ক্ষরণ ( ৪র্থ পর্ব )

খোরশেদ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রুমীর দিকে “শোনেন, আমি সত্যি কিছু জানিনা। তবে আন্দাজ করতে পারতেছি মনেহয়, কি ঘটছে ! বলছিলাম, পারবেন না। আপনারা শোনেন নাই। এখন কি করবেন? আইনি সাহায্য নেবেন? মিডিয়ারে জানাবেন? একশন নিতে তো দেরী হবে। এরমধ্যে যদি কিছু হয়ে যায়? ভাইটারে যদি আর ফেরত না পান? তাছাড়া অভিযোগ করবেন কিসের ভিত্তিতে? কোন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ আছে যে কারা এই কাজ করছে? নাই। অনুমানের উপর এই অভিযোগ টিকবে না। এদের ক্ষমতা সম্পর্কে কোন ধারনাই নাই আপনাদের! এজন্য বলছিলাম কেস ফেসে যাইয়েন না, আপোষে আসেন।”

ঘরটার মধ্যে অদ্ভুত নিরবতা নেমে এল হঠাৎ। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল রুমী, চোখ মুছল। “কাল কোর্টে যাবনা আমি, কথা দিলাম। আমার বিচারের দরকার নাই। সোনা ভাইটাকে ফেরত দিন। আমার মা মরে যাবে। কিচ্ছু করব না আমি, লিখিত দিতে হবে? দিব। আমরা চলে যাব এলাকা ছেড়ে। কাউকে কিছু বলব না।”

“এখন এসব বলে কি হবে? বাড়ী যান আপনারা। দেখি কি করা যায়!” আবদুর রহমানের দিকে তাকাল খোরশেদ —- “যান না ভাই! মেয়েটারে নিয়া যান। বুদ্ধি নাই আপনার? এখন পারবেন কিছু করতে? যত্তসব মাথা মোটা আহাম্মক আইসা জোটে।”

“যাব না আমি! ওকে না পেলে সারারাত এখানেই বসে থাকব। আমি সাথে করে নিয়ে যাব ওকে। খালি হাতে মায়ের সামনে কিভাবে দাঁড়াব আমি! বললাম তো, সব শেষ করে দিব আজই। লিখে দিই, কাগজ কলম দিন আমাকে!” মেয়ের দিকে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছেন আবদুর রহমান। হালকা ছানি পড়া চোখের কোল বেয়ে নামছে অবিরাম জলধারা।

বাবলু বাড়ী ফিরল রাত সাড়ে ১০ টায়। পাশের বাড়ীর রকিব ছুটতে ছুটতে এসে থানায় খবর দিল, বাবলু বাড়ী ফিরেছে। বাবার হাত ধরে উঠে দাঁড়াল রুমী — “অনেক মেহেরবানি অফিসার। অনেক দয়া আপনাদের। কাল সকালেই চলে যাব আমরা এখান থেকে। খুঁজেও পাবেনা কেউ! “

টেবিলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল খোরশেদ– “ঠিকানা টা দিয়ে যান। কাগজপত্রের ব্যাপারে লাগতে পারে।”

ফিরে তাকাল রুমী। ঠোঁটের মত চোখও যদি সরব হত, তাহলে খোরশেদ বুঝতে পারত, তীব্র ঘৃণার ভাষা কত ভয়ংকর!

গভীর রাত। মমতাজ বেগম ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বসে আছেন। আতঙ্ক কাটেনি এখনো তার। এখনো ঠিক বিশ্বাস করতে পারছেন না, ছেলে ফিরে এসেছে। অনেক বার জিজ্ঞেস করার পরও একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি বাবলু। তার চোখের পাশে নীলচে দাগ, ঠোঁট ফুলে গেছে অনেক টা। রুমী মায়ের কাঁধে হাত রাখল — “কিছু খেয়ে নাও মা, ওঠো! ”

হাউমাউ করে কেঁদে উঠল মমতাজ — “ছেলেটারে মারছে ওরা! অনেক মারছে আমার বাবারে! “

চোখ ভরে এল রুমীর, যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত এই মানুষটাকে শান্তনা দেবার কোন ভাষা জানা নেই তার!”

৮.

শীত পড়েছে অল্প অল্প। খুব ভোরে পাতলা কুয়াশায় ঢেকে যায় চারপাশ। শিশিরে পা ভিজে যাচ্ছে। খুব সকালে ইচ্ছে হয় খোলা হাওয়ায় বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে। চোখ বন্ধ করে লম্বা নিঃশ্বাস নিল রুমী, আহ! কি শান্তি! বাড়ীর পশ্চিম দিকের দেয়ালটায় হাত রাখল। এটা কবরস্থান। সবুজ মখমলের মত শেওলাগুলোতে হাত বোলাল সে। এখানে দাদার কবর, শুয়ে আছে এখানে, অথচ একসময় এবাড়ীর প্রতিটা কোনে হয়ত তার ব্যস্ত পদচারণা ছিল। জীবন কেন এত অদ্ভুত! নিজেকেও মাঝেমাঝে কেমন মৃত মনে হয় তার!

পেছনের দরজায় দাদীকে দেখতে পেল। বয়সের ভারে নুয়ে যাওয়া এই মানুষটাকে দেখলে অন্যরকম এক শক্তি পায় সে। ফিরোজা বেগমের বয়স আশির কোঠায়। ধীর স্থির , শান্ত স্বভাবের। একমাত্র ছেলের হাজার অনুরোধের পরেও স্বামীর ভিটা ছেড়ে কখনো শহরে গিয়ে থাকেননি। সবসময় বলতেন– “ডাল দিয়া খাই, নুন দিয়া খাই এইডা আমার বাড়ী। আমি ক্যান পরের বাড়ী গিয়া থাকমু!” এই কথার গভীরতা আগে না বুঝলেও বড় হয়ে বুঝতে পারে রুমী। অজপাড়াগাঁয়ের প্রায় অশিক্ষিত মানুষ টার এই বোধ আশ্চর্য করে তাকে। তার প্রবল ব্যক্তিত্ব আর মাথা উঁচু করে বাচার মানসিকতাকে শ্রদ্ধা করে সে। বাবলুকে দেখতে পেল পুকুর ঘাটে, উবু হয়ে হাত মুখ ধুচ্ছে। এ’কদিনে যেন আরও বড় হয়ে গেছে সে। চুপচাপ নিজের মত থাকে সারাদিন। এখানের একটা স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে তাকে। স্কুল ছুটির সাথে সাথে বাড়ী চলে আসে, কারও সাথে মেশে না। খেলতে যায়না। মাকে সাহায্য করে খুব। গাছে পানি দেয়া, বেড়া দেয়া, আগাছা পরিষ্কার করা অনেক কাজ করে দেয়। সন্ধ্যা হলেই হারিকেন জ্বালিয়ে গম্ভীর হয়ে পড়তে বসে। একটা ঘটনা পুরো পরিবার টাকে কেমন ওলটপালট করে দিল। সবচেয়ে বেশী বিপর্যস্ত হয়েছেন বাবা। সারাদিন কাচারিঘরে একা একা বসে থাকেন। লোহার ট্রাংকে একগাদা পুরানো বই, মলাট ছেঁড়া, পৃষ্ঠা গুলো মলিন, পোকা কেটে ফেলেছে অনেক গুলো। সারাদিন বসে বসে সেই বইগুলো পড়েন, চশমার কাঁচ পরিষ্কার করেন বারবার। কাছে গিয়ে দাঁড়ালে একবার মাথা তোলেন, তারপর দ্বিগুণ মনযোগে আবার পড়তে থাকেন। রুমী জানে এটা নিজের থেকে একধরণের পালিয়ে বাঁচা তার।

মা কিছুটা মানিয়ে নিয়েছেন। নিজস্ব ব্যস্ততা তৈরী করেছেন। বাড়ীর পেছনের বাগানে সবজি বাগান করেছেন, হাঁসমুরগী কিনেছেন বেশ কয়েকটা। সারাদিন ব্যস্ত থাকেন এসব নিয়ে। পৃথিবীতে কম বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ গুলোই সুখী হয়, ভাল থাকে। জীবনের জটিল বিশ্লেষণ তারা বোঝেনা। সকালের নরম রোদ এসে পড়েছে পায়ে, কোমল উষ্ণতা টুকু সচল করল তাকে। রান্নাঘরে উঁকি দিল — “চা বানিয়েছ মা? “

ধোঁয়া ওঠা এককাপ চা আর মুড়ির বাটি এগিয়ে দিলেন মমতাজ — “তোর বাবাকে দিয়ে আয়, মানুষ টা আগে খিদা পাইলে ঘরবাড়ী মাথায় তুলত। এখন আওয়াজ ও করেনা একটা।” দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি।

সংসার চলছে সাংঘাতিক টানাপোড়নে। এখানে সম্পদ বলতে এই বসতবাড়ি আর সামনের ধানি জমিটুকু। দাদীজানের কোনমতে চলে যেত। বাড়তি চারজন মানুষের চাহিদার তুলনায় সেটুকু খুবই সামান্য। তার উপর বাবলুর পড়ার খরচ, বাবার ওষুধ। বাড়তি সংযোজন হয়েছিল মায়ের চুড়ি বিক্রি করা টাকা। তাও এখন শেষের পথে। বাড়তি একটা উপার্জন দরকার, সেই ভাবনাতেই গত একমাস ধরে বিভিন্ন জায়গায় চাকরীর জন্য আবেদন করছে রুমী। সময়ে তার আলোচিত চেহারায় কিছুটা প্রলেপ নিশ্চয়ই পড়েছে। কিন্তু ইন্টার্ভিউতে ডাকছেনা কেউ! কোন চিঠিও আসছেনা। একটা প্রতিষ্ঠান ও ডাকবেনা, এটা কেমন করে হয়! কাল একবার পোস্ট অফিস যেতে হবে খোঁজ নিতে। এখানে রাত গভীর হয় দ্রুত। চারদিকে সুনশান নিরবতা, একটানা ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক, অদ্ভুত এক গা ছমছমে ব্যাপার আছে। সন্তর্পণে বালিশে মাথা রাখল রুমী। কাল সকাল সকাল বেরিয়ে পড়তে হবে।

পোস্ট অফিসের সামনের বড় রাস্তায় দাঁড়াল। প্রচণ্ড রোদে তাকানো যাচ্ছে না। পেছনের পথ ধরে বাড়ী গেলে মন্দ হয়না। রাস্তা লম্বা, কিন্তু ছায়া আছে। মাটির রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করল সে। মান্ধাতা আমলের পোস্ট অফিস। দুই টা চিঠি এসে ডাকে পড়ে আছে, এদের খবরও নেই। ইন্টার্ভিউর তারিখ চলে গেছে একটার, আরেকটার ডেট আজ। দুই চিঠির একটাও কাজে আসল না। এরপরে আবেদন পাঠানোর পর খোঁজ রাখতে হবে নিয়মিত। বাড়ী ফিরতে ফিরতে দুপুর হয়ে গেল। হাত মুখ ধুয়ে বসে পড়ল, এত ক্লান্ত লাগছে! অনেকটা পথ হেঁটেছে আজ। মমতাজ বেগম রান্নাঘর থেকে তাড়া দিলেন — “তোর বাবারে একটু ডাকবি? সকালে চা মুড়ি খাওয়ার পর আর কিছু দেইনি। খিদা পাইছে নিশ্চই! ভাত বেড়ে দিতেছি। ডেকে আন। আমি গোসলে যাই। খাওয়ার সময় কাছে থাকিস।” রুমী মাথা নাড়িয়ে সায় দিল। শরীরে রাজ্যের ক্লান্তি, ভাত খেয়ে লম্বা একটা ঘুম দিতে হবে।

কাচারি ঘরের দরজায় দাঁড়াল রুমী। বাবা শুয়ে আছে। তার ঘুমনোর এই ভঙ্গিটা খুব পরিচিত। দুবার ডাকল বাবা বাবা বলে, ঘুমিয়ে গেছে। কপালে আড়া আড়ি ভাবে রাখা হাত টা স্পর্শ করতেই কেঁপে উঠল রুমী। বরফ শীতল অনুভূতি। ছিটকে সরে এল সে, তার চোখ বিষ্ফোরিত। দ্বিতীয় বার আর স্পর্শ করার সাহস হল না। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার দিল সে —-“বাবা গো!”

ভেজা কাপড়ে পা ছড়িয়ে মেঝেতে বসে আছেন মমতাজ। প্রতিবেশী কেউ একজন মাথায় হাত দিতেই ক্ষীণ গলায় বললেন — “মানুষ টা ভাত খাইতে পারল না! আজ ছোট মাছ রানছিলাম ধনেপাতা দিয়া, খুব পছন্দ ছিল।”

রুমীর মাথার ভেতর টা কেমন শূণ্য হয়ে যাচ্ছে, চোখ গুলো ঝাপসা। জ্ঞান হারানোর ঠিক আগ মূহুর্তে সে দেখল লাশের খাটিয়া নিয়ে কয়েকজন বাড়ীর দরজায় ঢুকছে। বাবলুর চেহারাটা চিনতে পারল শুধু।

৯.

দেশপ্রেম টা অদ্ভুত বিষয়। দেশে বসে যে মানুষটা দুবেলা নিয়ম করে দেশের অবস্থা, পরিস্থিতি নিয়ে খিস্তি খেউর করে, সেই মানুষটাই যদি কখনো বিদেশে পাড়ি জমায়, তখন আবার নিয়ম করে সেই দেশের মায়ায় বালিশ ভেজায় চোখের জলে। আসলে দেশপ্রেম না, মানুষ জাতি টাই অদ্ভুত। রোজী মার্গারেটের কথা অবশ্য ভিন্ন, চরম ঘৃনা আর অভিশপ্ত কিছু স্মৃতি নিয়ে সে পাড়ি জমিয়ে ছিল লন্ডনে। এয়ারপোর্ট এর সুবিশাল চত্বরে দাঁড়িয়ে সে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল আকাশের দিকে। বাংলাদেশের আকাশ!

-নাঈমা পারভীন অনামিকা

                                     চলবে.........