নপুংসক ( ৬ষ্ঠ পর্ব )

‘এই ব্যাটা, তোর কি হইছে?’

প্রশ্নকর্তা সুন্দরি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে মনে হল,
আমি অন্যমনস্ক ছিলাম। নিজেকে আবিষ্কার করলাম খোলা ম্যানহলে নোংরা কাঁদা পানিতে দাঁড়িয়ে। হাস্যমুখের উৎসুক মানুষের মধ্যে যে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে টেনে তুলেছে সে হলো এই রুপবতী মেয়ে।

‘এমনে চাইয়া দেহস্ কি?’

মেয়েটির প্রশ্নে অবাক হয়ে লক্ষ্য করে বুঝলাম, এই অদ্ভুত সুন্দরি মেয়েটি হিজড়া সম্প্রদায়ের একজন।

‘রাস্তা চোহে দেহস্ না?’

আমি রাস্তা দেখেই তো যাচ্ছিলাম। বেড়িয়েছিলাম মায়ের দেয়া রশিদগুলো নিয়ে পোস্ট অফিস যাবার জন্য। কিন্তুু ভেবেছিলাম রুনুকে ।
রুনু আজ সকালে আমার ঘরে এলো। বাবার অসুস্থতার কারণে এ কয়দিন রুনুর দেখা মেলেনি তেমন করে। বাবা সুস্থ হয়ে ফিরলেও বাড়িটা এখনও অসুস্থ হয়ে রয়েছে। ছোটমা আগের মত চেচাঁমেচি করছেন না। রুনু নিজের মত থাকছে। বাবাও কেমন চুপচাপ হয়ে গেছেন। বাবার চিকিৎসা খরচে সংসারের সবার হাতের সব পয়সা বেড়িয়ে গেছে। তিনতলার নাজমা আন্টি ছোটমার কাছে বিশ হাজার টাকা রেখে গিয়েছিলেন। সেটাও গেছে। আজ সকালে আন্টি এসে টাকাটা চেয়ে গেছেন। বিশ্বাসে রেখে যাওয়া তার আমানত খোয়ানোর ভয়ে চিন্তিত তিনি। আমাকে জামা গায়ে দিতে দেখে রুনু বলল,

‘দাদা কোথাও যাবে?’

‘কেন রে?’ প্রশ্ন করেই মনে হল গতকাল রাতে ছোটমা বাবার ঔষধ এনে দিতে বলেছিল।

‘তুই বস আমার কাছে’

রুনু বসল কিন্তুু চুপ করে রইল। আমি আবার বললাম,

‘তুই মুখটা এমন শুকনো মলিন করে রেখেছিস্ কেন বলতো? দাদা আছে না, এত ভাবিস কি?’

‘তুমি মামুনের সাথে দেখা করেছিলে?’

মামুন নামে কাউকে চিনলাম না, শোনা নাম মনে হচ্ছে। পরেক্ষনেই বুঝলাম। বললাম,

‘তোকে কিছু বলেছে? কথা হয় তোর সাথে?’

‘বলেছে, আবার তুমি দালালি করতে গেলে খবর করে ছাড়বে তোমার । তুমি যেওনা ওদিকে।’বলেই রুনু মুখ নামিয়ে ফেলল, যেন লজ্জা পেল।

‘ঠিক আছে যাবনা। তুইও ওসব ভুলে যা’

‘আমাকে নিয়ে ভেবোনা। আমি ঠিক আছি।’

‘ঠিক থাকলে কাঁদিস কেন এত? ‘

রুনুর শান্ত নিভে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে আবার বললাম,
‘তোকে আমি ভাল একটা ছেলের সাথে বিয়ে দেব।
এতটা সুখে থাকবি যে, আমি গেলে আমাকে দেখে বলবি, এ কে?’

রুনু শুকনো হাসির চেষ্টা করে মৃদুস্বরে বলল,

‘আমি বিয়ে করবো না দাদা। অন্য কাউকে ঠকাতে পারবো না।’

আমি কিছুটা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকলাম ওর দিকে। রুনুর চোখ ভরে পানি চলে এলো। সে তা লুকানোর চেষ্টাও করলো না। কাঁদতে লাগলো।

আমার মাও নিশ্চই এমন করে কাঁদতেন নিজের কাছে নিজেকে হারিয়ে! রুনুর হেরে যওয়া আমি বুঝতে পারছি, মায়ের হেরে যাওয়াটা কেন বাবা বুঝলো না? মানুষের স্বার্থ তার ভালোবাসার থেকে বড় হয়? আমি আমার হাত বাড়িয়ে রুনুর হাত ধরলাম। ভরসার হাত। যে হাত বলে দেয়, ‘আমি আছি’

‘তোর পা তো কাইটা গেছে। রক্ত পরতাছে। যাবি ক্যামনে?’ সুন্দরি হিজড়া মেয়েটার কতায় সম্বিত ফিরল আমার,
তাকিয়ে দেখি ম্যানহলে থাকা ধারালো কিছু দিয়ে আমার পায়ের পিছনে অনেকখানি কেটেছে।

‘তুই চুপ কইরা এহানে দাড়া। লোক আইতাছে। তোরে ডাক্তারের কাছে লইতে হইব’

ম্যানহলের পাশে আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম। পা বেয়ে রাস্তায় রক্ত পড়ছে। আমার কিছু করারও ছিলনা। এ অবস্থায় কারও সাহায্য ছাড়া উপায় নাই। কিছুক্ষণ পর লোক বলতে তার মতই আরেকজন এলো। আমি কিছুই বললাম না। ওদের কথামত রিক্সায় উঠলাম।
পায়ে চারটা সেলাই দেয়া হলো। এ্যান্টিসেপটিক ইনজেকশান দেয়া হলো। ঘন্টা দুয়েক পরে ডাক্তার আমাকে ছাড়লেও সুন্দরি তানিয়া, কেয়া আমাকে ছাড়লো না। রিক্সায় বসে ওদের সাথে বেশ কিছু কথা হয়েছিল।ওদের নাম শুনে নিয়েছিলাম।ওদেরকে নিয়ে রিক্সা করেই পোস্ট অফিস গেলাম। পোস্ট অফিসার অবাক চোখে আমাকে বারবার দেখতে লাগলো। সম্ভবত: ভাবছিল, আমি ওদের মত কেউ কিনা?

বাবার ঔষধ আমার আমার নিজের ঔষধ নিয়ে ওরা আমাকে বাড়ি পৌঁছিয়ে দিল রাত দশটায়। ছোটমা তানিয়া, কেয়ার দিকে বিন্দুমাত্র আগ্রহ না দেখিয়ে আমার অবস্থা দেখে প্রথমবারের মত বিচলিত হলেন। তার চোখে তখন ছিল তার দ্বিতীয় অবলম্বন এই আমার হাতটা ছুটে যাওয়ার ভীষণ ভয়…..

চলবে……

-বেলা প্রধান