নপুংসক ( ৮ম পর্ব )

অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে মীরা বলল
‘তোমার পায়ের অবস্থা কি?’

ফোনে মীরার কন্ঠ এত সুন্দর আসে যে, আমার কানে নয় বুকে বাজে। ক্যামন সুখ সুখ লাগে। সুখটাকে গিলে আমি বললাম,

‘আজ যাব বিকালে সেলাই কাটতে’

আবারও নিরবতা। আমি ফোন কানে বসে রইলাম। জানি মীরা ওপাশে আছে। ও কথা খুঁজে পাচ্ছে না। আমিও কিছু বলছি না।

‘তুমি আজকাল কেমন যেন পাল্টে গেছো! তোমার কি হয়েছে বলবে আমায়? ‘মীরার কথায় হতাশা ছিল

আমি মৃদু হাসলাম।
‘ তুই বসে বসে আজাইরা এত ভাবিস কেন? আমার কিছু হয়নি। ভাল আছি।’

‘ আমাকে মিথ্যে বলে ভাল লাগে তোমার?’

এবার আমি চুপ রইলাম। জানি মীরাএখন কথায় কথায় আক্রমন করবে। বিরক্তি দেখিয়ে বললাম,

‘সকাল সকাল ফোন করে প্যান প্যান করিস না তো। আমি বাইরে যাব। ফোন রাখ।’

‘হাঁটতে কষ্ট হয়না?’ মীরা বিরক্তির অভিনয় বুঝতে পারে। মেয়েরা ছেলেদের এসব চট করে বুঝে ফেলে সহজেই কিভাবে?

‘হয় সামান্য। ঠিক হয়ে যাবে। রাখ তো,ফোন রাখ।

আমিই ফোনটা কেটে দিলাম। আর কথা নয়। মীরা আমাকে ঘায়েল করার আগে কথার আক্রমন থেকে বেড়িয়ে এলাম।নিজের মনের অস্থিরতা সব কাছের মানুষগুলোর উপর প্রভাব ফেলছে আমি বুঝতে পারছি। বাবাও কাল রাতে একই প্রশ্ন করেছিল খাবার টেবিলে।

রেস্টুরেন্টে ঢোকার মুখেই আজও মঈন চাচার সামনে পড়ে গেলাম। তিনি অভ্যাসমত ইশারায় ডাকলেন।

‘আমাকে দেখে পালাচ্ছ কেন? তোমার পায়ের খবর কি? শুনলাম, রাস্তায় ম্যানহলে পড়ে গিয়েছিলে? ইয়াংম্যান, এই বয়সে লাইফ ইনজয় কর। কি সব ওল্ডম্যান সেজে আছে বলতো!!’

আমি হাসলাম,’আজ বাজারের ব্যাগ দেখছি না যে চাচা?’

‘আজ ছেলে গেছে বাজারে। স্পেশাল কোন দিন হয়তো আজ। বাসায় দেখলাম,সাজ সাজ রব। তুমি বল, কি করছ আজ কাল?’

‘তেমন কিছু না, চলছে তো।’

‘চলছে তো জানি। আজকাল হিজড়াদের আনাগোনা তোমাদের বাসায়,ব্যপার কি?’

চাচার প্রশ্নে আমার বিরক্ত লাগছে। হিজড়ার ব্যাপারটাতো তার জানার কথা তারপরও প্রশ্ন কেন?

‘হিজড়ার আনাগোনা ক্ষতিকর নয় চাচা তাই না?’

হিজড়াদের সাথে এক রিক্সায় রুনু ঘুরছে জানলে তো ভয় বা দোষের কিছু নাই।’

আমার চা শেষ হয়েছিল। কাপ রেখে চাচার অবাক করা চাহুনি উপেক্ষা করে আমি উঠে এলাম। বৃদ্ধ বয়সে মানুষ এমন ছুকছুকে হয় কেন বুঝিনা।
আকাশের দিকে তাকালাম। পরিষ্কার ঝকঝকে আকাশ। পায়ের অংশটা ছাড়া শরীরটা অন্যদিনের চেয়ে ভাল লাগছে। একটা রিক্সা নিয়ে মীরার বাসায় চলে গেলে হয়,অনেকদিন যাওয়া হয়নি।

দিনের শুরুটা দেখে বুঝিনি রাতটা ভয়ঙ্কর হবে। তানিয়া, কেয়া ছাড়াও আরো কয়েকজন মিলে রাত আটটার দিকে আমাদের বাসায় এসেছে। রুনুর ঘরে ওরা বসে আছে। আমি বসে আছি বাবার সামনে। বাবার অস্থিরতায় ছোটমা বারবার উদ্বিগ্ন হয়ে বলছেন,

‘তুমি শান্ত হও, এটা আমাদের ভয় পাবার কিছু নেই। আমরা তো কিছু করিনি।’

আমার দিকে তাকিয়ে আবার বলছেন,
‘বাবলু, যা, ওদেরকে এখান থেকে যেতে বল। ওরা এখানে থাকলে আমরা বিপদে পড়বো।’

ঘটনাটা বলি আসলে কি ঘটেছে-
রুনুর সাথে তানিয়া, কেয়ার ঘনিষ্ঠতার কারণেই সম্ভবত তারা মামুন ছেলেটা সমন্ধে সব জানতে পেরেছে বলে মনে হয়। ঐ পলিটিকাল ক্ষমতাধর বাবার ছেলে রুনুর জীবন নষ্ট করে চলে যাবে, আর আমরা কিছু করতে পারিনি এটা ওদের কাছে ঠিক মনে হয়নি। তাই তারা প্রতিশোধ নেয়ার জন্য ছেলেটাকে একা পেয়ে দল বেঁধে ধরেছিল। রাস্তার পাশে কোন সিডির দোকানের সামনে তারা ছেলেটাকে অপমান করেছে। শুধু তাই নয়, তারা নিজেরা ওকে ঘিরে নেংটো নাচগান করা ছাড়াও তানিয়ার কথায় হিজড়ার দল মামুনের প্যান্ট খুলে নেংটো করেছে। ছেলেটা একা থাকায় কিছু করতে পারেনি, তবে তানিয়াকে গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে মামুন।

বাবা বিছানা ছেড়ে একবার উঠলেন, আবার বসলেন। বাবা অস্হির হলে বারবার ডান হাতের কব্জি দিয়ে কপাল মোছেন। এখন তিনি তাই করছেন। আমাকে বললেন,

‘বাবু, ওরা আমাদের বাসায় কেন আসে বল? তুই ঢুকিয়েছিস ওদেরকে এই বাসায়। বল ঠিক কি না?’

আমি বাবার মত অস্থির নই বরং কেন জানি শান্তি শান্তি লাগছে। যেন মনের কোন কষ্ট ধুয়ে গেছে। কিছু কাজ আছে না করতে পারার কষ্ট ভিতরে সবসময় যন্ত্রণা দেয়। আমার সে রকম একটা কষ্টের আজ অবসান হয়েছে। আমি তাই শান্ত হয়েই বাবাকে বললাম,

‘বাবা, আমি ওদের যেতে বলছি। তুমি ঘাবড়িও না। আমরা তো কিছু করিনি। যারা এ কাজ করেছে, কিছু হলে তাদের হবে।’

বাবা আবারও অশান্ত আর রুক্ষ স্বরে বললেন,

‘আহা, তুই বুঝতে পারছিস না, ওরা যে আমাদের বাড়িতে আাসা যাওয়া করে এটা তো সবাই জানে। আমরা ওদেরকে দিয়ে এসব করিয়ে নিয়েছি, তা কি মামুন ভাবতে পারেনা?’

‘কিছুই হবেনা বাবা, আমি দেখছি’ বলে উঠে এলাম বাবার সামনে থেকে। নিজের অস্থিরতা যদি অন্যের উপর প্রভাব ফেলে তাহলে নিজের শান্তিটা অন্যকে প্রভাবিত করছে না কেন কে জানে..।

রুনুর চোখে পানি। তানিয়া ওর মাথায় হাত রেখে সম্ভবত শান্তনা দিচ্ছিল। আমাকে দেখে তানিয়া ওর কাছ থেকে উঠে এলো। আমার সামনে দাঁড়িয়ে মুখোমুখি হলো।

‘বাবলু ভাই, ঠিক করেছি না?’

আমি কিছু না বুঝেই বললাম,’ঠিক করেছো’

রুনু কান্না ভুলে আমার দিকে অবাক চোখে চেয়ে রইলো যেন কথাটা বলে অপরাধ করে ফেলেছি। আমি তানিয়াকে বললাম,’ তোমরা পালিয়ে যাও’

-বেলা প্রধান

চলবে…..

https://m.facebook.com/groups/1749042645384412?view=permalink&id=2214452462176759