ধ্রুবতারা (৩য় পর্ব)

ডিমলা থানার অধীন গয়াবাড়ি ইউনিয়নের অন্তর্গত ছোট্ট একটা গ্রামের নাম জমশেদপুর। তিস্তা নদীর পাড়ে বেড়ে উঠা ছোট্ট এই গ্রামখানা একটা প্রাইমারী স্কুল , মক্তব , একটা কাঁচা বাজার ও প্রায় শ’ তিনেক ঘরবাড়ি নিয়ে গড়ে উঠেছে। এই গ্রামের ঠিক পাশ দিয়ে বয়ে চলা তিস্তা ব্যারেজের একটা ক্যানেল সোজা গিয়ে তারাগঞ্জ থানার সাথে সংযোগ হয়েছে। বর্ষাকালে যখন তিস্তার পানি বেড়ে যায় তখন এই ক্যানেল গুলো নদীর ঘোলা জলে পরিপূর্ণ রূপে ভরে উঠে। এছাড়া খরার সময় ক্যানেল গুলির নিটোল স্বচ্ছ বদ্ধ জলে শাপলা শালুক ফুটে থাকে। ক্যানেলের আশেপাশের চাষের জমিগুলো খরার সময় এই ক্যানেলের পানি দিয়ে চাষাবাদ করা হয়। এছাড়াও ক্যানেলের এই জলে অনেক দেশি মাছ পাওয়া যায়। স্থানীয় মানুষজন এই মাছ ধরে থাকে। বিকেলের মিষ্টি সোনালী রোদ এই জলের উপর পড়তেই পানি কেমন জানি চিকচিক করে উঠে। আর ক্যানেলের পাড় ধরে যতদূর চোখ যায় শুধু রাশি রাশি কাশফুলের সমারোহ লক্ষ্য করা যায় ।

বিকেলবেলায় রাজন একাকী আনমনে ক্যানেলের পাড়ে কাশবনের ধারে চুপটি করে বসে আছে। হঠাৎ পায়ের আওয়াজ পেয়ে পিছন ফিরে চাইতেই মিনুকে দেখতে পায়। মিনুর পড়নে আজ লাল পাড় গাঢ় সবুজ শাড়ি। দুহাত ভর্তি সেদিন রাতে রাজনের দেয়া কাঁচের চুড়ি। কাঁচের চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ তুলে হালকা কোমড় দুলিয়ে লাজুক পায়ে সে রাজনের সামনে এসে দাঁড়ায়। রাজন মুগ্ধ নয়নে তার দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকতেই মিনু চট করে নিজের বুকের দিকে একনজর তাকিয়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে তার অষ্টাদশী শরীরের তীক্ষ খাঁজ বৃথাই ঢাকার চেষ্টা করে। পরক্ষণেই মিষ্টি করে হেসে উঠে।

” আইজ কি আপনের মনটা খারাপ ? ক্যামন য্যান নাগিচ ? ”

” হ , ঠিকই কইচিন ! মুনটা ভালা নোয়ায় , এলায় বসি আচি। ” একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উত্তর দেয় রাজন ।

” হামাক ক্যামন নাগিচ , কই কিচু কহিলেন না তো? এলায় কি জন্নি সাজিয়া আসিচ আপনের দারত কন দিকি? ”

” তুই খুব ভালা মাইয়া রে মিনু ! মুই তুর যোগ্যি নোয়ায়। তুর দিকত তাকানি পরে মোক বুকের বিত্তরে ওমাই য্যান ফাল দিয়া উটে ! ”

“এলায় কি জন্নি আপনের মুনে ফাল দিয়া উটে কন দিকি ? হামাক কি আপনের একনায় দেকিবার মুন চাইনা ? ”

” আরে দূর পাগলী , এলায় এয়লান কি কস ! তরে মুই বুকের মইদ্যে কই রাখিচ হ্যার হদিস তুই কি জানস লা ? মুই আচি আরেক চিন্তত । ”

” আপনে এলায় আবার কি চিন্তা করিচেন লা ? ”

” তুই কি বুঝিবারে মোর মইদ্যে কি ডাংগাইতাচে ? ক্যামোনে যে তুরে বুঝাইম ? এইকান কুনো কাম কাইজ নাই। পাইসা কইথনত কামাই করিম তা বুঝিবার নোয়ায় পারিচি লা ? তরে যে কিয়াম পাই ? কবে পায়াম , কিসক পায়াম তা নোয়ায় জানি ! তর হাতকান হারা জীবনের নায়ান ধরি থাকিবার মুই পারিম কিনা তাই চিনতত আচি। প্যাডের খিদা মুই সইহ্য করি পারিবো কিন্তুক তরে হারানোর ব্যাথা মুই ক্যামোনে সইহ্য করি ক দেকি ? জন্মের পরথনত মুই এতিম আছিন। ভাবি ছিলাম তরে জড়াই ধরি হামি বাঁচি থাকিম। একনা যদি তরে হারায় ফেলি তয় মুই ক্যামোনে বাঁচিম ! ”

মিনু চট করে রাজনের মুখে হাত চাপা দিয়ে বলে উঠে , ” আপনে এ্যায়ম কতা আর মুকে নোয়ায় আইনেন , আর নোয়ায় শুনিবার চাই। ”

মিনু আবারও বলে উঠলো , আপনে কুনো চিন্তা নোয়ায় করিয়েন। উপ্রেত আল্লাহ্ আচে , ত্যানে সবি দেকিচ। তিনিই একটা কিচু ঠিক করি দিবেন লা। হামাক চাইরটি ভাত দিলেই হবি। নোয়ায় দিবার পারলি নোয়ায় দিবিন , ক্ষতি নাই। কত্তদিনত বাপে খাওন দিবার নোয়ায় পারিচে। হামার না খায়া থাকনের অভ্যাস আচে। হামাক নিয়া আপনে মুটেও চিনতিত হইয়েন না। এলায় চিন্তা করিতে করিতে আপনের যদি একটা খারাপ কিচু অয় তাইলে মুই বিষ খামু এই হামি কয়া দিয়াম। ”

” দুর পাগলী , এলায় এসব কি কস ? দ্যাশত যখন কুনো কাম কাইজ নাই তয় ঢাকায় চলি গিয়া ওয়ানে কিচু একটা কাম করিম। ”

” আপনে ঢাকায় চলি গেইলে মুই এ্যাকেলা ক্যামোনে থাকিম ? হামি নোয়ায় খায়ি থাকত পারিম , কিন্তুক আপ্নেরে নোয়ায় দেখি থাকত পারিম লাই। ”

” মুই কি হারা জীবনের লয় চলি য্যাচি ? একটা কিচু কাজ জোগাড় করি আবারও মুই ফিরি আসি তোর বাপরে রাজি করাইয়া মুই তরে ঘরে তুলিম । ”

মিনু অশ্রুসজল নয়নে রাজনের হাতদুটো ধরে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠলো ,
” নোয়ায় , আপনে ঢাকায় যাইতত পারিবেন না। মরতে অয় এই কানত দোনোজন না খায়ি মরিম। তাও মুনে শান্তি থাকিবে। ঢাকায় কেউ একবার গেলি হে আর না ফিরি আসে। হামাকেরে গেরামের কত্তজন হেই যে ঢাকায় গ্যাচে আর ফিরি নোয়ায় আইসে। হামি আপনেরে ঢাকায় যাতি নোয়ায় দিমু। নোয়ায় লাগিবে আপনের চুড়ি ফিতা। শুদু আপনের বুকেত হামাক এট্টু ঠাঁই দিয়েন। ” কথাগুলো বলে মিনু শাড়ির আঁচলের খুঁটায় চোখ মুছতে মুছতে চলে গেল॥

( চলবে )

-ফিরোজ চৌধুরী