একলা আমি

আমার শ্বাশুড়ি আমাকে পরকীয়া করতে বলছে , এই কথা আমি কাকে বুঝাই ? হুম , ওনার একমাত্র ছেলের বউকে উনি বলছেন অন্যজনের সাথে প্রেম করে ঘর বাঁধার চিন্তা করতে ! এতদিন আকারে ইঙ্গিতে বললেও আজ সকালে সরাসরি হাতজোড় করে , দুই চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে আমার কাছে এসে কাকুতি মিনতি করে গেল।
আমি বুক ভাঙ্গা দীর্ঘশ্বাস চেষ্টা করেও চেপে রাখতে পারিনি ।
হতাশ গলায় বলি, ” মা আমি ঠিক আছি । হিমেলের সাথে আমার কথা হয় নিয়মিত । সব ঠিক হয়ে যাবে । আপনি শুধু শুধু চিন্তা করছেন।” হিমেলের সাথে আমার নিয়ম করে ফোনে কথা হলেও সব কিছু যে ঠিক আছে কথাটা সত্য না এবং সত্য হবার আর কোন উপায় আছে বলেও আমার মনে হয় না ।
উনি আবার ফোনে ছেলেকেও জানিয়ে দিয়েছেন , উনি আমার বন্ধু সৌরভের সাথে আমার বিয়ে দিচ্ছেন ! হিমেল নাকি কিছু না বলে ফোন রেখে দিয়েছে । আত্নীয় স্বজনদের সাথে যে পরামর্শ করবেন সেই সুযোগ নেই । সবার অমতে অন্য ধর্মের একটা মেয়েকে বিয়ে করার অপরাধে এমনিতেই সবাই মা ছেলেকে বলতে গেলে একরকম একঘরে করেই রেখেছে ।
হিমেল ভাল আছে । সে লন্ডনে আছে । পড়ালেখা শেষ করে সে এখন সেখানেই সেটেল হবার অপেক্ষায় ! অথচ কত রাত জাগা স্বপ্ন দেখতাম দুজন মিলে ! ছোট্ট একটা সংসার হবে মা সহ ! বছরে অন্তত একবার একসাথে সমুদ্রে পা ভেজানোর শপথ ছিল , নৌকা নিয়ে মাঝ নদীতে ভাসতে ভাসতে পূর্ণিমা দেখার , ঝুম বৃষ্টিতে একসাথে দুজনে গরম ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ির সাথে বৃষ্টি দেখার কথা ছিল !! একসাথে দেখা সব স্বপ্নগুলো সব ডানা মেলেছে এখন অন্য আকাশে ! আমাদের সেসব একসাথে লেখা গান গাইছে এখন অন্য কেউ , হিমেলের নদীতে রাতদুপুরে এখন অন্যকেউ ঢেউ তুলছে !!
পাঁচবছর একসাথে স্বপ্ন দেখার পর একদিন সন্ধ্যায় সমাজ , জন্মজন্মান্তরের সম্পর্ক যাদের সাথে সেই মা বাবা , ভাইবোন , ধর্ম সব সবকিছু ফেলে চলে এসেছিলাম আমি । সন্ধ্যার অন্ধকারে নিজের ছায়াটাকেও দেখিনি আমি শুধু হিমেলের হাতটাই ছিল আমার উষ্ণ মুঠোর মধ্যে । হিমেল একটা কথাই বলত তখন , প্রেম মানুষকে উদার করে । যেখানে প্রেম আছে সেখানে পৃথিবীর কোন জটিলতা থাকতে পারেনা । সত্যিই তো ! কোন জটিলতাই ছিলোনা একসাথে থাকা দুটি বছর ছিলনা কোন বাড়তি চাওয়া !! শুধু অসম্ভব সুন্দর কিছু স্বপ্ন ছিল দুইজোড়া চোখে… ছোট্ট একটা সদস্য কবে আসবে, কি নাম হবে , কার মত হবে ……কত শত স্বপ্ন !! আর সব স্বপ্নের সাক্ষী ছিল শুধু একজোড়া বালিশ । আজো বালিশ সাক্ষী আছে । প্রতি রাতে সেসব স্বপ্ন গলে গলে যে বালিশের বুকেই লুকায় গিয়ে ।
হিমেল বিয়ে করেছে একজন ইউরোপিয়ান মেয়েকে ।হিমেলের ভাষায় আমাদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য সে একটা ঝুঁকি নিচ্ছে এবং আমারো উচিৎ উদার এবং আন্তরিক ভাবে তাকে সম্মতি দিয়ে সাহায্য করা !!
বাহ !! আমিতো ঝুঁকি , সুন্দর ভবিষ্যৎ এসব বাজি কখনোই ধরিনি !! আমিতো কখনোই বলিনি এবং চাইনি চকচকে ধুলোবালি হীন একটা শহরে নিশ্চিন্ত ভবিষ্যৎ হতে হবে আমার !! আমিতো শুধুমাত্র আমরা দুজন মিলেই জীবনের সব ঝুঁকি নেবার জন্য প্রস্তুত ছিলাম !! হিমেল যেদিন তার ভবিষ্যৎ নিয়ে ওর ভাষায় আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাকে বুঝানোর চেষ্টা করছিল , ফোনের এপাশে আমি তখন পুরো আকাশ একলা পাখি হয়ে পাড়ি দেবার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম ।
আমার শ্বাশুড়ি  দিশেহারা হয়ে আমার কাছে আসে । আমি উনাকে হাত ধরে বিছানায় বসাই। সরাসরিই বলি , ” মা , আপনার মত আমারও কেউ নাই এই পৃথিবীতে । আমি আছি আপনার সাথে । আমি আপনাকে ফেলে কোথাও যাবনা “।
আমার শ্বাশুড়ি আমাকে বুঝাতে চান পাসপোর্ট হয়ে গেলেই হিমেল ফিরে আসবে । মানুষ সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য কত কিছুই না করে ………। আহারে মা !! আমি একজন বিভ্রান্ত মা কে মুখের উপর বলতে পারিনা , ফিরে আসলেই আমি উনার ছেলেকে গ্রহণ করতে পারিনা । পারবোনা । ওনার ছেলের জন্য লেখা যে গান অন্য কেউ গাইছে আমি সেই সুর আর গলায় তুলতে পারবোনা । আমি যে প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে ভালবেসেছিলাম , সেই একই শক্তি নিয়ে বিরহ বয়ে নিয়ে যাব । আমি জোনাকি আলোয় বিরহী গান গাইবো ।
আজ সকালে আবার উনি আমাকে আকুতি জানাতে আসলে আমি শান্ত গলায় বলি , ” মা, হিমেলের বেবি আসছে । হিমেল আর ফিরবে না , ফিরতে চাইলেও হিমেলের ফেরা উচিৎ হবেনা “।
মা কেঁদে দেয় । মা আমাকে বলে আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে । মা’র কান্না দেখতে ভাল লাগে না আমার । এই মানুষটা আমাকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছিল আমার একা দুঃসহ দিন গুলোতে । আমাকে মা বাবা , পরিবারের জন্য মন খারাপ করা দিনগুলোতে চোখের পানি মুছে বুকে টেনে নিয়েছিল।
আমি মা’র দিকে তাকিয়ে হেসে বলি, আমি কাকে বোঝাই কিভাবে বোঝাই যে আমার শ্বাশুড়ি আমাকে পরকীয়া করতে বলছে !!!
আমি বোকা মেয়েটার চোখ মুছে দিয়ে বুকে টেনে নিয়ে গেয়ে শুনাই …
” অনেক কাছের একলা মানুষ আমার ভেতর করে আপোষ …
দুঃখগুলো সইতে জানি , দ্বন্দ্ব ভার বইতে জানি
শূন্যতায় ভাসতে জানি
একলা একলা বাঁচতে জানি …”।

-তাসলিমা শাম্মী