এক রহস্যময়ী রাত ও নারীর গল্প (শেষ পর্ব)

বাকি পথটুকু কোনো ঝামেলা ছাড়াই পার হওয়া গেল। ঝড়ের গতি এবং বৃষ্টি দুটোই কমে গিয়েছিল তবে থেমে যায় নি একেবারে। গাড়ির গতি কিছুটা কম হলেও বেশি সময় লাগল না ওদের গন্তব্য পৌছতে। লিসার অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে ঢুঁকে একটা ফাঁকা পার্কিং এ গাড়ি থামাল ফাহিম। পাশে তাকিয়ে দেখল লিসা চোখ বন্ধ করে আছে। গাড়িতে বেশ খানিক্ষণ বকবক করে শেষের দিকে সম্ভবত ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘড়িতে সময় দেখল ফাহিম, ভোর সাড়ে ৩টার মত বাজে। আড়মোড়া ভেঙে কিছুক্ষণ বসে রইল সে। ঘাড়ের পেছনে অসার হয়ে আছে। বৃষ্টির কারণে সামনের দিকে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না, তাই ঝুকে গাড়ি চালাতে হয়েছে প্রায় সারাটা রাস্তা। অবসাদ লাগছে খুব। মাথাটাও ধরে আছে। এত বড় দীর্ঘ পথ আবার ফিরে যেতে হবে ভাবতেই বুক শুকিয়ে আসছে। কিন্তু কী আর করা, একটু কষ্ট হবে তবে ফিরে গিয়ে একটা লম্বা ঘুম দিয়ে নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

আরো খানিকটা সময় পার করে ফাহিম আলত করে ডাকল, ‘লিসা?’

‘উম!’ চোখ না খুলেই একটা শব্দ করল লিসা।

‘আমরা এসে গেছি।’

‘কোথায়?’

‘গন্তব্যে।’

লিসা চুপ করে আছে। চোখ বন্ধ।

ফাহিম আবার বলল, ‘নামবে না?’

‘না।’

‘আমাকে তো ফিরে যেতে হবে।’

‘না।’

‘মানে কি?’

‘কিছু না।’

‘হেয়ালি কর না।’

‘হেয়ালি করছি না।’

‘আচ্ছা ঠিক আছে, আমাকে বিদায় দিয়ে দাও। আমাকে তো ফিরতে হবে—লং ওয়ে টু গো।’

‘তুমি এখন কোথাও যাচ্ছ না।’

‘কোথাও যাচ্ছি না মানে?’

‘মানে তুমি আমার সঙ্গে যাচ্ছ।’

‘কোথায়?’

‘আমার অ্যাপার্টমেন্টে।’

ফাহিম চুপ করে রইল। এই মেয়ে এসব কী বলছে? সে ভাবল হয়তো ওর কাছে ক্যাশ টাকা নেই, টিপস দিতে পারবে না, তাই সাথে যেতে বলছে। সে বলল, ‘তুমি তো অল্রেডি ভাড়া দিয়েছ। আর তুমি আমাকে যে এক্সট্রা টাকা দিতে চেয়েছিলে, তা দিতে হবে না।’

‘দিতে হবে না কেন?’

‘আমি এক্সট্রা টাকার জন্য তোমাকে রাইড দেই নি।’

‘তাহলে কেন দিয়েছ?’

‘কেন দিয়েছি তা তো ব্যাখ্যা করতে পারব না। তবে তোমাকে দেখে মনে হয়েছিল তুমি সত্যিই বিপদে পরেছ, তাই তোমাকে সাহায্য করতে চেয়েছি। কারো বিপদে সাহায্য করতে পারার ভাগ্যও তো সবার হয় না।’

এবার চোখ খুলে তাকাল লিসা। সোজা হয়ে বসল। তাকাল ফাহিমের দিকে। সুন্দর করে একটা হাসি দিয়ে বলল, ‘বাকী রাতটা তুমি আমার এখানে থেকে যাও। তুমি অনেক টায়ার্ড। আমি চাই না, রাস্তায় তুমি ঘুমিয়ে পড় এবং এক্সিডেন্ট কর।’

‘সমস্যা নেই—আমি গাড়িতেই কিছুক্ষণ ন্যাপ নিয়ে নিব। আমার অভ্যেস আছে।’

‘না।’

‘কী না?’

‘তুমি আমার সঙ্গে যাবে। আমার লিভিং রুমে সোফাবেড আছে—সেখানে একটা ঘুম দিয়ে সকালে আমার হাতে এক কাপ কফি খেয়ে তারপর চলে যেও।’

‘আরে নাহ।’

‘আরে হ্যাঁ।’

ফাহিম হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই বলল, ‘সো নাইস অফ ইউ লিসা। আই অ্যাপ্রিসিয়েট ইয়োর কনসার্ণ, কিন্তু…’

‘কিন্তু কী?’

‘আমার মনে হয় এটা ঠিক হবে না।’

‘কেন ঠিক হবে না?’

ফাহিম কোনো উত্তর দিল না।

‘ওকে নো প্রবলেম, আমিও নামছি না গাড়ি থেকে।’

‘মানে কী?’

‘ভেরি সিম্পল। কয়েক ঘণ্টা রেষ্ট না নিয়ে তোমাকে আমি যেতে দিচ্ছি না। একে তো ওয়েদার খারাপ। আসার সময় তুমি বারে বারে হাই তুলছিলে। যাবার সময় তুমি থাকবে একা—তোমার পাশে বসে বকবক করে কেউ তোমাকে জাগিয়ে রাখবে না। ঘুমিয়ে পড়বে এবং নির্ঘাত হাইওয়ে থেকে পাশের খাদে ছিটকে পড়বে। আমি অন্তত তা হতে দিচ্ছি না।’

‘এক্সিডেন্ট যদি করিও—তোমার দায়টা কোথায়? তুমি এত উতলা হচ্ছ কেন?’

‘কারণ আমি তোমাকে জোর করে নিয়ে এসেছি—তোমার মৃত্যুর ভার সারাজীবন আমাকে বয়ে বেড়াতে হবে। আই ক্যান নট লেট ইট হ্যাপেন।’

ফাহিম মুগ্ধ হয়ে এই অচেনা মেয়েটির কথা শুনল। এবং খানিকটা কৃতজ্ঞতাও বোধ করল। এই বয়সের মেয়েদের আসলেই বোঝা মুস্কিল। এদের মাথায় কখন যে কী এসে ভর করে কে জানে।

লিসা তাকিয়ে আছে ফাহিমের মুখের দিকে। ‘কী হল?’ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল।

ফাহিম অবাক হয়ে দেখছে মেয়েটিকে। এ কী ধরণের পাগলামি? ফাহিমের মাথায় শত চিন্তা। সে ঠিক বুঝতে পারছে না ওর কী করা উচিৎ। এই বয়সী একটা মেয়ের সঙ্গে তার অ্যাপার্টমেন্টে যাওয়া আবার রাত থাকা কতটা যুক্তিসঙ্গত? আবার কোনো ঝামেলায় পড়ে না যায়। মেয়েটি একা থাকে না রুমমেট আছে, তাও তো সে জানে না।

‘তোমার বাসায় আর কে আছে?’ উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে ফাহিম জানতে চাইল।

‘কেউ নেই—আমি একাই থাকি। কেন?’

‘না মানে…’

‘না মানে কী?’

‘ব্যাপারটা শোভনীয় নয়।’

‘শোভনীয় নয় কেন? তোমাকে তো আমার বিছানায় আমন্ত্রণ জানাচ্ছি না—’

‘না না আমি সেসব কিছু বলতে চাই নি।’

‘তা হলে কী বলতে চেয়েছ?’

ফাহিম চুপ করে রইল। হঠাৎ করেই বাতাসের শো শো আওয়াজ বেড়ে গেল আবার। বৃষ্টির তেজও বেড়ে যাবে মনে হয়। ফাহিমের মাথায় রাজ্যের চিন্তা শুরু হয়ে গেল। লিসা নামের এই আধ পাগল মেয়েটার যন্ত্রণা থেকে কীভাবে দ্রুত রক্ষা পাওয়া যায় তাই নিয়ে ভাবতে থাকল।

‘কী হল?’

‘আচ্ছা ঠিক আছে। আমি যাচ্ছি তোমার সাথে তবে বেশিক্ষণ থাকব না। তুমি আমাকে এখনই এক কাপ কফি বানিয়ে খাওয়াবে। কফি খেয়েই আমি চলে আসব। ডিল?’

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে লিসা বলল, ‘ডিল।’

বৃষ্টির তেজ খানিকটা কমে এলেই গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিঙের ভেতর ঢুকে পড়ল লিসা আর ফাহিম। কিছুদূর এগিয়েই লিসার রুম। ভেতরে ঢুকে লাইট জ্বালিয়ে লিসা বলল, ‘মেক ইয়োরসেলফ কম্ফোর্টেবল।’

ফাহিম চারিদিকে একবার তাকিয়ে দেখল। এক বেডরুমের একটা অ্যাপার্টমেন্ট। ছোট একটা লিভিংরুম—সেখানে একটা সোফা আর একটা কফি টেবিল। বাড়তি কোনো আসবাবপত্র নেই। রুমটাও বেশ ছোটই। ফাহিম ইতস্তত করে দাঁড়িয়ে রইল।

লিসা বলল, ‘ওয়াশরুমটা ঐদিকে—তুমি ফ্রেশ হয়ে এস, আমি আসছি।’ বলতে বলতে লিসা তার কিচেনে গিয়ে ঢুকল।

প্রচন্ড ক্লান্তি এসে ভর করেছে ফাহিমের শরীরের। মুখে একটু পানির ঝাপটা দিলে হয়ত ক্লান্তিবোধটুকু কম হবে। ক্লান্তিভাব না কাটা পর্যন্ত গাড়ি চালানো বেশ কঠিন হয়ে পড়বে। কিন্তু শরীর টেনে নিয়ে কিছুতেই যেতে ইচ্ছে করছে না ওয়াশরুম পর্যন্ত। কয়েক পা এগিয়ে সোফাতেই বসে পড়ল সে।

বেশ কিছুক্ষণ পরে দু’কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি আর কিছু স্ন্যাকস নিয়ে এসে লিসা দেখল ফাহিম কাঁচুমাচু হয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে।

হাতের ট্রে কফি টেবিলে রেখে লিসা তার বেডরুম থেকে একটা ব্লাঙ্কেট এনে ফাহিমের গায়ের উপরে দিয়ে দিল। ঘুমের মধ্যে একটু নড়েচড়ে উঠতেই ব্লাঙ্কেট খানিকটা সরে গেল ফাহিমের শরীর থেকে। লিসা ব্লাঙ্কেটটি ঠিক করতে গিয়ে ভয়াবহ এক অনুভূতি হল ওর। ঘুমের মধ্যেই লিসার দুহাতের মাঝে মুখগুজে দিল ফাহিম। হঠাৎ করেই লিসা কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। সে নির্বাক বসে থাকল পায়ের উপর হাতের মধ্যে ফাহিমের মুখ নিয়ে।

প্রচন্ড মাথা ব্যাথা নিয়ে ফাহিমের ঘুম ভাঙল। এবং অবাক হয়ে লক্ষ করল, সে শুয়ে রয়েছে একটি অপরিচিত বিছানায়। এক সেকেন্ডের জন্য মনে হল কোথায় আছে সে? পরক্ষণেই মনে পড়ল লিসার বাসায় এসেছে সে রাতে। একটু ধাতস্থ হতেই উঠে বসল ফাহিম।

‘কি ঘুম ভাঙল?’

ফাহিম ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, বেডরুমের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে লিসা। সে ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমি এখানে কীভাবে এলাম?’

লিসা আবারও হাসল। রহস্যময়ী হাসি।

‘এসবের মানে কী লিসা? আমি তোমার বেডরুমে কেন?’

‘তোমার কি ধারণা, আমি তোমাকে কোলে করে নিয়ে এসে শুইয়ে দিয়েছি আমার বিছানায়? লজিক কি বলে, এটা সম্ভব?’

চিন্তার সাগরে ডুবে গেল ফাহিম। গত রাতের কথা তেমনভাবে কিছুই মনে করতে পারছে না সে। ক্যাসেট প্লেয়ার রিওয়াইন্ড করার মত মেমোরি রিওয়াইন্ড করে সর্বশেষ অবস্থান মনে করল—লিসার সোফাতে বসে সম্ভবত ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। কিন্তু সেই সোফা থেকে লিসার বেডরুমের বিছানাতে সে কী করে এল? লিসা এভাবে রহস্যপূর্ণ হাসি হাসছে কেন? এর মানে কী?

‘উঠে এস। কফি ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।’

ফাহিম তাকাল লিসার দিকে। সে বিছানা থেকে নেমে ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে ঢুকল ওয়াশরুমে। নিজেকে কেমন বোকা বোকা লাগছে। মুখে পানির ছিটে দিয়ে চোখ বুজতেই হঠাৎ কোথা থেকে এক ঝটকায় যেন কাল রাতটা ফিরে এল। সম্পূর্ণ না, ভাঙা ভাঙা টুকরো। সোফায় ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। কতক্ষণ পর সে জানেনা, কেউ একজন তার পা’দুটো তুলে দিয়েছিল সোফাতে। ঘুমের মধ্যেই হাত চেপে ধরেছিল তার।

ভাঙা টুকরোগুলো সব নিমেষেই জোড়া লেগে সামনে চলে এল। ফাহিম হাত ছাড়িয়ে নিতে চাইলেও পারেনি, লিসা দু’হাত দিয়ে ওর গলা জড়িয়ে ধরে শক্ত করে। ফিসফিস করে বলে, ‘আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধর প্লিজ।’

‘ইউ আর ড্রাঙ্ক লিসা।’

‘বিকজ, আই’ম আপসেট। আমার মনটা ভাল করে দাও।’ মাতাল কন্ঠে লিসা বলল। তার চোখে আকুলতা স্পষ্ট। বলতে বলতেই সোফা থেকে পড়ে যাবার উপক্রম হল তার।

ফাহিম তাকে ধরে ফেলল, ‘হয়েছে অনেক, এখন চল তোমাকে শুইয়ে দেই—ঘুমোবে।’

দুহাতে লিসাকে তুলে দাড় করাতেই লিসা ফাহিমকে সাপ্টে জড়িয়ে ধরল। বেডরুমে এনে বিছানায় শুইয়ে দিতে গেলেও ওকে ছাড়ল না। ফাহিম হাত ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হল। লিসা তাকে অক্টোপাসের মত জড়িয়ে ধরে রাখল। ফাহিম কিছু না বলে তাকিয়ে থাকল। লিসা ওর ঠোটে জোর করে চুমু খেল।

বিদ্যুৎ চমকের মত সোজা হয়ে দাড়াল ফাহিম। মুখ হাত মুছে লিভিং রুমের সোফায় গিয়ে বসল। আর তখনই লক্ষ করল দুটো ওয়াইনের গ্লাস আর অর্ধেক খালি বোতল সাইড টেবিলে পরে আছে। ফাহিমের আর বুঝতে বাকি রইল না—কিন্তু তবুও কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েই গেল।

লিসা কিচেন থেকে দু’কাপ কফি আর কিছু প্যাস্ট্রি নিয়ে এসে বসল ফাহিমের পাশে। কফির কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘দেখ তো ঠিক আছে কি না।’

ফাহিম কফির কাপে আস্তে করে চুমুক দিল। সে কিছুই বলছে না দেখে লিসা বলল, ‘চিনি ঠিক আছে?’

ফাহিম মাথা নাড়ল।

দুজনে চুপচাপ কফির কাপে চুমুক দিয়ে চলল। এক পর্যায়ে ফাহিম বলল, ‘আমাকে যেতে হবে।’

‘জানি।’

আবারও নীরবতা। কিছু একটা বলতে চেয়েও না বলে উঠে দাঁড়াল ফাহিম। তাকাল লিসার দিকে, ভাবলেশহীন দৃষ্টি। মুখে কিছু না বললেও মাথার ভেতর চলছে হাজারো প্রশ্ন। কিছু একটা জট পাকিয়ে আছে—জট না খোলা পর্যন্ত অস্থিরতা কমছে না। ফাহিম ইতস্তত করে বলল, ‘তুমি কি বলবে, রাতে ঠিক কী ঘটেছিল?’

‘বলতে পারি এক শর্তে।’ লিসার ঠোটের কোণে হাসি। এত রহস্য করতে পারে মেয়েটা!

‘কী শর্ত?’ ভ্রূ কুঁচকে জানতে চাইল ফাহিম।

‘আজকের দিনটা যদি থেকে যাও—সব বলব।’

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ফাহিম বলল, ‘থাক, কিছু বলতে হবে না।’ বলেই দরজার দিকে পা বাড়াল সে।

‘আরে সত্যিই চলে যাচ্ছ নাকি? একটু দাঁড়াও–শোনো।’

ফাহিম দাঁড়াল।

লিসা এগিয়ে দাঁড়াল ফাহিমের সামনে। ‘তুমি যা ভাবছ, তেমন কিছুই ঘটে নি।’ আবারো রহস্যময়ী হাসি তার মুখে।

ফাহিমের অস্বস্তি তবুও কাটল না।

কোনো রকম ভনিতা ছাড়াই ফাহিমকে জড়িয়ে ধরল লিসা। তারপর আস্তে করে বলল, ‘আই উইল নেভার ফরগেট অ্যাবাউট দিস নাইট। থ্যাঙ্কস ফর এভ্রিথিং।’

লিসার গভীর আলিঙ্গন থেকে নিজেকে আস্তে করে ছাড়িয়ে নিল ফাহিম। দরজা খুলে বের হয়ে গেল সে।

লিসা এল তার পিছে—দাঁড়িয়ে রইল অদূরে।

ফাহিম গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। একবার তাকাল লিসার দিকে। কেমন মায়া কাড়া চোখে তাকিয়ে আছে মেয়েটি। সে কি কেঁদে ফেলবে না কি? কি বিচিত্র মানুষের মন। মাত্র একটি রাতের কয়েকটি ঘণ্টার পরিচয় অথচ মনে হচ্ছে কতদিনের চেনা। ফাহিম চোখ সরিয়ে নিতেই বুঝতে পারল মেয়েটি এগিয়ে আসছে তার গাড়ির কাছে। এভাবে বসে থাকাটা আর সমিচীন হবে না। ফাহিম হঠাৎই গাড়ি ঘুরিয়ে দ্রুত বের হয়ে গেল। রিয়ার ভিউ মিররে এক ঝলক দেখা গেল লিসাকে, হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছে।

স্নিগ্ধ সূর্য উকি দিয়েছে আকাশে অনেক আগেই। প্রকৃতির চারপাশে উঠে গেছে আলো। সুন্দর ঝলমলে একটি সকাল। এমন রোদেলা সকাল বহুদিন দেখেনি ফাহিম। কাল রাতে যে ঝড় বয়ে গেছে এই প্রকৃতিতে তার কোনো ছিটেফোঁটা চিহ্ন পর্যন্ত নেই। বিশ্বপ্রকৃতি আশ্চর্যরকম শান্ত। প্রকৃতির রূপ এত তাড়াতাড়ি বদলে যেতে পারে তার জানা ছিল না। মানুষের মনও কি তেমন, বদলে যায় প্রকৃতির মতই—সময়ে অসময়ে? প্রকৃতির এই রূপের সঙ্গে মানুষের মনের যথেষ্ট মিল আছে। প্রকৃতির বদলায় রং, মানুষের বদলায় মন।

ভাবতেই ভাবতেই আবাসিক এলাকার রাস্তা ছেড়ে হাইওয়েতে উঠে পড়ল ফাহিমের গাড়ি। জানালার কাঁচ নামিয়ে দিল সে। ঝিরিঝিরি হিমেল হাওয়ায় অন্যরকম একটা অনুভূতির ছোঁয়া যেন আচ্ছন্ন করে ফেলল তাকে। (সমাপ্ত)

© ফরহাদ হোসেন
লেখক/নির্মাতা
ডালাস, টেক্সাস

পর্ব-১
পর্ব-২