দায়বোধ থেকে

বাংলা সিনেমা জগতে হঠাৎ আবির্ভুত হয়ে, মৌলিক সিনেমা ভাবনাকে তাল গোল পাকিয়ে ফেলে,বাংলা সিনেমাকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যাবার এক অদ্ভুত কিম্ভুতের নাম “অনন্ত জলিল”!

তার ভাষা, মুল ভাবনা,উপস্থাপণার আঙ্গিক ও নির্মাণে হলিউড, বলিউড, ঢালিউড,টালিউড সব এক সাথে মিশিয়ে বেশ জম্পেস খিচুড়ি বানানোয় তিনি যেমন এক অনন্য দক্ষতার সাক্ষর রেখেছেন।তেমনিই তার সিনেমার ‘নাম’ নির্বাচনেও বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। “নিঃস্বার্থ প্রেম what is love.”খোঁজ the Search ” ইত্যাদি। এটিএন’এর মাহফুজুর রহমান সাহেবের মত টাকা হলে যা হয় আর কি!

যাক, আমি সাধারনত সিনেমা দেখি কম(দেখার মত কিচ্ছু পাইনা বলে) তাই সিনেমা নিয়ে খুব একটা লেখালেখি করিনা।তবে যেদিন প্রথম শুনলাম, অনন্ত জলিল নামে কেউ একজন বিদেশ থেকে অনেক ক্যাশ টাকা নিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে নিজস্ব অর্থায়নে সিনেমা বানাবার ইচ্ছে নিয়ে।সেদিন বাংলা সিনেমার এই খরাময় শুষ্ক দুর্দিনে একটু বৃষ্টিস্নাত হবো, আশায় বেশ খানিকটা উচ্ছসিত হয়ে উঠেছিলাম। দেশের অনেক প্রতিভাবান সু-সন্তান পড়ে আছেন বিদেশে। যারা সুস্থ্য পরিবেশ, সৎ দক্ষ ও স্বচ্ছ মনের লোকবল এবং নিয়মতান্ত্রিক কর্মধারা চর্চ্চার অভাবে স্বদেশে এ নিয়ে কাজ করবার সাহস ও মনোবল পান না। সেখানে জলিল নামের কেউ এসে যদি এমন সাহসী উদ্যোগ নেয়।তাকে প্রাণখোলা স্বাগত জানানোই তো স্বাভাবিক।

কিন্তু যখন অনন্ত জলিলের কয়েকটি টিভি ও পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দেখলাম এবং তার নিজস্ব প্রযোজনা, পরিচালনা এবং অভিনীত সিনেমার নাম শুনলাম,তখন রীতিমতো আহত হলেও হতাশ বা নিহত হইনি।শুধু মনে মনে ভেবেছিলাম। আহারে… জলিল সাহেবের একজন যোগ্য Proof reader অথবা ব্যক্তিগত সাহিত্য সচিব দরকার। যিনি তার এরুপ দৃষ্টি ও শ্রুতিকটু ভয়ংকর ত্রুটি গুলো সংশোধন করে তার পুরো কাজটিকে একটি আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে সহযোগিতা করতে পারেন। কিন্তু পরে জানলাম, জলিল সাহেব এ ব্যাপারে কারো সহযোগিতা কামনা করেন না। তিনি যা করছেন, তার মতে সবই ঠিক। অন্যের সমালোচনার তিনি তোয়াক্কা করেন না।

বেশ…তো! বাংলা সিনেমার কয়েক যুগের তৃষ্ণার্ত দর্শকের কাছে বোম্বাইয়া ধাচে কস্টিউম, মেক আপ,গেট আপ আর বিদেশের বিভিন্ন লোকেশনে নাচ গানের দৃশ্য ধারন করে ঝলমলে রঙ্গীন ছবি উপহার বেশ কৌতুহলেই গ্রহনযোগ্যতা পেলো তখন। মন্দ কি? নিন্দুকের মুখে ছাই! “নিঃস্বার্থ ভালোবাসা”র ইংরেজী অর্থ what is love নাকি what is গানা’, তাতে কিচ্ছু আসে যায়না।ছবি হলে খেলে, ঘরে টাকা নিয়ে ফিরলেই হলো। এক্কেবারে শুদ্ধ ব্যবসায়িক চিন্তা।শিল্প সাহিত্য চুলোয় যাক! কার বাপের কি? অনেকেই হয়তো ভাবছেন, সেই পুরোনো কাসুন্দি এতদিন পরে ঘেটে কি লাভ? হা হা..
উদ্দ্যেশ্য তো আছেই।

অতি সম্প্রতি আমাদের জলিল সাহেব একটু ধর্ম কর্মে মনোযোগী হয়ে উঠেছেন,যা তার একান্ত ব্যক্তিগত ইচ্ছা। পৃথিবীর প্রত্যেকেটি মানুষেরই তার নিজস্ব ধর্ম বিশ্বাস চর্চ্চার সমান অধিকার রয়েছে। কিন্তু জলিল সাহেব যে ধর্মে দীক্ষিত।সে ধর্মে, হাজার মানুষের সামনে,লাইম লাইটের নিচে নারী পুরুষের খোলামেলা ঢলাঢলি, নর্তন কুর্দন করে শ্যুটিং করায় কিছু নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বৈকি।
বেশ কিছুদিন আগে জলিল সাহেব দেশব্যাপী ঘটা করে, ঘোষনা দিলেন এক্কেবারে হলিউডি স্টাইলে এক দুনিয়া কাঁপানো ছবি বানাবেন তিনি।এবং দেশের তরুন প্রজন্মের বেশ কিছু নতুন মুখ তিনি তাতে অভিশেক ঘটাবেন। বেশ আশা জাগানিয়া কর্মোদ্যোগ! সেটির সর্বশেষ কোন আপডেট জানা নেই।

কিন্তু মাত্র পাঁচদিন আগে(১৮ ই জুন’১৮)ইরানের তেহরানে “ফারাবী সিনেমা ফাউন্ডেশন” নামে এক প্রযোজনা সংস্থার সাথে তার এক যৌথ প্রযোজনার ছবি বানানোর সিদ্ধান্ত পাকা করেছেন তিনি। মহা সমারোহে তার ঘোষনাও প্রচারিত হয়েছে তা। সিরিয়া, ইয়েমেন সহ বিশ্বে মুসলমানদের উপর নির্যাতন, এ ছবির মুল প্রেক্ষাপট। অর্থাৎ ধর্ম ভিত্তিক অমানবিক নৃসংশতার চিত্র ধারনের ভাবনা থেকেই এ যৌথ প্রযোজনার মুল ভাবনা।যাতে তিনি নিজেই অভিনয় করার ঘোষনা দিয়েছেন। সমস্যা নেই।বরং নিঃসন্দেহে এটি একটি ভাল উদ্যোগ। কিন্তু ছবির নাম “দিন, the day.”

জলিল সাহেব, এর আগে “নিঃস্বার্থ ভালোবাসা”কে what is love করেছেন। ভালোবাসা পাগল মানুষ সেটি নিয়ে হাসাহাসি করলেও খুব গভীরভাবে মাথা ঘামাননি। কিন্তু ধর্মীয় একটি আন্তর্জাতিক ইস্যুকে নিয়ে আপনি আন্তর্জাতিক বাজারে যাচ্ছেন সিনেমা বানাতে। তাতে সিনেমার নাম করণ বা Tittle Head’এর শব্দ বানানই ভুল করবেন। যার মুল অর্থই ভিন্ন। এটা কি বিশ্ব মানবে?

জলিল সাহেব, বিনা সন্মানীতেই আমি আপনার ছবির নাম “দিন; the day” এর সঠিক অর্থটা বুঝিয়ে দিচ্ছি। বাংলায় “দিন” শব্দের অর্থ দিবস। আর “দ্বীন” মানে ধর্ম। আপনি ধর্ম নিয়ে ছবি বানাতে যাচ্ছেন,সেটি আপনার ইরানী সহ প্রযোজক “আলীরেজা তাবেশ” সাহেব জানেন।কিন্তু তিনি ‘দিন আর দ্বীন’এর পার্থক্য বুঝেনা না নিশ্চয়ই। কারন তার ভাষা বাংলা নয়। আপনি ব্যয় বহুল এই ছবিটি নির্মাণের আগে নামের এই বিষয়টি একটু শুধরে নিবেন, আশা করি। সব শুভ কাজের মঙ্গল কামনায়।

-ববি অস্তরাগ।