উত্তরাধিকার ( ২১ তম পর্ব )

উকিল সাহেবের অবিরাম সান্ত্বনার বাণীতে নুরার মনে সন্দেহের উদ্রেক ঘটে। সে বদুকে নিয়ে উকিলের চেম্বার থেকে বের হয়ে আসে। সে বদুকে নিয়ে যে কোর্টের সমন পেয়েছে সেখানে রওয়ানা হয়। দীর্ঘ দিন যাবত মামলা মোকদ্দমা করে সে অনেক কিছু জেনে নিয়েছে প্রয়োজনের তাগিদে। সে খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারে তার নামে দুটি মামলা হয়েছে। একটি দেওয়ানী অপরটি ফৌজদারী। দেওয়ানী মামলায় তার বাড়ির জমিতে ঐ মহিলা জায়গা পাবে দেখিয়ে দাগ খতিয়ান সংশোধনের আবেদন করেছে। অপরটিতে তার বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগে মামলা হয়েছে। এবার সে চোখে মুখে অন্ধকার দেখছে। দেওয়ানী মামলাকে সে সামাল দিতে পারবে কিন্তু জালিয়াতির মামলা মানেই পুলিশ। এই একটা জায়গায় সে নাকাল। সে আবার উকিলের চেম্বারে ফিরে আাসে। উকিল সাহেবকে চেপে ধরে,

– উকিল সাব, আমি আপনের অনেক দিনের চিনা। আপনে আমারে একটু খুইল্লা কইবেন।
উকিল সাহেব তার চরিত্রের বাইরে কখনো যেতে পারবে না। তিনি স্বভাবসুলভ উত্তর দেন,
– নুরা ভাই, আপনি অযথা চিন্তা করছেন। আমি বলেছিতো আছি আপনার পাশে।
– আপনে আমার মামলার কাগজ আনছেন?
– হ্যা, আমার জুনিয়রকে পাঠিয়েছি আনতে। এখনি চলে আসবে।

ঠিক তখনই উকিলের জুনিয়র এসে হাজির হয়। সে এসে উকিলের হাতে মামলার কাগজ তুলে দেয়। তিনি নুরাকে মামলার অবস্থা ব্যাখ্যা করে বুঝায়। সব শুনে নুরা বুঝতে পারে এই উকিলের হাত থেকে তার নিস্তার নেই। তাই সে উকিলের সাথে কোন রকম তর্কে না জড়িয়ে ভদ্র আচরণ করে।
– উকিল সাব, আপনে আমার মামলার হাজিরার ব্যবস্থা করেন।
– আপনি কোন চিন্তা করবেন না। আমি সব ব্যবস্থা করছি।
নুরা উকিলের চেম্বার থেকে বের হয়ে ডিসি অফিসে প্রবেশ করে। ডিসি অফিসের একজন স্টাফের সাথে তার বেশ ভালো সম্পর্ক আছে। বিভিন্ন সময়ে সে তার কাছে থেকে সংবাদ নিয়ে থাকে। সে ডিসি অফিসে প্রবেশ করে তাকে খুঁজে বের করে। এখানে এলেই নুরা বিনয়ের অবতার সাজে। সে তার টেবিলের সামনে গিয়ে লম্বা সালাম দেয়।
– আস সালামু আলাইকম।
বাশার সাহেব গভীর মনোযোগে একটি ফাইল দেখছিলেন। সালাম পেয়ে চোখ না তুলেই সে সালামের জবাব দেয়। নুরা বুঝতে পারে বাশার সাহেব এখন বেশ ব্যস্ত আছেন। তাই তার সামনে চেয়ারে বসে আবার তার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে। এবার বাশার সাহেব চোখ তুলে তাকায়।

নুরাকে দেখে চিনতে পারে। বেশ শাসালো মক্কেল। ছোট খাটো উপকার করে বেশ ভালো বকশিশ পাওয়া যায়। বাশার সাহেব বেশ আন্তরিকতার সাথে এবার উত্তর দেয়।
– কি খবর নুরু ভাই? অনেকদিন পর এলেন।
– হ ভাই, অনকদিন আওনের সুযোগ পাই নাই।
– তো বলেন কি উপকার করতে পারি?
এবার নুরা খপ করে বাশার সাহেবের হাতটি চেপে ধরে।
– ভাই, আমার একটা উপকার করন লাগব।
– বলেন, আমরা আছিই আপনাদের উপকার করার জন্য।
নুরা তার কথা শুনে মনে কিছুটা শান্তি খুঁজে পায়। সব জায়গায় কিছু লোক থাকে খবর বিক্রি করে কিছু কামানোর ধান্ধায়। বাশার সাহেব তেমনই একজন। বিভিন্ন সময়ে সে নুরাকে কিছু খবর দেয়ার বিনিময়ে বেশ ভালো নজরানা পেয়েছে। তাই সে মুখিয়ে আছে কিছু পাওয়ার আশায়। নুরা এবার বদুকে উদ্দেশ্য করে বলে,
– তুই বাইরে যা, চা খাইয়া আয়, আমি এট্টু ভাইয়ের লগে কতা কই।
বদু এসব ব্যাপারে বেশ পাকা। সে বুঝতে পারে। তাই সে বের হয়ে যায়। নুরা জানে টাকা পয়সার লেনদেন কখনো কারো সামনে করতে নেই। বদু বের হয়ে যাবার পর সে বাশার সাহেবের হাতে গুনে গুনে পাঁচটি একহাজার টাকার নোট তুলে দেয়।

নুরা যতক্ষণ টাকাগুলো গুনতে থাকে ততক্ষণ বাশার সাহেব লোলুপ দৃষ্টিতে টাকাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। বাশার সাহেব দ্রুত টাকাগুলো পকেটে ঢুকিয়ে স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে।
– বলেন ভাই, আপনার সমস্যাটা কি?
এবার নুরা একটু সময় নেয়। ধীরে সুস্থে তার মামলার বিবরণ খুলে বলে।
– ভাই, আপনে আমার বড় ভাই, আমি কেমনে এই সমস্যা থেইকা বাচমু, হেইডা আপনে কইবেন।
বাশার সাহেব এবার পিছুটান দেয়ার চেষ্টা করে।
– ভাই, আমি তো অফিসিয়াল ব্যাপারে আপনাকে সাহায্য করতে পারব। মামলার ব্যাপারে আমার কিছু করার নেই।
নুরা বুঝতে পারে রেট বাড়াতে হবে। সে বলে,
– ভাই কোন চিন্তা কইরেন না, আমি আপনের দিকডা দেহুমনে।
এবার বাশার সাহেব বলে,
– আপনি দেওয়ানী মামলার হাজিরা দেন সময় মতো। বাকিটা আমি খোঁজখবর নিয়ে আপনাকে জানাব। আপনি আগামীকাল না এসে তার পরদিন আসেন।
নুরা আশ্বাস পেয়ে আরো পাঁচ হাজার টাকা বের করে বাসার সাহেবের হাতে তুলে দেয়। এরপর বিদায় জানিয়ে বের হয়ে আসে। ভেন্ডার অফিসের কাছে থেকে বদুকে খুঁজে বের করে। আরো একবার উকিলের চেম্বারে হাজিরা দিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়।

জেলা প্রশাসকের বাসভবন। ছুটির দিনেও যথেষ্ট জনসমাগম থাকে। কিন্তু আজ জেলা প্রশাসক মাহমুদুল হাসান শোভনের বাসভবনে ব্যস্ততা অন্য রকম। তার বাসার লোকজন সবাই ব্যস্ত। তার অফিসের লোকজন ছাড়াও একজন লেডি নবীন অফিসার রয়েছেন। তারা সবাই ব্যস্ত। জেলা প্রশাসক শোভনের স্ত্রী এসেছে বাচ্চাদের নিয়ে। রিশার পোস্টিং সচিবালয়ে থাকার কারণে শোভন একাকী থাকেন। বাচ্চাদের নিয়ে বাইরে সময় কাটাচ্ছে অফিস স্টাফরা। তাদের ডিসি স্যার অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি। ভেতরে নবীন ম্যাজিস্ট্রেট সময় দিচ্ছেন ম্যাডামকে। ম্যাডাম আছেন তাদের ক্যাডারে। সচিবালয়ে পোস্টিং। একসময় রিশা অনেক বুঝিয়ে নবীন অফিসারকে বিদায় করে। শোভনের সাথে একান্তে কথা বলার সময় হয় তার।
– ওরে বাবা, ডিসি সাহেবের টিকির নাগাল পেতে তার স্ত্রীর যদি বেগ পেতে হয় তাহলে অন্যদের কি হবে?
শোভন একটু ভাব নেওয়ার চেষ্টা করে।
– তোমাকে বুঝতে হবে, তুমি ডিসি সাহেবের অর্ধাঙ্গিনী।
– সেটা তো বুঝতেই পারছি। আমাদের ছেড়ে তো ভালোই আছে?
– হ্যা, ভালো আছি। তবে নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই। তুমি কেমন আছ?
– আমি কি তোমাকে ছাড়া ভালো থাকতে পারি?
– তুমি রিয়াদের বাসায় চলে গেলে পারতে। সেখানে আম্মা আছেন। সবার ভালো সময় কাটতো।
– আমার বাসা রেখে রিয়াদের বাসায় যাব কেন?
– আরে বাবা, তোমার একটু ভালো সময় কাটতো।
– আমার শ্বশুর শাশুড়ির কাছে ছোট হতাম না।
– সরি বাবা, তোমার তো আবার প্রেস্টিজ জ্ঞান টসটসে।
– এটা তো আমার জন্য নয়। তোমার জন্য। আমি চাই না কেউ আমার জন্য তোমাকে নিয়ে প্রশ্ন তুলুক।
শোভন এবার গাঢ়স্বরে বলে,
– আমার মতো ভাগ্যবান কজন আছে বলো?
– আচ্ছা আর গ্যাস দেওয়ার দরকার নেই। চলো বাইরে গিয়ে বসি।

শোভন বেয়ারাকে ডেকে বাইরে বসার ব্যবস্থা করতে বলেন। তারা দু’জন বাইরে এসে বসে। রিশা হঠাৎ করে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে।
– তোমার শ্বশুর বাড়ির এলাকা কেমন লাগছে?
– আমি তো এখনো শ্বশুরবাড়ি যাই নি।
– তোমার ফাজলামো রাখ। তাহলে কি রিয়াদকে বলবো তোমাকে বরণঢালা সাজিয়ে নিয়ে যেতে।
– মন্দ হয় না কিন্তু। আর একবার না হয় নওশা সেজে শ্বশুরবাড়ি গেলাম।
– ওরে বাব্বা, শখ দেখি ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। ডিসিগিরি তো লাটে উঠবে।
– জ্বী না ম্যাডাম, তোমার জামাইটা মাকাল ফল নয়।
– আচ্ছা, সে মামলার কি অবস্থা বলো তো?
– নুরার দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়েছে।
– তোমার অফিসে এসেছিল নাকি?
– সে তো আমার অফিস থেকেই খোঁজ খবর নিচ্ছে।
– বলো কি? তোমার সাথে দেখা করার চেষ্টা করে নি তো।
– না, এখনো সে চেষ্টা করে নি।
– ভালো কথা, তোমাকে কেউ চিনে ফেলবে নাতো?
– আমার মনে হয় না। আমি তো খুব একটা তোমাদের বাড়ি যাই নি।
– তুমি যাবে কিভাবে? আমরাই তো যাই না। শুধু একটা উদ্দেশ্য সাধনের জন্য আমি কতদিন যাবৎ দাদু বাড়ি যাই না। জানো, সেখানে আমার কতো স্মৃতি জড়িত? একটা শয়তানের কারণে আমি নিজেকে বঞ্চিত করছি। এখনো যদি কিছু করা সম্ভব না হয় তাহলে কখনো কিছু করা যাবে না।
– আর অল্প কিছুদিন অপেক্ষা করো, এবার ইনশাল্লাহ কিছু হবে।
– তুমি জানো না, রিয়াদ বাড়ি যাবার বায়না ধরতো যে কোন সময়। অথচ দেখ সেই রিয়াদ কতদিন বাড়ি যায় না। আমার ভাবতে অবাক লাগে আমার ভাইটা এমন দৃঢ় চরিত্রের। অথচ তার ছোটবেলার দিকে ফিরে তাকালে আমি অবাক হয়ে যাই।
– তুমি এতো ভেব না, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ।

রিশাকে ভাবাবেগে পেয়ে বসে। তার মায়ের কথা মনে পড়ে। মা নিয়মিত বাড়ি যেতে চাইত। তাদের পরিকল্পনার কথা খুলে বলার পর থেকে মা বাড়ির কথা মনে করে না। কোন ঈদে মা বাড়ি যেতে চায় না। তার মা একজন জনম দুঃখী মানুষ। রিশার নানাবাড়িতে তারা খুব একটা যেত না। তার নানা-নানী যতদিন জীবিত ছিল ততদিন মোটামুটি যাতায়াত ছিল। এরপর যোগাযোগটা একেবারে শূন্যের কোটায় চলে এসেছে। তার একমাত্র ভাইটির শোভন ছাড়া কেউ নেই। রিয়াদের যত আবদার সব সে করেছে তার কাছে। সে শোভনকে নিয়ে গর্ব করে। শোভন কখনো রিয়াদকে শ্যালক হিসেবে দেখেনি। সে দেখেছে ছোট ভাই হিসেবে। শোভনের ডাকে রিশা ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে আসে।
– কিছু বলছো?
– তোমার সামনে একজন জলজ্যান্ত মানুষ রেখে কোথায় হারালে?
– আমি মা আর রিয়াদের কথা ভাবতে গিয়ে আনমনা হয়ে গিয়েছিলাম।
– কেন, তাদের আবার কি হলো?
– তুমি ভেবে দেখ, মার কতো কষ্ট হচ্ছে। তিনি মাঝে মাঝে তার স্বামীর বাড়িতে থাকতে পারতেন, অথচ আমাদের পরিকল্পনার কারণে কতদিন তিনি বাড়ি যেতে পারেন না।
– হ্যা, আম্মার জন্য এটা খুব কষ্টের। তিনি বাড়িটা নিজের হাতে সাজিয়েছেন।
– তাইতো বলি, তুমি একটু তাড়াতাড়ি করো।
– আমাকে একটু সময় দাও। আমি সবদিক সামলে নেব। নুরাকে উচিত শিক্ষা দিতে হলে তার দখলকৃত জায়গা জমি দখলমুক্ত করতে হবে।
– তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন মা। তোমার সিদ্ধান্তের উপর তার অগাধ আস্থা।
– আম্মা আমাকে একটু বেশিই স্নেহ করেন।
– তুমি কি কোন তন্ত্রমন্ত্র জানো?
– কেন?
– তুমি মাকে আমাদের কাছে থেকে ছিনিয়ে নিয়েছ?
– আমার তো আরো কঠিন অভিযোগ আছে। তুমি তো আমার পুরো পরিবারকে ছিনিয়ে নিয়েছ। আমার বাবা মা আমার চেয়ে তোমার কথার মূল্য বেশি দেয়। আমার ভাই বোন তোমার পক্ষে।
– তারপরও তো তুমি আমাকে চিনলে না।
– ঠিক আছে আজ রাতে নতুন করে চিনে নেব।
– যাও, ফাজলামো করবে না।
– তুমিই তো বললে তোমাকে ভালো করে চিনে নিতে।
– আমি উৎসকে ডেকে নিয়ে আসি। অনেকক্ষণ ওদের দেখি না।
বলেই প্রাপ্তিকে ডাকে। শোভন তাকে বলে,
– রিশা, তুমি ভুলে গেলে এটা ডিসির বাংলো। তোমার ছেলে মেয়ের সাথে লোক আছে। ওরা খেলা করছে ওদের খেলা করতে দাও।
– ওদের নাস্তা দিতে হবে তো।
– এতোক্ষণে ওদের নাস্তা করা হয়ে গিয়েছে মনে হয়।
– বলো কি? ওদের কি নাস্তা দেবে?
– তোমার করা মেন্যু ওরা জানে। তুমি বসো। তোমার রাগ করা মুখটা আরো একটু দেখি।
– না, তোমাকে বিশ্বাস নেই। তুমি আবার হাতটাত ধরে ফেলবে।
– ওমা হাত ধরা যাবে না?
– ডিসি সাহেবের লজ্জা শরম নেই?
– আচ্ছা বুঝেছি জুনিয়র অফিসাররা দেখলে ম্যাডামের মান যাবে।
– তোমার লেডি অফিসারকে কখন বিদায় করে দিয়েছি। বেচারী নতুন বিয়ে করেছে।
তাদের আলোচনার মাঝে ভাই বোন মিলে চলে আসে। প্রাপ্তি বাবার গলা জড়িয়ে ধরে। উৎস মায়ের কোলে বসে। প্রাপ্তি বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বলে,
– পাপা, দীপ্ত ভাইয়াকে নিয়ে আসলে আরো মজা হতো। তাইনা?
– হ্যা, মা মনি, তুমি তাকে নিয়ে এলে না কেন?
– মামীমা ছুটি নিতে পারে নি তো।
– তাহলে পরের বার নিয়ে এসো।
তারা ছেলে মেয়ে নিয়ে গল্পে মেতে উঠে। ভুলে যায় জগতের কুটিল দিক। ভুলে যায় সবকিছু। তাদের মর্ত্যের বাগানে নেমে আসে স্বর্গের আবহ।

চলবে——-

-বাউল সাজু