উত্তরাধিকার (১৬ তম পর্ব)

সুপয়ার দিনটি কাটে মহা ব্যস্ততায়। আজ তার জন্য বিশেষ দিন। ঈদ বললে খুব বেশি বলা হবে না। তিন বন্ধুকে পাশে বসিয়ে গল্পে মশগুল তিনি। তার গল্প একজন কিছুটা বুঝলেও বাকি দুজন না বুঝেই হেসে গড়াগড়ি। ভাইয়া হেসেছে মানে তাদের আরো বেশি করে হাসতে হবে। সুপয়াকে ঘিরে বসে আছে উৎস, প্রাপ্তি এবং সুদীপ্ত। রিশার ছেলে মেয়ে হৈহৈ করে বাসায় ঢুকেছে। সুপয়া তখন মাত্র সুদীপ্তকে খাইয়ে বিছানায় পাঠানোর চেষ্টা করছে। দুজন সোজা দোতলায় উঠে সুদীপ্তের রুমে। সুদীপ্ত লাফ দিয়ে বিছানা ছাড়ে।

– দীদা, আমার ঘুম হবে না। এখন ভাইয়া ও প্রাপ্তির সাথে খেলা করব।
সুপয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল উৎস ও প্রাপ্তির দিকে। সুপয়া উৎসকে প্রশ্ন করে,
– কার সাথে এলে নানু ভাই?
– মামার গাড়ি আমাদের নিয়ে এসেছে।
– বলো কি? তোমার আব্বু আম্মু জানে?
– হ্যা, আমি মাম্মিকে ফোন করেছিলাম। মাম্মি তোমার কাছে আসতে বলেছে।
উৎসের সাথে নানু এতো কথা বলছে এটা প্রাপ্তির সহ্য হয় না। সে নানুর মুখের কাছে গিয়ে বলে,
– নানু, আমি মাম্মিকে বলেছি। ভাইয়া কিচ্ছু বলেনি।
– ঠিক আছে আপুমনি। চলো তোমাদের খেতে দেই।
– আমরা তো খেয়ে এসেছি। এখন তুমি গল্প বলো।
– তাহলে তোমরা শোও, আমি তোমাদের গল্প শুনাবো।

নাতি নাতনিদের গল্প শোনানোর পাশাপাশি বাড়ির রাধুনিকে ডেকে রান্নার ফরমায়েস দিতে থাকে। তার মেয়ে মেয়ের জামাই রাতে খাবে। ছেলে মেয়ের পুরো পরিবার একসাথে পেলে সুপয়ার আনন্দের শেষ থাকে না। ছেলে গুলশানে বাড়ি করার পর তার মনে আশার সঞ্চার ঘটেছিল। এবার মনে হয় ছেলে মেয়ে একসাথে থাকবে। তার ছেলের বউয়ের তুলনা হয় না কারো সাথে। মেয়েটি কত সহজে সংসারটাকে আপন করে নিল। রিয়ার বাবা জেলা জজ হিসেবে চাকরি করছে। অথচ মেয়েটির এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র অহমিকা নেই। তিনজনকে গল্পের ফাঁদে ফেলে এক সময় সুপয়া তাদের ঘুম পাড়িয়ে দেয়। এরপর তিনি ছোটেন রান্নাঘরে। জামাইয়ের পছন্দের সবগুলো ডিশ নিজহাতে রান্না করেন তিনি। তিনি উসখুস করতে থাকেন। একবার রান্নাঘরে যান আবার ফ্রিজের কাছে যান। কিছু কি বাকি রয়ে গেল?

সুপয়া বসে বসে নাতি নাতনিদের পাহারা দেয়। একেকটা যেন দেব শিশু। কি সুন্দর গুছিয়ে কথা বলে! সারাক্ষন তাদের কথা শুনতে পেলে তার আর কিছুর দরকার নেই। সুদীপ্ত দেখতে হুবহু তার দাদার মতো হয়েছে। তার গায়ের রঙ, কথা বলার ঢং, এমনি এ বয়সেই অল্পতেই রেগে যাওয়া। দাদু ভাইকে কাছে পাওয়ার পর এখন আর গ্রামের বাড়ি যাওয়ার কথা তার মনেই আসে না। গ্রামের বাড়িটি সুজয় গভীর ভালোবেসে করেছে। কোথায় কি হবে? প্রত্যেকের জন্য আলাদা ঘর। এখন বাড়িতে একজন কেয়ার টেকার রেখেছে রিয়াদ। ছেলেটা বড় হওয়ার পর হঠাৎ করে খুব দায়িত্বশীল হয়ে পড়েছে। অথচ সুজয় ছেলেটাকে নিয়ে কত চিন্তা করেছে। একমাত্র ছেলের লেখাপড়া, তাকে মানুষ বানানো। এসব কিছু নিয়ে মানুষটার চিন্তার শেষ ছিল না। শেষ সময়ে তিনি ছেলের উত্থান দেখে গিয়েছেন। মেয়ে রিশার উপর ছিল অগাধ আস্থা। মেয়েটি যা করেছে সব কিছু হিসেব করে। জীবনে একটি টাকা বাহুল্যখরচ করেনি। ছেলে মেয়ে দুটোই তাদের পছন্দ মতো বিয়ে করে সুখে আছে।

সুপয়া তার জীবনের সুখ শান্তির কথা ভাবতে গিয়ে কখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে তা বুঝতেই পারে নি। তার চমক ভাঙ্গে রিয়ার কথায়।
– বাহ মা, তুমি তো আজ বিশ্বজয় করে ফেলেছ।
রিয়া তার  শাশুড়িকে  তুমি করে বলতে বাধ্য হয়েছে সুপয়ার জোড়াজুড়িতে। সুপয়ার এক কথা, রিশা যদি তাকে তুমি বলে তাহলে রিয়া তুমি করে বললে ক্ষতি কি? সুপয়া রিয়ার কথার মানে বুঝতে পারে না। তাই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে রিয়ার মুখের থাকে।
– কি বলছ তুমি রিয়া?
– মা, তুমি তিনজনকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছ কিভাবে? বিশেষ করে দীপ্ত তো এ সময় কখনো ঘুমাতে চায় না।
– তোমরা আমার দাদুভাইটাকে অযথাই বক।
– আমরা তোমার দাদুভাইকে বকা দেই নাকি তোমার দাদুভাই আমাদের বকে?
– রিয়াদ কোথায়?
– আসছে, আমরা একসাথে এসেছি। গাড়ি রেখে আসছে।
– ড্রাইভারকে বসিয়ে বসিয়ে বেতন দিচ্ছে কেন সে? কত করে বলি নিজে ড্রাইভ করিস না, কে শোনে কার কথা! তুমি কি ওকে একটু বুঝাতে পার না?
– মা, তোমার ছেলে শুনবে আমার কথা!

রিয়াদ রুমে ঢুকতে ঢুকতে বলে,
– আমাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গিয়েছে?
বলেই রিয়াদ মাকে জড়িয়ে ধরে। সুপয়া ছেলেকে বলে,
– ড্রাইভার থাকতে তুই গাড়ি নিয়ে বের হচ্ছিস কেন?
– মা, তুমি এগুলো নিয়ে চিন্তা করো নাতো। তাছাড়া তাকে তোমার দরকার পড়তে পারে। আমরা দুজন সারাদিন বাইরে থাকি। তোমার মাথার উপর একটা বিশাল বোঝা চাপিয়ে দিয়ে যাই। দীপ্তকে শান্ত রাখতে তোমাকে কখন কি দরকার হয় তার কোন ঠিক আছে।
– অন্ততপক্ষে তোর চেয়ে আমার দাদুভাই অনেক লক্ষি।
– হ্যাঁ তাতো দেখতেই পাচ্ছি। কিচ্ছু বলা যাবে না। কিছু বললেই দীদার কাছে বিচার দেবার হুমকি দেয়।
– ঠিকই তো আছে। আমার দাদুভাইকে তোরা কিছু বলবি কেন?
মা ছেলের কথার মাঝে রিয়া বলে,
– মা, কিছু কি রান্না করার বাকি রেখেছ নাকি সব শেষ?
– দুর পাগলি সারাদিন অফিসে খেটে এসেছিস, বাসায় এসে আবার খাটবি?
রিয়া শাশুড়িকে জড়িয়ে ধরে,
– বাংলার প্রতিটা ঘরে তোমার মতো শাশুড়ি থাকলে স্বর্গ ধরায় নেমে আসত মা।
– ঠিক নারে মা, এক হাতে তালি বাজে না। তোরা আমার খেযাল নিচ্ছিস। আমি মনের তাগিদে একটু তদারকি করছি।
রিয়াদ টিপ্পুনি কাটে,
– রিয়া, তুমি বুঝতে পারছ না, আজকে উনার মেয়ে আসবে তাই স্পেশাল।
– কি বলতে চাস? আমি মেয়েকে বেশি ভালোবাসি?
বলেই ছেলের কান টেনে ধরেন সুপয়া।
– আহ মা, বউয়ের সামনে তুমি ইজ্জতের বারোটা বাজিয়ে দিলে।
রিয়া বের হয়ে যেতে যেতে বলে,
– মা, আমি কিছু দেখিনি। তুমি একটু আচ্ছামতো টাইট দিয়ে দাও। আমি একটু চেঞ্জ হয়ে আসি।

সুপয়া ছেলের কান ছেড়ে দিয়ে বলেন,
– কিরে, ওরা কখন আসবে?
রিয়াদ না বুঝার ভান করে বলে,
– কারা মা?
– আবার কি কান মলা খাবি?
– দাও না আরেকটু, অনেকদিন পর মজাই লাগে খেতে।
– পাগল, তোর দুলাভাই কখন আসবে?
– কি বলছ? আমার আবার দুলাভাই এলো কোথা থেকে?
– মরাব এক থাপ্পর। ফাজলামো করিস?
– মা, থাপ্পর দিলে চাইলে দিতে পার আপত্তি নেই। তবে যা বলার খোলাসা করে বলো।
– ঠিক আছে এবার দীপ্তকে ডাকি। তার সামনে তোর বারটা বাজাব।
রিয়াদ মাকে জড়িয়ে ধরে। বলে,
– মা, তোমার সাথে মজা করতে আমার ভালো লাগে। তোমার কি মনে আছে, আমি সারাদিন তোমাকে জ্বালাতাম। হাতের সামনে পানির গ্লাস রেখেও তোমাকে ডেকে ডেকে হয়রান করেছি। তুমি হাতের কাজ ফেলে আমার কাছে আসতে, আমি তোমাকে বলতাম, মা, একগ্লাস পানি দাও। আমি কেন বড় হলাম মা? মা, তুমি কথা দাও আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না।
সুপয়া ছেলের মাথাটা বুকে নামিয়ে আনতে চেষ্টা করে। রিয়াদ মাকে ধরে বিছানায় বসিয়ে তার কোলে মাথা রাখে। ছেলের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে সুপয়ার চোখের কোণ জলে ভরে আসে। কান্নাভেজা কন্ঠে বলেন,
– বাবা, তোরা দু’জন ছাড়া আমার কেউ নেই। আমি কোথায় যাব? আমার স্বামীর ভিটে ছাড়া যাবার জায়গা নেই।
– মা, আমি তোমাকে আপুর বাসায় যেতে দিতে চাই না, তুমি কষ্ট পেও না। আমি বাসায় ফিরে তোমাকে না দেখলে আমার সব কিছু এলোমেলো লাগে।
– তুই রিশাকে এখানে থাকতে বলতে পারিস না?
– তুমি কি মনে করো আমি সে চেষ্টা করি নি? তোমার মেয়ে যে পরিমাণ সেনসেটিভ। তাই রিয়াকে দিয়ে বলিয়েছিলাম। ডাইরেক্ট অ্যাকশন। বলে দিয়েছে এটা নিয়ে কখনো কথা বলা যাবে না।
– আমি কি রিশার সাথে কথা বলে দেখব?
– বলতে পার, কিন্তু কোন কাজ হবে বলে মনে হয় না।
– মেয়েটা হয়েছে বাবার মতো, এক কথার মানুষ। যা বলবে তো বলবে। কোন এদিক সেদিক হতে পারবে না।

– মা ছেলে মিলে কি আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছ?
রিশার কথায় বাস্তবে ফিরে দু’জন। সুপয়া মেয়েকে টেনে পাশে বসায়।
– এতো দেরি করলি কেন মা? আমি সেই বিকেল থেকে তোদের অপেক্ষায় আছি।
– মা, অফিসে অনেক কাজ ছিল। সব দোষ তোমার। আমি চাকরি বাকরি করতে চাই নি। অথচ তুমি জোর করে আমায় চাকরিতে ঢুকালে। আমি তোমার শত্রু। এখন ছেলেকে নিয়ে যখন তখন মজা করো।
– দুর পাগলি, তোরা দু’জনই তো আমার সব। এককাজ কর, তোরা এ বাড়িতে চলে আয়। তাহলে নানুভাইদের দেখাশোনা করা আমার পক্ষে খুব সহজ তো।
– তোমাকে কি এই শয়তানটা উকিল ধরেছে?
– কেন, রিয়াদকে বলতে হবে কেন? আমার মন চায় না তোদের সব সময় কাছে পাই।
– মা শোন, আমার শ্বশুরবাড়ির কাছে আমাকে ছোট করো না। বিশেষ করে, তুমি বললে শোভন সাথে সাথে রাজি হয়ে যাবে। ভুলেও এ কাজটি করো না মা। মানুষ হিসেবে বেচে থাকতে হলে আত্মসম্মানটা ধরে রাখতে হবে।
– ঠিক আছে মা, আমি শোভনকে বলবো না।
– মা, তুমি ওদের ঘুম পাড়ালে কি করে?
– টপ সিক্রেট, বলা যাবে না। শোভন কোথায়?
– নিচে বসে আছে।
– তোরা জামাইকে নিচে বসিয়ে রেখে এসেছিস কেন? তোরা আয়, আমি নিচে যাচ্ছি।

সুপয়া তাড়াহুড়ো করে নিচে নেমে আসে। এসে দেখে শোভন সোফায় বসে সেদিনের পত্রিকা পড়ছে। শাশুড়িকে দেখে উঠে সালাম করে।
– বেঁচে থাক বাবা, তোমাকে একা রেখে ওরা উপরে চলে গেল কেন? তুমি তোমার রুমে গিয়ে ফ্রেশ হও।
– আপনার ব্যস্ত হতে হবে না মা। আমি যাচ্ছি আস্তে ধীরে।
– তোমার বাবা মা কেমন আছেন? অনেকদিন উনারা আসেন না।
–  জ্বী আম্মা, বাবা মা ভালো আছেন। আপনাকে নিয়ে যেতে বলেছেন।
– যাব বাবা, তোমাকে শরবত দিতে বলি।
– আম্মা ব্যস্ত হবেন না।
সুপয়া শোভনের কথায় কান না দিয়ে তার জন্য শরবতের ব্যবস্থা করেন। গৃহ পরিচারক বেশ কয়েক প্রকার ফ্রেশ জুসসহ শরবত নিয়ে আসে। সুপয়া তাকে দিয়ে সবাইকে খাবার টেবিলে আসার খবর পাঠান। বাচ্চারা ঘুম থেকে উঠে নিচে নেমে আসে। সুপয়া সবাইকে ধরে ধরে জুস শরবত খাইয়ে দেন। বাচ্চাদের পেছনে ছুটতে ছুটতে তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এতো ব্যস্ততা দীর্ঘদিন পর তার মনে শান্তি এনে দেয়। আজকের দিন সুপয়ার জীবনে বারবার ফিরে আসবে না। তিনি মনে মনে আল্লাহর দরবারে হাজার হাজার শুকরিয়া আদায় করে।

চলবে———

– বাউল সাজু