একটি ভালোবাসার গল্প

সদরঘাটের সামনে সি এন জি থেকে নেমে আনু দাড়াল, কোলে ১১ মাসের বাচ্চা। স্বামী বদরুল আলম পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে ২০ টাকার চার টা নোট হাতে থুথু লাগিয়ে মোট তিনবার গুনল। সি এন জি ওয়ালা তিব্র বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে আছে, বদরুল ভাড়া দিতেই সে টাকা গুলা দুই আংগুল দিয়ে ধরে বলল ” ছ্যাপ দিয়া তো টাকা গুলারে ভিজাই ফেলছেন পুরা, যত্তসব!!

বদরুল হাক দিল- ” এই আনু পথের মাঝখানে দাড়াই আছ ক্যান?? মাইনসের ধাক্কা খাইতে মজা লাগে?? আনু উদাস চোখে তাকাই রইল ভ্যান গাড়ী টার দিকে। আজকাল এসব কথা একদম তার গায়ে লাগেনা!! বদরুল ভারী একটা সুটকেস নিয়ে আনুর পাশে দাড়াল, “কথা বললে কানে যায় না তোমার!! হাটো!! আনু হাটতে শুরু করল। বাবার বাড়ী যাচ্ছে আনু, একা। বদরুল অনেক চেষ্টা করেও দুইদিনের ছুটি ম্যানেজ করতে পারে নি। অডিট চলতেছে অফিসে, বস টাও মহা হারামি।অল্পবয়সী বউকে এভাবে একা পাঠনো কোন মতেই যুক্তিসংগত না। কিন্তু কোন উপায় নাই।বুড়া বাপটা এখুনি অসুখ বাধাইল, টাইম পাইলনা আর!!
লঞ্চে উঠে কেবিনবয় কে খুঁজে বের করল বদরুল। ২২৮ নং কেবিন। কত্তগুলা টাকা খরচ হইতেছে। সে নিজে সাথে যাইতে পারলে লঞ্চের ডেকে যাওয়া যাইতো। চাদর একটা পাইতা একঘুমে রাত কাভার!!

লঞ্চের কেবিনে ঢুকে সুটকেস টারে খাটের নীচে রাখল বদরুল।বাচ্চাটা ঘুমিয়ে গেছে। আনু তারে খাটে শুইয়ে দিল। ” শোন আনু আমি লঞ্চ থেইকা নাইমা যাবার পর এই দরজা আর খুলবানা। ধাক্কাই যদি কেউ ভাইংগাও ফেলে তবুও খুলবানা। আর চল এখন বাথরুম সাইরা আসবা!! আনু অবাক হয়ে বলল–বাথরুম না আসলে কেমনে যাব?? বদরুল বলল– আসবে। বাথরুমে গিয়া পায়ের উপর পানি ছাইড়া দিবা, দেখবা এক নং চলে আসছে।বইলা হাতের কনি আংগুল সোজা করে দেখাল বদরুল। কথা শুনে আনুর গা গুলাইতে লাগল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাড়াল। বাথরুমের দরজা বন্ধ করে দাড়াই রইল চুপচাপ, কাদল কিছুক্ষণ। চোখে মুখে পানির ঝাপ্টা দিয়ে স্বাভাবিক হল সে। কেবিনে ঢুকতেই বদরুল বলল। ” বাথরুম হইছে?? বলছিলাম না!! সিস্টেম আছে বুঝলা!!
আর শোন ” তোমারে না কইছি নীল রংগা কাপড় কিনবানা!! নীল রংগের কাপড় পড়লে ইটের ভাটার আগুনের মত দেখায় তোমারে, একমাইল দূর দিয়াও মানুষ জন চাইয়া থাকে।আরও বলছি জামার সামনে বুতাম দিবানা। বাচ্চারে খাওয়াইয়া খোলা রাইখা দিবা আর লোকজন দেইখা হা কইরা লালা ফেলবে। সমস্যা কি তোমার! যেটাই নিষেধ করি সেইটাই বেশী কর!! দেখি এদিকে আস বুতাম গুলা খোলা কিনা চেক করি। বদরুল সিরিয়াস ভঙ্গী তে বুতাম চেক করতে লাগল। আনু তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইল বদরুলের দিকে— “” আপনারে না বলছি, গায়ে হাত দিতে ইচ্ছা করলে সরাসরি বলবেন? বাহানা করেন ক্যান? গায়ে হাত দিবেন? কাপড় খুলব? বদরুল অপ্রস্তুত হল; বেয়াদবি আমি একদম পছন্দ করিনা আনু, তুমি হইলা মহা বেয়াদবের বেয়াদব!! ভাল করে শোন সকালে গফুর মিয়া নিতে আসবে তোমারে।সে ফোন দিয়া বলবে ” আনু মা আমি গফুরচাচা তারপর ই তুমি দরজা খুলবা”। আনু বলল ” এই ডায়লগ না দিয়া যদি সে বলে “” মাগো কেমন আছ” তাইলে কি দরজা খুলবনা?? রসিকতা করবানা আনু, স্বামীর সাথে রসিকতা করা বেয়াদবদের কাজ!! আমি যাইতেছি, রাতে যদি ১নং আসে, খাটের নীচে লঞ্চের বালতি আছে সেইখানে কাজ সাইরা ফেলবা। খবরদার বাইরে যাবানা!! লঞ্চের হুইসেল বাজতেছে, বদরুল হনহন করে চলে গেল। লঞ্চ ঘাট ছাড়ল সাড়ে আট টায়!!!

কেবিনের সামনের একটা চেয়ারে আনু বসে আছে। রাত প্রায় ১০ টা। অন্ধকারে নদীর পানিতে একধরনের রহস্যের সৃষ্টি হয়, আনু গভীর মনোযোগে সেই রহস্যে ডুবে গেল।। প্রায় দুই বছর আগে একদিন দুপুরবেলা আনু কলেজ থেকে ফিরে দেখল ঘর ভরতি লোকজন। আনু হতভম্ব। আত্মীয়স্বজন প্রায় সব চলে আসছে। তার মেঝফুপু তারে বাইরের কলতলায় নিয়া বসাইয়া হলুদ মাখিয়ে গোসল করাল। তারপর একটা কাঁচা হলুদ রংগের শাড়ী পড়াই দিল। বিস্ময়ে হতবাক আনু। কোনমতে একবার ফরিদা বেগম কে জিজ্ঞেস করল “আম্মা আপনারা আমার বিয়া দিতেছেন!! একবারও তো বললেন না!”” আনুর মা অতি ব্যস্ততার ভান করে বলল- “” তোমারে জানাতে হবে ক্যান? তোমার আব্বা ভাল ছেলে পাইছে।ছেলে সরকারী অফিসার। তাই সব ঠিক করে ফেলছে। আনু তীব্র অভিমান, কষ্টে কাঁদতেও ভুলে গেল। সন্ধ্যার পর একগাদা লোক আইসা খাওয়া দাওয়া কইরা তারে নিয়া গেল।
সম্পূর্ণ অচেনা অজানা একটা বাড়ী। পুরা বাড়ীতে হইচই হট্টগোল। একলা আনু বসে ছিল নিশ্চুপ,নির্বাক, অনুভূতিহীন হয়ে। সব কিছু কেমন দুঃস্বপ্নের মত লাগছিল তার কাছে!!!!!

সকালে ফোনের আওয়াজে ঘুম ভাঙল তার। গফুরচাচা আসছে। সে পান খাওয়া দাঁত বের করে বলল ” কেমন আছ ছোট আম্মা?? আনু গফুরমিয়াকে জড়িয়ে ধরল। গফুর মিয়া চোখ মুছতে মুছতে বলল ” আমাগো ছোট্ট সাব কই? মাশাল্লাহ কত সুন্দর হইছে, আনুর বাচ্চাকে কোলে নিল সে!!
পুরা বাড়ীতে লোকজন ভরতি। সামনের বারান্দায় লম্বা হয়ে শুয়ে আছেন মহিউদ্দিন সাহেব(আনুর বাবা)। আনু পা ছুঁয়ে সালাম করল তাকে। কিছুক্ষণ বসল সে তার কাছে। নিজের ঘরটায় ঢুকে বাচ্চাকে শুইয়ে দিল সে। ফরিদা এসে মাথায় হাত রেখে বললেন ” কেমন আছিস আনু?” হাত সরিয়ে দিল আনু ” গায়ে হাত দিয়েন নাতো আম্মা! অসহ্য লাগে!!” আনুর মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “তুই সবসময় এমন করিস ক্যান?” আনু তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইল ফরিদার দিকে ” আপনি যান আম্মা খুব মাথা যন্ত্রণা করতেছে”।

আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী সবাই আসছে আনুকে দেখতে। কত ভাল বিয়ে হইছে আনুর!! কত ভাল আছে সে!!!!
একে একে সবাই চলে গেছে এখন। রাত প্রায় সাড়ে বারোটা। আনুর বাচ্চাকে কোলের মধ্যে জড়ায়ে ফরিদা ঘুমাচ্ছে। বাইরে এমন বৃষ্টি শুরু হইছে!! জানালায় দাঁড়াল আনু। বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে যাচ্ছে সে। দক্ষিণ দিকের ছোট একতলা ঘরটায় আলো জ্বলছে, আনু দরজা খুলে বের হল।নিঃশব্দে হেটে গেল দক্ষিণ দিকে। দরজায় হাত দিতেই দরজাটা খুলে গেল।চমকে উঠল জহির। চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেল সে। হাতে লেগে টেবিলে রাখা পানির গ্লাস থেকে ছলকেপানি পড়ে গেল বইয়ের উপর। জহিরের ভারী চশমার ভেতর থেকেও আনু তার অতি বিস্মিত দৃষ্টি দেখতে পেল। আনু হাসল, ” ভাল আছেন জহির ভাই? জহিরের ধাতস্থ হতে আরও কিছু সময় লাগল। “” এত রাতে তুমি কেন আসছ আনু? পাগল তুমি? এখুনি যাও এখান থেকে। কেউ দেখলে কি হবে ভাবছ?? প্লিজ যাও!!
আনু দীর্ঘশ্বাস ফেলল।চলে যাব এখুনি, আপনারে একটা সত্যি কথা বলতে আসছি। বলেই চলে যাব।
“”সকালে শুনব আনু, তুমি এখন যাও, জেদ কইরোনা প্লিজ!!
আনু ধমক দিল” এখুনি শুনবেন, বলছিনা বলেই চলে যাব!!!
“” আপনার মনে আছে– একদিন আপনার কাছে পড়া শেষ হইল আমার!! আমি বই খাতা নিয়া উইঠা দাঁড়াইতেই মাথা চক্কর দিল আমার! পইড়া যাচ্ছিলাম আমি আপনি পেছন থেকে আমারে জড়াইয়া ধরলেন, আনু আনু বইলা চিৎকার দিলেন!! ওই দিন আসলে আমার মাথা ফাতা কোন চক্কর দেয় নাই, নাটক করছিলাম আমি!! কেন করছিলাম বলেন তো???
জহির মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আনু কাঁদতেছে। আমার বিয়ের দিন কই ছিলেন আপনি? গফুর চাচা, মতির মা কেউ খুঁজে পায়নাই আপনারে। কেউ বলতে পারেনাই আপনি কোথায়!! বলেন না কই চলে গেছিলেন!!
জহির জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে বাইরে। চশমার কাঁচ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে বারবার। সে ক্ষীণ গলায় বলল ” আনু যাও তুমি”।
“একটা অনুরোধ করব রাখবেন?? মানা কইরেন না। আপনার হাত দুইটা একটু ধরতে চাই……
জহিরের হাত দুইটা জড়িয়ে ধরে সে আকুল হয়ে কাঁদতে লাগল, জহির গভীর ভালবাসায় তার মাথায় হাত রাখল!!
প্রবল বারিধারায় আজ গলতে শুরু করেছে মনের ভেতরে জমাটবাধা সকল অনুভূতি……..।

ফজরের আজান হইতেছে। ফরিদা উঠল। আনুর ছেলেটা এত শান্ত, আসার পর থেকে তার কাছেই আছে। খাট থেকে নামল সে। আনু এত ভোরে আবার কই গেল কে জানে!! ছোট্ট একটা টর্চ লাইট নিয়া সে ওজু করতে পুকুর ঘাটে গেল। অন্ধকার কাটেনি এখনো। পুকুর ঘাটের সিঁড়ি তে টরচের আলো পড়তেই ফরিদা দেখল আনুর পায়ের নূপুর জোড়া। মেয়েটার এই মনভোলা স্বভাব আর গেলনা!! নিশ্চয়ই দুপুরে গোসল করে ভুলে ফেলে গেছে!! ফরিদা নীচু হয়ে তুলতে গিয়ে দেখল নুপুর জোড়ার নীচে ভাজ করা একটা কাগজ। একটু বিস্মিত ফরিদা টরচের আলো ফেলে কাগজ টা খুলল।

আম্মা,
আমি জানি ওজু করতে আপনিই প্রথম আসবেন পুকুরঘাটে। আপনারে কিছু গোপন কথা বলতে চাই আম্মা। আমারে যেদিন বিয়ে দিয়ে পাঠাই দিলেন ওদের বাড়ী। আমি একা একটা ঘরে বসে ছিলাম কতক্ষণ। কখন যেন ঘুমাই গেলাম। ঘুম ভাংগলো আতঙ্ক নিয়া, হাল্কা আলোতে দেখি মানুষের মত দেখতে একটা জানোয়ার আমারে প্রায় ছিন্নভিন্ন করে ফেলতেছে।আমি ভয়ে আতংকে পাথর হয়ে গেলাম। বাধা দেয়ার শক্তি পর্যন্ত হারাই ফেললাম। যন্ত্রণায় চিৎকার দিলাম আমি। জানোয়ার টা আমার মুখ চেপে ধরছিল আম্মা। প্রায় প্রত্যেক রাতে ওই হায়না টা আমার উপর ঝাপাই পড়ে, ক্ষুধা মিটাই চলে যায়। আর প্রতিদিন লজ্জায় অপমানে আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে। কার সাথে বিয়ে দিলেন আম্মা???? লজ্জা পাইতেছেন?? আমার সমস্ত শরীরে হায়নাটার আঁচড়ের দাগ, আমিও লজ্জায় কাউরে বলতে পারিনা। আপনি খেয়াল করছেন? আমার বাচ্চাটার জন্য কোন মায়া নাই।ওর দিকে তাকালেই আমার জানোয়ারটার কথা মনে হয়, ঘেন্না লাগে। ওর কি দোষ বলেন”! আপনি বাবুর একটা ভাল নাম রাইখেন,ভালবাইসেন ওরে। এই জীবনের ভার আমি আর বইতে পারতেছিনা আম্মা। মাফ করে দিয়েন।
আনু।।

ফরিদা মাটিতে বসে পড়লেন। চারিদিক আলো করে নতুন সকাল আসছে। কি স্নিগ্ধ শান্ত সকাল!! ফরিদা অস্ফুট স্বরে ডাকল ” আনুরে………..”।

জ্ঞান ফেরার পর ফরিদা উঠানে আনুর ভেজা নিষ্প্রাণ দেহ টা দেখতে পেল।সাদা চাদরে ঢাকা সমস্ত শরীর টা। সবুজ কাচের চুড়ি পড়া হাতটা বেরিয়ে আছে শুধু…….।

  1. -নাঈমা পারভীন অনামিকা