জীবন কাব্য

হিশাম আজ সকাল থেকেই ফোন ধরছে না। কি যে হল! এইবার দিয়ে পনের বার ফোন করে ফেলেছে সুকন্যা। একটু চিন্তা হচ্ছে। এমনো তো হতে পারে ও অফিসের জরুরী মিটিং তাই কলটি রিসিভ করতে পারছে না।

সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সুকন্যা তড়িঘড়ি করে তৈরি হয়ে নেয় ছেলেকে স্কুল থেকে আনতে যাবে বলে। দিনটা শুরুই হয় যেন হিশামের সাথে গল্প করে। কত কথা যে ও জানে। গল্প কবিতা থিয়েটার সব বিষয়ে এত টাই জানে যে সুকন্যা যেন মুগ্ধ শ্রোতা ।এভাবে প্রায় তিন বছর হয়ে গিয়েছে ওদের সম্পর্ক টা। এই সম্পর্কটা সুকন্যার বাঁচার অবলম্বন যেন।

মাহাতি আজ দু বছর হল নেই। অবশ্য বেঁচে থাকলেও এই সম্পর্কের প্রতি বিন্দুমাত্র টান ছিলনা তার। মাহাতি বেঁচে থাকা সময়ই হিশামের আগমন ঘটেছে সুকন্যার জীবনে। হিশাম বড় ব্যাবসায়ী, তার স্ত্রী ও দুইটি পুত্র সন্তান আছে।

হিশামের সাথে প্রতিটা মুহূর্ত সুকন্যা মন প্রান দিয়ে উপভোগ করে। একটা সময় পর সুকন্যা মনে মনে প্রার্থনা করত যেন মাহাতির অস্তিত্ব জীবন থেকে মুছে যায়। এই সমাজ সংসারের কাছে সে বড় বেশি অসহায় তাই ইচ্ছে করলেই মাহাতির কাছ থেকে নিস্তার পাওয়া সম্ভব ছিলনা। আর মাহাতি হারতে পছন্দ করে না। মদ ,নারী কোন দোষ থেকেই সে দূরে ছিলনা। তার সাথে তার দুর্ব্যবহারের কমতি ছিলনা। একটি দিনের জন্যও সুকন্যা মাহাতির কাছ থেকে ভাল ব্যাবহার পায়নি।

মাঝে মাঝে সুকন্যার অপরাধবোধ হলেও পরক্ষনেই নিজেকে সামলে নিত এই ভেবে যে যদি মাহাতি তাকে ঠকিয়ে সংসার করতে পারে তবে তার অন্যায়টা কোথায় ।

মাহাতির চলে যাবার পর সুকন্যাকে অনেকেই বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে অনেকেই ইশারা ইঙ্গিতে বুঝিয়েছে তাদের দুর্বলতার কথা। কিন্তু সুকন্যা সংসার কে বড্ড ভয় পায়। বিয়ের আগে মাহাতি ছিল খুব রোমান্টিক সুন্দর সভ্য একজন মানুষ । বিয়ের পর আস্তে আস্তে মুখোশ খুলেছে তার আসল চরিত্র প্রকাশ পেয়েছে।

তার চাইতে এই জীবনকেই সুকন্যার ভাল লাগে। কারো হুকুমজারি নয়। দিনশেষে কারো সেবাদাসী হবার চাইতে এই তো ভাল!

মাহাতির চলে যাবার পর সুকন্যা একটি বায়িং হাউসে চাকুরী জীবন শুরু করে। সেখানেই হিশামের সাথে পরিচয়। হিশামের মাঝে অনেক না পাওয়া অতৃপ্ততায় যেন এক পশলা বৃষ্টি দেখেছিল সে!

অফিসের পর কফি শপে সময় কাটানো সব চলছিল। তার সাথে মোবাইলে কথা তো ছিলই । সুকন্যা মনে মনে সান্ত্বনা খুঁজে নিয়েছিল যে সে কখনো হিশামের সংসারে অশান্তির ছোঁয়া লাগতে দেবে না। সম্পর্ক টা কখনোই বাড়াবাড়ি পর্যায়ে যেতে দিবে না সে। দুটি মানুষ যদি খুব অল্পতেই সুখী থাকতে পারে সব ঠিক রেখে তো ক্ষতি কি?

বাসায় সে খুব ভাল একজন মা। সব দায়িত্ব নিপুণতার সাথে পালন করে। তার ছেলে স্কুলে প্রথম হয়। সব কিছুর পরও এই মন বড্ড বেসামাল।ভালবাসার সুখ যে কোনদিন পায়নি তারও প্রান খুলে ভালবাসতে আর পেতে ইচ্ছে করে।

অফিসে প্রতি বছর শেষে একটা গেট টুগেদার হয় ঢাকার বাইরে। দুইটি দিন স্বপ্নের মত চলে গেছে। সে একজন মানুষ তার ভিতরের আমিটা কখনো বেসামাল হতে চাইলে কি খুব বেশী অন্যায়! আর তাই সবার অগোচরে ওরা দুজন একই রুমে ছিল দুই দিন।মানুষের জীবনে তিনটি বিষয় থাকে আর তা হল বর্তমান , সিক্রেট আর পারসোনাল । মানুষ চাইলেও অস্বীকার করতে পারেনা। অনেকেই সারাজীবন তার সিক্রেট লাইফকে সবার অলক্ষ্যে লালন করে। কেউ সংযত হতে জানে আবার কেউ নয়।

স্বাভাবিক বর্তমানের বাইরে যদি দু তিনদিনের জন্য হারিয়ে যাওয়া যায় তাহলে কি খুব খারাপ হয়ে যেতে হয়! নাকি মনের দুর্নিবার চাওয়াকে একটু প্রশ্রয় দেয়াই যায়!

এসব সাত নয় ভাবতে ভাবতেই কখন ওরা দুজন একসাথে খুব কাছে এসেছিল । সময়টাকে খুব স্বপ্নময় করে তুলেছিল। সুকন্যার বার বার মনে হয়েছে হোক না হয় ক্ষনিক সুখ তবুও তার জীবনে এটা অনেক বড় কিছু। অনেক পরম পাওয়া।

কিন্তু কি যে হল গাজীপুর থেকে আসার পর থেকেই হিশাম সুকন্যাকে এড়িয়ে চলছে। প্রথমে বিষয়টা পাত্তা না দিলেও এখন বুঝতে পারে হিশাম ইচ্ছে করেই করছে!

বিষয়টা জানতে সুকন্যা একবার মুখোমুখি হতে চায় তাই হিশামকে না জানিয়ে ওর অফিসে দেখা করতে চলে যায়। হিশামের অফিসের সামনে বসা পিয়নটি না করা সত্ত্বেও সুকন্যা হিশামের রুমে ঢুকে যায়। রুমে গিয়ে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না। হিশাম তার প্রাইভেট সেক্রেটারির সাথে খুব অন্তরঙ্গ হয়ে বসে আছে। সুকন্যাকে দেখে একটু ইতস্তত করলেও পরে সামলে নিয়ে জানতে চায় কি ব্যাপার তুমি!
ততক্ষণে তার প্রাইভেট সেক্রেটারি রুম থেকে বের হয়ে গিয়েছে। সুকন্যা জানতে চাইল তুমি কি অন্য আরও কারো ? কিভাবে পার?
হিশাম বেশ স্বাভাবিক ভাবে বলে দেখ ভিত্তিহীন সম্পর্ক এক বা দুই কি আসে যায়। সুকন্যা কিছুই বলতে পারে না।

হঠাৎ নিজেকে খুব ভারশূন্য মনে হয়। তাই তো বেলাশেষে সব পুরুষ ই কোন না কোনভাবে এক হয়ে যায়।

সারাজীবন ঠকে তার নতুন করে কেন অবলম্বন লাগবে! তারচাইতে জীবন নদী না হয় বয়ে যাক একলা।

-হালিমা রিমা