দায়মুক্তি (১ম পর্ব)

বাস থেকে নেমেই নিলুর স্যান্ডেল টা ছিঁড়ে গেল। সে ইফতেখারের দিকে তাকিয়ে অপরাধীর মত হেসে বলল “স্যান্ডেল টা ছিড়ে গেল রে ইফতি”! ইফতেখার বলল অসুবিধা কি এক্সট্রা জুতা এনেছেন না? নিলু হাসতে লাগল। যার মানে সে এক্সট্রা জুতা আনেনি। ইফতেখার বিরক্ত হল ” হাসছেন কেন?? আপনার ভাবভঙ্গি দেখে তো মনে হয় জুতা ছিঁড়ে যাওয়া টা খুবই আনন্দের বিষয়”
নদীর খেয়া ঘাট বাস স্ট্যান্ড এর কাছেই। ঘাটে এসে ইফতেখার মহাবিরক্ত। ঘাটে ট্রলার বাঁধা তিন টা কিন্তু কোন মানুষ নেই। সে মায়ের দিকে তাকাল, ” আম্মা আপনাকে কে আসতে বলছে, কোন দরকার ছিল বলেন? উপহার টা পাঠিয়ে দিলেই হত। কিযে যন্ত্রণা করেন আপনি'”। নিলু হাসছে। কথা বললেই শুধু হাসেন কেন আম্মা? ইফতি সত্যি রেগে গেল। “তোর রাগ দেখে হাসি,তুই অনেক রাগ করলে কান দুইটা টমেটোর মত লাল হয়ে যায়, দেখতে ভাল লাগে। চশমা খুলবিনা?? বেশী রেগে গেলে তো তুই চশমা খুলে ফেলিস। “”
ইফতেখার হেসে ফেলল – – অদ্ভুত একটা মানুষ আপনি!!
” আয় রাগ করিস না,আমরা একটু বসি।” ট্রলারের মাঝিগুলা মনেহয় খেতে গেছে, চলে আসবে। খেয়াঘাটে ছাউনি দেয়া একটা বেঞ্চে তারা বসল।
প্রায় ঘন্টাখানেক পর মাঝবয়েসী একটা লোক দুলতে দুলতে এল। ইফতেখার উঠে দাঁড়াল। “চাচা আমরা একটু ওপারে যাব, প্লিজ যদি একটু পার করে দেন!! বুড়া মিয়া এমন ভাবে তাকিয়ে রইল যেন এর চেয়ে আজব কথা সে জীবনেও শোনেনি। সে কোন উত্তর না দিয়ে ট্রলারের পাটাতনে গিয়ে বসল,তারপর লুঙ্গির গিট্টু দিয়া দিয়াশলাইয়ের একটা কাঠী বের করে গভীর মনযোগে দাঁত খুচতে লাগল। ইফতেখার হতাশ চোখে নিলুর দিকে তাকাল। উঠে দাড়াল নিলু — ” ভাইজান ভাল আছেন? হেডমাস্টার সাহেবের বাড়ী যাব, একটু নিয়া যান না!!” লোক টা এবার মাথা তুলল ” তুমি চৌধুরী বাড়ীর মাইয়া নিলুফার না? লগে এইডা ক্যাডা তোমার পোলা? আদব কায়দা তো কিচ্ছু শিখাও নাই পোলারে!! আস, ট্রলারে উডো দিয়া আসি”
নিলু ইফতেখারের দিকে তাকাল — রাগে ইফতির ফরসা মুখ লাল, চশমা খুলে ফেলেছে সে, ঘন ঘন পলক ফেলছে চোখের। নিলু খুব কষ্টে হাসি চাপিয়ে রাখল। রাগ করলে ছেলে টারে যে এত সুন্দর লাগে!!!

বাড়ীতে যখন তারা পৌঁছল তখন প্রায় বিকেল। বাড়ীর দরজায়ই সিরাজ চাচার সাথে দেখা। নিলুকে দেখেই সে আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার দিল– ” আরে তোমরা দেখ কে আইছে, বাইর হও সব। তুই ক্যামন আছস রে নিলু? আর এই নায়কের লাহান পোলাডা ক্যাডা- ইফতু নি?? সিরাজ মিয়া এই বাড়ীর পুরানো লোক, ধানি জমি গুলা তিনি দেখাশোনা করেন।
চেঁচামেচি শুনে জাহানারা বেগম ছুটে বের হলেন – ছোট বোনকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করলেন। উঠানের মাঝখানে একগাদা নীরব দর্শক। তারা খুব আগ্রহ নিয়ে এই দৃশ্য দেখছে। নিলু চিৎকার দিল “ওরে বড় আপা ছাড় এখন, এত কান্দছ ক্যামনে তুই? ঘরে নিয়া আমাদের কিছু খাইতে দে, খিদায় তো মইরা যাইতেছি!!
জাহানারা একটু অপ্রস্তুত হল ” মাইর খাবি তুই নিলু বুঝছস! পোলার সামনে শরম দেছ। ইফতি টা কেমন বড় হই গেছে! আয়, আগে হাতমুখ ধুয়ে নে।
পুকুরঘাটে তাদের নিয়ে যাওয়া হল। নীরব দর্শক দের কয়েকজন সক্রিয় হল। তারা ঘর থেকে তোয়ালে সাবান নিয়ে আসল।কিছু দর্শক পুকুরপাড়ে এসে দাঁড়িয়ে গেল, খুব মনযোগ দিয়ে হাতমুখ ধোয়া দেখতে লাগল। ইফতেখার ফিসফিস করে বলল– ” আশ্চর্য আম্মা!! এসব কি? এই মেয়েগুলো এভাবে তাকিয়ে আছে কেন?
নিলু হেসে ফেললো। “তোরে দেখতেছে মনে হয়। সিরাজ চাচা কি বলল শুনলি না! তুই নাকি নায়কের মত দেখতে। বলেই হাহাহা করে হাসতে লাগল। ” পুকুরপাড়ের দর্শকরাও নিলুর সাথে সাথে দাঁত বের করে হাসতে লাগল। ইফতেখার চোখ মুখ শক্ত করে ফেলল — “আম্মা আপনি রসিকতা করতেছেন আমাকে নিয়া? অদ্ভুত!!! আমার আসাই উচিৎ হয় নাই।

সিরাজ মিয়া এগিয়ে এলেন ” অই বেহায়া ছেমড়ি গুলান, এইখানে খাড়াইয়া কি দেখস? দূর হ চোখের সামনে দিয়া! আল্লাহর শত্রু, দুনিয়ার আজাব এগুলান!! বুঝলা ইফতি এই জাত দিয়া সবসময় দূরে থাকবা, জাহান্নামের আগুন হইল এই জাত!!
নিলু ইফতেখারের কানে ফিসফিস করে বলল ” আমাগো সিরাজ চাচার বউ কিন্তু তিনখান বুঝলি!! ইফতেখার শব্দ করে হেসে উঠলো,,,
সিরাজ মিয়া একটু অপ্রস্তুত হয়ে কাশি দিলেন–” নিলু মা কি আমারে নিয়া কিছু বললা, তিনজন উপস্থিত থাকলে দুইজনের গোপন বাতচিত ঠিক না, হাদিসে নিষিদ্ধ আছে। ইফতেখার তখন ও হাসছে,,, ।

খাওয়াদাওয়া শেষ করে সবাই মাঝের বড় ঘর টায় বসল। জাহানারার স্বামী খন্দকার সাহেব এখানকার সরকারী স্কুলের হেডমাস্টার।চাকরী ছাড়াও স্থানীয় একটা প্রভাব আছে তার। অতিশয় সজ্জন ব্যক্তি। চেয়ারে বসতে বসতে তিনি বললেন– “তুমি যে আসবা এই টা ভাবি নাই, আমি অতি আনন্দিত হইছি নিলুফার”। তোমার ছেলে তো মাশাল্লাহ ডাক্তার হয়ে গেল! ইফতেখার সালাম করল খন্দকার সাহেব কে, ” ফাইনাল প্রফ” দিলাম মাত্র খালু!!
ওই তো একই কথা!! ছোট বেলা থেকেই তো তুমি অনেক মেধাবী ছিলা!”

নিলু গলা তুলল ” এই বড় আপা আমরা আসছি তো অনেক্ষন হইছে, রানুরে তো দেখলাম না”
জাহানারা হাসল ” লজ্জায় আসতেছে না তোদের সামনে”।
আরে লজ্জা কিসের!! দাড়াও আমি ডাকি, নিলু উঠে দাঁড়াল ” রেহনুমা! এই রেহনুমা!!
দরজার পাশে চোখ মুখ লাল করে রেহনুমা দাঁড়াল, পা ছুঁয়ে সালাম করল নিলুকে, সাথে ইফতিকেও।
ইফতি লাফ দিয়ে উঠল ” আরে কর কি!! দেখেন তো আম্মা!!!
নিলু সস্নেহে জড়িয়ে ধরলেন রানুকে ” আল্লাহ কি সুন্দর হইছে মেয়েটা !! কি পড়িস তুই এখন?
” অনার্স সেকেন্ড ইয়ার, ভাল আছেন খালা?
” আরে তুই তো মরে যাইতেছিস লজ্জায়। আর ওই বান্দর টারে সালাম করছিস তুই?? তোর মনে নাই ও তোরে কি মাইর টাই না মারত! তোর মাথার অর্ধেক চুল টাইনা উঠাই ফেলছে ইফতি, আর তুই ওরে সালাম করিস!!!
একসাথে হেসে উঠল সবাই, লজ্জা কাটিয়ে অনেকটা সহজ হল রানু !!

রাতের খাওয়া সেরে পান খেতে খেতে খন্দকার সাহেব বললেন ” ইফতির বাবা বেঁচে থাকলে কত ভাল হইত!! “কবির ” দেইখা যাইতে পারলনা ছেলে টা ডাক্তার হইল!! এত ভাল একটা মানুষ ছিল!! এত অল্প বয়সে দুনিয়া থেকে চলে গেল, ভাবলে কষ্ট লাগে নিলুফার।!! তুমি অনেক বুদ্ধিমতী নিলু, তাই শক্ত হাতে সব সামলাতে পারছ, কবিরের ব্যবসা, ইফতির পড়াশোনা, দোয়া করি ভাল থাক সবসময়!!
নিলু একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলল– —–

খন্দকার সাহেব প্রসঙ্গ পালটালেন “ভাল ছেলে পাইলাম তাই আর দেরী করলাম না, বুঝলা নিলু!! ছেলের নাম শফিক আহমেদ। সরকারী কলেজে ইংরাজি পড়ায়। বংশ ভাল, দুইভাই তারা।ছোট ভাই ঢাকা ভার্সিটি তে পড়ে। নির্ঝঞ্চাট ফ্যামিলি।
” ভাল করছেন দুলাভাই” বড় আপা, রানুর জন্য কি আনছি দেখবানা? নিলু ব্যাগ থেকে একটা লাল রঙের বক্স বের করল—
“জাহানারা চিৎকার দিল ” আরে তুই করছিস কি এইডা, এই চুড়ি দুইটার ওজন তো অনেক!! কে বলছে তোরে এত খরচ করতে!!

দোতলার দক্ষিণ দিকের ঘরটায় নিলুদের শোবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইফতি গভীর মনোযোগে বই পড়ছে, চুড়ির শব্দে সে চোখ তুলে তাকাল। দরজায় রানু, হাতে পানি ভর্তি জগ আর গ্লাস।
” আরে তুই পানি নিয়া আসছিস!!
রানু জগ আর গ্লাস টেবিলে রেখে চলে যাচ্ছিল, ইফতি ডাকল ” এই রানু বোস না!! তোকে ছোটবেলায় আমি অনেক মেরেছি, মাফ করে দিস। তোর অভিশাপেই মনে হয় কানা হয়ে গেছি আমি। চশমা ছাড়া কিছু দেখিনা বুঝলি!!
রানু হাসল–
এই চুল ভিজা কেন তোর? রাতে গোসল করেছিস? ঠান্ডা লাগবে না? আর এত লম্বা চুল নিয়া হাটিস কিভাবে তুই, ঘাড় ব্যথা করে না??
রানু হাসতে হাসতে বলল “” তুমি আগের মতই রইলা, একটু ও বদলাও নি!!!

সকাল থেকেই শুরু হয়ে গেছে ব্যস্ততা। আত্মীয়স্বজন রা আসতে শুরু করেছে একে একে।একদল লোক চলে আসলো আলোকসজ্জার জন্য। বাবুর্চিরা উঠানের বাদাম গাছ টার নীচে রান্নার আয়োজনে ব্যস্ত। জেনারেটরের ও ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঘুম থেকে উঠে কাঠের বারান্দায় বসে এই আয়োজন দেখছে নিলু। কি যে আনন্দ লাগছে তার!! ইফতির ও সে এমন করে বিয়ে দেবে। অনেক আয়োজন করে, আনন্দ করে। কলেজের বন্ধুদের সাথে নীতু নামের একটা মেয়ে আসে প্রায়ই, দেখতে মন্দ না। খুব হাসিখুশি। মেয়েটা ইফতিকে পছন্দ করে, চোখ দেখলে বুঝতে পারে নিলু। ইফতিকে ও দেখেছে খুব আল্লাদ করে কথা বলে মেয়েটার সাথে। জিজ্ঞেস করতে হবে এবার!!!

দুপুরের দিকে রানুকে হলুদ দিয়ে গোসল করানো হল। সেই থেকেই শুরু হল জাহানারার কান্না!! নিলু অনেক চেষ্টা করেও থামাতে পারলনা তাকে। শেষমেশ বিকেলের দিকে খন্দকার সাহেব এসে ধমক দিলেন– “চুপ একদম!! কান্না বন্ধ!!! কোন আওয়াজ করবানা। অপদার্থ মহিলা!!
এক ধমকে জাহানারা চুপ। চোখ মুছে স্বাভাবিক গলায় বলল– “মাস্টার সাব গরম হই গেছেন, তিনি গরম হইলে আবার সমস্যা। নিলু তুই একটু দেখবি, রানুরে কদ্দুর সাজানো হইল!! সন্ধ্যার পরেই কিন্তু বরযাত্রী চইলা আসবে ! আমি দেখি বাবুর্চিরা কদ্দুর আগাইল”‘!
নিলু জাহানারার দিকে তাকিয়ে রইল— বেচারি সারাজীবন এমন বোকাসোকাই থেকে গেল!!!

সমস্ত আয়োজন শেষ!!!
রানুকে সাজানো হয়েছে প্রায়। মাগরিবের আজান পড়ছে।নামাজের প্রস্তুতি নিচ্ছে সবাই। নিলু সামনের দরজা থেকে নামতেই। ২০/২২ বছরের একটা ছেলেকে দেখতে পেল। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে সে। নিলু ডাক দিল– কাউকে খুঁজছো তুমি??
“জ্বী”। এটা শফিক ভাইয়ের বাবা দিয়েছেন খন্দকার সাহেবকে, খুব জরুরী!!
নিলু খাম টা হাতে নিতে নিতে বলল ” শফিক মানে রানুর জামাই!! আমাকে দাও, আমি রানুর খালা।
খাম টা দিয়েই ছেলে টা চলে গেল, দাঁড়াল না।
নিলু কিছুটা চিন্তিত হয়ে খাম টা খুলে ফেলল— চিঠি ???

-নাঈমা পারভীন অনামিকা