পালকি

খুট করে শব্দটা হতেই মিনু চমকে ওঠে। রান্নাঘরের জানালার পাশেই বিশাল একটা আম গাছ। বেলা তখন প্রায় বারোটা। রোজকার মতই রান্না বসিয়েছে মিনু। বাসায় কেউ নেই। খালাম্মা আর খালু অফিসে। আপু ভাইয়া স্কুলে। এই সময়টা মিনু একাই থাকে বাসায়। তড়িঘড়ি করে রান্না সারতে হবে। একটু পরই ভাইয়া আপু স্কুল থেকে আসবে। তখন মিনু ওদের সাথে খেলা আর টিভি দেখায় ব্যস্ত হয়ে যাবে।বেশ কিছুদিন হলো নুরা ছেলেটা কথা বলতে চায়। ছাদে কাপড় নাড়তে গেলে কেমন তাকিয়ে থাকে! পাশেই সাততালা বস্তি। নুরার ঘর ওখানেই। নুরা ছেলেটা দেখতে বেশ ভাল। মিনু প্রায় তিন বছর এই বাসায় এসেছে। সৎমা আর বাবার অত্যাচার আর সহ্য হয়নি।

হুট করে মা মারা গেলো দশদিনের জ্বরে। গ্রামের ডাক্তার স্যালাইন ভরলো, ওষুধ দিলো।কবিরাজ গাছান্তি খাওয়ালো। জন্ডিস ঝাড়লো, ডাব পড়া তাও দিলো। মায়ের জ্বর সাড়ে না। সাথে খুব কাশি। রাতে মা ঘুমায় না। কাশির শব্দে কারো ঘুমই হয় না। একঘরে সবাই থাকে।বাবা রিকশা চালায়। আর বাড়ী ফিরে অসুখের গুষ্টি উদ্ধার করে। মিনু রান্না বান্না করে। বাবা খায় আর খিস্তি খেউর করে রাতে পুকুরপাড়ে মাচায় তাস খেলতে যায়।

সেদিন খুব বৃষ্টি ছিল। মায়ের জ্বর কাশি দুটোই বাড়তি। মিনু গরুগুলোকে ঘরে ঢুকাতে গিয়ে ভিজে জারবার। মুরগীর ঘরের ঢাকনাটা তুলে দিতে যেয়ে ডিমের জন্য হাতটা বাড়ায়। রাতে মাকে ডিম দিয়ে ভাত দিলে যদি একটু খায়।
আঙুলে কি যেন একটা কামড় দেয়। খুব জ্বালা করে। ঘরে এসে কাপড় বদলানো হয় না। তিরতির করে হাত বেয়ে কি জানি ওঠে! ভয় পেয়ে যায় মিনু। মা জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকে। আঁধার ঠেলে ওঝা বাড়ীর পথে মিনু।
তখন মিনুর বয়স চৌদ্দ। বেশ ডাঙর হয়েছে গতরে। গ্রামের মানুষ বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে আসে বাবার কাছে। যৌতুকের একটা বিশাল অংক আর লিষ্ট…. মিনু জানে বাবা তাকে বিয়ে দিতে পারবে না। বাবার এত টাকা জোগাড় করাও হবে না কোনোদিন।ওঝা হাত চালান দেয়। কি সব পড়ে, আবার হাত চালান দেয়। হাতটা মিনুর কাঁধ বরাবর থামে। তারপর আঙুলগুলো অস্থির…. পিলপিল আঙুল বুক বরাবর। সাপের বিষ নাকি এভাবেই নামে! ওঝা আবার হাত চালান দেয়… এবার এ বুক থেকে সে বুক! আঙুলের স্পর্শ নয় এবার হাতগুলো লুফে নেয় সব! রাত গভীর হয়। মিনুর ভয় হয়। বড় ভয় হয়। বাবা মাচালে তাস খেলছে। মিনু বাবার কাছে যেতে চায়।
… নাড়াচাড়া করলে বিষ মাথায় উঠে যাবে। ওঝা ধমকের সুরে বলে। চুপ করে থাকো। বাস্তুসাপ এটা… ভয়ংকর। কাঁকলা মাছের কাঁটা দিয়ে মিনু হাত ফুটাতে থাকে আর রক্ত বের করে। আবার হাত চালান…. হাতগুলো এবার আরো উদ্ধত। মিনু কুঁকড়ে যায়… সারারাত ভর ওঝা বিষ নামায়। তৃপ্তিতে মেতে ওঠে ষাটোর্ধ ওঝা।সকালের আলো ফুটেছে। মিনুর বিষ নামানোর কাজ শেষ।
…. এবার বাড়ী যা। সব বিষ নেমে গেছে। আর ভয় নেই। ওঝা অন্যকাজে ব্যস্ত হয়ে যায়।কোনোমতে বাড়ী ফিরে মিনু। ঘরে ঢুকতেই দেখে কুন্ডলী পাকিয়ে আছে মা। বিছানায় রক্তের দাগ। শক্ত শরীরটা ধরে বসে থাকে মিনু। কোন সময় মারা গেলো মা! রাতের কোন সময়! তাস খেলে বাবা ফেরে ঘরে।ততক্ষণে সবাই শুনেছে খবরটা। মিনুর কান্না পায় না। গলার কাছে দলা পাকিয়ে থাকে কি একটা! ভাবলেশহীন চোখে এতটুকু জল আসে না।

সাতদিন না ঘুরতেই বাবা বিয়ে করে। পাশের গ্রামের বিধবা জয়তুনকে। জয়তুনের বয়স ষোল। তেরো বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল চল্লিশ বছরের আক্বেল আলীর সাথে।আক্বেল আলী রোডে গাড়ী চাপা পড়ে মারা যায়। কোনো ছেলেপুলে নেই জয়তুনের। মিনু বেশ বুঝে যায় সেইদিন সেই বিষ নামানোর পর এই গ্রামে তার বিয়ে হবে না।

এখন মিনুর সতেরো বছর হয়তো চলে। নুরা ছেলেটা প্রেমের কথা বলতে চায়,মিনু টের পায়।
…. শোন মিনু তোরে বিয়ে করতে চাই। আমরা সংসার করবো। রান্নাঘরের জানালা ধরে আম গাছে ঝুলতে ঝুলতে নুরার গলা।
…. আপনি এহানে ক্যা? কেউ দেখলি পর কি কবিনি আমাক? মিনুর ভয়ার্ত গলা।
নুরার এমন সাহস। মিনু অবাক হয়। এরপর চলে প্রতিদিন কথা। এই সময়টাতে নুরা আসে জানালায়।
… আইজ তুই বাইর হবি মিনু। আইজ আমরা বিয়ে করবো।
… দরজা তো তালা। মিনু অসহায়ের মত বলে।
… আসলি পর বাইর হবি। আমি রাস্তার মাথায় থাকপোনে। বিকেলে ভাইয়া আপু ঘুমে। খালাম্মা খালু আসে সন্ধ্যায়। মিনু দরজা ভিড়িয়ে বের হয়ে আসে। বেশ সাজসজ্জা মুখে। লিপিস্টিক, কাজল আর সবচেয়ে সুন্দর জামাটা পরেছে মিনু। নুরা তাকে নিয়ে একটা সিএনজি ভাড়া করে। মিনু লজ্জায় মরে যেতে চায়।
… কোনে বিয়ে হবিনি?
… চলেক তো। সব ঠিক করে থুইছি।
নুরা মিনুর হাতটা ধরে। পরম বিশ্বাসে মিনু বড় নির্ভার বোধ করে। রাত এগারোটা। নুরা আর তার তিন বন্ধু… মিনু একা। পালাক্রমে চলে তাণ্ডব। মিনুর সব বিষ চারজন মিলে ঝাড়তে থাকে। ব্যথায় কুঁকড়ে কুঁকড়ে ওঠে মিনু। নুরা দ্বিতীয় রাুউন্ডে….
ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে আসে মিনু। ছোটবেলায় মায়ের কাছে উড়ন্ত পালকির গল্প শুনেছিল।
মিনুর পাশে এসে থামে উড়ন্ত পালকিটা। সাদা ফ্রক পরে একটা পরীর মেয়ে পালকিতে চড়ে বসে। আকাশপথে মেঘ ছুঁয়ে উড়ে চলছে পালকি….

-ফারহানা নীলা