গোধূলিবেলায় (ষষ্ঠ পর্ব)


বাড়ি থেকে বের হয়ে রেবেকা রুমিকে নিয়ে একটা রিক্সায় উঠে বসলো। কিছুক্ষণ পর রিক্সা খানা নদীর পাড়ে এসে পৌঁছাতেই তারা দুজনেই রিক্সা থেকে নেমে দাঁড়ালো। রেবেকা ভাড়া মিটাতে যেতেই রুমি তাকে হাত দিয়ে মৃদু ধাক্কা দিয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো, ” দেখো বুবু, ফয়সাল ভাই ওই যে ওইদিকে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে কেমন সুন্দর করে মিটিমিটি হাসছে ! ভাইয়াকে কত্ত হ্যান্ডসাম লাগছে দেখো ! ” কথাটা বলেই রিমি প্রবল উত্তেজনায় হাত তালি দিয়ে উঠলো।

রেবেকা আড়চোখে ফয়সালকে একনজর দেখে নিয়ে পরক্ষণেই রিমির দিকে চোখ পাকিয়ে মৃদু ভর্ৎসনা করে উঠে বললো, ” একটা চড় খাবি, যদি ওইভাবে লাফাতে থাকিস। এতো লাফানোর কি আছে? ”

রেবেকার কথা শুনে রিমি ফিক করে হেসে বলে উঠলো, ” বু তুমি এক্কেবারে সাধাসিধে একটা মেয়ে, কিচ্ছু বুঝনা! ” বলেই ফিক ফিক করে হাসতে লাগলো।
ফয়সালকে দেখার পর থেকেই রেবেকা বুঝতে পারছে না এই মুহূর্তে সে কি করবে? কখনও সে এইরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি। মনে হচ্ছে পা দুটোর ওজন অনেক বেড়ে গিয়ে মাটির সাথে যেনো আটকে গেছে। কিছুতেই তুলতে পারছে না! হঠাৎ ফয়সালকে তাদের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে রেবেকার হার্টবিট বেড়ে গেলো! তার সাথে সাথে হাত পা ঘামতে শুরু করলো। গলাটা শুকিয়ে যেনো কাঠ হয়ে আসছে। সবচেয়ে ভালো হতো যদি এখান থেকে সে এক দৌঁড় দিয়ে পালিয়ে যেতে পারতো। আবার পরমুহূর্তেই তার মনে এক ধরণের ভাললাগা শুরু হতে লাগলো। লজ্জায় তার গাল দুটো লাল হয়ে উঠলো। কি করবে বুঝতে না পেরে সে শাড়ির আঁচলের কোনাটা ধরে বারবার আঙ্গুলে পেঁচাতে লাগলো।

ফয়সাল কাছে এগিয়ে এসে বেশ মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে রিমির মাথায় স্নেহ মাখা হাতটা একবার বুলিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলো, ” তুমি কেমন আছো আপু? ”

আকস্মিক এই স্নেহের স্পর্শ পেয়ে মুহূর্তেই রিমির চোখে জল চলে আসলো। সে কোনরকমে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে উঠলো, ” আমি ভালো আছি ভাইয়া! আপনি কেমন আছেন? ”

” আমি ভালো আছি। তোমাদের আসতে কোন অসুবিধা হয়নি তো? ”

” না না ভাইয়া অসুবিধা হবে কেনো! আমরা বাড়ি থেকে সোজা রিক্সায় করে চলে এসেছি। ”

” তোমরা কি দুইজনে ওই খানে বসবে? খুব সুন্দর বাঁধানো একটা জায়গা। ” কথাটা বলতে বলতে ফয়সাল হাত তুলে একটু দূরে নদীর ধারে শান বাধানো পাড়টা দেখিয়ে হাঁটতে লাগলো। রেবেকার একটা হাত ধরে রিমিরাও তার পিছন পিছন হাঁটতে লাগলো।
নদীর ধারে বসে ফয়সাল নরম গলায় রিমিকে জিজ্ঞাসা করলো, ” রিমি ফুচকা খাবে ? এখানে খুব সুন্দর ফুচকা বানায়। ইচ্ছে করলে চটপটিও খেতে পারো। ”

” না ভাইয়া, কিছু খাবো না। আমরা এইমাত্র ভাত খেয়ে এসেছি। ”

রিমির কথা শুনে ফয়সাল হো হো করে একচোট হেসে বললো, ” তাই বুঝি! আমি তোমার ভাইয়া হই , আমার কাছে তুমি জোর করে যা মন চায় তাই খেতে চাইবে, বুঝলে! ” কথাটা বলেই ফয়সাল হাত দিয়ে ইশারা করে ফুচকাওয়ালাকে ডাক দিয়ে তিনজনের জন্য তিন প্লেট ফুচকার অর্ডার দিলো।

একটু পর রিমি কিশোরী সুলভ চপলতায় ফুচকা খেতে খেতে পা দুটো দোলাতে দোলাতে বললো,
” ভাইয়া আপনি খুব ভালো। জানেন আমার কোন বড় ভাইয়া নেই! আমার একটা ভাইয়া থাকলে আমাকে মনেহয় এভাবেই আদর করে খাওয়াতো! ”

ফয়সাল একগাল হেসে বললো, ” তোমার ভাই নেই তো কি হয়েছে, ধরে নাও আজ থেকে আমিই তোমার ভাইয়া। তোমার যখন যা কিছু আবদার করার আমার কাছে করবে। আমি খুব সাধারণ একটা মানুষ! তেমন কোন বড় ধরণের চাকরি করি না। তাই বলে তোমার ছোটখাটো আবদার মেটাতে আমার কোন অসুবিধা হবে না, আর কিছু খাবে তুমি ? আরও এক প্লেট ফুচকা দিতে বলি? ”

রিমি প্রবলবেগে দুইদিকে মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিলো,
” না ভাইয়া আর কিছু খাবো না। ”

এভাবে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর ফয়সাল প্রথম নীরবতা ভেঙ্গে রেবেকার দিকে তাকিয়ে বললো, ” আমি আসলে কোন কারণ ছাড়াই এমনি আপনাদের এখানে আসতে বলেছিলাম। আসলে বাড়ির মুরুব্বীদের মধ্যে থেকে অনেক কথায় বলা যায় না। অনেক কিছুতেই তারা তাদের নিজস্ব মতামত দিয়ে বসেন। তাই আপনাকে আমার আলাদা ভাবে জিজ্ঞাসা করা উচিৎ আপনার কিছু বলার আছে কিনা ? তার আগে আমার সম্মন্ধেও আপনার কিছু জানা দরকার। আমি কি করি তা হয়তো আপনার জানা আছে। আমি পাস কোর্সে ডিগ্রী পাশ করে কিছুদিন বেকার থাকার পর এই চাকরিতে ঢুকেছি। আমরা তিন ভাইবোন। সাহেব বাজারে আমাদের একটা মুদির দোকান আছে। বাবা সেটা দেখাশুনা করেণ। বাবা খুব কষ্ট করে আমাদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করেছেন। অভাবের কারণে তিনি পড়ালেখা করতে না পারলেও পড়াশুনার মর্ম তিনি বুঝতেন। আমার বড় একটা বোন আছে। অবশ্য বছর দুই এক আগে তার বিয়ে হয়েছে। সবে ছোট ভাইটা কলেজে পড়ছে। পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে সে বাবার সাথে দোকানে বসে। ”
এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে ফয়সাল একটু চুপ থেকে আবারও বলে উঠলো, ” রমজান ভাইয়ের বাসায় আপনাকে আমি প্রথম দেখি। অবশ্য শেফালী ভাবীর মুখে আপনার গুণের অনেক প্রশংসা শুনে আপনার সাথে কথা বলার ইচ্ছা অনেক বেড়ে যায়। তাই আজ রিমির স্কুলে আপনার সাথে কথা বলার জন্য গিয়েছিলাম। ” আপনার ব্যাপারে আমার কোন অমত নেই। এখন সবকিছুই নির্ভর করছে আপনার মতামতের উপর। অবশ্য এখনই যে আপনাকে জানাতে হবে এমন কোন কথা নেই। আপনি চিন্তাভাবনা করে পরে শেফালী ভাবিকে বললেই আমি জেনে যাবো। ”

এতোক্ষণ ধরে রেবেকা একমনে ফয়সালের কথাগুলো মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলো। ফয়সালের কথা শেষ হতেই তার মনের মধ্যে কি এক পরম নির্ভরতা এসে জড়ো হতে লাগলো। সেই নির্ভরতার কারণেই এতদিনের জমে থাকা ক্ষোভ তার মনের ভিতর থেকে ঠিকরে বের হয়ে আসতে চাইলো। সে আর আগে পিছে কোনকিছুই চিন্তা না করে মুখ ফুটে বলে ফেললো, ” আমি একটা কালো মেয়ে, একথা শুনতে শুনতেই আমি বড় হয়েছি। কেউ দেখতে আসলেই বাবা মাকে আমার গায়ের রঙ নিয়ে কথা বলতো। তারপরও যদি কেউ একটু আগ্রহ দেখাতো তবে দেখা যেতো তারা আমার ব্যাপারে না বরং যৌতুকের ব্যাপারেই বেশি আগ্রহ। আমার বাবা খুব সামান্য একটা চাকরি করেন। তাই তার পক্ষে এইরকম চাহিদা পূরণ করা সম্ভব না। ”
কথাগুলো বলে রেবেকা একটু থেমে আবারও বললো,
” আমি কালো বলে স্কুল কলেজে কেউ আমার সাথে ঠিকমতো কথা বলতো না। আত্বীয় স্বজনও এই নিয়ে আমার মাকে অনেক কথা শুনিয়েছে। সবার কাছে আমি এতোই ছোট ও নিকৃষ্ট হয়ে গেছি যে পরিচিত অনেকেই আমাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। আপনিই একমাত্র মানুষ যে এ ব্যাপারে একটিও কথা বললেন না। আবেগের বশে এখন কিছু না বললেও হয়তো দেখা যাবে দুইদিন পর ঠিকই বলছেন। তাই খুব ভয় হয়। ”

রেবেকা যখন কথাগুলো বলছিলো তখন শেষের দিকে রিমি আবেগে তাকে জড়িয়ে ধরে ফিস ফিস করে বলতে লাগলো, ” তুমি চুপ করো বুবু, তুমি চুপ করো। ”

রেবেকার কথা শেষ হতেই ফয়সাল একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কিছুক্ষণ চুপ থেকে একসময় বলে উঠলো,
” সন্ধ্যা হয়ে আসছে, চলেন ওঠা যাক। আপনাদের রিক্সায় তুলে দিই। ”
কথাটা বলেই ফয়সাল উঠে দাঁড়িয়ে সামনের এক ফেরিওয়ালার কাছ থেকে দুই প্যাকেট পটাটো চিপস কিনে রিমির দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো, ” এ দুটো তোমরা দুই বোনে মিলে খেতে খেতে বাড়ি যাবে কেমন। আর ভালোমতো পড়াশুনা করো। ”
তিনজনে মিলে হাঁটতে হাঁটতে কিছুটা সামনে এগিয়ে খালি একটা রিক্সা ঠিক করে ফয়সাল রেবেকাদের তুলে দিলো। রিক্সায় উঠে রিমি ফয়সালকে সালাম দিয়ে বললো, ” ভাইয়া আমাদের বাসায় অবশ্যই আসবেন কিন্তু ! ”
প্রতি উত্তরে ফয়সাল একটু মুচকি হেসে মাথা ঝাঁকালো। রিক্সাওয়ালা রেবেকাদের নিয়ে সামনে অগ্রসর হতে শুরু করলো।

তার পরের দিন রশীদ সাহেব অফিসে এসে প্রাত্যহিক কাজকর্ম গুলো করে দুপুরে লাঞ্চ ব্রেকের পর ম্যানেজারের রুমে প্রবেশ করে ম্যানেজার দ্বীন মোহাম্মদকে সালাম দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। দ্বীন সাহেব ফাইলে স্বাক্ষর করতে করতে রশীদ সাহেবকে জিজ্ঞাসা করলেন, ” কিছু বলবেন রশীদ সাহেব? ”

” জ্বি স্যার , আপনার সাথে একটু আলাপ ছিলো। ”

” ঠিক আছে, কি বলতে চান বলে ফেলুন। ”

” স্যার আমার কিছু টাকার প্রয়োজন ছিলো। আমার প্রভিডেন্ট ফান্ডে কতো টাকা জমেছে তা যদি একটু জানাতেন তাহলে ফান্ড থেকে লোন নিতাম। ”

রশীদ সাহেবের কথা শুনে দ্বীন সাহেব বেশ খানিকটা অবাক হয়ে হাতের ফাইলটা এক পাশে সরিয়ে রেখে জিজ্ঞাসা করলেন, ” আপনি আবার লোন তুলে কি করবেন? ”

” একটু দরকার ছিলো স্যার! ”

” কি এমন জরুরী দরকার পড়লো যে লোন করতে যাবেন! ”

” না মানে , আমার বড় মেয়েটার বিয়ে দিতে চাই, তাই বেশ কিছু টাকার প্রয়োজন। ”

” আপনার মেয়ের বিয়ে কি ঠিক হয়ে গেছে? বিয়ে কবে? ”

” জ্বি না স্যার , বিয়ে এখনও ঠিক হয়নি। তবে হতে কতক্ষণ! তাই আগেই এই ব্যাপারে একটু খোঁজখবর নিতে আপনার কাছে আসলাম। ”

দ্বীন সাহেব কোন কথা না বলে ইশারায় তাকে সামনের চেয়ারে বসতে বলে কাঠের আলমারি থেকে একটা ফাইল বের করে তার উপর কিছুক্ষণ নীরবে চোখ বুলাতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর ফাইল থেকে চোখ তুলে তিনি রশীদ সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, ” ফান্ডতো আসলে নির্ভর করে আপনার স্কেল ও বেতনের উপর। তাই বলছিলাম কি ফান্ডে আপনার তেমন বড় কোন টাকা জমা নেই। সবকিছু মিলিয়ে হয়তো চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকার উপর লোন তুলতে পারবেন না। ”

রশীদ সাহেব করুন হেসে বললো, ” এতো অল্প টাকা দিয়ে কি আর মেয়ের বিয়ে দেয়া সম্ভব স্যার। এই টাকা তো খাওন দাওনেই শেষ হয়ে যাবে। মেয়ে জামাইয়ের জন্য বিয়ের বাজার কোন টাকা দিয়ে করবো। ”

ম্যানেজার একটু আফসোস করে বললেন, ” কি আর করবেন বলেন, অফিস তো আর এসব দেখতে যাবে না। সে চলবে তার নিয়ম অনুযায়ী। আমি বলছিলাম কি এতো বড় আয়োজন করার কি দরকার। দুই একজন লোককে শুধু দাওয়াত দিবেন। ”

ম্যানেজারের কথা শুনে রশীদ সাহেব মনে মনে একটু দমে গেলেন। তাই আর কোন কথা না বাড়িয়ে একগাদা চিন্তার বোঝা মাথায় নিয়ে মুখটা বিষন্ন করে রুম থেকে বেরিয়ে আসলেন।

(চলবে)

-ফিরোজ চৌধুরী