উত্তরাধিকার ( ১৯ তম পর্ব )

নুরা জীবনে প্রথমবার এমন ভয় পেয়েছে। শত চেষ্টা করেও সে তার মন থেকে পুলিশ ভীতি দূর করতে পারে নি। ঝড়ের বেগে হোন্ডা চালিয়ে বাড়ির কাছাকাছি এসে মনে পড়ে তার শ্বশুর তাকে অপেক্ষা করতে বলেছিল। রাস্তার মাঝে হোন্ডা থামিয়ে কিছুক্ষণ দম নেয় সে। ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করার চেষ্টা করে। তার সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে আসে। সে কখনো কোন কিছু ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে নি। ছোট বেলা থেকে দেখে এসেছে, তার সামনে কেউ মাথা উঁচু করে কথা বলে নি। তার বাবা জরুকে সবাই ভয় পেত। হেন কোন খারাপ কাজ নেই যা জরুর পক্ষে করা অসম্ভব ছিল। সেই অমানুষ বাবার যোগ্য সন্তান হবার সবটুকু প্রচেষ্টা করেছে নুরা। তার বাপকে সে ছাড়িয়ে যেতে পারবে না। তার বাপ ঠান্ডা মাথায় মানুষকে রাস্তার ফকির বানানোর চেষ্টায় নিয়োজিত থাকত প্রতিনিয়ত।

কূটচাল দেয়ায় ওস্তাদ ছিল জরু। তার ছেলে হয়েও নুরাও হুজোগপ্রিয়। সে বেশিরভাগ কাজ করে মনের তাগিদে। একজনকে মারতে মন চেয়েছে তো মেরে চলে এসেছে। একটা বিষয় সে ভালো বোঝে, কখন কোথায় গরম হওয়া যাবে না। আবার ফিরতি পথ ধরে সে। থানায় ঢুকে বাইরে বসে অপেক্ষা করতে থাকে সে তার শ্বশুরের জন্য। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর সে কল করে রহিমকে। বেশ কয়েকবার রিং হবার পর রহিম ফোন রিসিভ করে।
– কাহা আমনে কই?
– বাইত যাইতাছি। তুই কই?
– আমি আমনের লাইগ্গা থানায় বইয়া রইছি।
– তরে থানায় না পাইয়া আমি বাইত যাইতাছিগা। তুই বাইত আইয়াপর।
– আইচ্ছা আমনে যান, আমি আইতাছি।

নুরা থানা থেকে বের হয়ে বদুকে ফোন দেয়,
– ওই —— পোলা, তোরে দেহি না কেন?
– ভাই, আমি ত আমনের বাইত গেছিলাম। দুফুরে খাইয়াই আমনের বাইত গেছিলাম।
– ফোন দিলি কেন চুতমারানির পোলা?
– আমনে থানায় গেছেন হুইন্না ফোন দেই নাই।
– তুই বাজারো থাক, আমি আইতাছি।
– আইচ্ছা আমনে আইয়েন।
নুরা ফোনের সংযোগ কেটে দিয়ে বাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। সে কখনো ধীরে সুস্থে হোন্ডা চালাতে পারে না। তার কাজ করার মতো হোন্ডা চালাতেও অস্থিরতা কাজ করে। সে প্রায় উড়ে চলে আসে বাজারে। নির্ধারিত চায়ের দোকানে সে তার চ্যালা বদুকে বসে থাকতে দেখে। তাকে দেখেই বদু অপ্রয়োজনে বেঞ্চটা পরিষ্কার করে। বসে থাকা অন্যদের অকারণে ধমক দেয়।
– সর সর, ভাইরে বইতে দে।
অন্যরা আরো জড়োসরো হয়ে বসে নুরার বসার জায়গা করে দেয়। এতোক্ষণে তার মনটা খুশি খুশি লাগে। এটা তার রাজত্ব। এখানে তার শাসনই আইন। কেউ প্রতিবাদ করার সাহস দেখায় না। দুই পা বেঞ্চের উপর তুলে কড়া মালাই দেয়া চায়ে লম্বা এক চুমুক দিয়ে শান্তির ঢেকুর তোলে।

রিয়া অফিসে লাঞ্চের পর বাসায় ফোন করে। তার ফোন ধরে দীপ্ত। ছেলের কন্ঠ শুনে সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায় তার। তার নিজস্ব পৃথিবীটা ঝলমল করে ওঠে সুখের স্নিগ্ধ আলোয়।
– বাবা সোনা কি কর?
– দীদার সাথে কার্টুন দেখছি।
– দীদাকে জ্বালাচ্ছ নাতো?
– মাম্মি, আমি বাপির মতো পঁচা না, আমি তো দীদার বন্ধু।
– তোমার বাপি কেমন করে পঁচা হলো?
– কেন, তুমি জানো না, বাপি দীদাকে খুব জ্বালাতো।
ছেলের কথা শুনে ঝর্ণার পানি আছড়ে পড়ার শব্দ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। রিয়ার মনটা প্রশান্তিতে ভরে উঠে। হাসতে হাসতে ছেলেকে বলে,
– তোমার বাপিকে বকে দাও না কেন?
– দীদা তো বকতে মানা করেছে।
– বাবা সোনা, একটু ঘুমাবে না?
– না মাম্মি, দীদার সাথে কার্টুন দেখব।
– বাবা, দীদাকে দাও। তোমার সাথে পরে কথা হবে। লাভ ইউ পাপা।
– লাভ ইউ মাম্মি। বাই।
দীপ্ত দীদার হাতে ফোনটা ধরিয়ে দেয়।
– মা, আস সালামু আলাইকুম, কেমন আছো?
সালামের জবাব দিয়ে সুপয়া জানায় সে ভালো আছে। কুশলাদি বিনিময় করে সুপয়া ফোন রেখে দেয়।

রিয়া মায়ের সাথে কথা বলা শেষ করে রিয়াদকে কল দেয়। রিং বাজার সাথে সাথে রিসিভ হয়। রিয়া চমৎকৃত হয়ে প্রশ্ন করে,
– কি ব্যাপার স্যার? রিং হওয়ার সময় দিলে না।
– মোবাইলটা হাতে নিয়ে তোমাকেই ভাবছিলাম।
– ওরে বাবা, প্রেম তো উপচে পড়ছে। ঘটনা কি?
– ব্যবসা মানে প্রেসার। একটু রিলাক্স পেতে তোমার ছবিগুলো দেখছিলাম।
– অনুমতি না নিয়ে আমার ছবি দেখছিলে কেন?
রিয়াদ এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলে,
– একটু ভিডিও কল দেই প্লিজ।
– এখন আমার রুমে কেউ চলে আসতে পারে।
– প্লিজ, একটু।
– তুমি তো আচ্ছা নাছোড়বান্দা। আচ্ছা ঠিক আছে তবে বেশিক্ষণ আটকে রাখতে পারবে না।
সাথে রিয়াদ কল কেটে দিয়ে ভিডিও কল দেয়। রিয়া কল রিসিভ করার সাথে হ্যান্ডসাম রিয়াদের হাসিমাখা মুখটি ভেসে উঠে। এ হাসিমাখা মুখ দেখলে রিয়ার সব কিছু এলোমেলো হয়ে যায়। কোন কাজে মন বসাতে পারে না সে। শুধুই রিয়াদের বুকে মাথা রেখে জড়িয়ে ধরে থাকতে ইচ্ছে করে।

রিয়াদ জানে রিয়া তাকে কতটা ভালোবাসে। আপুর পছন্দে বিয়ে করে রিয়াদ সুখী।সংসার অন্তপ্রাণ। কখনো রিয়াদ শুধু রিয়ার জন্য কিছু কিনতে পারে নি। তাকে সে এতো ভালো বুঝতে পারে, যার জন্য কখনো তাদের মধ্যে সংসারের অন্য সদস্যদের নিয়ে কোন ঝামেলা হয় না। রিয়াকে নিয়ে তার গর্ব হয়। ডাকসাইটে রকমের সুন্দরী সে। বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে। একটি মাত্র ছোট ভাই। বাবা জেলা জজ। তার মধ্যে কোন অহমিকা নেই।
– কি ব্যাপার, তুমি কথা বলছো না কেন? তুমি কতোক্ষণ যাবৎ তাকিয়ে আছ জানো?
রিয়ার প্রশ্নে তার সম্বিৎ ফেরে। তার চটপটে উত্তর,
– আমি কি কথা বলার জন্য ফোন দিয়েছি?
– তাহলে ফোন দিলে কেন?
– তোমাকে দেখার জন্য।
– ঘটনা কি? প্রেমেটেমে পড়লে নাকি?
– হ্যা, পড়েছি তো। সেই কবে থেকে এক সুন্দরী পুলিশ অফিসারের প্রেমে পড়েছি। সে তো পাত্তাই দিতে চায় না।
– তাই নাকি? নাম ঠিকানা বলো, লাইন লাগিয়ে দেই।
চকাশ করে রিয়াদ মোবাইল স্্ক্রীনে চুমো দেয়। বলে,
– আমার বউটাকে আমি কি অফিস থেকে নিতে আসতে পারি?
– আরে, তোমাকে সেটা বলার জন্যই কল দিয়েছিলাম। তুমি একটা অসভ্য বাচাল।

– ভালোবাসাটা কি অসভ্যতা?
– তুমি আবার শুরু করলে? আমি ফের ভুলে যাব।
– হুকুম কিজিয়ে বেগম সাহেবা।
– ঢং করো না, আমার আজ অফিস থেকে বের হতে দেরী হবে, তুমি সাড়ে সাতটায় আমাকে অফিস থেকে তুলে নিও।
– কোন শত্রুও যেন পুলিশ বিয়ে না করে।
কৃত্রিম  হতাশা ফুটিয়ে তোলে রিয়াদ চেহারায়। রিয়া টিপ্পনী কাটে।
– সুযোগ নেবে নাকি একটা?
– ও বাবা, মাফ চাই। এমন সুন্দরী লক্ষী বউ ক’জনের আছে?
– আর গ্যাস দিতে হবে না। ভুলে যেও না কিন্তু।
– আমি সাতটার আগে থেকে বসে থাকব।
– আগে আসতে হবে না, সাড়ে সাতটায় এসো।
– যথা আজ্ঞা বেগম সাহেবা।
– তোমাকে অনেক সময় দেয়া হয়েছে, আর দেয়া যাবে না। বাই।
রিয়া ফোন কেটে দেয়। রিয়াদ নিজের কাজে ডুবে গেলেও মনে ভালোলাগার অনুরণন ছড়িয়ে থাকে।

-বাউল সাজু