একসপ্তাহ পর ভাত


১৯৮৮ সাল,ঘনবৃষ্টি,হুমাদাহ বিল পানিতে থৈ থৈ।
পানি ফুলতে ফুলতে বড় রাস্তা ছুঁয়েছে।বিলের
এপার থেকে ওপারে তাকালে কালুহাঁটি,বেতাই,
দুর্গাপুর,অসস্থালী,দক্ষিণ ভবানীপুর মনে হয় সব
পানির নিচে।আবাদি ফসল পানির নিচে হাবুডুবু
খাচ্ছে।একমাস টানা ঘনবৃষ্টি,বৃষ্টির কারণে চরম
অভাব ঘরে ঘরে।হুমাদাহর বিলই আমাদের খাদ্যের
একমাত্র সম্বল।খাদ্য পানির নিচে পচেগলে নষ্ট হয়ে
যাচ্ছে।আর পেট ক্ষুধার জ্বালায় নিজের দেহ খেয়ে
কোনোহালে বেঁচে থাকে।যারা হতদরিদ্র তাদের রূপ
শীতেকাকের মতো,কোনো সৌন্দর্য নেই। হতদরিদ্র
পরিবারের মধ্যে আমরা এক পরিবার।আমাদের
পরিবারে লোক সংখ্যাও বেশি।আমরা পাঁচ ভাই
বোন,বাবা মা দাদী। বাবা গরুর গুতোয় আহত।
সংসার চালানোর লোক বলতে শুধু বাবা।পাঁচ ভাই
বোনের মধ্যে আমি মেজো,আমার বড় দুইজন।
বোন সবার বড়,তারপর ভাই আর আমি,আমার
ছোট দুইজন তারা একদম ছোট।আমার বয়স আট
কি নয়,বড় ভাই দশ এগারোর।গ্রামে কাজ নেই,
আমাদের কাজের বয়সও হয়নি,কাজ জানিই না।
আমরা যা পারি তা হলো খড়ি খোটা,ধান খোটা,
আর কিছু না।তলিয়ে যাওয়া ধান আমরা তিন ভাই
বোন বেশ সংগ্রহ করেছি,তাতে আবার রোদ নেই।
ধান সিদ্ধ করে শুকানোর কোনো ব্যবস্থা নেই।ধান
মাটির ডেস্কিতে আগুনের তাপে উছলিয়ে উছলিয়ে
শুকায়ে,ঢেঁকিতে ভেনে চাল করতো মা।সেই ধান
চাল কিছুদিন চলল,তারপর শেষ।শুধু আমাদেরই
শেষ,পাশের বাড়ির অনেকেরই আছে।আমাদের
আর কিছুই নেই নুন নেই তেল নেই ঝাল নেই
পেঁয়াজ নেই রসুন নেই তরিতরকারি নেই,ঘর শুন্য।
ছোট ভাই বোন ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদছে,কাঁদছি
আমরাও।কোনো উপায় না পেয়ে মা ছুটলো চালের
সন্ধানে,মা সারাগ্রাম ঘুরে,কোত্থেকে যেনো একশের
চাল ধার করে নিয়ে বাড়ি ফিরলো।আসরের সময়,
মাকে দেখে আমরাও সবাই আরো জোরে কেঁদে
ফেললাম।মা শান্ত্বনা দিলেন,এই তো এক্ষণি হয়ে
যাবে।মা চুলোয় জ্বাল ধরিয়ে দিলো।আমরা চুলোর
চারপাশে একটু খাওয়ার আশায় অপেক্ষারত।
চুলোয় আগুন জ্বলে,আগুন জ্বলে আমাদের পেটে।
চুলোয় আগুন জ্বলে কিন্তু আজ ভাত হতে একটু
দেরি হচ্ছে।মা বলল সবাই অল্প অল্প করে খাবি,এই
ভাত দিয়ে আজ আর কাল চলতে হবে।ভাতে পানি
বেশি করে দিয়েছি,অল্প করে ভাত আর বেশি করে
ফেন খাবি,আমরাও মায়ের কথামত তাই করলাম।
তারপর কোথাও ধার পায়না।মা খালি হাতে ফিরে
ফিরে আসে বাড়ি,দুদিন হয়ে গেলো ভাত নেই।
কে যেনো আধাশের গমের আটা দিয়েছে আমাদের,
তাতেই আমরা খুব খুশি।মা চুলোয় আগুন দিয়েছে।
হাড়িতে পানি গরম হচ্ছে।আটাঘোটা খাওয়ার জন্য
আমাদের ক্ষুধার্ত চোখ অপলক হয়ে চেয়ে আছে।
মা বলল আটা তো আছে নুন যে নেই।দেখতো
কারোর কাছে একটু নুন পাওয়া যায় কি না। কয়েক
বাড়ি ঘুরে কাচের ছোট্ট একবাটি নুন পেলাম,এনে
দিলাম।মা আটাঘোটা রান্না করলো,খুব মজা করে
খেলাম আমরা সবাই।রাত গেলো সকাল গেলো,
দুপুর গড়িয়ে,আর মিলছে কোনোকিছু।বাড়িতে শুধু
একটু নুন আছে।সন্ধ্যাও হয়ে আসছে।ক্ষুধায়
কান্নার শক্তিও নেই।মা সন্ধ্যায় কিছু কাবলি কচুর
ডেগো নিয়ে এসে সিদ্ধ করে দিলো আমাদের,
তাই খেয়ে রাত কাটালাম।এভাবে এটা ওটা দিয়ে
প্রায় সপ্তাখানেক চলছে।বৃষ্টি কমে গেছে অভাব
কমে নি।আমাদের কষ্ট দেখে অনেকেই মাইনে নিতে চাইলো,মা কখনো আমাদের মাইনে দেয় নি।
ধনীরা বলতো আমরা যে ভাত ফেলিয়ে দি,মাইনে
দিলে আমাদের ফেলে দেয়া সে গুলো খেয়ে ভালো
ভালোভাবে বাঁচতে পারবে।একথাগুলো আমার
মাকে আঘাত করতো,দেখতাম মায়ের বিবর্ণ রূপে।
বড় ভাই কাজ করার সুযোগ পেলো হাজিদের
জমিতে,পারিশ্রমিক দশটাকা।সকাল থেকে সন্ধ্যা
পর্যন্ত একটানা করতে কাজ করতে পারলে তবে।
একসপ্তাহ আমরা ভাতের মুখ দেখিনা।আজ বড়
ভাইয়ে কাজের দশটাকা দিয়ে চালডাল কিনবো।
ভাই সারাদিন না খেয়ে কাজ করে বাড়ি ফিরলো,
তখন ভাইয়ের দেহের দিকে তাকানো যাচ্ছিলো না,
মনে হচ্ছিলো এক্ষণি বুঝি আমার ভাই মারা যাবে।
কাজের টাকা পেয়ে ছুটলাম দোকানে।পথে যেতে
যেতে কয়েকবার ক্ষুধার চোঁটে পড়ে গেলাম।
অবশেষে দোকানে পৌঁছলাম।বাজার-সদাই করে
বাড়ি ফিরলাম।আজ একসপ্তাহ পর ভাতের মুখ।
চুলোর আগুনের আলোয় আমাদের মুখগুলো
যেনো সোনার মতো জ্বলজ্বল করছে।আমাদের
চোখে ক্ষুধা মিটানোর দারুণ আশা,আমাদের বুকে
আজ ক্ষুধার কোনো কান্না নেই।আজ যেনো বুকে
আমাদের ঈদের দিন,খাদ্যানান্দের দিন।সবার
চোখেমুখে বাঁচার বিশ্বাস,যেনো দম আটকে যাওয়া
দম ফিরে পেলাম।ভাত যেনো সকালে সূর্যের মতো
আমাদের জীবনে উদয় হয়েছে।হুম বুঝতে হবে,
আজ আমাদের বাড়িতে,একসপ্তাহ পর ভাত।

গুলজার হোসেন গরিব