উত্তরাধিকার (১২তম পর্ব)

রিয়াদ নুরাকে বিদায় করে দোতলায় উঠে মায়ের রুমের দিকে উঁকি দেয়। মা তাকে না দেখেই বলে ওঠে,

-সুদীপ্ত উঠেছে বাবা?
-না মা, এখোনো ওঠে নি।
-বৌমা কি অফিসে চলে গিয়েছে?
-হ্যাঁ মা, আচ্ছা বলতো তুমি আমাকে না দেখেই বুঝলে কি করে?
বলেই মায়ের পেছনে গা ঘেঁসে বসে পড়ে। এটা তার ছোট বেলার অভ্যাস। এখনো সে তার বেশ কতগুলো অভ্যাস পরিবর্তন করতে পারে নি। তার মধ্যে এটি একটি। সুপয়া ছেলের মাথায় হাত রেখে বলে,
-পাগল ছেলে, এখনতো বাবা হয়েছিস। এখনো বুছিসনি বাবা মা কিভাবে ছেলে মেয়ের উপস্থিতি টের পায়।
রিয়াদ গোঁয়ারের মতো উত্তর দেয়,
-তোমাকে প্রশ্ন করেছি তুমি উত্তর দেবে। আমার বোঝার দরকার নেই।
– তোর গায়ের গন্ধ আমার নাকে আলাদাভাবে ধরা পড়ে। কে এসেছিল বাবা?
– নুরা এসেছিল।
– সাবধান থাকিস বাবা।
– মা, তুমি বেশি চিন্তা করো না তো।
হঠাৎ কানে আসে সুদীপ্তের কন্ঠ। রিয়াদ দৌঁড়ে চলে যায় পাশের কক্ষে। সুপয়া অপেক্ষায় থাকে।

সুদীপ্তকে কোলে নিয়ে আবার মায়ের কক্ষে প্রবেশ করে। সুপয়ার পাশে শুইয়ে দেয়। সুদীপ্ত দীদার কোলে মাথা রেখে চুপচাপ শুয়ে থাকে। সুদীপ্তের অবয়বের দিকে তাকিয়ে থাকে সুপয়া অপলোকে। মাথার চুলে বিলি কেটে দিতে থাকে। রিয়াদ মাকে বলে ওঠে,
-মা, আমার অফিসের দেরি হয়ে য়াচ্ছে। তুমি তোমার নাতিকে নিয়ে থাক আমি গেলাম।
– বাবা, নাস্তা খেয়েছিস?
– আমি খেয়ে নিব। তোমার নাতিকে সামলাও।
– আমার নাতি তোর চেয়ে অনেক ভালো। তুই আমাকে অনেক বেশি জ্বালিয়েছিস।
রিয়াদ বের হতে গিয়েও ফিরে আসে।
-মা, আমি এখনো তোমাকে জ্বালাই?
রিয়াদের ছলছল কন্ঠ সুপয়ার কানে হাহাকার হয়ে বেজে ওঠে। সুপয়া বলে ওঠে,
-ধুর বোকা, আমি তো মজা করেছি।
কান্নাজড়িত কন্ঠে রিয়াদ বলে ,
-মা, তোমার কষ্ট আমাকে পাগল বানিয়ে দেয়।

সুপয়ার দু’চোখে নামে বাঁধভাঙ্গা জোয়ার। রিয়াদ মাকে জড়িয়ে ধরে।
-মা, তুমি জান, তোমাকে দেখতে পাব না বলে আপুর বাসায় যেতে দিতে চাই না। তোমাকে বাড়িতে যেতে বাঁধা দেই। জানি, তুমি কষ্ট পাও। কি করব বলো। আমি তো তোমার সেই ছোট্ট পাগলটিই থাকতে চাই।
মা ছেলের কান্না ও কথোপকথন অবাক হয়ে দেখছিল ছোট্ট শিশু সুদীপ্ত। বলে ওঠে,
-দীদা, পাপা তোমাকে বকা দিয়েছে? আমি মাম্মিকে বলে দেব। মাম্মি, পাপাকে বকে দিবে।
সুপয়া সুদীপ্তকে জড়িয়ে ধরে বলে,
-না, দাদাভাই, তোমার পাপা আমাকে বকা দেয় নি। মাম্মিকে কিছু বলো না।
-তাহলে পাপাকে স্যরি বলতে বলো
– স্যরি বলো দাদাভাইকে।
রিয়াদ দুই হাতে কান ধরে ছেলের সামনে বসে স্যরি বলে। সুদীপ্ত হাততালি দিয়ে হেসে ওঠে। রিয়াদ ছেলের কপালে চুমো খেয়ে বিদায় নেয়। সুদীপ্ত বলে ওঠে,
-বাই বাই পাপা।

রহিমউল্লা সবকিছু শুনে গভীর মনোযোগে। সব শুনে সে নুরাকে বলে,
-তুই বাইত যা, আমি দিনের বেলা চাচী আম্মার লগে কতা কমুনে।
নুরা বলে ওঠে,
-কাহা কন কি? দাদীর লগেও আপনে কতা কইতে পারবেন?
-কেন পারুম না কেন? তারা ত, আমগো আপন মানুষ। সবার লগে যোগাযোগ করলে লাভ অয়। তরাত স্বার্থ ছাড়া কারো লগে সম্পর্ক রাহছ না। এহন বাইত যা।
নুরার মনের ভয় অনেকাংশে কমে আসে। সে ফুরফুরে মেজাজে বাড়ির দিকে রওয়ানা হয়। নিজের উপর প্রচন্ড রাগ হতে থাকে তার। কেন প্রথমেই তার শ্বশুরের কথা মনে আসে নি। দীর্ঘদিন পর মনে শান্তি নিয়ে রাতে ঘুমাতে যায় সে।

রিয়াদ একজন সফল ব্যবসায়ী। সে বাসা থেকে বের হয়ে গাড়ি নিয়ে সোজা অফিসে ছোটে। বেশিরভাগ সে নিজে ড্রাইভ করে। তার অফিস মতিঝিলে। প্রতিদিন সে অফিসে ঢুকে প্রথমে ফোন করে রিয়াকে। রিয়া কল রিসিভ করে জানায় সে একটা জরুরী মিটিংয়ে আছে, মিটিং শেষ করে তাকে কল দেবে। সে তার আপুকে ফোন দেয়। ফোন রিসিভ করে প্রথা অনুযায়ী সম্ভাষন জানায় রিশা।
-কি লাগবে বল?
রিয়াদ উল্টো গিয়ারে থাকে।
-তোমার শ্রীচরণ দুখানি আমার অফিসে চাই।
-এটা কি মামা বাড়ি? যদিও তোমার ক্ষেত্রে কথাটা উপযুক্ত নয়। কোন সমস্যায় পতিত হয়েছ নাকি বৎস?
– জ্বী না, গুরুজী। আপনার সাথে দুপুরের খাবার খেতে চাই, সম্ভব হবে কি?
– তোমার দুলাভাইকে জিজ্ঞেস করে দেখ।
– সরি, তোমাকে ফোন দেওয়াটাই টাকার অপচয়।
– স্যরি, আপনি যে ব্যবসায়ী ভুলে গিয়েছিলাম।
– আরে আমি একটা বোকা, সহজ রাস্তা বাদ দিয়ে কন্টকময় রাস্তায় হাটার চেষ্টা করেছি। ভাইয়াকে কিছু বললে কখনো না করবে না।
– আমি তার আগে বলে দেব এবার না বলার জন্য।
– তুমি পারলে চেষ্টা করো। বাই আপু।
ফোন রেখে দেয় রিয়াদ।

রিয়াদ ফোন রেখে ইজি চেয়ারে হেলান দেয়। এমন বড় বোন ক’জনের ভাগ্যে জুটে। তার কোন কাজে কখনো বাঁধা দেয় নি। সেই ছোটবেলা থেকেই তার পাশে আছেন একজন গাইড হিসেবে। কত অন্যায় আবদার করেছে কখনো রাগ করে নি। বন্ধু হিসেবে পাশে থেকেছে অবিচল। ছোটবেলা থেকে রিয়াদ একটু ডানপিটে। তার বাবার মতো ভালো মানুষটাকে কষ্ট দিয়েছে অপরিমাণ। পড়াশোনায় ছিল প্রচন্ড অমনোযোগী। প্রচন্ড রকমের মেধাবী হয়েও কখনো স্কুল কলেজে আহামারি রকমের ভালো রেজাল্ট করতে পারে নি। অবশ্য ভালো করতে না পারার কারণ বাবার দেয়া স্বাধীনতা। বাবা কখনো তাদের দুই ভাইবোনের উপর পড়াশোনা চাপিয়ে দেন নি। তিনি সব সময় বলতেন, “তোমাদের কখনো ক্লাসে প্রথম/দ্বিতীয় হতে হবে না, শুধু মানুষ হবার চেষ্টা করো।” বাবার এমন সার্টিফিকেট রিয়াদকে আরো বেপরোয়া করে দেয়। পড়াশোনায় আরো অমনোয়োগী হতে থাকে সে। সেই রিয়াদ আপু দুলাভাইয়ের উদ্দীপনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ অনার্স শেষ করে বিদেশ গিয়ে এমবিএ করেছে। তার দুলাভাই শোভন শুরু থেকেই তাকে ছোট ভাইয়ের মতো দেখে আসছে। রিয়াদের ভাগ্যাকাশে ছিল একাদশে বৃহস্পতি।

শোভন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স মাষ্টার্স করে এডমিন ক্যাডারে জয়েন করার পর পারিবারিকভাবে রিশার সাথে বিয়ে হয়। তার বাবাও একজন সরকারী চাকরিজীবী। তারা দুই ভাই এক বোন। শোভন সবার বড়। তার ছোট ভাইবোন দুটোকে খুব সহজেই আপন করে নেয় রিশা। রিশাকে বাইরে থেকে দেখলে অনেকেই ভয় পেয়ে যায়। বেশ রাশভারী টাইপের মেয়ে কিন্তু তার মন যে কি পরিমাণ কোমল তা বুঝতে পেরেছে বিয়ের রাতেই সে।বিয়ের পর সে রিয়াদকে একজন শিশুর ন্যায় পায়। যদিও রিয়াদের বয়স একেবারে কম ছিল না। সে তখন মাত্র ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। তার শ্বশুর ছিলেন একজন পরিপূর্ণ ভদ্রলোক। পরিমিতবোধের একজন মানুষ। অপ্রয়োজনে কখনো কিছু বলেন নি। কিন্তু বউভাতের পর তার শ্বশুর তাকে নিভৃতে ডেকে বলেছেন রিয়াদকে দেখে রাখার জন্য। শ্বশুর মারা যাবার পর শোভনের আচরণ পুরোপুরি বদলে যায়। সে রিয়াদের বাবার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। রিয়াদের প্রতিটি ভালোমন্দ তার নখদর্পনে।

শোভনের মোবাইল ফোনের স্কিনে আলো জ্বলে উঠতেই ভাবনার জগত থেকে ফিরে আসে সে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখতে পায় রিয়াদের ফোন। রিসিভ করে কানে লাগাতেই সেই চিরাচরিত কন্ঠ,
-ভাইয়া, কি করছ?
– তোমাকে নিয়েই ভাবছিলাম।
– কেন? আমি আবার কি করলাম? আপু কোন বিচার দিয়েছে?
– আরে নাহ, এমনিই। তোমার কি অবস্থা? রিয়ার সাথে কথা হয়েছে?
– জী ভাইয়া, আলহামদুলিল্লাহ। আর বলো না, পুলিশের স্বামীর সাথে কথা বলারও সময় নেই।
– কি আর করবে? বেচারার অফিসের চাপ তো থাকবেই।
– তোমরা সবাই তার পক্ষে। ঠিকমতো একবেলা তোমাদের রান্না করে খাওয়ায় না, তারপরও তোমরা তার পক্ষে ওকালতি করো।
– কি ব্যাপার? শালাবাবুর মনে হয় মুখে বোল ফুটেছে? আমি কিন্তু বলে দেব রিয়াকে। কনফারেন্সে আনব নাকি তাকে?
– আমি সে ব্যবস্থা করার জন্য তোমাকে ফোন দিয়েছি।
– কিভাবে?
– ভাইয়া, আমার ইচ্ছে হয়েছে আজ আমলাদের সাথে লাঞ্চ করার। ইচ্ছে পূরণ হবে কি?
– তুমি আমার একমাত্র বড়কুটুম না বলার উপায় আছে? তা কে কে থাকবে লাঞ্চে?
– তুমি, আপু, আমি।
– ওরে বাবা! মামলা খাবো তো! পুলিশ ছাড়া হবে না।
– ওর কি সময় হবে?
– তুমি রিয়াকে বলো ফোন করে।
– ঠিক আছে ভাইয়া, আপুকে বলে দিও। আমি এসে তোমাকে কল দেব।
– ওকে বাই।

শোভনের সাথে কথা বলা শেষ করে রিয়াকে ফোন দেয় রিয়াদ। দ্বিতীয়বারে ফোন ধরে রিয়া,
-কি ব্যাপার? আজ কি আমাকে খুব দেখতে মন চাচ্ছে নাকি বারবার ফোন দিচ্ছ?
– পুলিশ বিয়ে করে ফেঁসে গিয়েছি। বউকে দেখতেও পাই না সবসময়।
– আমি এখনি চাকরিতে রিজাইন করে চলে আসি। আমার হিরোর সামনে সব সময় বসে থাকব।
– রাখ তোমার ফাইজলামো সে কপাল আমার না। আপা দুলাভাইকে বলেছি দুপুরে একসাথে খাব।
– ঘটনা কি?
– পুলিশ খালি প্রশ্ন করে। কোন ঘটনা নেই। আপুর সাথে দেখা হয় না কতদিন।
– বাবুটা কি কেঁদে দেবে নাকি?
– বাসায় আসলে মজা পাবে?
– তুমি কিন্তু পুলিশকে হুমকি দিলে মনে রেখ।
– হ্যা দিলেম, হাতকরা নিয়ে এসো।
– সেটাই তো অনেক আগেই পড়িয়ে ফেলেছি। ঠিক আছে তুমি আমাকে যাবার সময় তুলে নিও।
– ওকে বাই, তুমি বাসায় একটু ফোন দিও।
– আহ আমার কেয়ারী হাসবেন্ড।জী  জনাব। যথা আজ্ঞা। বাই, ভালো থেক।
রিয়াদ ফোন রেখে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তার ব্যবসায়িক কাজে। অনেক কাজ জমা পড়ে আছে।

চলবে———

-বাউল সাজু