ছিন্ন (সাহসী মেয়ের গল্প)

সেদিন আমার শরীরটা ভাল লাগছিল না।

সকাল থেকেই খুব দুর্বল লাগছিল। মনটাও খারাপ ছিল। শরীর খারাপের সাথে মন খারাপের নিশ্চয়ই কোন যোগসূত্র আছে। পিরিয়ড শুরু হলে মেয়েদের এক ধরনের মুড সুইং হয়, অবসাদ দেখা দেয়—ব্যাপারটা সে রকমও হতে পারে। তেমন কোনো কারণ ছাড়াই মন থাকে খারাপ।

আমি আমার দশ মাস বয়সী ছেলেকে নিয়ে শুয়ে ছিলাম। আমার স্বামী বেডরুমে এসে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল বাচ্চাটার মুখের দিকে। সে নিশ্চিত হতে চায় বাচ্চাটা ঘুমিয়ে পরেছে কিনা। নিশ্চিত হতেই সে আমার হাত ধরে একটা টান দিয়ে বলল, ‘এসো।’

আমি জানি এই টানের অর্থ কি। যখন তখন তার ইচ্ছে হলেই এমন হাত ধরে সে টানাটানি করে। আমার ইচ্ছা অনিচ্ছার ধার সে কখনোই ধারে না। তার ইচ্ছেটাই আসল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার ইচ্ছেতেই সায় দিতে হয়। সে তার কাজ সেরে নেমে যায়, আমি পাথরের মত শক্ত হয়ে পড়ে থাকি। তাকে না করেও কোনো লাভ হয় না। তবুও আমি বললাম, ‘আজকে না।’

‘কেন? সমস্যা কি?’ বিরক্ত হয়ে সে জানতে চাইল।

‘শরীরটা ভালো লাগছে না।’

‘কি হয়েছে?’

‘কিছু হয়নি। এমনিই। ইচ্ছে করছে না।’

‘ইচ্ছে করবে না কেন? ইচ্ছে না করার কি আছে?’

‘আশ্চর্য, সব সময় কি সব কিছু ভালো লাগে?’

‘তোমার না লাগুক। আমার লাগে। আমার চাই এবং এক্ষুনি।’ বলেই আমার দিকে অদ্ভুত চোখে একবার তাকাল।

আমি কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে বললাম, ‘বাচ্চাটা মাত্র ঘুমালো।’ বলেই আমি বিছানা ছেড়ে উঠে পরলাম।

‘এখনি ভাল সময়। ওর ঘুম ভেঙ্গে গেলে তো তুমি আবার একটা অজুহাত বের করবে।’

‘থাকনা বাদ দাও আজকে।’

‘তুমি কিন্তু আমার মেজাজ খারাপ করে দিচ্ছ।’

‘একবার তো বলেছি না।’

‘বাট, আমি বলেছি হ্যাঁ। আর আমার হ্যাঁ মানেই হ্যাঁ—সেটা তুমি ভালো করেই জানো।’

আমি কিছু না বলে চুপ করে রইলাম। সে আবার বলল, ‘ইউ আর বাউন্ড টু লিসেন টু মি এন্ড ফুলফিল মাই ডিজায়ার—এনিটাইম আই ওয়ান্ট।’

‘নো আই’ম নট। নট অলয়েজ!’ বলেই আমি রুম থেকে বের হয়ে গেলাম।

‘হোয়াট ডিড ইউ সে?’ বলেই সে বের হয়ে এলো আমার পিছে পিছে।

‘ইউ হার্ট মি!’ আমি ঘুরে দাঁড়িয়ে বললাম।

‘লিসেন, আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু ফোর্স, বাট…’

‘তুমি জোড় খাটাতে চাও?’

‘প্রয়োজন হলে তাই করব। সে অধিকার আমার আছে।’

‘জোড় খাটানোর অধিকার আছে?’

‘হ্যাঁ আছে।’

এভাবে আরো কিছুক্ষণ কথা কাটাকাটির পর এক পর্যায়ে আমি শান্ত স্বরে বললাম, ‘আমার পিরিয়ড হয়েছে।’

‘লায়ার!’ বলেই সঙ্গে সঙ্গে আমার মুখের উপর এক দলা থুথু ছিটিয়ে দিল সে।

এবার সত্যি সত্যি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম আমি। লজ্জায় আর অপমানে আমার চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে এলো। আমি শুধু বললাম, ‘ছিঃ।’

এবং সেটাই ছিল আমার শেষ কথা। এর পর আমি আর কোনো কথা বলার সুযোগ পাইনি। তার আগেই সে সজোরে একটা চড় বসিয়ে দিল আমার গালে।

আমি অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। অপমানে আমার চোখের প্রতিটা শিরা উপশিরা থেকে ঠিকরে পড়ল ঘৃণা। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে তার রাগ যেন আরও বেড়ে গেল। সে অগ্নিমূর্তি ধারণ করল এবং শুরু করল অকথ্য ভাষায় গালাগাল। তারপর এগিয়ে এলো সামনে। আমি জানি সে এবার কি করবে। আমি শিউরে উঠলাম ভয়ে। আমার শরীর তখন থরথর করে কাঁপছে।

আমি বরফের মত জমে শক্ত হয়ে দাড়িয়ে রইলাম। কিছুতেই পা দুটোকে নাড়াতে পারলাম না। সে এগিয়ে এলো হাত বাড়িয়ে। হঠাৎ আমার কি হলো জানিনা–আমার চুলের মুঠি ধরার আগেই আমি তার হাত ফসকে বেরিয়ে গেলাম। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারলাম। সে আমাকে জাপটে ধরে ধাক্কা মেরে ফেল দিল মেঝেতে। তারপর আমার চুলের মুঠি ধরে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল দরজার কাছে।

বাচ্চাটার ঘুম ভেঙ্গে যাবে সেই ভয়ে আমি কোনো রকম শব্দ না করে পড়ে রইলাম। সে আমার বুকে চেপে বসল এবং তার শক্ত হাত দুটো দিয়ে আমার গলা পেঁচিয়ে ধরল। আমি বুঝতে পারলাম কি ঘটতে যাচ্ছে। আমি তাকালাম তার চোখের দিকে। দেখলাম একটা মানুষ—যে কিনা আমার গর্ভজাত সন্তানের পিতা—সে খুনের দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে আমার চোখের দিকে।

তার হাতের চাপ ক্রমশই বাড়ছে। আমি দম আটকিয়ে পড়ে আছি। অনুভব করছি—আমার চোখের সামনে থেকে আলো সরে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসছে আমার জগত। চিৎকার করার মত কোনো শক্তি অবশিষ্ট নেই। আমার সমস্ত পেশী-ইন্দ্রিয় নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে আমি কোন গভীর সমুদ্রে তলিয়ে যাচ্ছি। প্রাণপণে চেষ্টা করছি উপরে উঠে এক বুক নিঃশ্বাস নিতে—কিন্তু পারছি না।

হঠাৎ সমস্ত অন্ধকার ফুঁড়ে আমার ছেলেটার মুখ ভেসে উঠল। আমি কিছুক্ষণ দেখলাম—সে আমার জন্যে বিষাদে কাঁদছে। অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে তার কান্নার শব্দ। আমি তার কান্না শুনতে পাচ্ছি—যদিও স্পষ্ট নয়। আমার শুধু একবার মনে হলো, আহা! আমার বাচ্চাটা। আমি মরে গেলে ও কার কাছে বড় হবে?

আর তখনই যেন কোনো দেবদূতের আগমন ঘটল—না কি হলো জানিনা, আমি অনুভব করলাম—আমার গলায় শক্ত হয়ে চেপে থাকা আঙ্গুল গুলো যেন ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে যাচ্ছে। গলার উপর থেকে পেঁচিয়ে থাকা হাত দুটো একটু একটু করে সরে গেল। বুকের উপর বসে থাকা ভার তখনও আছে। আমি ভয়ে ভয়ে চোখ মেলে তাকালাম–দেখলাম এক জোড়া নির্লিপ্ত চোখ শুন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি আবার চোখ বন্ধ করলাম—এবং তখনই আমার বুকের উপর থেকে মস্ত বড় একটা ওজনদার বস্তু নেমে গেল। আমি নিঃসাড় পড়ে রইলাম। কিছুক্ষণ পর শুনতে পেলাম সদর দরজা খোলার শব্দ। বুঝলাম সে চলে গেল বাইরে।

আমি ধীরে ধীরে উঠে বসলাম। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলাম। আর তখনই আমার ছেলের কান্নার শব্দ ভেসে এলো আমার কানে। সে চিৎকার করে কাঁদছে। ছেলেটা যে অনেকক্ষণ ধরেই কাঁদছে সেটা তার কান্নার শব্দ শুনলে কারোই বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়। এবং আমিও বুঝতে পারলাম–ওর কান্নার কারণেই আজ আমি আমার জীবন ফিরে পেয়েছি। ওর কান্নার শব্দই ঐ পাষণ্ড লোকটাকে বিচলিত করেছে—একটু হলেও। সে হঠাৎ তার সম্বিত ফিরে পেয়েছে–তার হাত শিথিল হয়েছে–নেমে গেছে আমার বুক থেকে। কৃতজ্ঞতায় আমার চোখ দিয়ে ছুটল অঝোর ধারা।

আমি দৌড়ে গিয়ে বুকে তুলে নিলাম আমার সোনা মানিককে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম দ্রুত—আমাকে পালাতে হবে। এখুনি এই মুহূর্তে।

জৈবিক কামনা নিবৃত্ত করতে না পেরে যে স্বামী তার স্ত্রীর গায়ে হাত তুলতে পারে—সে এই কাজ আরো করবে, এতে কোনো ভুল নেই। একজন মানুষের পক্ষে অন্য আরেকজন মানুষের সব ইচ্ছা সব সময় পূরণ করা সম্ভব নয়। এটুকু বিবেক বোধ যার নেই—তার সঙ্গে আর এক মুহূর্ত থাকা নয়।

স্ত্রীর প্রতি যে স্বামীর বিন্দু মাত্র সহানুভূতি নেই। যে তার ঔরসজাত সন্তানের মায়ের প্রতি সম্মান দেখাতে জানে না—তার সঙ্গে আর একদিনও নয়। এমন তো নয় যে আমি দিনের পর দিন অসুস্থ হয়ে পড়ে আছি–তার চাহিদা মেটাতে পারছি না। একদিন কি কারো খারাপ লাগতে পারে না? স্বামী-স্ত্রীর মিলন একটা পবিত্র ব্যাপার। ভালোবাসা-ভালোলাগার ব্যাপার। আনন্দের ব্যাপার। এখানে একজনের ইচ্ছা না হলে তার সঙ্গে জোড় পুর্বক সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে? একটা দিন কি নিজেকে নিবৃত্ত করা যায় না?

আমার অবচেতন মন সব সময় আমাকে সতর্ক করেছে–এমন একটা দিন হয়ত আসবে যে আমাকে সব কিছু ছিন্ন করে চলে যেতে হবে। এটা ঠিক আমরা সব সময় সচেতন মনের দ্বারা চালিত হই—সচেতন মন আমাদের সব কাজকে মনিটরিং করে যাতে কোন ভুল না হয়। কিন্তু সবথেকে শক্তিশালী হচ্ছে অবচেতন মন। সচরাচর এর কাজ আমরা অনুভব করতে পারি না। কিন্তু আমরা যা করছি, যা কিছু দেখছি, যা কিছু বোঝার বা শেখার চেষ্টা করছি—এর সব কিছুই চালনা করে আমাদের অবচেতন মন।

ছেলেটাকে কোলে নিয়েই দ্রুত গুছিয়ে নিলাম আমার অতি প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস পত্র। ছোট্ট একটা ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছিলাম অনেক আগে থেকেই। তাতে আমার পাসপোর্ট, গ্রীনকার্ড, ছেলের বার্থ সার্টিফিকেট, একটা ছোট্ট নোটবুক, যেখানে আমার প্রতিটা ঘটনার বর্ণনা–কখন, কি ঘটেছে, আমার সঙ্গে কি করেছে—সব লিখে রেখেছি। ব্যাগের মধ্যে বেশ কিছু ডলারও রাখা আছে। কাজেই আমি আর কালক্ষেপণ না করে পিছনের দরজা খুলে বের হয়ে গেলাম এক কাপড়ে।

নির্জন অন্ধকার গলি দিয়ে পাগলের মত হাঁটছি আর ভাবছি—রাতটা কোনো রকমে কোথাও কাঁটিয়ে দিতে পারলেই হয়। কাল সকালে ঠাণ্ডা মাথায় সব ব্যবস্থা করা যাবে। এই শহরে আমার পরিচিত অনেকেই আছে, কিন্তু আমি এখানকার কারো সাহায্য নিতে চাই না। সাহায্যের হাত হয়ত বাড়িয়ে দেবে অনেকেই কিন্ত এক কান-দু’কান করে সে খবর পৌঁছে যাবে আমার স্বামীর কাছে। তারপর এক কথা দু’কথা, আলোচনা, সালিশ, পরামর্শ শেষে ফিরে যেতে হবে সেখানেই।

অবশ্য ৯১১ এ ফোন করলেই পুলিশ এসে আমাকে তাদের গাড়িতে উঠিয়ে আমি যেখানে যেতে চাই সেখানে পৌঁছে দিত। আমার নিজের কোনো আত্মীয় বা পরিচিত কেউ না থাকলে তারা আমাকে নিয়ে যেত কোনো শেল্টার হোমে। চাইলে আমি তাকে অ্যারেষ্ট করাতেও পারতাম। কিন্তু ওসব কোনো কিছুর মধ্যেই আমি গেলাম না।

কিছুক্ষণের মধ্যেই নির্জন গলির রাস্তা ছেড়ে বড় রাস্তায় চলে এলাম আমি। রাত তখনো গভীর হয়নি। রাস্তায় গাড়ি চলাচল করছে—মানুষজনও আছে। আমি চার রাস্তার সংযোগ স্থলের একটা ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে গিয়ে দাড়ালাম এবং মুহূর্তের মধ্যে একটা ট্যাক্সিক্যাব পেয়ে গেলাম। ড্রাইভারকে বললাম, ‘প্লিজ টেক মি টু এ হোটেল অর মোটেল ক্লোজ টু দ্য এয়ারপোর্ট।’

বুদ্ধিমান ড্রাইভার যা বোঝার বুঝে নিল—গাড়িতে উঠা মাত্রই সে আমাকে নিয়ে ছুটে চলল। কয়েকবার রিয়ার ভিউ মিররে তাকিয়ে আমাকে দেখল সে। তারপর হাইওয়েতে উঠে সে মধ্যপ্রাচ্যীয় এক্সেন্টে জিজ্ঞেস করল, ‘ডু ইউ নিড এনি হেল্প? শুড আই কল দ্য পোলিছ?’

আমি বললাম, ‘নো। নো নিড। জাষ্ট টেক মি টু এ হোটেল।’

‘ইয়েস ম্যাম। অন আওয়ার ওয়ে।’

‘থ্যাঙ্কস।’

ট্যাক্সিতে উঠেই আমি ফোনের লোকেশন ট্রাকিং বন্ধ করে দিলাম। আমি কোথায় যাচ্ছি–কোথায় আছি সেটা কেউ জানুক আমি চাই না। ৩০ মিনিটের মধ্যেই ক্যাব ড্রাইভার আমাকে নিরাপদে এয়ারপোর্টের কাছে একটা হোটেলে পৌঁছে দিল।

হোটেলে চেক-ইন করেই আমি ফোন করলাম আমার সবচেয়ে কাছের বান্ধবীকে। সে থাকে অন্য একটা স্টেটের বড় একটা শহরে। ফোন ধরতেই প্রাথমিক দু‘একটি কথা শেষ করেই আমি বললাম, ‘কাল সকালেই তোর ওখানে আসছি। এসে সব বলবো। এই মুহুর্তে তুই কি আমাকে একটা হেল্প করতে পারবি?’

সে আমার কণ্ঠ শুনে কি বুঝল সেই জানে, তবে অন্য কোনো প্রশ্ন না করেই বলল, ‘বল, কি করতে হবে?’

‘আমাকে সকালের যে কোনো ফ্লাইটের একটা টিকেট কেটে দিতে পারবি?’

সে হেসে দিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ পারব! এক্ষুনি দিচ্ছি।’

‘কাটা হলে রিজার্ভেশন কোডটা টেক্সট করে দিস।’

‘আচ্ছা।’ একটু থেমে সে জানতে চাইল, ‘তুই এখন কোথায় আছিস?’

আমি সে কথার কোনো উত্তর না দিয়ে বললাম, ‘আমি নিরাপদেই আছি। তুই ভাবিস না। কাল সকালে এসে সব বলবো।’

‘আচ্ছা ঠিক আছে। তুই সাবধানে থাকিস আর সমস্যা হলে আমাকে কল করিস।’

‘ঠিক আছে।’

ফোন কেটে দিয়ে আমি মনে মনে ভাবলাম, প্রতিটা মানুষের জীবনেই এমন একজন বন্ধু থাকা খুব দরকার। যে আগ বাড়িয়ে কিছু জানতে চাইবে না—কিন্তু যখন যতটুকু দরকার, শুধু চাইলে হলো। সাহায্যের হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকবে। সংকটের সময় পাশে থাকবে, বিপদে সাহস জোগাবে—এমন অনেক কিছু। এক বন্ধু যখন হতাশায় নিমজ্জিত কিংবা সংকটে বিপর্যস্ত, তখনই সেই একজনকে খুব বেশি দরকার।

আমি খুব সকালের ফ্লাইট ধরে চলে গেলাম বান্ধবীর শহরে। কিছুদিনের জন্যে অতিথি হয়ে রইলাম তার বাড়িতে। বেশিদিন অবশ্য থাকতে হয়নি। বান্ধবী আর তার স্বামী মিলে ওদের পরিচিত কয়েকজনের কাছে নিয়ে গেল। অল্পদিনেই আমি একটা কাজ জোগাড় করে ফেললাম। শুরু হলো আমার নতুন জীবন–লাইফ এজ এ ‘সিঙ্গেল মাদার’। সেই থেকে এক বেডরুমের ছোট্ট একটা এপার্টমেন্টে আমি আমার ছেলেকে নিয়ে আছি। সুখে আছি কি-না জানি না, তবে কোনোরকম কষ্টে নেই একথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি।

তিন বছর আগে আমি আমার সুন্দর ছবির মত বাড়ি, নিজ হাতে গোছানো সংসার পেছনে ফেলে এক কাপড়ে যখন বের হয়ে এসেছিলাম—ভেবেছিলাম সেটাই ছিল আমার ‘আমেরিকার স্বপ্ন’ পূরণের শেষ দিন। আমি তখনো জানতাম না আমার ভবিষ্যত আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অন্ধকারের কথা চিন্তা করে আমি আমার নিজের অস্তিত্বকে বিকিয়ে দেইনি। নিজেকে ছোটো করিনি। সব সম্পর্ক ছিন্ন করে চলে আসাটা কোনো সহজ কাজ ছিলনা।

আমি অনেক বার ভেবেছি—আমি যা করেছি তা কি ঠিক ছিল? মানুষটাকে কি আর এক বার সুযোগ দেয়া যেত না? শত হলেও সে আমার সন্তানের বাবা। আমার ছেলেটা তার বাবার আদর ছাড়াই বড় হবে। তবুও আমি আমার সিদ্ধান্তে অনড় থেকেছি।

যে সব শিশু পারিবারিক সহিংসতা দেখে বড় হয়, তাদের মানসিক অবস্থাও প্রভাবান্বিত হয়। তারা সহিংসতা প্রবণ হয়। দুর্বলের উপর, বিশেষ করে নারীর উপর ক্ষমতা প্রয়োগ এবং নিয়ন্ত্রনের এক অসুস্থ প্রবণতা তৈরী হয় এই সব শিশুদের মনে।

সন্তানের চোখের সামনে, বাবার হাতে মা নির্যাতিত হচ্ছে। সন্তান দেখে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করে রাখছে–যাতে দেখতে না হয় বাবার ভয়ংকর রূপ আর মায়ের ভয়ে চুপসে যাওয়া মুখ। একজন অসহায় সন্তান কিছুই করতে পারছে না তার মায়ের জন্যে! আমার সন্তানকে সেই অসহায়ত্বের যন্ত্রণা সারা জীবন কুড়ে কুড়ে খাবে—সেটা অন্তত আমি হতে দেইনি।

ঐ রাতের পর থেকে আমার গায়ে কেউ হাত তোলেনি। কারো চোখ রাঙ্গানো দেখতে হয়নি। ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেউ আমাকে কোনো কিছুর জন্যে জোড় করেনি। কেউ আমার বুকে চেপে বসেনি। কারো হাতের দশটি আঙ্গুল শক্ত করে আমার গলায় চেপে ধরেনি। কেউ আমার নিঃশ্বাসও রোধ করতে পারেনি।

আমি জানি আমার মত এমন আরো অনেক মেয়েই আছে যারা প্রতিদিন এমন নির্যাতনের স্বীকার হয়, হচ্ছে—তাদের প্রতি আমার একটাই অনুরোধ, শোনো বোনেরা–সে, তোমার স্বামী, হবু স্বামী, বন্ধু যেই হোক না কেন, যদি তোমার গায়ে একদিন একবার হাত তোলে–জেনে রেখো, সে সেই কাজটি আরো করবে, প্রায়ই করবে, কারণে অকারণে করবে। সে যদি তোমার গায়ে একবার হাত তোলে, দ্বিতীয়বার চিন্তা না করে—দৌড়াও। প্রথম সুযোগেই। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সত্যিই পালানোর কোনো বিকল্প নেই। যদি বাঁচতে চাও–পালাও।

ভুলেও ভেবো না যে সে ঠিক হয়ে যাবে। ঠিক হবে না। ঠিক হয় না। ঠিক হয় নাই। কোনোদিনও।

যেই প্রত্যাশা অবাস্তব তা করলে ঠকতে হবে নির্ঘাত।

যে সম্পর্কে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নেই সে সম্পর্ক কখনোই সুস্থ হতে পারে না। ভালোবাসা একটু কম হলেও ক্ষতি নেই কিন্তু শ্রদ্ধাবোধ থাকতেই হবে। না হলে সেই সম্পর্কের মৃত্যু ঘটবেই।

(একটি সত্যি ঘটনার অনুপ্রেরনায়…)

(ভিকটিমের প্রাইভেসীর প্রতি সম্মান জানিয়ে গল্পের সব চরিত্র এবং কোনো স্থানের উল্লেখ না করেই ঘটনার বর্ণনা করার চেষ্টা করেছি। এতে গল্পের সৌন্দর্য হানি হয়েছে কিনা জানিনা তবে গল্পটা বলা হয়েছে, এতেই স্বস্তি বোধ করছি। সবার জীবন সুন্দর হোক-আনন্দময় হোক। সবার জন্যে শুভ কামনা।)

ফরহাদ হোসেন
লেখক-নির্মাতা
ডালাস,টেক্সাস