গোধূলিবেলায় ( ৩য় পর্ব )


দুপুর না গড়াতেই রমজানের বৌ শেফালী রেবেকার মায়ের কাছে এসে উপস্থিত হলো। শেফালীকে দেখতে পেয়ে আয়েশা বেগম বিছানা থেকে উঠে খাটে হেলান দিয়ে তাকে ডাক দিয়ে বিছানার উপর বসতে বললেন। শেফালী আয়েশা বেগমের পাশে বসে বললো , ” কি বুবু , তোমার শরীর খারাপ নি ? এতো বেলা হলো তাও বিছানায় শুয়ে আছো যে ? ”

” হ্যাঁ রে বইন , শরীরটা কাল রাত থেকে কেমন যেনো ম্যাজ ম্যাজ করছে ! মাথাটাও কেমন যেনো ভার হয়ে আছে ! ভালো লাগছে না , তাই শুয়েই আছি। মেয়েটা এসে একবার মাথায় তেল দিয়ে গেছে! তারপর থেকে একটু আরাম পাচ্ছি। আমার কথা বাদ দাও , তুমি কেমন আছো বলো? ”

” আমি ভালোই আছি বু। রাজনের বাপ আমায় খবর দিয়া পাঠাইলো, সামনের শুক্রবার বিকেলে ছেলে পক্ষ আমাদের রেবেকা মা রে দেখতে আসবে। ভাইকে ওইদিন বিকেলে বাড়িত থাকতে বলো। ছেলে , ছেলের মা আর ছেলের এক চাচা আসবে। রেবেকাকে অবশ্য তারা বাইরে একবার দেখছে। রাস্তায় যাইতে যাইতে যতটুকু দেখা তাতেই নাকি ছেলের পছন্দ হইছে। তোমরা যদি রাজি থাকো তাহলে সেদিন ঘটা করে একবার রেবেকাকে দেখে কথাবার্তা সব ফাইনাল করে ফেলবো। তুমি কি বলো বুবু ? ”

” আমার আর কি বলার আছে ! রেবেকার বাপরে আমি তোমার সব কথায় বলছি। তিনি সব শুনে উত্তর দিয়েছেন , মেয়েকে আগে পছন্দ করুক। তাদের কোন কথা থাকলে সেটাও যেনো জানায়। তারপর ছেলের বাড়ির সব খোঁজখবর নিয়ে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে তখন নাহয় দিন তারিখ ঠিক করা যাবে। তুমি কি বলো রাজনের মা ? ”

” ভাইতো ঠিকই বলছে। আসল হইলো বিয়ার খরচ পাতি। দেনা পাওনা সব ঠিক থাকলে এই বিয়া হতে আর কোন বাঁধায় থাকবে না। তাদের ডিমান্ড অবশ্য বেশি না। এই ধরো মেয়েকে একটু সোনা গয়না দিয়া সাজায়ে দিলা আর মেয়ে জামাই থাকবো তাই ঘরটাতে একটু ফার্ণিচারের ব্যবস্থা করে দিলা। আজকাল তো সবাই না চাইতেই এটা করে দেয়। ছেলে অবশ্য ভালো , তার নগদ টাকাপয়সার কোন ডিমান্ড নাই। রাজনের বাপে ভালো করে আলাদা ভাবে ছেলের সাথে কথা বলেছে। অবশ্য ছেলের বোন দেনা পাওনা নিয়া এট্টু ইটুস পিটুস করছিলো ! পরে বাড়ির লোক এক ঝাড়ি দিতেই থেমে গেছে । এখন বুবু সবকিছুই নির্ভর করছে তোমাদের উপর। ভাই অফিস থেকে আসলে কথা বলে দেখো কি বলে ? আমি তাহলে এখন যাই বু , কাইল সকালে আরও একবার আমি আসবো। তোমার কাছে সব শুনে তারা ভালো মনে করলেই শুক্রবারে দেখতে আসবে। ”
কথাটা বলেই শেফালী বিছানা থেকে উঠে যাওয়ার উদ্দ্যোগ করতেই আয়েশা বেগম বলে উঠলেন,
”এক্কেবারে খালি মুখে যাচ্ছো যে বু , অন্তত একটু পান মুখে দিয়ে যাও।”

” না বু , আজ আর কিছু খাবো না। যাই , ওইদিকে আবার বেলা চলে যাচ্ছে ; রান্নাবান্নার ব্যবস্থা করি গিয়ে। ”
কথাটা বলেই শেফালী ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।

দুপুরে রান্না শেষ হতেই রেবেকা গোসল করে নামাজটা পড়ে নিয়ে বাইরে যাওয়ার জন্য একটা শাড়ি পরলো। চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে মায়ের মাথায় একটা হাত রেখে নরম গলায় বললো, ” এখন কেমন লাগছে মা? আগের তুলনায় কি একটু ভালো বোধ করছো ? না আরও খারাপ লাগছে? ”

আয়েশা বেগম একটু স্মিত হেসে বললেন, ” না রে মা , তুই মাথায় তেল দেয়ার পর থেকে অনেক ভালো বোধ করছি। তা কোথায় যাচ্ছিস? রিমিকে আনতে?”

” হ্যাঁ মা , ইদানিং পাড়ার কয়েকটা বখাটে ছেলে প্রায় শুনি ডিস্টার্ব করে ! তাই ছুটির পর একলা আসতে নিষেধ করেছি। দেখি আমি যাই , স্কুলে ছুটির সময় হয়ে আসলো। রান্না সব কমপ্লিট করে রাখলাম। তুমি বরং উঠে গোসলটা করে ফেলো , দেখবে ভালো লাগবে। তারপর নামাজটা পড়তে পড়তে দেখবে আমি রিমিকে নিয়ে চলে এসেছি। বাইরের গেটটা চাপিয়ে দিয়ে যাচ্ছি! তুমি বরং উঠে গেটটা লাগিয়ে দিও , তানাহলে রাস্তার কুকুর বিড়াল আবার ঢুকে পড়বে। ”

” হাতে সময় থাকলে একটু বসে যা , তোর সাথে একটু কথা আছে। ”

মায়ের কথা শেষ হতেই রেবেকা দেয়াল ঘড়িটার দিকে চট করে একবার চোখ বুলিয়ে বললো, ” কি বলবে বলো? ”

” বলবো আর কি, ওই একই প্যাচাল! রমজানের বৌ তোর একটা সম্মন্ধ নিয়ে এসেছে। ছেলে সিটি কর্পোরেশনে চাকরি করে। তাদের সাহেব বাজারে একটা মুদির দোকান আছে। আজ শেফালীর মুখে শুনলাম কবে নাকি রাস্তায় তারা তোকে একনজর দেখেওছে। সামনের শুক্রবার বিকেলে তারা তোকে দেখতে আসবে। তাই কথাটা তোকে জানিয়ে রাখলাম। তুই কি বলিস মা ? ”

তাকে দেখে যে কেউ পছন্দ করবে এটাই তার মাথায় কোনদিন আসেনি। তাই আজ মায়ের মুখে হঠাৎ করে কথাটা শুনে বুকের ভিতরটা কেমন যেনো করে উঠলো। কি এক শিহরণ খেলে গেলো গোটা শরীরে! কোথা থেকে যেনো একগাদা লজ্জা এসে ভর করলো মনে। তাই কিছুটা থতমত খেয়ে বলে উঠলো, ” আমি আবার কি বলবো! তোমরা যা ভালো মনে করবে তাই হবে! আমি তাহলে এখন আসি মা। রিমির স্কুলের ছুটির সময় হয়ে আসলো। ”
কথাটা বলেই রেবেকা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে হাফ ছেড়ে বাঁচলো।

স্কুল ছুটির পর রিমিকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসার উপক্রম করতেই রিমি ইশারায় রেবেকাকে দেখিয়ে বলে উঠলো, ” বুবু দেখো , পিছনে একটা লোক সেই স্কুলের গেট থেকে তোমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। এখন আবার আমাদের পিছু পিছু একটা বাইসাইকেল ঠেলে হেঁটে আসছে। ”

রেবেকা কপট রাগী চোখে রিমির দিকে তাকিয়ে বললো, ” তুই এতসব দেখে বেড়াস কেনো? এইজন্য তো তোর এই অবস্থা। এইসব বখাটেদের দেখিস বলেই ছোড়াগুলো তোর পিছু লেগে বেড়ায়। খবরদার ওদের দিকে মোটেও তাকাবি না। সোজা মাথা নিচু করে হেঁটে বাসায় ফিরবি। বুঝেছিস আমি কি বললাম? ”

” আহ বুবু , কিছু না বুঝেই তুমি সারাক্ষণ আমাকে বকা দাও। ওই লোকটাতো তোমার দিকেই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমার একবারও লোকটাকে খারাপ লোক মনে হয়নি। তুমিই নাহয় একবার তাকিয়ে দেখো! ” কথাটা বলে রিমি হি ! হি ! করে হেসে উঠতেই রেবেকা তার মাথায় হাত দিয়ে মৃদু একটা গাট্টি দিয়ে সলাজ হেসে আড় চোখে পিছু চাইতেই লোকটা হাসিমুখে তাকে হাত তুলে ইশারা করতেই রেবেকার সমস্ত শরীরটাতে কিসের যেনো এক শীতল স্রোত বয়ে গেলো। দুই পায়ে কিছুতেই আর সামনে এগিয়ে যাওয়ার মতো শক্তি পাচ্ছে না। মনে হচ্ছে কে যেনো তার পা দুটো শক্ত করে মাটির সাথে গেঁথে রেখেছে। তার এই বিশ বছরে বয়ে চলা ভরা যৌবনে কেউ কোনদিন তার পথরোধ করে কিছু বলতে চায়নি। উপায়ন্তর না দেখে রিমিকে একমাত্র অবলম্বন ভেবে তার একটা হাত খপ করে ধরে দাঁড়িয়ে থাকলো।

লোকটা কাছে এসে তার দিকে মিষ্টি করে হেসে বললো, ” আপনার নাম রেবেকা, তাই না ? আমাকে আপনি অবশ্য চিনবেন না, আমার নাম ফয়সাল, সিটি কর্পোরেশনে চাকরি করি। আগামী শুক্রবার আপনাদের বাড়িতে মাকে নিয়ে আসতে চাচ্ছি। বাড়িতে হয়তো কিছু শুনে থাকতে পারেন। বাড়িতে অতো লোকজনের মধ্যে ঠিকমতো তো কথা বলতে পারবো না তাই অফিসের টিফিনের ফাঁকে আপনার সাথে দেখা করতে আসলাম। আপনি আবার কিছু মনে করলেন নাতো? ”

আকষ্মিক এধরণের পরিস্থিতিতে পড়ে রেবেকা বুঝে উঠতে পারলো না সে কি বলবে ? কথা বলতে গিয়ে দেখলো গলা শুকিয়ে একেবারে কাঠ হয়ে গেছে। তাই কোনরকমে বলে উঠলো , ” কি জানতে চান বলুন ? ”

ফয়সাল আবারও একটু মিষ্টি হেসে বললো, ” এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বললে মানুষ কি ভাববে বলুন। এরচেয়ে বরং চলুন না কোন রেস্টুরেন্টে বসে চা খেতে খেতে নাহয় কথা বলা যাবে ! ”

ফয়সালের মিষ্টি মাখানো কথাগুলো কানে যেতেই গভীর আবেশে মুহূর্তে রেবেকার চোখে পানি চলে আসলো। সারাজীবনে কেউ তাকে একটিবারের জন্যও এভাবে মিষ্টি করে কথা বলাতো দূরের ব্যাপার তার নামটাও পর্যন্ত জানতে চায়নি। সাথে সাথে তার হাতের তালু দুটোও ঘেমে উঠলো। খানিকটা থতমত খেয়ে কথা বলতে গিয়েই দেখলো কথাগুলো মুখের মধ্যে কেমন যেনো জড়িয়ে আসতে চাচ্ছে। একটু কেশে গলা পরিষ্কার করে রেবেকা মাটির দিকে তাকিয়ে বললো, ” বাড়িতে মা একাই আছে। তাছাড়া মা খুব অসুস্থ। প্রেসারটা বেড়েছে। রিমিকে নিয়ে সময় মতো বাড়িতে না ফিরলে মা আবার চিন্তা করবেন। ” কথাগুলো শেষ করেও সে দাঁড়িয়ে রইলো। এদিকে রিমি ফয়সাল ও রেবেকার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতে লাগলো। ব্যাপারটা সে খুব উপভোগ করছে। এই বয়ঃসন্ধিকালে এসে সে অনেক কিছুই এখন বুঝতে পারে। সেও মনেপ্রাণে চাইছে লোকটার সাথে বুবু যেনো অনেকক্ষণ ধরে গল্প করে। একটু দেরী করে গেলে মা আর কিইবা বলবে। একটু বকবে এই যা। এইরকম বকা সেতো রোজই কয়েকবার করে খায়। এ আর নতুন কি।

ফয়সাল বেশ আগ্রহ নিয়ে বললো, ” তাহলে একটা কাজ করা যাক, আজ বিকেলে আপনার বোনকে সাথে করে নাহয় নদীর পাড়ে আসেন। সেখানেই নাহয় কথা বলা যাবে। এতে কি আপনার কোন আপত্তি আছে? প্রয়োজন মনে করলে আপনার বাড়িতেও বলে আসতে পারেন। আজকাল অনেকেই তো বাইরে নিজেরাই কথা বলে নেয়। এতে নিশ্চয়ই আপনার আপত্তি থাকার কথা নয়। ”

” তাহলে বাসায় গিয়ে মাকে বলে দেখি। আমরা তাহলে এখন যাই ! ” কথাটা বলে রেবেকা আর একমুহূর্তও দাঁড়ালো না। রিমির হাতটা ধরে সোজা হাঁটতে লাগলো। পিছন থেকে ফয়সাল একটু উঁচু গলায় বলে উঠলো,
” আমি বিকেল পাঁচটা থেকে নদীর ধারে বড় কুঠির পাশে অপেক্ষা করবো। ” কথাটা বলেই ফয়সাল বাইসাইকেলে চেপে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।

(চলবে)

-ফিরোজ চৌধুরী