গোরজমিন

১৯৭১ সাল,জানুয়ারী মাস। তমার বিয়েটা খুব তড়িঘড়ি করে হয়ে গেলো রাহুলের সাথে। বেশ উড়ে চলছিল দিনগুলো। তমা টের পায় একটা অস্তিত্ব বেড়ে উঠছে তারই শরীরে।
গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারতো! উত্তাল মার্চ মাস। পঁচিশের কালরাত্রিতে ভীষণ ভয় পেয়েছিল সবাই। গ্রামের সব ঘরে ঘরে কানাঘুষা। জোয়ান জোয়ান ছেলেরা মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিচ্ছে। কেমন থমথমে চারিদিক। পঁচিশ তারিখে নাকি অনেক মানুষ মারা গেছে ঢাকায়।

১৯৭১ সাল, জুন মাস।
রাহুল মুক্তিবাহিনীতে গেলো। কিসব ট্রেনিং চলছে। খবরটা আলী মাতবর জেনে গেছে। মিলিটারী ক্যাম্পে আলী মাতবর খুব যাওয়া আসা করে। গ্রামের সব খবরাখবর জানিয়ে আসে। অফিসার সাহেব আলীকে খুব পছন্দ করে।
বোম্বিং শুরু হয়েছে। ট্রেঞ্চে বাড়ীর সবাই। বিশাল তেঁতুল গাছের নীচে পেছন পুকুরের কাছে ট্রেঞ্চ কাটা। তমা চুপচাপ বসে আছে ভেতরে। কথা বলাও বারণ। কতদিন হলো রাহুলের খোঁজ খবর নেই।
শুকনো পাতার মচমচ আওয়াজে সবাই তটস্থ হয়ে যায়। তমা পেটের উপর হাত দিয়ে নতুন প্রাণের অস্তিত্ব আঁকড়ে ধরে।… তমা! তমা! ফিসফিস আওয়াজে চমকে ওঠে তমা। রাহুল এসেছে। ট্রেঞ্চের ভেতরে আসে রাহুল। সারা মুখে দাঁড়ি, উস্কুখুস্কু চেহারা। হাতে রাইফেল। … তোমাকে একবার দেখতে এসেছি তমা। আমার অনাগত সন্তানকে একটু ছুঁয়ে দিতে এসেছি। খুব বড় অপারেশন হবে। মেয়ে হলে নাম রেখো মুক্তি আর ছেলে হলে বিজয়। তমা চেপে ধরে রাহুলকে… অজানা আশংকায় বুকে পাহাড়। … যেও না রাহুল। আমার খুব ভয় করে। রাহুল হাসে। পাগলী আমার। এখন তো ঘরে থাকার সময় নয়। রাহুলের বুক থেকে দীর্ঘ একটা শ্বাস ঘন হয়ে বের হয়।

জুলাই মাস….
আলী মাতবর পান চিবোতে চিবোতে জানতে চায় রাহুল কই। রাহুলের বাবা অসহায় হয়ে বলে…. জানি না আমি, জানি না। আলীর চোখে কি জানি খেলে যায়! … সাহেবকে বলি। রাহুলের খবর এমনি বের হবে তখন। দোগাছি ইউনিয়নের নদীর পাশে সারি বেঁধে চোখ বাঁধা মানুষ। রাহুলের বন্ধু অনিকেতকে কলেমা শিখানো শেষ। অনিকেতের মাথায় টুপি, দাঁড়ি। মিলিটারি এক এক করে অনিকেতের সামনে আসে। কলেমা শুনেই ক্ষান্ত হয় না। লুঙ্গী খোলে মুসলমান প্রমান জানার জন্য। তারপর ব্রাশ ফায়ার। রাহুলকে ধরতে পেরেছে এই আনন্দে আজ পার্টি হবে। লাশগুলো পানিতে ফেলে দিয়ে গাড়ীতে উঠে বসে তারা। উদ্দেশ্য ক্যাম্প আর পার্টি। আলীকে বলা আছে,আজ সুন্দর মুরগী চাই।

তমার পেটটা আজকাল বোঝা যায়। বিকেলে শুকনো কাপড় উঠোন থেকে তুলে ঘরে আসে তমা। বাড়ীর বৈঠকখানায় অনেক লোকের শোরগোল। তমা বুঝতে চায় ব্যাপারটা। এমন সময় দরজায় জোড়ে কেউ আঘাত করে। নীচ দিয়ে বুট দেখা যায়। না যেয়ে উপায় নাই। আলী মাতবর কথাটা বলে। তমা পেটটা চেপে ধরে। অফিসার এতদিন এমন মুরগী পায়নি। পেটওয়ালা মুরগীর স্বাদ নিতে উদগ্রীব হয়ে ওঠে। আলী বেটা বেশ রসিক। সারারাত চলে মদ আর মাতলামি। তমার পেটটা খুলে তাকিয়ে থাকে অফিসার। শালা বাঙালীর বাচ্চা…..
বাঙালীর বাচ্চা মরুক! তমা বাঁচাতে পারেনি নিজেকে, বাঁচাতে পারেনি মুক্তি বা বিজয়কে।

সেপ্টেম্বর মাস….
তমা পালিয়ে বেঁচেছিল সেদিন। মৃতপ্রায় একটা মেয়েকে কোনো এক অচেনা মানুষ হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। সেই অপরাধে তার বাড়ীঘর একরাতে দাউাদাউ জ্বলেছিল।
কুষ্টিয়ার মুক্তিফৌজ বাহার সেদিন তমাকে নিয়ে এসেছিল। তমার রক্তে তখন প্রতিশোধ। ছেলের পোশাকে অস্ত্র হাতে তমা। সবাই তমাল নামে চেনে তাকে।

ডিসেম্বর মাস…
স্বাধীন বাংলার পতাকা হাতে তমাল। পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে।
তমা ফিরে আসে গ্রামে,বাড়ীতে।
রাহুল,মুক্তি অথবা বিজয়…. কেউ যদি কোনোদিন আসে ফিরে! তমা অপেক্ষায় থাকে।
স্বাধীনতা এতটা দাম দিয়ে পেয়েছে তমা… বীরাঙ্গনা তমা একমুঠ মাটি তুলে নেয় হাতে। এতবড় বাংলাদেশে একমুঠ মাটি ছিটিয়ে দেয়…
রাহুল,মুক্তি অথবা বিজয়ের কবর তো এই দেশে,এই মাটিতে! পুরো বাংলাদেশকে তার কবর মনে হয়! হয়তো রাহুল,মুক্তি বা বিজয়ের….গোরজমিনে দাঁড়িয়ে লাল সবুজ পতাকাটা উড়ছে,দেখে তমা।

-ফারহানা নীলা

ছবি কৃতজ্ঞতা– সাখাওয়াত তমাল