উত্তরাধিকার ( ৩য় পর্ব )

নুরার সূক্ষ্ম বুদ্ধি এলাকায় নিন্দিত ভয়ানক রকমভাবে। সবাই তাকে একটু সমঝে চলে। কেউ সহজে তার বিরাগভাজন হয় না। তার আজকের জৌলুসের সব এসেছে অন্যের সম্পদ হাতিয়ে। নানা ভাবে মানুষকে হয়রানি করাই তার প্রধাণতম কাজ। অনেক সময় মনের পৈশাচিক ইচ্ছা পূরণের জন্য একজনের সাথে অন্য জনের ঝগড়া বাঁধিয়ে দেয়। এতে সে মনে অন্যরকম পুলক অনুভব করে। এসব কাজে তার যোগ্য সঙ্গি বদু।

তার সাহসকে কোন কিছুর সাথে তুলনা চলে না। কিন্তু একটা জায়গায় সে ভীতু। প্রশাসন কিংবা পুলিশের নাম শুনলে তার কাপড় নষ্ট হয়ে যায়। যৌবনের উদ্দামতার সময় সে ইয়াবাসহ পুলিশের হাতে ধরা খেয়েছিল। সে দিনের মাইরের রেশ রয়ে গিয়েছে তার মনে। সে ভুলেও পুলিশ কিংবা প্রশাসনের সামনে উচ্চবাচ্চ্য করে না। তার এলাকায় এখন ছোট কিংবা বড় যে কোন বিচার মজলিস তাকে ছাড়া কল্পনা করা যায় না। বিচার সালিশের রায় আগে থেকে ঠিক করা থাকে। যে আগে তার কাছে নালিশ করবে, তারই বিচারে জয় হবে।

এতো প্রভাব প্রতিপত্তি, অর্থের জোয়ারের পরও সে জমির দালালী ছাড়তে পারে নি। অন্যের জমি বিক্রি করে তার লোভের পরিধি আকাশ ছাড়িয়েছে। সে অনেককে পথে বসিয়েছে। ইদানিং সে গভীর রাতে আঁতকে উঠে ঘুম থেকে। একটি অজগর তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে স্বপ্নের ঘোরে। ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না। তার প্রেসার সব সময় হাই থাকে। যতই চেষ্টা করুক সে তার মেজাজকে ঠান্ডা রাখতে পারে না। কারো ক্ষতি করতে পারলে তার মেজাজ কিছুক্ষণ ঠান্ডা থাকে।

রিয়াদ প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে মায়ের ঘরে ঢুকে। তার মা এ জীবনের স্বর্গ। সে কখনো মায়ের কথার অবাধ্য হয় না। নুরার সাথে দেখা করার দিন নামাজ সেরে মায়ের ঘরে ঢুকে। তার মা নামাজ শেষ করে তসবি জপছে। মায়ের পাশে গিয়ে বসে মাকে জড়িয়ে ধরে। মা সুপয়া ছেলের ব্যবহারে অভ্যস্থ। শুধু ছেলের সোহাগটুকুর জন্য গ্রামে গিয়ে স্বামীর ভিটায় থাকতে পারে না।
– বৌমা উঠেছে বাবা?
– না মা, অনেক রাতে এসেছে তো, আমি ডাকি নি।
– বৌমার অফিস আছে না?
– আজ শুক্রবার তো।
– আজকাল সব ভুলে যাই।
– মা, তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।
সুপয়া ছেলের কন্ঠে বিশেষ সুর শুনতে পায়। মায়ের মন উৎকন্ঠায় উদ্বেল হয়ে পড়ে। ছেলে বলে,
– বাবা, তোকে একটু চা করে দেই?
– মা, তোমাকে কতবার বলেছি না, তুমি কোন কাজ করতে পারবে না।
– পাগল ছেলে, কিছু না করলে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ব না।
– কেন, তোমার ব্যয়াম ঘর আছে না?
– আছে বাবা। তুই সেই ছোটটিই রয়ে গেলি।
– আমি তোমার কাছে বড় হতে চাই না। তোমার সাথে আমার জরুরী কথা আছে।
এবার সুপয়া সোজা হয়ে বসে। জানে ছেলের কথা তাকে শুনতে হবে।
– বলো, কি বলবে?
– মা, বাবার স্বপ্ন পূরণের দিনক্ষণ আমি ঠিক করতে চাই।
সুপয়া ভাবতে পারে নি ছেলের কাছ থেকে এমন কিছু শুনবে।

সুপয়া ঘোরলাগা চোখে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার ছোট্ট দুষ্টু ছেলেটি আজ কত বড় হয়েছে। তার একেকটি পদক্ষেপ যেন হিসেব করা। বাপের সঞ্চয়কে সে কাজে লাগিয়েছে সঠিকভাবে। যে কোন কাজের আগে মা, বোনের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে তাদের মোটিভেট করেছে যুক্তি দিয়ে। তাই ছেলের উপর সুপয়ার নির্ভরতা শতভাগ।
– তোমার আপুর সাথে কথা বলেছ?
রিয়াদ স্বভাবসুলভ উল্টো প্রশ্ন করে,
– তোমার কি মনে হয় আমি আপুর সাথে আলোচনা না করে তোমাকে বলছি?
– তাহলে কিভাবে কি করবি?
– সেটা নিয়ে পারিবারিক আলোচনা করতে হবে। আপু একটু ব্যস্ত, তাই এই ফাঁকে গ্রাম থেকে নুরাকে খবর দিতে চাই।
– নুরা কি তোকে চিনতে পারবে?
– আমার তো মনে হয় পারবে না। সে তো আমাকে দেখে না প্রায় দশ বছরের বেশি।
– যাই করিস, সে কিন্তু লোক ভালো না।
– মা, তোমার ছেলেও কিন্তু সাদাসিধে না তোমার পতিদেবের মতো।
– মারব এক থাপ্পর।
রিয়াদ গালটা মায়ের দিকে এগিয়ে দেয়।
– দাও না মা, কতদিন তোমার থাপ্পর খাই না।
সুপয়া ছেলেকে জড়িয়ে ধরে। চোখ বেয়ে পড়তে শুরু করে আষাঢ়ের জল।

রিয়াদের স্ত্রী রিয়ার ঘুম ভাঙ্গে। পাশে রিয়াদকে না দেখে বুঝতে পারে রিয়াদ কোথায় আছে। চোখে মুখে একটু পানি দিয়ে সে মায়ের ঘরে ঢুকে। ঢুকেই থমকে দাড়ায়। তার শাশুড়িকে কাঁদতে দেখে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠে। শাশুড়ি তাকে মেয়ের মতো আদর করে। পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় দুজনের দিকে। পেছন থেকে মাকে জড়িয়ে ধরে। ফিরে তাকায় সুপয়া। মাকে বলে রিয়া,
– মা, তোমাকে রিয়াদ কিছু বলেছে?
ফোড়ন কাটে রিয়াদ।
– কেন? এরেস্ট করবে? তোমার হাতকড়া কই?
মা বলে,
– দুর পাগলী, তুমি থাকতে রিয়াদের কিছু বলার সাহস হবে।
আনন্দঘন মুহূর্তে রিয়াদ চট করে বলে ফেলে,
– মা, আমি একটা অন্যায় করে ফেলেছি।
রিয়া এবং মা রিয়াদের মুখের দিকে তাকায়। সেখানে কৌতুকের ছিটেফেটাও নেই। পৌরুষদীপ্ত মুখে দৃঢ়তার মুখোশ।

চলবে———-

-বাউল সাজু