উত্তরাধিকার ( ২০ তম পর্ব )

বেশ কয়েক মাস আগে নুরার নামে আদালত থেকে সমন এসেছিল। আদালতের সমন দেখে সে থোরাই কেয়ার করে। সে ভয় পায় পুলিশকে। আদালত তার খুব পছন্দের জায়গা। এখানে মামলা মামলা খেলতে তার খুব ভালো লাগে। তার বাঁধা এক ডাকসাইটে উকিল আছে। তার ভরসাতেই সে মামলাকে ডেম কেয়ার হিসেবে দেখে। সমন নিয়ে সে ছোটে জেলা সদরে উকিলের চেম্বারে। চেম্বারে যাওয়ার আগে সে উকিল সাহেবকে ফোন করে নিশ্চিত হয়ে নেয়। এ সব কাজে নুরা তার চ্যালাকে ছাড়া এক পা নড়ে না। মাঝে অনেকদিন উকিলের চেম্বারে সে পদার্পণ করে নি। সমন পেয়ে সবচেয়ে অবাক হয়েছে মামলাকারীর নাম দেখে। এ নামের কাউকে সে চিনে না। মামলাকারীর অস্থায়ী নিবাস ঢাকা। আরো আশ্চর্যের  বিষয় আবেদনকারীর স্থায়ী নিবাস হিসেবে নুরার গ্রামের নাম লেখা আছে। সবচেয়ে মজার বিষয়টা হলো আবেদনকারী একজন মহিলা। সে কখনো নারীকে মানুষ মনে করে না। তার দৃষ্টিতে নারী হলো অবলা জীব। তাই মামলাকে মোটেই আমলে নেবার ইচ্ছে তার নেই। কিন্তু বদুর তাগিদে উকিলের চেম্বারে হাজির হয়।

উকিলের চেম্বারে ঢুকেই নুরা উকিল সাহেবকে লম্বা একটা সালাম দেয়। উকিল সাহেব একটি মামলার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিল। মুখ না তুলেই উকিল সাহেব স্বভাবসুলভ সালামের জবাব দেয়। নুরা মনোক্ষুন্ন হয়ে বলে,
– উকিল সাব কি আমার উফরে মাইন করছেন?
এবার তিনি বিরক্ত হয়ে মুখ তুলে তাকান। বেশ কড়া কিছু বলার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু নুরার চোখে চোখ পড়তেই লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ান।
– আরে, নুরা ভাই, কতদিন পর। কি মনে করে এলেন?
– আরে ভাই, মাইনসে ঠেকলেই আপনেগো কাছে আইয়ে।
– আপনার আবার কি ঠেকা পড়ল?
– বইতে কইবেন না, খাড়াইয়া খাড়াইয়া কতা কমু নি?
এবার সুযোগ বুঝে বদু তার বোঁচা নাক গলিয়ে দেয়,
– উকিল সাব, ভাইরে আগে বইতে দেন, চা পানি খাওয়ান। আমনের জেবের স্বাইস্থ মোডা অওনের ব্যবস্থা অইবনে।
বদুর কথাকে গায়ে মাখে না উকিল সাহেব। তিনি বদুর কথা না শোনার ভান করেন। নুরাকে সামনের চেয়ারে বসতে বলেন। তার জুনিয়রকে পাঠান চা বিস্কুট আনতে। তিনি জানেন, নুরা তার একজন বেশ ভালো মানের মক্কেল।

নুরা আরাম করে বসে আয়েসি মেজাজে মালাই চায়ে চুমুক দেয়। উকিল সাহেব তাকে চা খেতে বলে নথিতে মনোনিবেশ করেন। ততক্ষণে নুরার চা খাওয়া শেষ হয়। উকিল সাহেব হাতের কাজ সরিয়ে রেখে নুরার দিকে মনোযোগ দেন।
– ভাই, এবার বলেন কি দরকারে এসেছেন?
– আর কইয়েন না, মান ইজ্জত এইবার গেলগা। কোন এক মহিলা মামলা করছে আমার নামে।
– বলেন কি? নারী নির্যাতনে জড়িয়ে গেলেন নাকি?
বদু তেল দেয়ার সুযোগটুকু ছাড়ে না।
– কন কি উকিল ছাব, আমগো ভাইয়ে কোনো নারী নির্যাতনে ফাসবো কেন?
নুরা বদুকে ধমক দেয়,
– তুই থাম নাটকির পোলা।
উকিল সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বলে,
– আরে ভাই, টেহা থাকলে ওইগুলা করে কোন খানকির পোলায়? এইডা অইন্য মামলা।
– আমাকে খুলে বলেন তো।
– আমনেরে খুইল্লা কওনের লাইগ্গাইতো নিজে আইয়া পড়ছি।

নুরা সমনটি বের করে উকিল সাহেবকে দেখায়। তিনি একটু নজর বুলিয়ে চেহারায় গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তোলেন। তার চেহারায় মেঘের ঘনঘটা দেখা দেয়। নুরা উকিলের চেহারার পরিবর্তন লক্ষ্য করে তাকে উপহাস করার উপক্রম নেয়।
– উকিল ছাব আমি আমনের পুরান মক্কেল, আমার লগে ভাব নেওনের কাম নাইক্কা। যা কওনের খোলাসা কইরা কন।
উকিল সাহেব জবাব দেবার আগে একটুক্ষন ভাবেন।
– নুরা ভাই, আদালত পাড়ায় একটা কথা বাতাসে ভাসতেছে।
– কি কন এইসব? আমি ত কিছুই বুঝতাছি না।
– আপনার বুঝার কথা নয়।
– আমনে কি আমারে ডর দেহাইতাছেন?
– না ভাই, আপনি আমার অনেকদিনের পরিচিত। আপনাকে ভয় দেখাব কেন? আপনি বসেন। আমি একটু খোঁজ খবর নিয়ে নেই।

নুরা নিশ্চিন্তমনে চেম্বারে বসে থাকে। এর পূর্বে বেশ কয়েকটা মামলায় উকিল সাহেব তাকে জিতিয়ে দিয়েছেন। জাল দলিলের মামলায়ও সে উতড়ে গিয়েছিল উকিলের পরামর্শে। উকিল সাহেব তার জুনিয়রকে জেলা প্রশাসকের পেশকারের কাছে পাঠায়। অল্পবিদ্যার হাফেজ বদু ফোড়ন কাটে,
– উকিল ছাব, আমনে জল ঘোলা করতাছেন মনে অইতাছে।
উকিল সাহেব বেশ রুষ্ট হয় তার ফাঁপর দালালীতে। বেশ কঠোর স্বরে তাকে জবাব দেয়।
– আপনার কেন এমনটা মনে হলো?
– আমনে ছোড উকিলরে কই পাডাইতাছেন?
– ওটা কি আপনাকে জিজ্ঞেস করব?
– না মাইনে, আমরাও কিছু অহন বুঝি। কোন মামলা কোন হানে অয়।
– এতো বেশি বুঝেন বলেই আপনাদের সমস্যা।
এবার নুরার মুখ দিয়ে গালির ফোয়ারা ছোটে। তার গালির স্টকের সেরা বেশ কয়টা গালি ঝেড়ে ফেলে বদুর উপর।
– তুই আর একডা কতা কইলে তরে খাইয়া ফালামু —- মাগির পোলা। তর বাপ বইয়া রইছে আর তুই মাদবরি করতাছত।
উকিল সাহেব নুরাকে থামিয়ে দেয়।
– ঠিক আছে নুরা ভাই আপনি থামেন। আমার জুনিয়র আসুক।

কিছুক্ষণ পর জুনিয়র এসে একটি চিরকুট ধরিয়ে দেয় উকিলের হাতে। চিরকুট হাতে নিয়ে জুনিয়রকে এবার পাঠায় মামলার সার্টিফায়েড কপি নেবার জন্য। তিনি নুরাকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
– আপনার মামলার বাদীর নাম জানেন?
– অনেক বড় নাম। আমার মুনো থাহে না।
– ঠিক বলেছেন, তার নাম মুনতাহা সালসাবিল অজান্তা।
– হ, ইমুন কডিন নাম আমার মুনো থাহে না।
– এরচেয়ে কঠিন একটা কথা আছে।
– কি কতা, কইয়ালান।
– এ মামলার বাদী নাকি ডিসি সাহেবের আত্মীয়।
এ কথা শুনে নুরার আত্মা খাঁচাছাড়া হবার উপক্রম হয়। সে জানে ওসি আর ডিসির ওপর বড় কোন অফিসার নেই। তাদের চেয়ে বেশি ক্ষমতা কারো নেই। সে বসা থেকে লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। তার নিরুদ্বেগ অবয়বে কালো মেঘের ছায়া পড়ে। কাঁদো কাঁদো কন্ঠে উকিল সাহেবকে বলে,
– উকিল ছাব, আমারে বাঁচান। যত টেহা লাগে আমনে নেন কিন্তুক আমারে বাঁচান লাগব।

উকিল সাহেব এ কথাটার অপেক্ষায়ই ছিলেন। তিনি আস্তে আস্তে জাল গুটিয়ে আনতে শুরু করেন। তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারেন রাঘব বোয়াল তার জালে পেঁচিয়ে আছে। তার বেড়িয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এবার খেলিয়ে খেলিয়ে তাকে ডাঙ্গায় তোলতে হবে। তিনি এবার উদার হবার অভিনয় করেন।
– নুরা ভাই, আপনি চিন্তা করবেন না। আমি আপনার পাশে আছি তো।
– হ, আমনে আছেন কইয়াইত আমি বাইচ্চা আছি।
বলেই পকেট থেকে এক তাড়া নোট বের করে উকিল সাহেবের হাতে গুঁজে দেয়। টাকার স্পর্শ উকিল সাহেবকে পাল্টে দেয়। তিনি দয়ার অবতার সাজেন। নুরাকে নানা রকম সান্ত্বনার বাণী শোনাতে থাকেন।

চলবে——–

-বাউল সাজু