গোধূলিবেলায় ( ৭ম পর্ব )

অফিস থেকে বের হয়ে রশীদ সাহেব উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে হাঁটতে নদীর পাড়ে গিয়ে উপস্থিত হলো। শুকনো একটা বোল্ডার পাথর দেখতে পেয়ে তার উপর বসে পকেট থেকে বানানো এক খিলি পান বের করে মুখে পুরে চিবুতে চিবুতে রেবেকার বিয়ের কথা ভাবতে লাগলো। গতকাল রাতে খাওয়া দাওয়া করে শুতে যাওয়ার সময় রেবেকার মা তাকে বলেছিল, ওই ছেলেটা রেবেকাকে দেখতে রিমির স্কুলে গিয়েছিল। কিন্তু স্কুলে মানুষজন থাকায় ঠিকমতো তারা কথা বলতে পারেনি দেখে বিকেলে মেয়েকে নদীর পাড়ে আসতে বলেছিল। নদীর পাড়ে ফয়সাল ও রেবেকার মধ্যে যা কিছু কথা হয়েছে রিমি বাড়িতে এসে সব খুলে বলেছে। রিমির সব কথা শুনে ছেলেটাকে তার ভালোই মনে হয়েছে। রশীদ সাহেবের বড় কিছু চাওয়া নেই। তিনি শুধু মনেপ্রাণে চান মেয়েটা তার সুখে থাকুক। জামাই তাকে ভালোবাসুক এই তার প্রত্যাশা। অবশ্য মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেলে মনে মনে সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়বেন , এই যা কষ্ট। রেবেকার মার মুখে ফয়সালের কথা শুনে বুঝতে পেরেছেন যৌতুকের ব্যাপারে ছেলেটার কোন লোভ নেই। এখন দেখার বিষয় তার বাড়ির লোকজন কি বলে! তাদের যদি কোন ডিমান্ড নাও থাকে তবুও বিয়ের খরচাপাতি ও খাওয়া দাওয়া মিলে অনেক টাকার ব্যাপার। বুঝতে পারছে না এতগুলো টাকা সে কোথায় পাবে? কিভাবে জোগাড় করবে? আজ দুপুরে ম্যানেজারের কথা শুনে সে আরও মুষড়ে পড়েছে! কোন কিছুই তার আর ভালো লাগছে না। আগামী শুক্রবারে ছেলে পক্ষ যদি রাজি থাকে তাহলে তিনি কি যে উত্তর দিবেন তা শত চিন্তা করেও ভেবে পাচ্ছেন না। এভাবে চিন্তা করতে করতে একসময় নিজের মনেই বলে উঠলেন, ” নাহ এভাবে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না, কিছু একটা করতে হবে। সবকিছু শুনে যা মনে হচ্ছে এতো ভালো একটা সম্বন্ধ হাত ছাড়া করা ঠিক হবে না। যেভাবেই হোক রেবেকার বিয়ে তিনি দিয়েই ছাড়বেন। দরকার হলে পৈত্রিক ভিটেমাটিটা কারও কাছে বন্ধক দিয়ে হলেও তিনি রেবেকার বিয়ের ব্যবস্থা করবেন। তিনি সবাইকে দেখিয়ে দিতে চান মেয়ে তার কালো হলেও অতো ফেলনা নয়। এই রকম লক্ষ্মী একটা মেয়ে দ্বিতীয় কেউ দেখাক দেখি। মেয়েটাকে নিয়ে তার অনেক গর্ব , অনেক স্বপ্ন। কিছুতেই তিনি সেই স্বপ্ন বৃথা যেতে দিবেন না। ” কথাগুলো ভাবতেই তিনি মনের মধ্যে অনেকখানি জোর পেলেন। তাই আর সাত পাঁচ না ভেবে নদীর পাড় থেকে উঠে ধীরে ধীরে শান্ত মনে বাসার দিকে অগ্রসর হলেন।

রাতে ভাত খাওয়ার পর রিমি মায়ের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো, ” মা তোমার মোবাইলটা কি একটু দেয়া যাবে? ”

আয়েশা বেগম খানিকটা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ”তুই এতো রাতে মোবাইল নিয়ে কি করবি?”

” না মানে , আজ সকালে স্কুল যাওয়ার পথে ফয়সাল ভাইয়ার সাথে আমার দেখা হয়েছিলো। তিনি তার মোবাইলের নম্বরটা আমার হাতে দিয়ে বললো আজ রাতে শুতে যাওয়ার সময় নাকি বুবুর সাথে কথা বলবে। দাও না মোবাইলটা! বুবু এখনও ব্যাপারটা জানে না। তাকে একটা সারপ্রাইজ দিয়ে আসি! ” শেষের দিকে বেশ আব্দারের সাথেই রিমি কথাগুলো বললো।

রিমির কথা শুনে মিসেস আয়েশা বেগম তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বললেন, ” যা ভাগ এখান থেকে! বিয়ের কথাবার্তা এখনও কিছু ঠিক হয়নি! পরে যদি সম্বন্ধটা ভেঙ্গে যায় তখন কি হবে ? বিয়ের কথাবার্তা ঠিক হলে নাহয় একটা কথা ছিলো। পরে যদি না হয় তখন মেয়েটা আমার কষ্ট পাবে না ? যা এখান থেকে! এতো রাতে কোন কথা বলতে হবে না। ”
মায়ের অগ্নি মূর্তি দেখে রিমি আর কথা বাড়ালো না। গুটিগুটি পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।

রাতে শুতে যেতেই মোবাইলটা একবার বেজে উঠে থেমে গেলো। আয়েশা বেগম অপরিচিত নম্বর দেখে মোবাইল ফোনটা টেবিলের উপর রেখে দিতেই পিছন থেকে রশীদ সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, ” এতো রাত্রে কে আবার মিস কল দিলো? ”
আয়েশা বেগম মাথা নেড়ে উত্তর দিলো, ” বলতে পারবো না, নম্বরটা অপরিচিত। কেউ হয়তো ভুল করে দিয়েছিলো। ”
কথাটা বলেই ঘরের লাইটটা নিভিয়ে দিয়ে তিনি বিছানার কাছে আসতেই পিছন থেকে ফোনটা আবারও বেজে উঠলো। আয়েশা বেগম তাড়াতাড়ি করে টেবিলের কাছে গিয়ে কলটা রিসিভ করে ”হ্যালো, কে বলছেন? ” জিজ্ঞাসা করতেই ওপর প্রান্ত থেকে কে যেনো কোন কথা না বলে একটু চুপচাপ থেকে কলটা কেটে দিলো।

আয়েশা বেগম রশীদ সাহেবের ভয়ে তাড়াতাড়ি করে ফোনটা নিয়ে দরজা খুলে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে রেবেকাদের ঘরের দরজায় কড়া নেড়ে মেয়েকে নাম ধরে ডাকতেই রেবেকা দরজা খুলে মায়ের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো।
আয়েশা বেগম কোনরকমে তার দিকে ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, ”তোর ফোন, দ্যাখ কে যেনো কল করেছিলো? ” কথাটা বলেই তিনি দ্রুত নিজের ঘরের দিকে অগ্রসর হলেন। পিছনে দাঁড়িয়ে অবাক দৃষ্টিতে রেবেকা মায়ের গমন পথের দিকে চেয়ে রইলো।

(চলবে)

-ফিরোজ চৌধুরী