দায়বদ্ধতা

মায়ের বাসা ছেড়ে এসেছি আজ প্রায় মাস ছয়েক হলো। কি ভাবছেন? বিয়ে হয়ে গেছে আমার? না, আমি আমার বাবার বাসায় এসে উঠেছি। আমার বাবা মায়ের ডিভোর্স হয়ে গেছে বছর দুয়েক আগে। কি কারণে ডিভোর্স হয়েছে মা আমাকে খুলে না বললেও আমি ভালোই জানি। আমার বাবা নামক প্রানীটির ভালো রকমের চরিত্রের দোষ আছে। আমি নিজেই সাক্ষী তাই কারো কিছু বলা বা না বলায়, বোঝানো বা না বোঝানোয় আমার কিছুই যায় আসেনা। নিজের চোখকে তো আর অবিশ্বাস করা যায়না। তাহলে প্রশ্ন হলো কেন আমি মা কে ফেলে বাবার বাসায় চলে আসলাম? আমি আদতে সুযোগ খুঁজছিলাম। বাবা আর তার আত্মীয় পরিজন মায়ের নামে নানা কথা বলে আমাকে চলে যেতে বলেছে ওনাদের কাছে। কিন্তু নিজের অবস্থান আরেকটু পোক্ত না করে আমি মা কে ছেড়ে আসতে চাইনি।

আমি এবছর বুয়েটে চান্স পেয়েছি। ক্লাস শুরু হয়েছে কয়েকমাস হলো। বুয়েটে চান্স পাওয়ার পরপরই আমার বাবা আবার আমাকে ফিরে পাওয়ার তোড়জোড় শুরু করলো। কেন আমাকে পেতে উনি এতো মরিয়া হলেন সেটার শুধু একটা ব্যাখ্যাই আমার কাছে আছে; মা যেন জিতে না যায়। বাবার বাসার কাছাকাছি আমার ক্যাম্পাস এটাই ছিল সবচে বড় অজুহাত; নয়তো রোজ আসা যাওয়ার পরিবর্তে হয়তো হোস্টেলে থাকতে হতে পারে। এ প্রসঙ্গে এখানে বলে রাখা ভালো, আমার মায়ের অনেক দোষের কারণ নাকী সে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করেছে তাই মেয়ে খারাপ। এক টুকরো কাগজে মা কে দুটো লাইন লিখে আমি বাক্স গুছিয়ে বেরিয়ে আসি বাবার সাথে। মা তখন কাজে ছিল।

‘ মা, অনেকদিন তো তোমার সাথে রইলাম, এখন একটু বাবার সাথে থেকে দেখি কেমন লাগে। কষ্ট পেয়োনা। বাবার ও তো আমার ওপর অধিকার আছে, তাইনা? আমাকে পাখির বাচ্চার মতো আলতো করে মানুষ করেছো তুমি। কোন ঝড়ঝাপটা সইতে দাওনি, বুঝতেও দাওনি। তার প্রতিদানটুকু দেয়ার সুযোগটুকু আমায় দেবে নিশ্চয়ই? ভাবছো এ কেমন প্রতিদান যেখানে তোমাকেই ছেড়ে যেতে হয়? সত্যি বলছি এছাড়া আর কোন ভালো উপায় আমার জানা নেই। আমার নিজের সাথে নিজের বোঝাপড়াটুকুর জন্যই আমি তোমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি। তোমাকে ছাড়া প্রতিটা দিন আমার খারাপ কাটবে। তবু যাচ্ছি। আমার ওপর রাগ করোনা। মোবাইল নম্বর পাল্টে ফেলছি। শহরের ভীড়ে হারিয়ে যাওয়া মানুষ ভেবে আমায় ভুলে যেও।’ তোমার টিয়া পাখি।
চিঠিটা পড়ে মা খুব কাঁদবে আমি জানি। সব উপায়ে আমাকে পেতে চাইবে। কিন্তু আমি নিরুপায়।

বাবার চরিত্রের ত্রুটিটুকু আমি প্রথম বুঝতে পারি মা বিদেশে ট্রেনিংয়ে যাবার পর। কয়েক জন আন্টি নামক মহিলা আসতো যেতো আমাদের বাসায়। বাবা মায়ের বেডরুমে তাদের আড্ডাটুকু জমতো। প্রথমদিকে বুঝতে না পারলেও দিনে দিনে বুঝতে শিখলাম, জানলাম বাবার চরিত্র সম্পর্কে। মা প্রতিদিন একবার ফোন দিত। কিন্তু বাবা সামনে থাকাতে কখনোই কিছু বলতে পারিনি। ট্রেনিং শেষে ফিরে আসার পর মা নিজেও বুঝতে পারে কিছু একটা গড়বড় হয়েছে। হয়তোবা জানতেও পারে বাবার চরিত্রের কালো অধ্যায়টুকু। কিন্তু তারপরও বুঝি আমার দিকে তাকিয়ে মেনে নিয়েছিল ভাগ্যকে। কিন্তু আমি কেন যেন মানতে পারিনি। আর তাই মায়ের ডিভোর্স সিদ্ধান্তে আমিই সবচেয়ে খুশী হই। সবাই কিন্তু পুরো ব্যাপারটাকে মায়ের বাড়াবাড়ি আর দোষ দিয়েই গেছে আর মতান্তরে বাবা হয়ে গেছেন নিষ্পাপ। আর তাই যখন তারা মায়ের নামে আজেবাজে কথা বলে আমাকে তাদের কাছে নিয়ে যেতে চায় তখনই আমি সিদ্ধান্ত পাল্টাই আমি বাবার মুখোমুখি হবো।

মা আমাকে একা নিয়েই বেশ জীবন চালিয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু বাবা কিন্তু এর মধ্যেই বিয়ে থা করে সংসারী পুরোদমে। নতুন মা আমাকে তার সংসারে কিছুদিন মেনে নিলেও ঘরে অশান্তি শুরু হতে সময় লাগেনি। আমার জায়গা হয় দাদীর সাথে দুকামরার এক ফ্ল্যাটে বুয়েট ক্যাম্পাসের আরো কাছাকাছি। আসার আগে আমার দারুন সখ্যতা হয় বাড়ির কাজের মেয়েটার সাথে। সময় সময় ওর সাথে ফোনে কথা হতো। আর মাসে দুমাসে ও বাড়িতে অতিথি হিসাবে যাওয়ার সুযোগও মিলতো। আমার বহুগামী বাবা নতুন মা কে ও ঠকাবেন এটা আমি বেশ বুঝে গিয়েছিলাম।

…………

আজ আমার আঠারোতম জন্মদিন। দাদী আমার সব আত্মীয়দের বাসায় দাওয়াত করেছে। খুব হৈচৈ পুরো পরিবার এক হওয়াতে। শুধু আমি চুপ করে বাথরুমের দরজা আটকে মোবাইলের সেন্ড বাটনে আলতো হাত ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছি। একটা ভিডিও, কিছু মেসেজ একের পর এক পাঠালাম আমার নতুন মায়ের মোবাইলে নিজের কেনা নতুন সিম থেকে।

বসবার ঘরে পিনপতন নীরবতা। আমার নতুন মা বাবার গালে সবার সামনে সজোরে চড় মেরেছেন। আর পর্দার আড়ালে দাঁড়ানো আমি চোখের জলে বুক ভাসিয়ে আমার মাকে মেসেজ পাঠাচ্ছি, ‘ আমার দায়বদ্ধতা মেটানো শেষ, মা। আমি তোমার কাছে ফিরে আসছি।’

-জান্নাতুল ফেরদৌস