পরিচয়

সালেহা ভাবী, কতদিন পর আমাদের বাসায় এলেন বলেন তো?

-সময় পাইনা ভাবী। এ বছর রিটায়ারমেন্টে যাব তো তাই অফিসেও ভীষণ কাজের চাপ। আপনারাও তো ভুলেই গেছেন।

-বোঝেনই তো আপনাদের মতো তো আর শহরে থাকিনা। গ্রামে চারদিকে অনেক বেশী খেয়াল রাখতে হয়। তাই চাইলেও সুযোগ হয়ে ওঠেনা। আজ কিন্তু দুপুরের খাওয়া না খেয়ে যেতে পারবেন না।

রেহানা ভাবীর কথা শুনে আমার একই সাথে ভালো লাগে আবার খুব হাসিও পায়। কত শত অতীত স্মৃতি এক লহমায় উঁকি দিয়ে যায় মনের দরজায়। রেহানা সম্পর্কে আমার চাচাতো জা। আমারই বয়সী। আমাদের দুজনের বিয়ে হয় সপ্তাহ কয়েকের ব্যবধানে। দুজনের বয়স আর বিবাহের বয়স কাছাকাছি হলেও আমাদের দুজনের মধ্যে ছিল কিছু ব্যাপারে ভীষণ অমিল। পারিবারিক স্বচ্ছলতা, গাত্রবর্ণ আর শারিরীক গঠনে রেহানাই এগিয়েই ছিল। আমার নিজের পক্ষে বলার মত ছিল শুধুই আমার পড়ালেখা। তাও আহামরি কিছুনা, সামান্য বি.এ পাস। না ছিল বাবার সম্পত্তি, না ছিল রেহানার মতো শারিরীক সৌন্দর্য্য। অর্থাৎ আপাতদৃষ্টিতে নতুন বৌ হিসেবে নাম্বারের কোটায় একেবারে শেষের সারিতে।

আজ থেকে বছর চল্লিশেক আগে শ্বশুরবাড়িতে রেহানার গুণগুলোই একজন পাত্রীর যথাযথ গুণ ছিল বিধায় আমার পড়াশোনা থাকা বা আমার গৃহকর্মে পারদর্শীতা কম থাকাকে ভীষণ গুরুতর অপরাধ ধরা হতো। তবু নিতান্তই বিয়ে হয়ে গেছে বলে না পারতে মেনে নেয়া এই আমাকে কটু কথা আর তুলনামূলক কথার বাক্যবাণে জর্জরিত হতে হতো সহসাই। শ্বশুরবাড়িতে বিয়ে হয়ে আসা দুজন নতুন বৌ থাকলে কে ভালো কে খারাপ সে তুলনা হবেই। এসব নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা ছিলনা। ভেবেছিলাম আমরা সমবয়সী কাজেই দুজনের দিন গল্পগুজবে ভালো কাটবে। আর তাই সময়ে সময়ে বড় কষ্ট লাগতো। কারণ রেহানার চলাফেরা, হাবেভাবে ছিল বড়লোকী ভাব। কিছু জিজ্ঞেস করলে এমন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে জবাব দিত যে মনে হতো আমি বুঝি তার নখেরও যোগ্য নই। তার ওপর বাড়ির সবাইও ওকে এমনভাবে সম্মান দিয়ে কথা বলতো বা এতো যত্ন নিত যে সময়ে সময়ে আমার মনে হতো এরকম বিয়ে হওয়ার চেয়ে বুঝি না হওয়াই ভালো ছিল।

রেহানার বাবার বাড়ি থেকে প্রায়শই এটা ওটা খাবার, উপহার পাঠানো হতো। আমি ছাড়া বাড়ির আর সবাই তার ভাগ পেতো। অন্যদিকে আমার বাবার বাড়ি থেকে না ছিল কিছু কিনে পাঠানোর মতো সামর্থ্য, না ছিল কিছু কিনলেও কাউকে দিয়ে পাঠানোর মতো কেউ। বিয়ের কয়েক মাসের মাথায় রেহানার শ্বশুর ছেলেকে আলাদা ঘর তুলে দেন নিজের ঘরের কাছাকাছি। শোনা যায় ঘর তোলার সিংহভাগ টাকাই এসেছে রেহানার বাপের বাড়ি থেকে। আর আমি বা আমার স্বামী সে হিসেবে নিতান্তই ছাপোষা দুজন মানুষ। স্বামী শহরে এক কোম্পানীতে সামান্য চাকুরী করে। একই কোম্পানীতে আমারও চাকুরী হয়ে যাওয়াতে বাধ্য হয়েই শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে শহরে চলে আসতে হয়।

সংসারের কাজ, অফিস সব সামলে যখন ভীষণ ক্লান্ত লাগতো হয়তো শ্বশুরবাড়ি যেতাম। দরিদ্র বাবার বাড়ি নিজেই যেতে চাইতামনা, পাছে তাদের ওপর খরচের ভার বেড়ে যায়। দুদিনের জন্য গেলেও সেখানে আমার সাথে দুদন্ড কথা বলার কেউ থাকতো না। যেন আমি কোন মানুষই না। সবাই ব্যস্ত থাকতো রেহানাকে নিয়েই। দিনে দিনে আমার সংসারে ছেলেমেয়েরা এলো, রেহানার সংসারেও। জীবনের ব্যস্ততায় সপ্তাহান্তে বাড়ি যাওয়া হয়ে গেলে মাসান্তে। কখনো বা তারচেয়েও সময় লাগতো। আমি শহরে থাকলেও বা আমরা স্বামী স্ত্রী দুজনে কাজ করলেও সব খরচ সামলে হাতে এমন কোন পয়সা থাকতোনা যা দিয়ে একটু স্বচ্ছলতায় দিন কাটানো যায়। আর তাই বাপের বাড়ি শ্বশুরবাড়ির স্বচ্ছলতার জোরে গ্রামে থাকলেও রেহানার ছেলেমেয়েরা সবসময়ই দামী কাপড়চোপড়ে মোড়ানো থাকতো। সে হিসেবে আমার ছেলেমেয়েদের পোশাক চালচলন ছিল খুবই সাধারণ মানের।

শিশুদেরকে আমরা খুব অবুঝ মনে করলেও ওরা কিন্তু সময়ে সময়ে ভীষণ কঠোর হতে পারে। বেশীরভাগ শিশুই সমবয়সী অন্য কারো সংস্পর্শ এলে তুলনা করার চেষ্টা করে। তারই জেরে নাকি পারিবারিক শিক্ষার কারণে আমার বাচ্চারাও রেহানা ভাবীর ছেলেমেয়েদের কাছে নিতান্ত অবহেলার শিকার হয়। না চাইলেও মেয়েকে ডাকতে যেয়ে একবার শুনে ফেলি রেহানা ভাবীর মেয়ে রিমিন বলছে, ‘এই তুমি আমার পুতুলে হাত দেবেনা, ভেঙে যাবে। তুমি জানো এই পুতুলের দাম কত?’ আমার মেয়েটা সে রাতে বাড়ি ফিরে খুব কেঁদেছিল আর বলেছিল, আমরা কি অনেক গরীব মা? এ কথা ছাড়াও আর কিছু হয়েছিল কিনা আমি জানিনা তবে আমার ছেলেমেয়েরাও আর পরে পরে গ্রামে গেলে ওদের বাড়ি যেতে চাইতোনা।

আরেকবার বেড়াতে গিয়ে শুনি রেহানা ভাবীর ভাইয়ের বিয়ে। সবাই দাওয়াত পেলেও আমাদের দাওয়াত মেলেনি। নিতান্তই বাড়িতে গেছি বলে না পারতে সাথে নিয়ে গেছে। বিয়ে বাড়িতে সেদিন একদানা পোলাও আমার গলা দিয়ে নামেনি এক সূক্ষ্ম অপমানে। বিয়ে বাড়ির সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেও আমাদের পরিচয় দিতে গিয়ে যেন রেহানা ভাবী ভুলেই যান আমরাও তার আত্মীয়। হাতটা শূন্যে নাড়িয়ে অন্যদিকে হেঁটে চলে যান তিনি।

সময়ের পরিক্রমায় আমার বাচ্চারা বড় হয়েছে, ভালো চাকুরী পেয়ে এখন অনেক স্বচ্ছল। ফিরিয়েছে আমাদের দিনও। আমার শুধু একটা চেষ্টাই ছিল পড়ালেখার পাশাপাশি ওরা যেন মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান করতে শেখে, ভালবাসতে শেখে। আমি নিজে যেসব অবহেলার শিকার হয়েছি আমার ছেলেমেয়েরা যেন তাদের স্বচ্ছল জীবনের সুবাদে অন্য মানুষকে অবজ্ঞা না করে।

‘একি সালেহা ভাবী কিছুই তো নিচ্ছেন না।’

রেহানা ভাবীর ডাকে চমকে উঠে প্লেটে একটু খাবার নেই। আনমনে পেটিসে খেতে খেতে শুনতে থাকি রেহানা ভাবী আশেপাশের বাড়ি থেকে আসা লোকদের বলে যাচ্ছেন, ‘উনি আমার চাচাতো জা। আমরা ভীষণ কাছের ছিলাম, একই সময়ে বিয়ে হয়েছিল তো দুজনেরই। ঢাকাতে থাকেন। ছেলেমেয়ে সবাই খুব ভালো চাকুরী করে। ভাবী নিজেও বিরাট অফিসার।’ তারপর আমার দিকে ঘুরে বলতে থাকেন, ‘আপনিই ভাবী ভালো আছেন। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়েছেন। নিজেও চাকুরী করাতে কারো মুখাপেক্ষী হতে হয়নি। অথচ দেখেন আমি সেই যে ঘরের লোক হয়ে ঢুকলাম একজীবনে আর এই গ্রাম থেকে বের হওয়া হলোনা। মেয়েদেরকেও সেভাবে পড়াশোনা করাইনি। ওদেরও আমার মতই জীবন। বাবার বাড়ি থেকে দিয়েছে, শ্বশুরেরও ছিল তাই আপনার ভাই কখনোই নিজে থেকে সেভাবে কিছু করলো কই? সম্পত্তি বেঁচে বেঁচে সংসার যে আর কতদিন চলবে কে জানে?’

একদিন যে ঘরে আমার কম দামী কাপড় কিংবা সাধারণ বেশভূষার জন্য বসার সুযোগও পাইনি আজ সেই ঘরেই কি আয়োজনের সাথে নাস্তা খাওয়ার সুযোগ সৃষ্টিকর্তা করে দিলেন। একদিন যাদের কাছে আমার পরিচয় দেয়ার মতো সময় বা ইচ্ছেটুকুও ছিলনা আজ কি অবলীলায় তিনিই উঁচু গলায় বলে যাচ্ছেন আমার পরিচয়। এজন্যই বুঝি লোকে বলে, কার যে কখন দিন আসবে এক সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কেউই জানেনা।

-ডাঃ জান্নাতুল ফেরদৌস