জলকন্যা

লোকমান মিয়ার ভাতের হোটেলের, বিশালাকার ধোয়া ওঠা শেষ ভাতের হাড়িটা, মাটির গনগনে উনুন থেকে নেমেছে যখন, তখন রাত্রির প্রথম প্রহর। শেষ সময়ের এই ভাতের কাস্টমাররা হলো মেঘনা পাড়ের আড়তদার আর বেপারী, ব্যবসায়ীর দল। এরা গরম গরম সাদা ধোয়া তোলা ভাতের সাথে রুই, পাংগাস নাহলে মৌরালা মাছের লাল লাল ঝোল দিয়ে ভাত মাখিয়ে গোগ্রাসে গিলে। মেঘনা পাড়ের এই শ্যামদেউড়ির হাটে পেয়াজ রসুনের জব্বর বিকিকিনি! সারা দিন চলে এই হাত বদলের খেলা। দূর দূরান্ত থেকে লোকজন আসে পাইকারি দরে আনাজ পাতি কিনতে। তার উপর আজ ছিল হাট বার। বেপারী ব্যবসায়ীর দল সারা দিনের হিসাব নিকাশ মিলাতে ব্যস্ত। ওদিকে পেটের ক্ষিধে পেট ছাড়িয়ে বুক ডিঙ্গিয়ে গলা অবধি চলে এসেছে। তাই তাড়াহুড়া আরো বেশী,বুড়ো আংগুলে থুতু লাগিয়ে জোরসে গুনছে টাকার বান্ডিল। রাত বাড়ার সাথে সাথে হাটের কোলাহলও কমে এসেছে, দুই একটা কুকুরের হাক ডাক জোরালো হয়ে উঠছে নির্জনতার সাথে পাল্লা দিয়ে। বেপারীদের আধ ময়লা শরীর বেয়ে পেয়াজ রসুনের গন্ধ যুক্ত ঘাম ঝরছে, বাতাসে সেই একই গন্ধ জানান দিচ্ছিল আজকের হাটের গরম হাল চাল!
ইদ্রিস আলী গামছায় ঘাড় মুখের ঘাম মুছতে মুছতে জয়নাল মিয়ার ছাপড়া আড়ত থেকে বেড়িয়ে আসে। জয়নাল মিয়া ঢাকার ব্যবসায়ী, তার মতো গ্রাম গঞ্জের ছোট খাটো পিয়াজ রসুনের ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মাল কিনতে আসে। আজকের মতো বেচাবিক্রির পাট শেষ! এখন ঝাপায় পড়তে হবে লোকমান মিয়ার ভাতের হোটেলে। নদীর পাড় ধরে হাটার সময় ইদ্রিস মিয়ার চোখ আপনিতেই চলে যায় দূরে নদীর অন্ধকার বুক চিরে আসা টিমটিমে আলোতে। সেই আলো আসছে মেঘনার বুকে ভাসমান নিশি কন্যাদের ছইওয়ালা নাও থেকে। হারিকেনের আলো নাওয়ের পাটাতনে দন্ডায়মান বাশের মাথায় টানিয়ে নেড়ে নেড়ে তারা খদ্দেরদের আহবান করছে। তার উপর আজ হাটবার বলে কথা! রসের নাগররা লাইন ধরবে এটাই স্বাভাবিক।
ইদ্রিস মিয়ার চোখে মায়মুনার শ্যামলা মুখটা ভেসে উঠে। গাড় কাজল দেয়া ডাগর চোখ,কালো টিপ, সস্তার গোলাপী লিপস্টিক আর জংলীছাপের সুতি শাড়িতে যৌবনবতী মায়মুনার রুপ মেঘনার বাতাসে বড় বেশী খুলে!! জোর করে মায়মুনার মুখটা চোখের সামনে থেকে সরিয়ে দিল ইদ্রিস। ক্ষুধার তাড়নার কাছে মায়মুনার আবেগ পরাজিত হয়। তাকে দেখে লোকমান মিয়ার ভাতের হোটেলের পিচ্চি আজগর আলী এগিয়ে আসে তার বিশালাকার ফোকলা দাতের হাসি দিয়ে! ইদ্রিস মিয়ারে কেন যেন এই পিচ্চি খুব ভাল পায়। আজগর আলী নামটা যত ভারী সে দেখতে ততটাই তালপাতার সেপাই। ইদ্রিস আলী হাসতে হাসতে বরাবরের মত তার মাথার চুল এলো মেলো করে দেয় আর বলে,
–কি রে বেটা তুই দেহি আইজকা আরো শুখাইছোছ, দুই দিন পরতো নাই অইয়া যাবি। তোর কলকব্জা সব ঠিক আছেতো? বলেই উচ্চ স্বরে হাসতে লাগলো। আজগর মিয়াও হাসিতে যোগ দিলো।
আসলে প্রথম যেদিন এই হোটেলে পিচ্চিটার সাথে পরিচয় সে উদোম গায়ে রং জ্বলা লাল রং এর ঢোলা একটা হাফ প্যান্ট পড়েছিল যার ভিতর তার মত আরো তিনটা ডুকতে পারবে। দড়ি দিয়ে কোন মতে কোমড়ে বেধে রেখেছে তাও কিছুক্ষণ পর পর প্যান্ট খানা নিজের ভার সইতে না পেরে নীচে নেমে যাচ্ছে,তখন এক হাতে আবার তা উপরে টেনে তোলার ব্যর্থ প্রয়াস চলছে। প্যান্টের চেইনখানিও নষ্ট। সেই নষ্ট চেইনের ফাক গলে তার ভিতরকার অংগপ্রত্যঙ্গ দৃশ্যমান। তা দেখে ইদ্রীস আলী হাসতে হাসতে বলে উঠেছিল,
— কি রে বেটা তোর কলকব্জাতো সব বাইরায় গেছে। কলকব্জা শব্দের আদি রসাত্মক মাহাত্মে দুজনেই হেসে কুটোপাটি হয়েছিল। সেই থেকেই দেখা হলে ইদ্রীস মিয়ার ডায়ালগ,”কিরে তোর কলকব্জা সব ঠিক আছেতো”! তারপর দুজনে একচোট হেসে নেয়। পিচ্চি এত কিছু না বুজলেও এটা বুঝে যে কলকব্জা একটা বড়ই শরমের ব্যাপার। ইদ্রিস মিয়ার খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত পিচ্চি তার আশপাশে ঘুরঘুর করে, ফুটফরমাশ খাটে। টিনের পিরিচে সুন্দর করে সাজিয়ে পেয়াজ, কাচামরিচ এনে দেয়,গ্লাসটা ডলে ডলে ধুয়ে পানি ভরে দেয়।
আজ পাংগাস মাছের সালুন যেন একটু বেশীই ঝাল। তবু নাক মুখ লাল করে খেতে বেশ লাগছে। রান্নাটা বাবুর্চি ভালই করে,তা না হলে এই ব্যস্ত শ্যামদেউড়ির হাটে টিকে থাকা মুসকিল হোত। তৃপ্তির ঢেকুর তুলে ইদ্রিস মিয়া খাওয়া শেষ করে। পান চিবুতে চিবুতে বিল্ মিটিয়ে বের হবার পথে পিচ্চির হাতে দু টাকা গুজে দেয় লজেন্সের জন্য। ছোট্ট আজগর মিয়ার চোখ আনন্দে চক চক করে উঠে। কিছু মানুষের চাহিদা কত কম! কত অল্পতেই না সুখী করা যায়! দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে নিজের অজান্তেই। এবার একটা বিড়ি না ধরালেই না। হাটতে হাটতে চলে যায় নদীর ধারে,পরিত্যক্ত কিছু বাশ কাঠের উপর লুঙ্গী কাছা মেরে জুত করে বসে বিড়িতে সুখটান দেয়। মেঘনার বাতাস মাঝ রাত্তিরে উজানে জোরসে বইছে,মাঝে মাঝে স্টিমারের ভটভট আওয়াজ ছাড়া সব শুনশান। দূরে কিছু ইলিশ ধরার ট্রলার দেখা যায়। এই সময়টাই যা কিছু আয় ইনকাম হয় মেঘনার এই হতদরিদ্র জেলে গুলার। সারা রাত হারিকেন জ্বালিয়ে চলে রুপালী ইলিশ ধরা আর ভোর বেলা এইখানে এই ঘাটে চলে বেচাকেনা। মহাজনরা যতটা পারে ঠকিয়ে নেবার চেষ্টা করে। কিছু করার নেই এমনটাই চলে এসেছে যুগ যুগ ধরে। সকালের হাটের সেই আশটে গন্ধ এখনো বিদ্যমান।
ইদ্রিস মিয়ার চোখ আবারো চলে যায় নিশিকন্যাদের নাওয়ে,এখনো কয়েকটায় আলো জ্বলছে। মনে মনে মায়মুনার নাওটা খোজার চেষ্টা করে কিন্তু পায়না। নাকি লীলা সেরে ঘুমিয়ে গেছে! ভাবতেই বুকের ডান দিকে একটা ব্যাথার কুন্ডলী উপর দিকে উঠে গলার কাছটায় আটকে যায়। পাচ বছর আগে ইদ্রিস মিয়ার বউ জয়তুন,দুই ছেলে আর বুড়ো মা নিয়ে ছিল সুখের সংসার। বউটা গাড় শ্যাম বর্ণের হলে কি হবে খুব মায়া ভরা টলটলা একটা মুখ ছিল তার, মেঘনার জলের মত একরাশ কোমর ছাড়ানো চুল ছিল। এই চুল দেখেই তারে মনে ধরেছিল ইদ্রিসের। মেয়েটা স্বামীরে মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসতো। ইদ্রিস মিয়ার পছন্দের কচু নারিকেল তরকারী আর খইলশা মাছের ঝোল খুব ভাল রান্না করতো। পর পর দুই ছেলে হওয়াতে আল্লাদী গলায় ইদ্রিস বউকে বুকে জড়িয়ে আদর করে বলতো, “বউ এইবার কিন্তু আমার মাইয়া চাই”। বউ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যেত, তবু লাজুক হাসি ঝুলিয়ে স্বামীর দিকে চেয়ে থাকতো,সে বুঝতো না মেয়ে আর ছেলে কেমনে সে বানাবে! মাইনষে চায় পোলা আর হ্যায় চায় মাইয়া! তবু চোখ বন্ধ করে বুদ হয়ে স্বামীর আদর নিতো। বউয়ের চেহারা বুঝতে পেরে ইদ্রিস মিয়া বলতো,
–মাইয়া মানুষই ভালা পাই বউ। তোরা কত নরম শরম দেখতো,কত মায়া তোগ দিলে! আমারে কত আদর দেস! পিতীবিতে আমার আর কিচ্ছু চাওয়ার নাই একটা মাইয়া ছাড়া।
এক রাতের প্রবল জলোছ্বাসে সাত মাসের পোয়াতি বউ সহ,দুই ছেলে সব গিলে খেলো সর্বনাশী মেঘনা। আশ্চর্যের বিষয় তার বুড়ো মা বেচে রইলেন! বুড়ী নাকি ভাসতে ভাসতে হাতের নাগালে কোন এক কাঠের খুটি পেয়ে গিয়েছিল। খোদার কাজ কামে অবাক হয় ইদ্রিস। সেই থেকে এক বোহেমিয়ান জীবন চলছে। নাওয়া খাওয়ার ঠিক নেই,বাড়ী ফেরার ঠিক নেই। বুড়ি অনেক চেষ্টা করেছে ছেলেকে আবার বিয়ে থা দিতে কিন্তু সধবা বিধবা স্বামী পরিত্যাক্তা কেউকেই আর মনে ধরেনি। মেনে নিতেই পারেনি বহু বছর তার সাথেই কেন এমন হল! এরপর মেঘনায় গড়িয়েছে বহু জল। নারী সংগ বিনে পুরুষ থাকতে পারে না! লোকমানও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রথম দুই তিন বছর কষ্ট করে থাকলেও নিজের অবাধ্য শরীরী আবেগকে আর নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারেনি, মেঘনার নিশিকন্যা মায়মুনার সাথে সেই থেকেই পরিচয়। মায়মুনার পোশাকি নাম সুমি কিন্তু কেন জানি ইদ্রিসকে সে আসল নাম খানাই প্রথম দিন বলেছিল। কাঠখোট্টা মানুষটাকে তার আস্তে ধীরে ভাল লেগে যায়,মানুষটা তাকে ছাড়া আর কারো নাওয়ে যায় না। একদিন ফেরার পথে হাত ভর্তি লাল কাচের চুড়ি পরিয়ে বলেছিল,
–সংসার করতে মন চায় না তোর?
মায়মুনা বিষ্ফোরিত চোখে চেয়েছিল দীর্ঘক্ষণ। অনেক ক্ষণ লেগেছিল বুঝতে মানুষটা তাকে সংসারের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। একটা ছাও পোলাপান নিয়ে সংসারের স্বপ্ন তার আজন্ম কাল! সেই ছোট বেলায় মাটির হাড়িপাতিল নিয়ে খেলার সময়ই বুঝি মেয়েদের মনে সংসার করার বীজ গাথে। সে কোন কথা বলতে পারেনি,চোখ দিয়ে টপটপ করে ঝরে পড়া বড় বড় ফোটার অশ্রু অনেক কথারই উত্তর দিয়ে দিচ্ছিল। সৎ মায়ের অত্যাচার থেকে  বাাঁচতে প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়েছিল, আর সেই ভালোবাসার মানুষ তাকে বিক্রি করে দিয়েছিল এই বেশ্যালয়ে। নিজের সাথে সাথে সংসারের স্বপ্নকেও কবর দিয়েছিল সেইদিনই। এরপরও কেটে গেছে অনেক দিন,ইদ্রিস নিজের সাথে যুদ্ধে পেরে উঠেনি! তার বুড়ো মা বেশ্যা পাড়ার মেয়ে কিছুতেই মেনে নিবে না আর গ্রামের লোকজনতো আছেই। তার শরীরে ছুড়ে মারবে নর্দমার বিষ্ঠা। একদিকে তার ভালোবাসা আরেক দিকে সমাজ। শুধু অন্ধকারে হাতড়ে গেছে কি করবে না করবে,সমাধান পায়নি। মায়মুনা অন্য পুরুষের সাথে শোয় এটাও মেনে নিতে পারেনা। কেমনে যে ভাব ভালোবাসা হলো সে কেন টের পেল না এ নিয়ে আফসোস লাগে মাঝে মাঝে।
আজ দুপুরে জয়নাল বেপারী বলছিল,
–আমরিকাত ভোট লাগছে, এক প্রার্থী নাকি কইছে,”পরিবর্তন আনবো এই সমাজে”। সেই সুরে সুর মিলায়ে ইলেকশনের আগে দেশের নেতারাও কইতেছে হেরাও পরিবর্তন আনবো। মনের চারিদিকে পরিবর্তন নামের কেমন একটা জাদুর ছোয়া ছেয়ে যায় ইদ্রিস আলীর। বিড়ীর শেষ সুখ টান দিয়ে অবশিষ্ঠাংশ নদীতে ছুড়ে মারে আর ভাবে,নাহ এইবার সাহসী হইতে হইবো,কাপুরুষের মত বাইচ্চা থাকার চেয়ে একবার সাহসী হওয়া ভাল। সেও পরিবর্তন আনবে, মায়মুনার মত মেয়েরাও ভাল বউ হইতে পারে সে তা প্রমান করে ছাড়বে! মেয়েটারে সেই সুযোগতো দিতে হবে,কেউরে না কেউরেতো সে উদ্যোগ নিতে হবে। সেই না হয় এই উদ্যোগ নিলো। তারা দুজন মিলে এই সমাজকে মোকাবেলা করবে আর মা কত দিন রাগ পুষে রাখবে সন্তানের উপর! পরিবর্তন শব্দটা হঠাৎ জাদুর মত ইদ্রিস আলীকে বদলে দেয়। সে মায়মুনার নাওয়ের দিকে যাওয়ার উদ্যোগ নেয়,আজকেই বিয়ের কথা বলবে মায়মুনাকে। দুঃখী মেয়েটা কতটা খুশী হবে ভাবতেই ইদ্রিস আলীর মন তৃপ্তিতে ভরে যায়! ভোর হতে যে আর বেশী বাকী নেই।
-শারমিন জাহান