সামনে এসে গুলিয়ে ফেলেছে।
– নুরা, তোমাকে কিছু কাজ দেব, করবে কি?
– জ্বী করমু।
না সাহস তার হয় না। রিয়াদের আভিজাত্যময় চেহারার দিকে তাকিয়ে কুঁকড়ে যায় সে।
– তোমাকে যে জমির দাগটা দিয়েছি, সেখানে যাদের যাদের বাড়ি আছে, তাদের সবার নামের তালিকা দেবে আমাকে। পারবে কি?
– স্যার, পারুম।
– কতদিন লাগবে বলো।
– স্যার, সাতদিন অইলেই অইব।
– আচ্ছা ঠিক আছে তাহলে তুমি কাজ শুরু করো। আর শুনো বদু তোমার চ্যালা না?
– কি কন স্যার?
রিয়াদ নুরার বুকের ভেতরে ভয়ের ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দিয়েছে। এরপর নুরাকে বিদায় করে নিজে অফিস যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়।

চলবে———–

-বাউল সাজু