ক্যাশ মেমো

নানা ব্র্যান্ডের গোটা কয়েক লিপস্টিক, ফাউন্ডেশন ক্রিম, আই শ্যাডো, টিপের পাতা, ছোট বড় সাইজের ব্রাশ,কন্সিলার,পরিত্যক্ত ওয়েট টিস্যু বেশ কিছু ক্যাশ মেমো সহ মেয়েদের টুকটাক সাজ সরঞ্জাম বিছানা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
খাটের এক প্রান্তে ভাঁজ ভাঙা চারপাঁচটা শাড়ি। শাড়ী গুলোর নমুনা দেখে মনে হচ্ছে রেবা আজ হাই ক্লাস কোন পার্টিতে গিয়েছে। ইদানীং তার পার্টি প্রোগ্রাম লেগেই থাকে।
রেবা খান, সেজানের স্ত্রী। ফেসবুকের ছোটখাট সেলিব্রেটি। সামাজিক এই নেটওয়ার্ক নাকি আজকাল সামাজিক অবস্থানেরও একটা মানদন্ড। কার পোস্টে কত লাইক পড়ল, কতগুলো কমেন্ট হলো, সেটা দিয়ে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় জনপ্রিয়তা বিচার করা হয়। সে হিসেবে রেবা সেজানের চেয়ে অনেক বেশী জনপ্রিয়। তার ফলোয়ারের সংখ্যা হুহু করে বাড়ছে। সেজান রেবার একজন ফেসবুক বন্ধু। এতে সুবিধা হল, স্ত্রীর কিছু কিছু খবর ঘরে না পেলেও ফেসবুক থেকে সে পেয়ে যায়।
লিপস্টিক গুলো খুলে ঘ্রাণ নিতে নিতে সেজান সিদ্ধান্ত নিল যে, এই ঘ্রাণে এক ধরণের মাদকতা রয়েছে। আবিষ্ট করে ফেলে। আচ্ছা লিপস্টিকের বাংলা শব্দ কি? প্রশ্নটা এখন মনে আসার কথা নয়, কিন্তু এটা নিয়ে সেজান বেশ কিছু সময় ভাবল। তার মনে হল এর বাংলা ‘ঠোঁট দন্ড’ হতে পারে অথবা ‘ঠোঁট লাঠি’। বা, এ দুটির কোনটি নয়।
রেবা কোথায় যায়, কি করে, সেটা এখন আর সেজানকে জানায় না। হয়ত নারী স্বাধীনতার পরিপন্থী মনে করে। নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করছে কিনা! স¤প্রতি সেন্ট্রাল রোডের এক গৃহকত্রী তার বাসার কাজের মেয়েকে মেরে হাত ভেঙ্গে ফেলেছিল। সেটা নিয়ে রেবার কি দৌড় ঝাঁপ! মিটিং, মিছিল, র‌্যালি কত কি! ফেসবুকে একটা বিশাল জ্বালাময়ী নোটও লিখেছিল। লেখাটি ফেসবুক দুনিয়ায় সাড়া ফেলে দিয়েছিল। সেজান অবশ্য সেখানে মন্তব্য করে স্ত্রীর অত্যধিক রাগী স্বভাবের কথা প্রকাশ করেনি। এমনকি তাদের বারো বছর বয়সী কাজের মেয়ে কুলসুমের শরীরের পোড়া ক্ষতের কথাও বলেনি।
ক্যাশ মেমো গুলোর বেশির ভাগই ম্রিয়মাণ। কিন্তু একটিকে মনে হল সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত, ঝাঁ চকচকে। সেজান সেটা হাতে তুলে নেয়। বাংলাদেশের নামকরা একটি বুটিক সেন্টার থেকে কেনা পাঞ্জাবির বিল ভাউচার। ভ্যাট সহ মূল্য সাত হাজার নয়শ নিরানব্বই টাকা। তারিখ প্রায় সপ্তাহখানেক আগের। এত দামী পাঞ্জাবি রেবা কার জন্য কিনেছে? সামনে কি কোন বিশেষ দিন রয়েছে? বিবাহ বার্ষিকী, জন্মদিন,ভ্যালেন্টাইন ডে, এরকম কিছু? রেবা এসব দিবসের কথা খুব মনে রাখতে পারে। প্রতি অকেশনের আগের রাত বারটা এক মিনিটে সেজানকে সারপ্রাইজ গিফট করে। সেজানের বিস্মিত হবার ক্ষমতা খুবই কম কিন্তু সে যুগপৎ ভাবে বিস্মিত ও খুশি হবার ভান করে রেবার ঠোঁটে ঠোঁট মেলায়। রেবা হয়ত জানে না, স্ত্রীর আবেগহীন শীতল ঠোঁট স্বামীর কাছে মুহূর্তেই সব ফাঁকি ফাঁস করে দেয়।
ভাউচারটি তাকে পেয়ে বসে । প্রত্নত্বত্তবিদ যেভাবে কোন প্রাচীন নিদর্শন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে, তেমনি করে তারিখ, মডেল, ভ্যাট, মোট মূল্য সবকিছু দেখতে থাকে।
বাসায় কারো সাড়া শব্দ নেই। ঘরে ঢোকার সময় দেখে এসেছে লিভিং প্লেসের সোফায় ছেলে অনিক ঘুমোচ্ছে। মেঝেতে কুলসুম। টিভি অন করা ছিল। ‘স্টার জলসা’র কোন একটি সিরিয়াল চলছে। কুলসুম সেটা দেখছিল নাকি ঘুমাচ্ছিল সেটা খেয়াল করা হয়নি। অনেক বিষয় আছে সেজান খেয়াল করে না। আবার দরকার নেই এমন অনেক কিছুই তার মনোযোগ টেনে নেয়। সেদিন যেমন পদ্মা টিভির একটা টক শোতে উপস্থাপিকা সাদা ব্লাউজের ভেতরে গোলাপি অন্তর্বাস পরে এসেছিল। সেজানের দৃষ্টি বারবার সেদিকে চলে যাচ্ছিল। অথচ বিষয়টি সময়ানুক‚ল ছিল না ।
কল বেল বাজছে। পরক্ষনেই ঘর জুড়ে পারফিউমের মিষ্টি একটা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। সেজান ভাউচারটিকে দ্রুত ট্রাউজারের পকেটে ঢুকিয়ে পেপারের পাতায় চোখ রাখে।
ওয়ারড্রবে স্বামীর লাশ, স্ত্রী গ্রেফতার।
আজকাল তাহলে স্ত্রীরা ওয়ারড্রব, আলমারিতে, কাপড়ের বদলে স্বামীর লাশ ঢুকিয়ে রাখছে? বাহ!
ঘরে ঢুকেই রেবা খোঁচা দেয়,
আজ যে বড় তাড়াতাড়ি?
সেজান চুপ করে থাকে। এই প্রশ্নের জবাব না দিলেও চলে।
আমার ফিরতে একটু দেরী হয়ে গেল, মিলা এমন করে ধরল যে ডিনার না করে আসতে পারলাম না ।
মিলা নাকি মিলন সেটা কে জানে? সেজান স্বগোক্তি করে।
কি বললে?
কিছু না ।
রেবা আজ হলুদ জমিনের উপর জংলী ছাপের একটি চওড়া পাড়ের সিল্ক শাড়ি পরেছে। সমান চার ভাঁজে ভাঁজ করা আঁচলটিকে বুকের উপর পাট পাট করে বিছিয়ে দিয়েছে। ভাঁজ গুলো ঘাড়ের কাছে ব্লালাউজের সাথে পিন দিয়ে আটকানো। বুকের ক্লিভেজে রহস্যময় মনোলোভা খাঁজ । শাড়ির ভাঁজ প্রস্থে এত কম যে, একপাশ থেকে নারী শরীরের ঢাল সমতল সবকিছু স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। এমনিতেই রেবার ফিগার দুর্দান্ত। তার উপর নিয়মিত জিমে গিয়ে শরীরটাকে আরও ধারালো করে তুলেছে। কে বলবে ওর বয়স ত্রিশের কোঠার মাঝ বরাবর।
সেজানের মনে হল পকেটের ছোট্ট কাগজটি নড়াচড়া করছে। হয়ত মনের ভুল। পাঞ্জাবির বিষয়ে রেবাকে জিজ্ঞাসা করবে কি না ভাবছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে ভাবনা বাতিল করে।
এই শোন, তুমি খেয়ে অনিককে নিয়ে শুয়ে পড়। আমার ঘুমোতে দেরী হবে।
কথা বলতে বলতে রেবা ল্যাপটপ অন করে।
বাবার বুক ঘেঁষে অনিক ঘুমোচ্ছে। সেজান চেয়ারে বসা রেবাকে খেয়াল করে। ওর পরনে স্কিন কালারের স্বচ্ছ গাউন। কানে ইয়ার ফোন। ফোনে কারো সাথে মৃদু স্বরে কথা বলছে। ল্যাপটপের স্ক্রিনের চ্যাটবক্সে মেসেজ ঘনঘন পপ আপ করছে। কথার সাথে সাথে কী-বোর্ডে রেবার হাতও দ্রুত গতিতে চলতে থাকে।
সেজান পাশ ফেরে। আগামীকাল একটা নিউজ চ্যানেলে টক শো আছে। একটু তৈরি হবার দরকার ছিল কিন্তু ইচ্ছে করছে না। ইদানীং বিভিন্ন টিভি চ্যানেল থেকে প্রায়ই আমন্ত্রণ আসছে। বন্ধুবান্ধব কেউ কেউ তাকে ‘টকশো আর্টিস্ট’ ডাকতে শুরু করেছে। এই নামটি শুনতে সেজানের ভাল লাগে না । নিজেকে জোকার জোকার মনে হয়। বর্তমানে দেশে ইলেক্ট্রনিক আর প্রিন্ট মিডিয়ার ছড়াছড়ি। তাদের কল্যাণে নামের শেষে কত সব বাহারি উপাধি জুড়ে যাচ্ছে! টিভি ব্যক্তিত্ব, পাবলিক ফিগার, সেলিব্রেটি, টকশো আর্টিস্ট,কলামিস্ট! যার পাদটীকা হবার যোগ্যতা নেই সেও আজ বিশদে বিস্তৃত।
কালকের আলোচনায় বড় দুই দলের দুইজন নেতা থাকবেন। আর ত্যানা প্যাঁচানোর জন্য বিশিষ্ট কলামিস্ট হিসেবে থাকবে সেজান। অবশ্য যেখানে সরকার দল বিরোধী দলের নেতা থাকেন, সেখানে নস্যি ঢালতে সেজানের মত কারো প্রয়োজন পড়ে না। একজন আরেকজনের চান্দি গরম করার জন্য যথেষ্ট । একবার দুই মেরুর দুইজন নেত্রীর মাঝে পড়ে তার এমন অবস্থা হয়েছিল যে, ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’। তাদের ঝগড়ার গতি প্রকৃতি দেখে সঞ্চালক মাঝ পথেই যখন মুখে মেকি হাসি ঝুলিয়ে দর্শকদের কাছে বিদায় নিচ্ছেন, ক্যামেরার আড়ালে তখন চুলোচুলি হবার উপক্রম।
কি-বোর্ডে রেবার হাতের টকটক আওয়াজের মধ্যে কখন যে সেজানের দুচোখ জড়িয়ে এসেছে মনে করতে পারে না। সকালে রেডি হয়ে ভার্সিটিতে যাবার আগে সন্দেহবাতিকগ্রস্থ স্বামীর মত চুপিচুপি রেবার মোবাইল ফোনের কল লিস্ট, মেসেজ বক্স চেক করে। গতকাল দুপুরের পরে আর কোন কল বা মেসেজের হিস্ট্রি নাই। সেজান হতাশ হয়ে ঘুমন্ত স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে যেন নিজেকেই প্রশ্ন করে, রেবা তার কাছ থেকে কি লুকোতে চায়?
ধানমন্ডির সাতাশ নম্বর হয়ে গাড়ি মিরপুর রোডে এসে জ্যামে আটকে আছে। সেজান বাম পাশের গ্লাসটা একটু নামিয়ে দিতেই ঝাঁঝাঁ দুপুর চোখে মুখে ঝাপটে পড়ে। বাইরে মানব জঙ্গলে গাড়ীর প্যাপু আওয়াজ, ইঞ্জিনের হাপরের টানে শ্বাস নেবার শব্দ, রাজ্যের শোরগোল।
কাগজটি কি আবারো নড়ে উঠল? কি আশ্চর্য! সেজান খান, বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক, যে কিনা নিজেকে একজন মুক্ত চিন্তার মানুষ ভাবতে শুরু করেছে, তার চিন্তা ভাবনা সামান্য একটি ক্যাশ মেমোকে ঘিরে ঘুরপাক খাচ্ছে? সেজানের মুখটা নিমতেতো হয়ে আসে। মুখের মধ্যে দলা দলা থুথু জমে উঠছে। কাঁচ নামিয়ে রাস্তায় থুথু ফেলতে গিয়ে সে থেমে যায়। এটা কোন ভদ্র লোকের কাজ নয়। বরং গিলে ফেলাই শ্রেয়। কে আর দেখতে যাচ্ছে! মানুষ পরের কত জিনিসই চুপিচুপি হাপিস করে ফেলে। এ তো নিজের জমানো থুথু!
নানা ধরণের বুঝ দিয়েও সেজান নিজেকে ফিরিয়ে আনতে পারল না। একটা দূর্বার আকর্ষণ তাকে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেল। একতলা থেকে চার তলা পর্যন্ত পুরোটা জুড়ে বুটিকটির শো রুম। এই ভর দুপুরেও প্রচন্ড ভিড়। কিছুদিন আগে প্রতিষ্ঠানটির একটি বিজ্ঞাপন নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। সেটার কোন নেগেটিভ ছাপ বিক্রি বাট্টায় পড়েছে বলে মনে হচ্ছে না। সরাসরি কাউন্টারে গিয়ে সে ক্যাশ মেমোটা দিয়ে বলল,
সেম পাঞ্জাবি আমার একটা দরকার। আছে কিনা একটু দেখুন, প্লিজ।
নিশ্চয় স্যার, দেখছি। স্মার্ট মেয়েটি চটপট জবাব দিয়ে কম্পিউটারে চেক করে।
জী স্যার, আমাদের কাছে এই পাঞ্জাবি আর মাত্র এক পিস রয়েছে। দেখবেন কি ?
সিউর।
পিয়া, স্যারকে নিয়ে যাও এই স্যাম্পলটা দেখাও।
পিয়া নামের সেলস গার্লের পিছু পিছু সেজান একটি পুরুষ মূর্তির সামনে এসে দাঁড়ায়। ওয়েস্টার্ন চেহারার মূর্তিটির গায়ে আকাশী রঙের সিল্কের পাঞ্জাবি। বাদামী বাটিকের মাঝে নেভিব্লু আর সাদার কারুকাজে পাঞ্জাবিটিকে অসাধারণ লাগছে।
স্যার, এটা কি খুলে দেখাব?
সেজান যেন একটু চমকে উঠল।
নাহ, এই সাইজ আমার গায়ে ফিট হবে বলে মনে হচ্ছে না। সরি ফর বদারিং, নাউ ইউ মে গো প্লিজ।
মেয়েটি চলে যেতেই সে পাঞ্জাবিটির উপর আলতো করে হাত বোলায়। মোলায়েম, ঠিক রেবার পেলব শরীরের মত।
ড্রাইভারকে আশুলিয়ার দিকে যেতে নির্দেশ দিয়ে সেজান গাড়ীর সিটে শরীর এলিয়ে দেয়। এসি বন্ধ করে সবগুলো কাঁচ নামিয়ে দিয়েছে। অবসাদ আর ক্লান্তিতে তার চোখ বন্ধ হয়ে আসে।
বহুক্ষণ ধরে টুংটাং করে একটা মিষ্টি শব্দ যেন দূর থেকে ভেসে আসছিল। কিশোর বেলার সেই বাইসাইকেলের বেলের মত। শব্দটি ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসছে। একসময় সেটা মাথার মধ্যে হাতুড়ী পেটাতে থাকে। সেজান পকেট হাতড়ায়, মোবাইল ফোন বাজছে।
হ্যালো, সেজান তুমি কই?
রিনরিনে নারী কণ্ঠে সেজানের ঘুম পুরোপুরি ছুটে গিয়েছে।
আমি মিলা বলছি, শুনতে পাচ্ছ?
হ্যাঁ, বল।
তুমি এখন কোথায়? আমার সাথে দেখা করতে পারবে? জরুরী কথা আছে।
ফোনে বলা যায় না? আমি একটু ঢাকার বাইরে।
হিরণ্ময় যে ফিরে এসেছে সেটা কি তুমি জান? শোন, বৌকে সামলে রেখ। আমাকে তো তুমি কখনোই পাত্তা দাওনি কিন্তু এই কথাটি ফেলে দিও না।
হিরন্ময় তাহলে কানাডা থেকে ফিরে এসেছে। ফেসবুকে নতুন করে হিরন্ময়ের সাথে রেবার যোগাযোগের খবর মিলা আগেই দিয়েছিল। কিন্তু এত বছর পর সে কিসের টানে ফিরল? রেবা ?
রাত যত গভীর হচ্ছে চিন্তার ব্যারোমিটারের সূচক ততই নিম্নগামী হতে থাকে। অভ্যাস বশত রেবা সেজানের বুক ঘেঁষে আদুরে বিড়ালের মত ঘুমোচ্ছে। কি নিষ্পাপ একটা মুখ! নীলচে আলো ওর কাশফুলের মত ফিনফিনে ত্বকে আসন নিতে পারে না, পিছলে যায়। ছাত্র ইউনিয়ন করা হিরন্ময়ের চোখের গভীরে রেবা যখন ডুব সাঁতার কাটছিল হিরন্ময়ও তখন রেবার জন্য হাজার কবিতা লিখে ফেলেছিল। কিন্তু বিয়ের প্রশ্নে হিরন্ময় সাফ জানিয়ে দিল, সে কোন বন্ধনে নিজেকে জড়াবে না। অগত্যা সেজানের প্রশস্ত বুকে রেবা সুখ স্বাচ্ছন্দ খুঁজে নিয়েছিল। বা বলা যায় খুঁজতে চেয়েছিল।
সেজান রেবার কপালে আলতো করে চুমু দেয়। নাকে নাক ঘষে, ঠোঁট নামিয়ে আনে ঠোঁটে। ধীরে ধীরে দুটি শরীর জেগে উঠছে। সেজান বোঝে, এটাও অভ্যাসের বশে। দেহের টানে দেহ জাগে, মনের খবর নাই। কাঞ্চনজঙ্ঘা মন্থন শেষে কস্তুরির ঘ্রাণে উন্মাতাল হয় রাতের পুরুষ। কারিগরের চতুর হাতিয়ার নেমে আসে নলিনী বনে, পদ্মমধুর খোঁজে।
অকস্মাৎ মনে হল পা বেয়ে একটি শুঁয়ো পোকা ক্রমশ উপরের দিকে উঠে আসছে। তীব্র আতঙ্কে সেজান কেঁপে ওঠে। ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ শরীরের উষ্ণতা যেন মুহূর্তেই হিমাঙ্কের ঘরে নেমে আসে। রেবা আর ওর মাঝে দেয়াল তুলে দাঁড়িয়ে আছে হিরন্ময়। ওর সিঁধেল চোখ সেজানকে এফোঁড় ওফোঁড় করে ফেলছে। অথচ আকাশী রঙয়ের পাঞ্জাবিটি ওকে কি সুন্দর মানিয়েছে!
এই, কি হয়েছে? অমন করে তাকিয়ে কি দেখছো?
সেজান ঘুমঘোর দৃষ্টিতে রেবাকে দেখে। লাস্যময়ী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে মদির হাসি। ওর হাতে আকাশী রঙয়ের পাঞ্জাবিটি দুলছে। সামনের দেওয়াল ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক রাত বারটা বেজে এক মিনিট।
সে আলতো করে পকেটে হাত রাখল। ক্যাশ মেমোটি খিকখিক করে হাসছে। বিদ্রুপের হাসি। সেজান ভাবছে এটা হয়তো তার মনের ভুল।

-ম্যারিনা নাসরীন