নীলাদ্রির দ্বিতীয় আমার প্রথম বিয়ে

খুব অভ্যস্ত হাতে নীলাদ্রি একে একে আমার শাড়ি, শাড়ির সেফটিপিন, খোঁপার কাঁটা এবং গয়নাগুলো শরীর থেকে খুলে টেবিলের ওপর রাখছিল। দীর্ঘ বিশ বছর সংসার করার অভিজ্ঞতা প্রথমা স্ত্রীর সাথে। অতএব এ জাতীয় কাজ তার ভালোই রপ্ত থাকার কথা এবং আছেও।

যাই হোক, প্রায় পাঁচ কেজি ওজনের কাতান শাড়ির ভার বইতে আমার লিকলিকে শরীর এদিক ওদিক হেলে-দুলে যাচ্ছিল। দীর্ঘ ছয়-সাত ঘণ্টা এই ওজন বহন করে ক্লান্ত, শ্রান্ত আমি। বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এলে নীলাদ্রি ধবধবে সাদা একটা গাউন ধরিয়ে দিলো, ‘এটা পরে নাও।’ কিছু না বলে বাধ‌্য মেয়ের মতো চুপচাপ হাত বাড়িয়ে গাউনটা নিয়ে পরে ফেললাম।‌ সাদা গাউনটায় অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল আমাকে। হলদে ফর্সা আমার গায়ের রং। মা বলত, ‘সোনার বরণ মেয়ে আমার।’ বাবা বলতেন, ‘ওকে সব সময় একটা কাজলের টিপ পরিয়ে রেখো তো, দিলরুবা।’

কেন যেন ড্রেসিং টেবিলের আয়নার দিকে চোখ চলে গেল। খোলা চুলে প্রসাধন ছাড়া মুখে সাদা গাউনে ভীষণ স্নিগ্ধ আর মোহনীয় লাগছিল আমাকে। ভীষণ মুগ্ধতা নিয়ে নিজেই নিজের দিকে তাকিয়েছিলাম। আয়নার মধ্যে দেখতে পেলাম, নীলাদ্রির অপলক চোখ জোড়াও আমার দিকে নিবদ্ধ। সে দৃষ্টি শূন্য ছিল, নাকি গভীর মনোযোগে আমাকে দেখছিল, জানি না! চোখে চোখ পড়তেই চোখ নামিয়ে নিলাম। নীলাদ্রি ডাকল, ‘নেহা’। ভরাট অথচ নরম গলায় একবার ডেকে চুপ করে রইলো। আমি উত্তর না দিয়ে রাজ্যের ক্লান্তি নিয়ে শুয়ে পড়লাম।

নীলাদ্রি বাসর ঘরটাও সাজিয়েছে একদম তার মনের মাধুরী মিশিয়ে। মনে মনে বললাম, ‘বুড়ো বয়সে বিয়ে করেও ব্যাটার শখ কত! তাও আবার দ্বিতীয় বিয়ে।’ হয়তো আমার জন্যই এত সুন্দর করে সাজিয়েছে। তার দ্বিতীয় বিয়ে হলেও আমার তো প্রথম বিয়ে।

ঘর জুড়ে ডিম লাইটের টিমটিমে নীলাভ আলো। নীল আলোয় গন্ধরাজ এবং গোলাপ ফুলগুলোকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল। ঘরময় ফুলের মিষ্টি গন্ধ। দুই দেয়ালে মুখোমুখি সেট করা দুটো স্পিকার থেকে স্টেরিও সাউন্ডে অল্প ভলিউমে বাজছিল পুরনো দিনের বাংলা গান। কিন্তু এতসব আয়োজন আমার কাছে অসহ্য লাগছিল। মনে হচ্ছিলো এক দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে যাই। বিশাল বেডরুম। কম করে হলেও ৪০০ বর্গফুটের হবে এত খোলা জায়গায়ও আমার হাঁসফাঁস লাগছে। ঘুম আসছে না। তবুও চুপচাপ ঘুমের‌ ভান ধরে কাত হয়ে শুয়ে আছি। নীলাদ্রিও এসে আমার পাশে শুয়ে পড়লো। আলতো করে আমার কপালে হাত রাখল।

নীলাদ্রির প্রতিটি স্পর্শ আমার রক্তধারায় যেন উত্তাল স্রোতের ঘূর্ণিমাতন! যেন ঝড়ের ডাক! যেকোনো সময় তুমুল ঝড়ে লণ্ড ভণ্ড করে দেবে সবকিছু। নীলাদ্রির পরিপক্ব হাতের আলতো স্পর্শ আমার চিবুক, গ্রীবা ছুঁতে ছুঁতে ক্রমশ নেমে যাচ্ছিল শরীরের নীচের দিকে। যেন চেনা পথে হঠাৎ দৃষ্টি হারানো কেউ। কোনো অসুবিধা হচ্ছে না পথ চলতে। এক ঝটকায় নীলাদ্রির হাতটা সরিয়ে দিয়ে বারান্দায় এসে বসলাম।

আকাশে থালার মতো একটা বড় চাঁদ। চারদিকে ঝলমলে জ্যোৎস্না। পাতার ফাঁক গলে আসা জ্যোৎস্নায় বারান্দা ভেসে যাচ্ছে। দখিনা ঠাণ্ডা, মৃদুমন্দ হাওয়ার সাথে কামিনীর ঘ্রাণ। কতদূর থেকে, কার দুঃখ কিংবা সুখ ছুঁয়ে আসা সে বাতাস, কে জানে! আমার চোখ, মুখ আর খোলা চুলগুলো ছুঁয়ে গেল পরম মমতায়। বাতাসের সাথে সঙ্গত করে চলেছে একটা উইন্ড-চাইমের টুং টাং আওয়াজ।

ক্লান্ত দুচোখ বন্ধ করে রকিং চেয়ারে গা টা এলিয়ে দিলাম। বুক ভরে দম নিলাম। অসুস্থ বাবার অসহায় মুখটা খুব মনে পড়ছে। জীবন যুদ্ধে হেরে যাওয়া একজন পরাজিত মানুষ। উঠে এসে আমাকে বিদায়ও দিতে পারেন নি। প্রচণ্ড অভিমানে ঠিক মতো তাকাই নি তাঁর মুখের দিকে। যদিও অভিমানের কোনো যৌক্তিক কারণ ছিল না। কাঁদি নি একটুও।

বিদায় নেয়ার জন্য বড় আপা আমাকে আব্বার ঘরে নিয়ে গেলেন। ব্রেন স্ট্রোক করার পরে আব্বার মুখের ডান দিকটা বেঁকে গেছে। বউ সাজে আমাকে দেখেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। অনেক কষ্টে ভেঙে ভেঙে বললেন, ‘ মা রে, তোর এই বুড়ো বাপটাকে মাফ করে দিস।’

সুঠামদেহী, সদা হাস্যোজ্জ্বল আব্বার এ করুণ উচ্চারণে আমার বুকের ভেতর যেন সবকিছু উপড়ে ফেলা উদ্ধত এক ঝড় উঠলো। ভেঙে যাচ্ছিলাম। টলমল পায়ে দাঁড়িয়ে আছি বাবার সামনে। দূরে দাঁড়িয়ে কাঁদছে ছোট‌ ভাই-বোন মিলা, রিহান, রোদসী। আমার পরেই মিলা। তারপর রোদসী। সবার ছোট রিহান। ছোট বেলায় খুব নাদুসনুদুস ছিল। আব্বা অসুস্থ হবার পর থেকে ভালো খাবার, যত্নের অভাবে দিন দিন কেমন রোগা হয়ে যাচ্ছে।

মনে পড়ছে হিমেলের কথা। কি যেন কী বলতে চেয়েছিল! কতদিন একা পেলেই পথ রোধ করেছে, ‘নেহা, একটা কথা বলতে চাই।’ শুধু একটা কথাই। একটা মিনিট সময় দাও, প্লিজ।’ ব্যস্ততার অজুহাতে পাশ কাটিয়ে গেছি। জানতাম হিমেল ভালোবাসতো আমাকে। কখনো চোখ তুলে তাকাই নি ওর চোখের দিকে। সব ভালোলাগার আকাশ দেখতে নেই। সব অনুভূতিকে ডুবতে দিতে নেই চোখের সমুদ্রে। খুঁজতে নেই পরিণতি। সময়ই বা ছিল কোথায়! সকাল-সন্ধ্যা ছুটতে হয়েছে টিউশনির পেছনে। দু’বছর হলো বাবা প্যারালাইজড হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। এতগুলো মানুষের সংসার! আমাদের সবার খাওয়া, লেখাপড়ার খরচ, বাবার চিকিৎসা, সব মিলিয়ে মা হিমশিম খাচ্ছেন। বড় আপাকেও চলে আসতে হয়েছে শ্বশুরবাড়ি থেকে। বেকার দুলাভাই ব্যবসার জন্য পাঁচ লক্ষ টাকা চেয়েছে। না দিতে পারলে তিনি আর ফিরতে পারবেন না শ্বশুরকুলে। মা কোথায় পাবেন এত টাকা!

মায়ের গোপন কান্না দেখি। বুকের ভেতরের সুতীব্র কষ্টের কালো ছায়া তার সারা মুখ জুড়ে। বুক ভেঙে যায়। ভীষণ আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মা, না খেয়ে থাকলেও কোনোদিন কোনো আত্মীয় স্বজনদের কাছে হাত পাতেন নি। আসলে পাততে হয়নি। এখন সেই মা দিন গোনেন চাচা,ফুপু, মামাদের অনুকম্পার অপেক্ষায়। কখনো কখনো মুখ ফুটে চাইতেও এখন আর দ্বিধা করেন না। দেয়ালে পিঠ ঠেকানো। হয়তো তার বুক ভেঙে যায়, দলিত মথিত হয় আত্মসম্মানবোধ।

সংসারের এই টালমাটাল অবস্থায় বড় মামী একটা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসলেন। তার বোনের ভাসুরের ছেলে।। মামীর কথার তোড়জোড়ে বোঝা যায় তিনি মোটামুটি আটঘাট বেঁধেই নেমেছেন ঘটকালিতে।

“শোনো দিলরুবা, ‘তিন বাচ্চার বাপ হলেও দেখলে বোঝা যায় না। লোকটা লম্বা, চওড়া হ্যান্ডসাম। একেবারে খারাপ লাগবে না নেহার পাশে। আর ব্যাটা মানুষের বয়স বাড়ে নাকি! তোমার সংসারে কোনো অভাব থাকবে না। ভাইয়ের চিকিৎসা নিয়েও আর তোমাকে ভাবতে হবে না। ভীষণ মানবিক মানুষ নীলাদ্রি। আমি নীলাদ্রিকে সব খুলে বলবো। বিশাল ব্যবসায়ী। টাকার অভাব নাই। ওর বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই। হঠাৎ করে বউটা মারা যাওয়ায় ছোট বাচ্চাগুলোকে নিয়ে বিপাকে পড়েছে। নেহাকে তুমি বুঝিয়ে বলো।”

মামীর ফিসফিস করা কথার মাঝে আমার নামটা শুনে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে গেলাম। মা ফ্যালফ্যাল করে মামীর মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। আস্তে করে শুধু বললেন, ‘নেহা তো কেবল কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে উঠলো। আমি চাই ও লেখাপড়াটা শেষ করুক।’ মামীর মুখের ওপর সরাসরি না বলবেন, মার সে জোর কই? তাদের সবার দয়া দাক্ষিণ্যে কোনো রকমে খুঁড়িয়ে চলছে আমাদের ভাঙা সংসার। আমাকে দেখেই মা কাঁচুমাচু করে প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাইলেন। ‘মা, তোর মামীকে একটু চা নাস্তা দে। তোর বাবাকে দেখতে এসেছেন।’

মামী একপ্রকার মাকে থামিয়ে দিয়ে নিজেই শুরু করলেন, ‘শোনো মা, তুমি এখন যথেষ্ট বড় হয়েছো। সবই বোঝো। তোমার বয়সে আমি দুইজনের মা হয়েছি। তাছাড়া আমি তো তোমাদের খারাপ চাই না, তাই না?’

মাকে বিব্রতকর অবস্থা থেকে অব্যাহতি দিতে মামী শুরু করার আগেই আমি বললাম,’আমি সব শুনেছি মামী।’ যদিও মামীর কথার কোনো উত্তর দিতে ইচ্ছে করছিল না। সুযোগ পেয়ে মামী আমার মুখের কথা একেবারে কেড়ে নিয়েই বললেন, তুমি বুদ্ধিমতী মেয়ে, আশাকরি বুঝবে।’ আমি তোমার উত্তরের অপেক্ষায় থাকবো। দু দিন ভাবো।

আমি জানি মা সারারাত ঘুমাতে পারবেন না। ‘কী সিদ্ধান্ত নেয়া উচিৎ’ এ ভাবনার দোলাচলে এপাশ ওপাশ করে আমিও রাত পার করছি । বড় আপা সবই শুনেছেন। কিন্তু তিনি কোনোভাবেই আমার ওপর চাপিয়ে দেবেন না তার ইচ্ছে। বরং আমাকে বোঝালেন, ‘কটা দিন ধৈর্য্য ধরো। দেখি আমি কিছু একটা করতে পারি কি না। তুমি কোনো টেনশন করো না।’

জীবনের পুরো ভ্রমণটাই একটা গোলক ধাঁধা। মুহূর্তেই ভীষণ অচেনা হয়ে যায় তার গতিপথ । হোঁচট খেতে হয় যখন তখন। অসুস্থ বাবার অসহায় চিন্তিত মুখ, মায়ের আত্মসম্মান, ছোট ভাইবোনদের উদ্বিগ্ন কাতর মুখ- জীবনের এই রুদ্ররূপ নিমিষেই আমাকে বয়সের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত বুদ্ধিসম্পন্ন করে দিল। মামীর কাছ থেকে শোনার পর থেকেই অনেক ভেবেছি। ছন্নছাড়া দোদুল্যমান ভাবনাগুলো অবশেষে একটা নির্দিষ্ট গন্তব্যে থিতু হলো। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললাম, নীলাদ্রিকেই বিয়ে করব।

পরের রাতেই বাবা-মায়ের ঘরে গেলাম। তাঁরা জেগে আছেন তখনো। আমি আস্তে করে তাদের পায়ের কাছে বসলাম। এত অল্প বয়সে কোথায় পেয়েছিলাম এই অপরিসীম মনের জোর কে জানে!

‘কিছু বলবি, মা?

‘হুম, আমি এই বিয়েতে রাজি মা ! তুমি মামীকে হ্যাঁ বলে দাও।’

বাবা বাম হাতে শক্ত করে আমার ডানহাতটা ধরে হু হু করে কেঁদে ফেললেন। ডান দিকটা একেবারেই নাড়াতে পারেন না। মা ডুকরে কেঁদে ওঠেন, না রে মা, না, তোর এমন সিদ্ধান্ত নেবার দরকার নেই। আমরা লোভী নই, মা। আল্লাহ দেখবেন আমাদের। তুই যেভাবেই হোক পড়াশোনা শেষ করবি, মা।’

‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি, মা। অন্তত একটা বোঝা তোমাদের মাথা থেকে নামুক। আমাকে বারণ করে কোনো লাভ নেই।’

‘তুই আমাদের বোঝা নস, মা! আমাদের জন্য খেটে মরছিস দিন রাত।’

‘সবার কাছে তুমি, বাবা এত ছোট হচ্ছো, আমার ভালো লাগে না,মা।’ আমি ঠিক নিতে পারছি না।’

‘আমরা জামাইর কাছে হাত পাতবো নাকি।’

‘জনে জনে ছোট হওয়ার চেয়ে তো ভালো। সুযোগ এলে শোধ করে দিও।

মাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আমি দ্রুতই বের হয়ে আসি তাঁদের ঘর থেকে।


প্রায় চার হাজার স্কয়ার ফিটের প্রাসাদোপম নীলাদ্রির বাড়ি। বাড়ির প্রতিটি কোণায় তার শৈল্পিক মন এবং ভাবনার ছোঁয়া। কারুকার্য খচিত সেগুনের বিশাল সিংহদ্বার গলে প্রবেশ করতেই ডাইনিং, লিভিং, ফ্যামিলি লিভিং মিলে খেলার মাঠের মতো বড় ওপেন স্পেস। দেয়ালে দেয়ালে পিকাসো, ভিনসেন্ট ভ্যান গগ, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ছাড়াও বিশ্বসেরা পেইন্টারদের বিখ্যাত পেইন্টিংস। এছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ট্র্যাডিশনাল পেইন্টিংসের সাথে আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক বিখ্যাত পেইন্টিংস, শোপিস দিয়ে ঘর সাজানো। ঘরের কর্নারগুলো ইনডোর প্লান্টে সুশোভিত। নীলাদ্রি আর তার পরলোকগত বউয়ের সৌখিনতা এবং রুচিশীলতার ছাপ সর্বত্র সুস্পষ্ট।

এত বড় আলিসান বাড়িতে শুরুতে ভীষণ অস্বস্তি লাগত। ফ্রি হতে পারতাম না। এখন বাচ্চাদের সাথে ভালোই দিন কেটে যায়। ঘরের কাজ তেমন করতে হয় না। বেশির ভাগ সময়েই নীলাদ্রির বাচ্চাদের সাথে গল্প করি, লুডু খেলি। ওরাও এখন আমার সাথে ভীষণ ভাবে মানিয়ে গেছে। বড় মেয়ে ফারিয়া ক্লাস টেনে পড়ছে। সে তো পুরাদস্তুর আমার বান্ধবী বনে গেছে। তিনা পড়ছে ক্লাস ফাইভে। একটু চুপচাপ। সবার ছোটটা ছেলে। নাম তূর্য। ভীষণ চঞ্চল। মায়ায় ভরা একটা মুখ। মায়ের মৃত্যুতে কী ভীষণ কষ্ট পেয়েছে বাচ্চাটা! এই বয়সে মায়ের সাথে খুনসুটি করে মায়ের বুকে ঘুমানোর কথা! অথচ সবার মাঝে থেকেও কী ভীষণ একা! একটু আদর করে কাছে ডাকলেই বুকের সাথে লেপ্টে থাকে। এখন আমার সাথে তার আবদারের শেষ নেই। গল্প শুনে খেতে হবে, ঘুমাতে হবে। কখনো কখনো পর্দার আড়াল থেকে একটু দেখে যায় আমি কী করছি। চোখে চোখ পড়তেই দৌড়। একটু পরেই আবার আসবে। লুকোচুরি খেলে আমার সাথে। ঠিক যেন রিহান। রিহানেরও সব দাবী দাওয়া ছিল আমার সাথে। খুব আমি ন্যাওটা ছিল। বাসায় যতক্ষণ থাকতাম আমার হাতেই খেতো, কুটুর কুটুর গল্প করত। গল্প শুনে শুনে ঘুমত আমার সাথে। এখন তূর্যকে নিয়েই ব্যস্ত সময় কাটে আমার।

মেয়েরা আজন্ম এক মমতাময়ী মা। যেকোনো বয়সেই সময়ের প্রয়োজনে তাদের মধ্যে জাগ্রত হয় চিরন্তন এক মায়ের মমতা, স্নেহ, ভালোবাসা। আমিও মাতৃহীন এই বাচ্চাগুলোর সান্নিধ্যে এসে কবে যেন নিজের অজান্তেই পুরাদস্তুর এক মা বনে গেলাম। এখন আর ওদের মুখে মা ডাক শুনতে অস্বস্তি লাগে না। ওদের ছাড়া ভালো লাগে না।

সেই রাতের পর থেকে শারীরিক সম্পর্কের জন্য নীলাদ্রি আমার সাথে কোনোদিন আর জোর করে নি । মুখস্থ পড়া দেওয়ার মতো সংসারের টুকটাক কথা বলে একটা কাঠের পুতুলের মতো চুপচাপ শুয়ে থাকি ওর পাশে। নীলাদ্রি মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, মাঝে মধ্যে চুলে বিলি কেটে দেয়। তার সান্নিধ্য বা স্পর্শ কোনোটাতেই আর বিরক্ত লাগে না আগের মতো।

অফিস থেকে কখনোই খালি হাতে ফেরে না নীলাদ্রি। টুকিটাকি কত কি, কত শাড়ি এনে যে জমিয়েছে। ক্রীমসন রেড খুব পছন্দ তার। প্রায়ই বলতো শাড়ি পরার কথা। আমি চুপচাপ শুধু শুনে গেছি।

নীলাদ্রি আসলেই একজন ভদ্র লোক। মামী যা বলেছিলেন ওর সম্বন্ধে, তার চেয়েও কয়েক ধাপ এগিয়ে সে। কবে যে আমাদের পুরো পরিবারের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে আমাকে টেরও পেতে দেয়নি। সবচেয়ে ভালো লাগলো, আমার চেয়েও আব্বা আর মা কে জোর গলায় সম্বোধন করে ডাকে সে। অফিস থেকে ফেরার পথে প্রায়ই দেখে আসে তাঁদের। আমি খুব একটা যাই না ওর সাথে। লজ্জা লাগে। খারাপও লাগে। মনে হয় আমাদের বাসাটা খুব বেমানান ওর জন্য।

নীলাদ্রি বুঝতো, ওর এই রাজকীয় বাড়িতে আমি সহজ হতে পারি না। তাই প্রায়ই ওর জীবনের গল্প করত, ‘জীবনের অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আজকের এ অবস্থানে এসেছি। কিন্তু বাবা-মায়ের জন্য তেমন কিছু করার সুযোগ হয়নি। শীলার বাবা-মা, মানে আমার শ্বশুর-শাশুড়িও অসময়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। তাদের জন্যও কিছু করার সুযোগ হয়নি আমার। তাই তোমার বাবা-মায়ের জন্য কিছু করতে পারা আমার জন্য খুব প্রশান্তির।’

আমি ওর দিকে তাকিয়ে থাকি পরম ভরসার এবং শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে। আমার চোখ ঝাপসা হয়। উঠে এসে নীলাদ্রি আমার হাত ধরে, মাথায় হাত রাখে। আমি জোরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠি। চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে নীলাদ্রির হাতের ওপর। নীলাদ্রি আলতো মুছে দেয় সে অশ্রু, উহু,আর কোনো কান্না নয়।’

আমার ভেতরে তখন ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ। আবেগকম্পিত কণ্ঠস্বর। কিছুই বলতে পারি না। এক না ফোঁটা নিশিগন্ধার না বলা কথাগুলো শুধু কান্না হয়ে ঝরছিল,

“কে জানিত, তুমি ডাকিবে আমারে, ছিলাম নিদ্রামগন।
সংসার মোরে মহামোহঘোরে ছিল সদা ঘিরে সঘন।
আপনার হাতে দিবে যে বেদনা,ভাসাবে নয়নজলে,
কে জানিত হবে আমার এমন শুভদিন, শুভলগন।”

যত দিন যায় আমি নীলাদ্রিকে একটু একটু করে আবিষ্কার করি। ঝলমলে রোদ্দুরের এক অমিত আকাশ সে। কিন্তু হঠাৎ ঝড়ের কবলে পড়ে অনেকটাই তছনছ। একটা মিহি কষ্টের আবরণ ওর মুখাবয়বে। অন্তর্গত বিষণ্ণতা স্পষ্ট চোখে মুখে। খুব মায়া হচ্ছিল ওর দিকে তাকিয়ে। আমি বুঝতে পারছি বসন্তের বুনো বাতাস ক্রমশ মেঘ সরিয়ে নিচ্ছে আমার মনের আকাশ থেকে। ভেতরের ক্ষত থেকে ধীরে ধীরে নির্গত রক্তের গতি শ্লথ হতে শুরু করেছে। আমি মনে হয় নীলাদ্রির মায়ায় পড়ে গেছি।

সময়কে বেঁধে রাখে, সে সাধ্যি কার ! বছর পেরিয়ে গেছে। অভিযোজিত মনের দরজায় যখন মায়া কড়া নেড়ে গেছে তখনই এক রাতে ভয়াবহ পেট ব্যথা নিয়ে হসপিটালে ভর্তি হই। প্যানক্রিয়াটাইটিস। অপারেশন লাগবে। যে কয়দিন হাসপাতালে ছিলাম নীলাদ্রি এক মুহূর্তও সরেনি পাশ থেকে। বাচ্চাগুলোকে আমাদের বাসায় রেখে নিজে থেকেছে আমার সাথে। আমাকে খাওয়ানো, গোসল করানো সব করেছে নিজ হাতে। হাতের মুঠোয় হাত রেখে পাশে বসে থেকেছে। সাহস যুগিয়েছে। চোখ ভিজে গেছে বারবার। ক্রমশ সে আমার এক মায়াময় বৃক্ষে পরিণত হয়েছে ।

হসপিটাল থেকে বাসায় ফেরার পরেও অতন্দ্র প্রহরীর মতো নীলাদ্রি আমার পাশে ছিল। অফিসে যাওয়ার আগে আমাকে নিজ হাতে খাইয়ে যাওয়া, প্রয়োজনীয় সবকিছু আমার হাতের কাছে রেখে যাওয়া, অফিস থেকে বারবার ফোন করে খোঁজ নেওয়া–কী না করেছে। ভালোবাসার, মায়ার, ভরসার হাত বাড়িয়ে একটু একটু করে সে আমার সমস্তটুকু অধিগ্রহণ করছিল ।

বাচ্চাগুলোর সাথেও আমার এমন এক আত্মিক টান তৈরি হয়েছে, এখন আর মনেই হয় না আমি ওদের পেটে ধরিনি। কী সুন্দর করে ওরা আমাকে মা ডাকে। মন ভরে যায়। আমার অসুস্থতায় তূর্যটার বেশি কষ্ট হয়েছে। কতবার এসে যে ঘুরে যেতো! ঘুমিয়ে আছি কি না দেখে যেত। হঠাৎ চোখ খুলে দেখি খাটের ওপর উঠে পেছন থেকে উঁকি দিয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। কখনো ছোট ছোট হাতগুলো আমার কপালে রাখতো, কখনো আমাকে গালে চুমু খেয়ে এক ছুটে চলে যেতো। একদিন হঠাৎ জাপটে ধরলাম। কাছে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমাকে ছেড়ে খুব কষ্ট হচ্ছে,বাবা।’ মুখে কিছু না বলে শুধু মাথা দুলিয়ে হ্যাঁ বললো।’ ‘বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে আরো জোরে জড়িয়ে ধরলাম। দেখি, তূর্যের দু চোখে পানি।’

‘এই তো আমি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছি, বাবা। আমরা আবার গল্প করব, খেলা করব।’

সপ্তাহ খানেক হলো অফিস ট্যুরে নীলাদ্রি দেশের বাইরে। বিয়ের পরে এই প্রথম ওকে ছাড়া থাকলাম। ওর অনুপস্থিতি আমার মধ্যে ভীষণভাবে ওর অভাববোধ জাগিয়ে দিয়ে গেছে, ওর অপরিহার্যতার জানান দিয়ে গেছে। ছোট ছোট ব্যথার ঢেউ বুকের মধ্যে। সারাক্ষণই থেকে থেকে মনে পড়ছে ওর কথা। ফাঁকা লাগছে ভীষণ। কী ভীষণ ভালোবাসায় আগলে রেখেছে আমাকে, আমাদেরকে। কৃতজ্ঞতায়, ভালোবাসায় চোখ ভিজে আসে। অথচ কত ঠকিয়েছি ওকে। বিয়ে করে যেন উদ্ধার করেছি। সব দোষই যেন ওর। আমাকে বিয়ে করে ও যেন মহা অন্যায় করেছে । আহা, শুধু শুধু কতটা কষ্ট দিয়েছি বেচারাকে! ইচ্ছে করছে সমস্ত শক্তি দিয়ে নীলাদ্রিকে জড়িয়ে ধরতে, বুঝিয়ে দিতে তার সবটুকু পাওনা।

আজ নীলাদ্রি দেশে ফিরবে। প্লেনের ল্যান্ডিং টাইম রাত বারোটা। এয়ারপোর্টের সব কাজ সেরে বাসায় পৌঁছুতে তার রাত একটা থেকে দেড়টা বাজার কথা। খাবার টেবিলে দিয়ে বুয়া কে সব বুঝিয়ে দিয়েছি। বেশি রাতে ফিরলে নীলাদ্রি নিজেই খেয়ে নেয়। আমাকে আর ডাকে না।

শুধু ওর জন্যই সেজেছি আজ। টকটকে লাল রঙের একটা শাড়ি পরেছি। দু হাত ভরে চুড়ি, টেনে কাজল পরলাম চোখে। খোলা চুলের এক পাশে বেলি ফুল গুঁজে দিলাম। রুমে ঢুকে নীলাদ্রির মনে হলো,সে সাত আসমান থেকে পড়েছে।
‘কাকে দেখছি আমি! এ কোন নেহা!

বাইরে তুমুল বৃষ্টি। পত পত করে উড়ছে রুমের পর্দাগুলো। নীলাদ্রির তন্ময় দৃষ্টিতে বিস্ময়, আবেগ,ঘোর, ভালোবাসা সবটাই। আমি চুপচাপ বসে আছি। নীলাদ্রি দু হাতে আমার মুখটা তুলে নিয়ে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আমার মুখের দিকে। ‘টিপ পরোনি কেন?’ আমি কিছু না বলে ওর হাতে একটা লাল টিপ ধরিয়ে দিলাম, ‘তুমি পরিয়ে দেবে বলে।’

নীলাদ্রি টিপ পরিয়ে দিয়ে গভীর আলিঙ্গনে আমাকে জড়িয়ে ডুবে যায় কামনা তাড়িত ওষ্ঠের গভীর থেকে গভীরে। আবেগের আতিশয্যে বাকরুদ্ধ আমার যত অকারণ অভিমান, না বলা কথা আর জমে থাকা কষ্টগুলো চোখের জলের অঝোর ধারায় নীলাদ্রির বুক ভিজিয়ে দিতে থাকে। দুজনের দুর্বোধ্য ব্যবধানগুলো যেন ক্রমশ বিলীন হতে থাকে। বহু কাঙ্ক্ষিত অথচ অনাস্বাদিত স্পর্শের অনুরণন দুজনের রক্তপ্রবাহে। নীলাদ্রি পিষে দিচ্ছে আমাকে ওর বুকের সাথে। বাঁধনহারা দুজন দুজনকে সঁপে দেই এক অপার্থিব সুখের কাছে।

শ্রাবণের সেই মধ্যরাত্রিতে যেন অনুরণিত হতে থাকে কবিগুরুর সেই গান,–

“আহা তোমার সঙ্গে প্রাণের খেলা, প্রিয় আমার, ওগো প্রিয়
বড় উতলা আজ পরাণ আমার, খেলাতে হার মানবে কি ও।”

রাতভর তুমুল বৃষ্টির পরে সকালের ভেজা বাতাস ছোঁয়া এক ফালি নরম রোদ্দুরে আমাদের ঘুম ভাঙে। নিজেকে আবিষ্কার করি নীলাদ্রির প্রশস্ত বুকে, যেখানে আমার এলোমেলো চুলগুলো ছড়িয়ে আছে গভীরতম অধিকারের সগর্ব প্রশ্রয়ে।