ধ্রুবতারা (৫ম পর্ব)

রাজন গাজীপুরে এসে অনেক চেষ্টার পর তার গ্রামের এক লোকের সহায়তায় এক গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীতে চাকরি পেল। চাকরি পাওয়ার পর থেকেই সে খুব আন্তরিকতার সাথেই ডিউটিটা করতে লাগলো। এছাড়াও এখন প্রতিদিনই সে নিজের ডিউটির সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও অভার টাইম ডিউটি করে অতিরিক্ত কিছু টাকা জমানোর চেষ্টা করে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে মিনুর কথা মনে হলেই তার বুকের ভিতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠে। কত্তোদিন হলো মিনুকে দেখেনা সে। দাদিই বা কেমন আছে ? কি যে করছে বুড়ি ? কিই বা খাচ্ছে , কোন কিছুই তার জানা নেই। এখন সে যে টাকা রোজগার করছে তাতে করে দাদিকে সে নিজের কাছে নিয়ে এসে একটা ঘর ভাড়া করে থাকতে পারবে। খুব ছোটবেলায় বাপ মা মারা যাওয়ার পর থেকেই এই দাদিই তাকে খেয়ে না খেয়ে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছেন। তাই সে মনেমনে ঠিক করেছে , সামনের মাসে ম্যানেজারের কাছে কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে গ্রামে গিয়ে মিনুকে একনজর দেখে আসবে আর বুড়ি দাদীকে সাথে করে নিয়ে আসবে।

আজ বাদ জুম্মা মিনুর সাথে জমিরের বিয়ে সম্পন্ন হল। মিনুর বাবা জনা দশেক বরযাত্রী ও গ্রামের কিছু লোকজনের জন্য দুপুরে খাওয়ার আয়োজন করতে লাগলেন। মেহমানদের খাওয়ানোর পর পানের বাটা নিয়ে সবাইকে পান বিতরণের সময় এক পর্যায়ে মিনুর বাবাকে চেয়ারম্যান রুস্তম আলী আড়ালে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন , ” বেটির বিয়া তো ভালাই দিলেন বাহে ! ত্যালে গাবরুরেত কি দিচেন ? ”

নূর ইসলাম একটু হেসে উত্তর দিল , ” ফ্যাদলা মুই না কই। গাবরুত কিচু না দিবার লাগিচ ! ওঙ্কার কুনো ডিমান্ড নাই। তয় ছাওয়াক সাজােনের লাগত ওর মায়ের এক গাচি সোনার চুড়ি ও মালা আচিল। তয় স্যাকরার কাছত থন ভাঙ্গি এলায় গড়াই দিচি। এর সাথত একটা আংগুটি ও নোলকও বানায় দেয়া ল্যাগিচ। বাড়িত এক্কান ভোকরা পাটা আচিন তাই হাটত বিক্রি করা নাগিচ। দাদনের কাছত চল্লিশ হাজার টিকা কর্জ করিবার লাগিচ। মোর একটাই ছাওয়া। ত্যান এইকনা কশটিয়া নোয়ায় করি। একনা মুই গোটালে ফকির। এ্যামতন উন্দাও হয় আচি। একনা কর্জ শেষ নোয়ায় পর্যন্ত কোষ্টা শাক ও ঢেঁকিয়া খায়া থাকিম। তোমরা হামার বাড়িত আইচেন এতোই মুই খুব খুশি। আপনেরে সব্বাই মিলি হামাকেরে ছাওয়াদের নিগ্যা এট্টুক দুয়া করি দিবেন , য্যান তারা ভালা ভালায় দিন গুজিবার পারে ! ”

চেয়ারম্যান দ্রুত উত্তর দেয় , সব ঠিকই আছে বাহে ! তুমার দেয়া খাওন দাওন ভালা আছিল। দেকিচি বিয়াত মাইনও পড়িচ বেশ ভালায় ! ”

মিনু শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার পর থেকেই সারাদিন মনমরা হয়ে থাকে। বাড়ির কারও সাথে তেমন বিশেষ কোন কথা বলে না। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলেই শুধু উত্তর দেয়। বাকি সময় সে চুপ করে থাকে। তবে সংসারের সব কাজ সে একমনে চুপচাপ করে যায়। এইসব দেখতে দেখতে একদিন রাতে ভাত খাওয়ার পর বিছানায় শুয়ে মিনুর হাত থেকে পানের খিলি নিতে গিয়ে জমির হঠাৎ প্রশ্ন করে ” তুই কি হামাক বিয়া করি সুখী হচিন না রে বৌ ? ”
মিনু কোন উত্তর না দিয়ে মাথাটা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।

” তুমি হামার কাছত এট্টু বও তো বৌ। ক্যান য্যান নাগিচে হামাক বিয়া করি তুই সুখী নোয়ায়! হারাদিন মুন মরা হয়ি চলিস ক্যান লা ? কি হচে তর ? হামাক সব খুলি ক!না অয় কয়দিন বাপের বাড়িত থন ঘুরি আয়। ”

মিনু তবুও নিরুত্তর থাকে। জমির তার কাছে এসে বিছানায় জোর করে বসিয়ে দিয়ে ডান হাত দিয়ে মিনুর থুতনিটা আলতো করে উপরে তুলে ধরতেই মিনু দুচোখ বন্ধ করে ফেললো। তার বন্ধ দুই চোখের কোল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তে দেখে জমির একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে হতাশা মিশ্রিত গলায় বলে উঠলো , ” হামি কি তর মুনে কুন আঘাত দিসি রে বৌ ? কাঁই তোরে কিচু কচে ? এলায় ক্যান কান্দিচ ? বিয়া অওনের পর দেকি কতজন বৌ ভাতার মিলি কত রঙ্গ করে। হামাক কি তুই স্বামী বল্যা ম্যানবার পারিচেন না ? না হামার বয়েস এট্টু বেশি তয় তোর মোক পচন্দ নোয়ায় ? ”

মিনু মুখটা আবারও নীচু করে উত্তর দেয় ,
” হামার নোয়ায় কিচু হচে ! মুই ভালা আছিন। আপনে হামাক আর কিচু কইবেন ? ”

আবারও একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে জমির বলে উঠে ,
” কাইল তরে অটোত তুল্যা দিমু লা। কয়দিন বাপের বাড়িত কাটি আই। আর ঘরের কুণে ছিপডা এট্টুক দে দিকি। ছিপডা নিয়া এলায় ক্যানেলের ধারত মাছ মারিবার যাই । ”

” এলায় আপনে এত আইতত কোনটে যাতিচেন ? নিদ নোয়ায় পারি ক্যাংকা আইত পার করিবেন লা ? ”

জমির একটু কাষ্ঠ হাসি দিয়ে বলে , ” হামার ঘুম আইজ আর না আইসে ! অনেক ক্যা দিন ক্যানোলোত মাচ ধরিবার যাই নাই । মুই যাওনের পর কাপাটটা আওজা দিয়া নিদ পারিবার যাস । ”

সামনের মাসে রাজনের দেশের বাড়ি যাওয়ার আগেই তার দাদীর মৃত্যু সংবাদ পেতেই কালবিলম্ব না করে সে নীলফামারীর উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।তারও কিছুদিন আগে লোক মারফত মিনুর বিয়ের খবর পেয়ে ভীষণ মুষড়ে পড়ে রাজন। বুকের ভিতর কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। কি এক অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে সে দিনগুলি কোনরকমে পার করছিল। ভেবেছিল এর এক ফাঁকে দেশে গিয়ে বাপের ভিটে বিক্রি করে দিয়ে সারাজীবনের মত গ্রাম ছেড়ে দিয়ে দাদীকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসবে। যেখানে মিনু নেই সেখানে আর সে ফিরে যাবে না। কিন্তু দাদীর মৃত্যুতে তার সবকিছুই কেমন যেন অলট পালট হয়ে গেল ।

দাদীর মারা যাওয়া আজ দিয়ে তিনদিন হচ্ছে। এখন আর এখানে থাকার কোন মানে দেখছে না রাজন। ভাবছে আজ রাতের ট্রেন ধরে সে ঢাকায় চলে যাবে । হঠাৎ পাশের বাড়ির হামিদ ব্যাপারীর মেয়ে কুলসুম এসে চুপিচুপি রাজনকে জানালো , আজ রাতে পুকুর পাড়ে মিনু তার জন্য অপেক্ষা করবে। রাজন যেন অবশ্যই সেখানে যায় ।

রাতে পুকুর পাড়ে পৌঁছাতেই রাজন চাঁদের আবছা আলোয় মিনুকে বসে থাকতে দেখে। আজ কেমন যেন এক ধরনের অস্বস্তি নিয়ে রাজন তার দিকে এগিয়ে চলে। মিনু এখন অন্যের স্ত্রী। বুঝতে পারছে না মিনুর সাথে কিভাবে কথা বলবে আর তার সাথে কিইবা কথা বলার থাকতে পারে ?

“ক্যারে মিনু , তুই ক্যাংকা আচন ? ”

” মুই ভালা আচিন ! হামার না বিয়া অইচে ! মুই খারাপ থাকিম ক্যান লা ? ”

” হামাক তুই ক্যান ডাকিচিস ? ”

” হামি আপনেরে একটি বার দেখিবার জন্নি ডাকিচিলাম ! সারাজীবনের লাগান আপ্নেরে মুই হারায়ে ফেল্যাচি ! শ্যাষ বারের লাগান আপ্নেরে দুই চোখ ভরি দেখ্যা মুই চলি যামু। আপ্নের কাছত মুই ক্ষেমাও চাইম। তা নাইলে হামি মরি শান্তি পাইম না। ”

” এইগুলান কতা বাদ দে মিনু । কি লাভ হবি এইসব ফ্যাদলা কতা বলি! যে যাবার সেতো মোর কাচত থন চলি গ্যাচে! মিচাই আর কতা বাড়ায়ে লাভটা কি হবি শুনি! ”

” আপনে একটা বিয়া করেন। এইরম আকেলা
আকেলা কাঁই থাকিবার পারে ? হামার এ কতা কওয়া মানায় না। ”

রাজন কোন কথা না বলে চুপ করে থাকে। একটু পর রাজন আস্তে করে বলে উঠে , ” মিনু আইত অনেক হচে তুই বাড়িত যা ! তুই একন অন্যের বৌ ! কেউ দেখ্যা ফেলিবার পারে ! তকুন তুর মান ইজ্জত সব যাবি ! ”

মিনু শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বলে উঠে ,
” আপনের হাত দুকান এট্টু বাড়াই দিবেন ? হামি শ্যাষ বারের নাগান আপনের হাত দুটি ধরব্যার চাই ! ”

” শ্যাষ বারের নাগান মানি ? তুই কি কইবার চাস ? ”

” আপনেই তো কইনেন , হামি একন পরের বৌ ! কাইল সক্কালে হামি শ্বশুর বাড়ি চল্যা যামু । তয় কাঁইতরত বৌ এত আইতত কুন বেগানা পুরুষের সাথত দেকা করিবার চায় ? ” এই কথা বলেই মিনু রাজনের হাত দুটি জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে ।

রাজন তার পিঠে নিজের হাত খানা দিয়ে সান্তনা দিতে গিয়েও শেষ মুহূর্তে হাতখানা মিনুর পিঠের উপর থেকে সরিয়ে নেয়। ব্যাপারটা খেয়াল করে মিনু আর্তনাদ করে আকাশের দিকে মুখ তুলে বলে উঠে ,
” হায় খোদা তুমি সবকিচুর স্বাক্ষী আচ ! এই কুন শাস্তি তুমি হামারেক দিলা ! যারে শিশুকাল থাইকা স্বামী বলি মানচিলাম , তারে তুমি হামার কাচ থন কাড়ি নিলা ! হামি কি নিয়া বাচিম ! ” কথাগুলো বলতে বলতে মিনু হঠাৎ নিচু হয়ে রাজনকে কদমবুচি করে এক দৌঁড়ে পুকুর ঘাট থেকে চলে গেল ।

মিনু শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার পরেরদিন সকালে মিনুর বাপ নূর ইসলামের কাছে খবর আসল , আজ ভোরবেলায় মিনু ধুতুরা গাছের ফুল খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। বর্তমানে তাকে বাঁচানোর জন্য ডিমলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক ।

দুঃসংবাদটা শুনা মাত্রই নূর ইসলাম হাউমাউ করে কেঁদে উঠে হাসপতালের দিকে ছুটে গেল ॥

গাবরু : বর
নাগিচ : লেগেছে
ফ্যাদলা : গুরুত্বহীন কথা
কশটিয়া : কৃপণ
কোষ্টা শাক : পাট শাক
এইকনা : এতটুকু
নোয়ায় : না
উন্দাও : ন্যাংটা
এ্যামতোন : এমন
ভোকরা পাটা : বড় পাঠা

(আগামী পর্বে সমাপ্ত)

-ফিরোজ চৌধুরী