প্রকৃতির মুখ


চায়ের পাতা তোলার ফাঁকে চকিত মুখ তুলে তাকিয়েছে মেয়েটি। ওর পানপাতা মুখ, চ্যাপ্টা নাক। শ্যামলবরণ চোখে একইসাথে কৌতুক, বিস্ময় আর মুগ্ধতা খেলে যাচ্ছে। সেই চোখে যেন জগতের সব অধরা স্বপ্ন ভিড় করে আছে। তেলহীন শুষ্ক চুল, হলুদ দাঁত আর পরনের সায়া-ব্লাউজের উপর একটুকরো কাপড় ওড়নার মত করে জড়ানো। পিঠে কাপড়ের ঝোলায় এতক্ষণ ধরে তোলা চা পাতা রাখা আছে। শেষ বিকেলের সোনালি আলোর আভা জড়িয়ে আছে তার সারা অঙ্গে। এক ঝলক দেখে মনে হয় মেয়েটি এই প্রকৃতিরই একটি অংশ। ওকে ছাড়া চারপাশটা যেন অসম্পূর্ণ রয়ে যায়।

প্রীতমের সনি আলফা এ৭ ক্যামেরায় তোলা ছবিগুলো একের পর এক দেখতে দেখতে এই ছবিটাতে এসে থমকে গেল অবন্তী। ছবির দিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে তারপর চোখ তুলে তাকাল প্রীতমের দিকে। প্রীতম কিছুটা অবাক হল। এতক্ষণ ছবি দেখতে দেখতে নানা ধরণের মন্তব্য করছিল অবন্তী। ‘আরেকটু ফোকাস হলে ভাল হত’, কিংবা ‘এই ছবিতে সূর্যের আলোর রিফ্লেকশনটা খুব চোখে লাগছে’, ‘আরেকটু এঙ্গেল থেকে তুললে ভাল হত’, ইত্যাকার নানা মন্তব্য। প্রীতম ছবি তোলে নিতান্তই শখের বশে, মনের তাগিদে; অনেকটা নেশা থেকেও। ঐ তোলা অব্দিই। ছবির এঙ্গেল, ফোকাস, কিংবা লাইটিং এসব নিয়ে সে কখনো মাথা ঘামায় না। তবে ওর সব ছবির বিশ্লেষক সমালোচক অবন্তী। ছবির ব্যাপারে অবন্তী ভীষণ রকমের সিরিয়াস। প্রীতম দেখেছে, মেয়েরা সাধারণত নিজের ছবি তোলার ব্যাপারে আগ্রহী থাকে। কিন্তু অবন্তীর আগ্রহ নিজের ছবি নিয়ে নয়। যে কোনো ছবি সে গভীর আগ্রহ নিয়ে দেখে, তারপর তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে। প্রীতম ওকে অনেকবার বলেছে, ‘তোমার যখন ছবির প্রতি এত আগ্রহ, ফটোগ্রাফির কোর্স কর, প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার হয়ে যাও।‘ কিন্তু অবন্তীর তাতে কোন আগ্রহ নেই। ও-ই বরং পীড়াপীড়ি করে প্রীতমকে একটা ফটোগ্রাফি কোর্সে ভর্তি করে দিয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পরে প্রীতমের আর ভাল লাগে নি। ওই নিয়ে অবন্তীর সে কী রাগ! দু’সপ্তাহ প্রীতমের সাথে কোনো কথা বলে নি। প্রীতমের নানা জায়গায় ঘোরার খুব নেশা, সুযোগ পেলেই দেশ-বিদেশে ঘুরতে যায়। সাথে থাকে ওর প্রিয় সনি আলফা এ৭ ক্যামেরাটি। গেল বছর অবন্তীই এটি উপহার দিয়েছিল। ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ মন চাইলেই ফটাফট ছবি তুলে নেয় প্রীতম। ওর বেশীরভাগ ছবি জুড়ে থাকে প্রকৃতি আর মানুষ; অবশ্যই ন্যাচারাল, পোজবিহীন। প্রীতম বলে, ‘মানুষ তো প্রকৃতিরই অনুষঙ্গ।‘ আর অবন্তী বলে, ‘প্রীতমের হাতের ছোঁয়ায় ছবি কথা বলে।‘ উত্তরে প্রীতম কিছু বলে না, হাসে। অবন্তীর সবকিছুতেই বাড়িয়ে বলা, প্রীতমের সবকিছুতে।

আগের সব ছবিতে মন্তব্য করলেও অবন্তী এই ছবিটা নিয়ে কিছু বলল না। ব্যাপারটা কী? অবন্তীর মুখটা কি একটু গম্ভীর মনে হচ্ছে? প্রীতম তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘মেয়েটা চা বাগানের কর্মী।’


সে তো দেখাই যাচ্ছে। – ছবির দিকে তাকিয়েই উত্তর দিল অবন্তী।চা বাগানে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ মনে হল মেয়েটির ছবি তুলি। ছবিটা কেমন হয়েছে বললে না তো! – প্রীতম যেন কৈফিয়ত দিচ্ছে।

অবন্তী স্মিত হাসল। – মেয়েটার নাম কী, জানো?

সঙ্গীতা।

আর কোনো কথা হলো না। পরের ছবিগুলো কেমন যেন দায়সারাভাবে দেখে শেষ করল অবন্তী। তেমন কোনো আগ্রহ নেই আর। এই প্রথম এমনটা ঘটল, প্রীতম লক্ষ করল। ছবি দেখা শেষ করে প্রীতমের দিকে তাকাল অবন্তী, ‘তোমার তোলা ছবিগুলো আমি কপি করে নিতে পারি?’

এই ব্যাপারটাও প্রথম। অবন্তী কখনো ছবি কপি করে নেয় নি। প্রীতম বিস্ময় চেপে রেখে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, ‘নিশ্চয়ই।’

ছবিগুলো নিজের মেসেঞ্জারে সেন্ড করে অবন্তী উঠল। ওর নাকি কী কাজ আছে, জলদি যেতে হবে।

অবন্তী চলে যেতে একটু চিন্তিত হল প্রীতম। মেয়েটা হঠাৎ এমন গম্ভীর হয়ে গেল কেন? তবে কি চাবাগানের মেয়েটির ছবি তোলার বিষয়টা ও সহজভাবে নেয় নি? তাই-বা কেন হবে? এর আগে প্রীতম কতবার কত ছবি তুলেছে। সেখানে কত মেয়েরই তো ছবি ছিল। স্বল্পবসনা, এমনকি বিকিনি পরিহিতা কত মেয়ের ছবিই প্রীতমের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। সেসব নিয়ে কই কখনো কিছু মনে করে নি অবন্তী। ও সেরকম মেয়েই নয়। ছবির শিল্প অভিজ্ঞানটাই ওর চোখে ধরা পড়ে। অনেক ভেবেচিন্তেও অবন্তীর আজকের এ আচরণের কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে না পেয়ে শেষতক ক্ষান্ত হল প্রীতম। জগতে কে কবে রমণীর মন বুঝতে পেরেছে? মুনি-ঋষিরাই যেখানে ব্যর্থ হয়েছেন, সেখানে প্রীতম তো কোন ছার!

সেদিনের পর ছয়মাস কেটে গেছে। প্রীতম এখন খুব ব্যস্ত ওর অফিসের একটা প্রজেক্ট নিয়ে। মাঝে মালদ্বীপ ঘুরে আসার পরিকল্পনা করেও শেষ মুহূর্তে বাতিল করেছে। প্রজেক্টটাকে মোটামুটি একটা পর্যায়ে না এনে এই মুহূর্তে কোথাও ঘুরতে গেলে সেটা পুরোপুরি উপভোগ করা যাবে না। এদিকে ক’দিন ধরে মা বিয়ের জন্য তাড়া দিচ্ছেন। অবন্তীরও মাস্টার্স ফাইনাল শেষ। এবার অবন্তীর সঙ্গে কথা বলে ওর বাসায় প্রস্তাব নিয়ে যেতে হবে। তবে এসব কিছুর আগে প্রজেক্টটাকে ভালোমতো দাঁড় করাতে হবে।
এই প্রজেক্টের ব্যাপারেই একটা জরুরি মিটিঙয়ে ব্যস্ত ছিল প্রীতম, এসময় হঠাৎ অবন্তীর ফোন। ধরবে না ধরবে না করেও প্রীতম ফোনটা ধরল। না ধরলে অবন্তী লাগাতার ফোন করতেই থাকবে। তারপর এক পর্যায়ে ফোন বন্ধ করে রাখবে। প্রীতমের একাধিক বার এ অভিজ্ঞতা হয়েছে। একবার টানা বিশ দিন লেগেছিল অবন্তীর মান ভাঙাতে। এমনিতে অবন্তী বেশ পরিপক্ব মানসিকতার, কিন্তু কিছু কিছু ব্যাপারে ভীষণ অবুঝ। কিংবা হয়তো পজেসিভ, প্রীতমের ব্যাপারে।

ফোন ধরতেই অবন্তী উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, ‘প্রীতম তুমি এখুনি শেফ’স টেবল এ চলে আস।’

প্রীতম খুব বিরক্ত হল, তবে অবন্তীকে বুঝতে দিল না। যথাসম্ভব শান্ত কণ্ঠে বলল, ‘অবশ্যই আসব। এখন আমি অফিসে একটা জরুরি মিটিঙয়ে আছি। মিটিঙটা শেষ করে চলে আসব। বিকেলে দেখা হবে।’
ফোন রাখতে উদ্যত হলেও ও প্রান্তের কথা শোনা গেল। অবন্তী হড়বড় করে বলে চলেছে, ‘না তুমি এখুনি আসবে। আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমাকে একঘণ্টা সময় দিলাম। একঘণ্টা প্লাস তোমার আসতে যে সময় লাগবে। এখন বাজে এগারটা পঁচিশ। ঠিক দুটোয় তোমার আসার সময়। আমি দুটো দশ পর্যন্ত তোমার জন্য অপেক্ষা করব। বাই।’

শোনো, শোনো, অবন্তী……।

ততক্ষণে অবন্তী লাইন কেটে দিয়েছে। প্রীতম বলতে চাচ্ছিল ওর মিটিং একঘণ্টায় শেষ হবে না। সবেমাত্র শুরু হয়েছে। কিন্তু এখন অবন্তীকে আর ফোন করে লাভ নেই। ও ফোন ধরবে না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রীতম মিটিং শুরু করল। টিমের সদস্যদের আজকের মত মোটামুটি সব বুঝিয়ে দিয়ে বেরোতে বেরোতে একটা বেজে গেল। জিগাতলা থেকে গুলশান দুই। রাস্তায় জ্যাম থাকলে একঘণ্টায় কোনোভাবেই পৌঁছানো সম্ভব নয়। অথচ অবন্তী দুটো দশের পরে এক মুহূর্তও অপেক্ষা করবে না।
রাস্তায় যথারীতি অনেক জ্যাম। প্রীতম বারবার ঘড়ি দেখছে আর ড্রাইভারকে বলছে তাড়াতাড়ি যেতে। কিন্তু জ্যাম থাকলে ড্রাইভারই বা কী করবে? ঘড়ির কাঁটা যেন লাফিয়ে লাফিয়ে চলছে। জ্যাম ঠেলে প্রচণ্ড টেনশন নিয়ে প্রীতম যখন গুলশান দুই এ শেফ’স টেবলে পৌঁছল, ঘড়িতে তখন আড়াইটা। এখন আর উপরে গিয়ে কাজ নেই। প্রীতম নিশ্চিত, অবন্তী ওখানে নেই। তবুও লিফটে উঠল প্রীতম, যদি থাকে। তাছাড়া ওর প্রচণ্ড খিধে পেয়েছে, কিছু একটা খাওয়া দরকার। এর মাঝে ও অবন্তীকে বেশ কয়েকবার ফোন করেছে, কিন্তু ফোন সুইচড অফ। মাঝে মাঝে প্রীতমের খুব অস্থির লাগে। অবন্তীকে ও খুব ভালোবাসে, অবন্তীও। কিন্তু অবন্তীর এইসব ছেলেমানুষি অবুঝপনা প্রীতম কতদিন মেনে নিতে পারবে, তাই নিয়ে প্রীতমের ভয় হয়। ‘শেফ’স টেবল এর চারপাশে একটা চক্কর দিয়ে এসে প্রীতম যখন নিশ্চিত অবন্তী নেই, তখনই ওর হৃৎপিণ্ডটা ধড়াস করে উঠল। ও-ই তো, কোনার টেবিলে অবন্তী বসে আছে। গালে হাত দিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে শেফদের রান্না দেখছে। প্রীতমকে ও খেয়াল করে নি। হালকা হলুদ শাড়িতে ওকে মনে হচ্ছে আকাশ থেকে ভুল করে নেমে আসা কোনো পরী। ওর গায়ের রঙের সাথে শাড়িটা যেন একেবারে মিশে গেছে। এমনিতে অবন্তী খুব একটা সাজগোজ করে না, কিন্তু আজ হালকা সেজেছে। ঠোঁটে ন্যাচারাল কালারের লিপস্টিক, কপালে ছোট্ট লাল টিপ। ঝট করে মনে করার চেষ্টা করল প্রীতম, আজ কি কোনো বিশেষ দিন? অবন্তীর জন্মদিন? ওদের প্রথম দেখা হওয়ার দিন? কত দিনের হিসেব যে অবন্তীর মাথায় থাকে! কিন্তু প্রীতমের কিছুই মনে পড়ছে না। প্রীতম আজ মনে মনে ঠিক করে রেখেছিল অবন্তীকে ওর এহেন অবুঝপনার জন্য দুচারটা কথা শুনিয়ে দিবে। কিন্তু অবন্তীকে দেখার পর সেসব কিছুই মনে রইল না। সব ভুলে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল সে। বুকটা ব্যথায় টনটন করে উঠল। এই একটা মুখের পানে তাকিয়ে ও হাজার বছর কাটিয়ে দিতে পারবে।

সংবিৎ ফিরল অবন্তীর ডাকে, ‘এই যে মশায়, ওখানে দাঁড়িয়ে কী করছেন?’

অবন্তীর মুখোমুখি চেয়ারে বসল প্রীতম। হাতজোড় করে বলল, ‘স্যরি অনি, রাস্তায় এত জ্যাম, দেরি করে ফেললাম। তোমাকে অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখেছি, তাই না?’

কিন্তু অবন্তীর যেন সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই। তুড়ি মারার ভঙ্গীতে উড়িয়ে দিল কথাটা, যেন কিছুই হয় নি। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল প্রীতম।এ

বার বল, মহারানীর হঠাৎ কেন এত জরুরি তলব?

তোমার জন্মদিনের গিফট দেব।

আকাশ থেকে পড়ল প্রীতম।জন্মদিন? আমার জন্মদিনের তো এখনো দুই মাস বাকি।

তাতে কী? এডভান্স গিফট দেব।

সেজন্য অফিস থেকে এভাবে জরুরি মিটিং ফেলে আনলে? – প্রীতমের কণ্ঠে এবার কিছুটা উষ্মা।

হুম, আমার ইচ্ছা। তোমার কোনো অসুবিধা? – অবন্তী যেন প্রীতমের কথা গায়েই মাখছে না।

প্রচণ্ড রকমের মেজাজ খারাপ হলেও নিজেকে সামলে নিলো প্রীতম। কারণ জানে, রাগ দেখিয়ে পরবর্তী প্রতিক্রিয়া সামাল দিতে পারবে না।ঠিক আছে, কই দাও তোমার গিফট।

এত তাড়া কিসের? আগে তো জন্মদিনের খাবার খাওয়াও।

কেক অর্ডার করতে হবে নাকি?

হলে মন্দ হত না। তবে ওটা জন্মদিনের দিনই না হয় খাব। আপাতত লাঞ্চ করাও।

ইন্দোনেশিয়ান ফুড নিলো ওরা, নাসি গোরেং। ফ্রাইড রাইস উইথ সানি সাইড আপ পোঁচ এন্ড চিকেন। অবন্তী খুব পছন্দ করে এই মেন্যুটা, প্রীতমের কাছে মোটামুটি লাগে। পরিমাণে বেশ খানিকটা, অবন্তী পুরোটা শেষ করতে পারল না। একটু খেয়েই হাঁসফাঁস। খেতে খেতে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে অবন্তী, একটু যেন প্রগলভ আজ, প্রীতম খেয়াল করল। ওর আশেপাশে কোনো উপহারের প্যাকেট দেখা যাচ্ছে না। জন্মদিনের দুমাস আগেই প্রীতমের জন্য অবন্তী কী উপহার নিয়ে এলো কে জানে? ভাবতে ভাবতে হঠাৎ প্রীতমের মনে হল, দুম করে অবন্তী আবার বলে বসবে না তো, চল আমরা বিয়ে করে ফেলি? প্রীতম আর অবন্তী দুজনের পরিবারই ওদের ব্যাপারটা জানে, কারো কোনো আপত্তিও নেই। তবুও অবন্তীর খেয়ালের খেই পাওয়া মুশকিল। অবন্তী এরকম কোনো কথা বললেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। প্রীতম অস্বস্তি নিয়ে তাকাল অবন্তীর দিকে। প্রীতমের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে ও। এবার প্রীতমের আর সন্দেহ রইল না। এত সাজগোজ করে আসার তবে এই অর্থ? আজই কাজী অফিসে গিয়ে অবন্তীকে বিয়ে করতে হবে? এরপর মাকে কী জবাব দিবে, সেই চিন্তায় নাসি গোরেং বিস্বাদ লাগল প্রীতমের।

এতক্ষণের ভাবনাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করে অবন্তী যখন প্রীতমকে ওর ইমেইল দেখাল, চারপাশ ভুলে গিয়ে চিৎকার করে উঠল সে, ‘এ তুমি কী করেছ অনি?’ বিস্ময়ের প্রাথমিক ধাক্কা সামলে নিয়ে অবন্তীর ইমেইলে নিজের নামে আসা মেইলটা সে আবার পড়ল। প্রীতমের তোলা ছবি প্যারিসের এক আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে। ছবির নাম ‘নেচার’স ফেস’, অর্থাৎ “প্রকৃতির মুখ”। অবন্তী ছবিটা প্রীতমের নাম করে পাঠিয়ে দিয়েছিল।

ঘোরলাগা চোখে প্রীতম অবন্তীর দিকে তাকাল। – “প্রকৃতির মুখ” মানে? আমার কোন ছবিটা অনি?

অবন্তী কিছু বলছে না, ওর চোখেমুখে দুষ্টুমি। খানিক পর যখন মোবাইল থেকে ছবিটা দেখাল, বিস্ময়ের সীমা রইল না প্রীতমের।এবার বুঝলে তো তোমার জন্মদিনের গিফট কেন দু’মাস আগে দিতে হলো?

এটি আমার জীবনে জন্মদিনের শ্রেষ্ঠ উপহার অবন্তী।

তুমি সত্যি খুশি হয়েছো তো? আমার কিন্তু একটু ভয় ভয় করছিল। তোমাকে না জানিয়ে তোমার ছবি পাঠিয়ে দিলাম। আবার না রাগ করে বসো!

খুশি মানে? আমি ভীষণ ভীষণ খুশি অবন্তী। আমার এত আনন্দ লাগছে, ইচ্ছে করছে তোমাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরি। কেন যে এমন ভরা রেস্টুরেন্টে নিয়ে এলে!

প্রীতম আফসোসের ভঙ্গী করল। অবন্তী হাতের ব্যাগ দিয়ে ওর গায়ে দমাদম দু’ঘা বসিয়ে দিল। এমনিতে অবন্তী খুব স্মার্ট, কিন্তু কিছু কিছু ব্যাপারে ভীষণ সেকেলে। তিন বছরে প্রীতমকে এমনকি ওর হাতটাও ধরতে দেয় না। প্রীতম ভাবে, এত কাছে থেকেও এত দূরে রয় বলেই বুঝি অবন্তীর প্রতি ওর আকর্ষণ দিন দিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।

নদীর নাম খোয়াই। নদীটি বেশ চওড়া, তিনশ ফুট মতন হবে। বর্ষায় ফুলে ফেঁপে ওঠে। এখন পানি অনেক কম, তবে বেশ খরস্রোতা। নদীর পাড়ে কিছুটা জায়গা জুড়ে আখ ক্ষেত। আখ গাছগুলো বেশ বড় হয়েছে। প্রীতম গাড়ি থেকে নামতেই দেখল রেমা টি এস্টেটের ম্যানেজার বিমল বাবু তার অপেক্ষায় লোকজন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। খেয়া নৌকা দিয়ে খোয়াই নদী পেরিয়ে রেমা টি এস্টেটে যেতে হয়। এস্টেটটি বেশ বড়, প্রায় বারোশ একর জায়গা নিয়ে এর এলাকা। অনেক পুরাতনও, সে-ই ব্রিটিশ আমলের। এস্টেটের বর্তমান মালিক পিতামহের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে এর মালিকানা লাভ করেছেন। প্রীতমকে দেখে বিমল বাবু সহাস্যে এগিয়ে এলেন। – বেশ তাড়াতাড়ি পৌঁছে গেছেন স্যার।

হ্যাঁ। চার ঘণ্টা লেগেছে। পথে কোনো জ্যাম ছিল না।

বিমল বাবু প্রীতমকে নিয়ে নৌকায় উঠলেন। পাঁচজন মানুষ নৌকায় দাঁড়িয়ে। প্রবল স্রোত নৌকাকে বারবার বিপরীত দিকে নিয়ে যাচ্ছে। প্রীতম সাঁতার না জানলেও এতটুকু ভয় লাগছে না তার। মুগ্ধ হয়ে স্রোতের টান দেখছে। ঠাঠা রোদ্দুরের মধ্যে নদীর বুকের হালকা নির্মল বাতাস স্বস্তির পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। অল্প দূরত্ব, অথচ পার হতে দশ মিনিট লেগে গেলো।

নৌকা থেকে নেমে বিমল বাবুর জীপে উঠে বসল প্রীতম। ওর গাড়ি ওপারে রাখা আছে। ঢালু পাহাড়ি রাস্তা, এবড়ো থেবড়ো পথে ফোর হুইলার ছুটে চলেছে। রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ। ছয় মাস আগে শীতের সময় যখন প্রীতম এসেছিল, তখন এত খানাখন্দ ছিল না। ড্রাইভার জানাল, গত কয়েকদিনের বৃষ্টি, সেই সাথে ট্রাক্টর চলার কারণে রাস্তার এই বেহাল দশা। মিনিট দশেক লাগল বাংলোতে পৌঁছাতে। বাংলোর দরজায় গাড়ি এসে থামতেই দৌড়ে এলো সাত্তার, এখানকার দেখাশোনা করে। গাড়ির দরজা খুলে একগাল হেসে বলল, ‘কেমন আছেন স্যার?’

আগের বার এখানে এসে দুইদিন থেকে গিয়েছিল প্রীতম। জায়গাটা, এবং মানুষগুলোও, তাই পরিচিত।

প্রীতম হেসে উত্তর দিল, ‘ভালো আছি। তোমরা ভালো?’

সাত্তার গাড়িতে প্রীতমের লাগেজ খুঁজছে। লাগেজ বলতে একটামাত্র ব্যাকপ্যাক, সেটা যথাস্থানে আছে। প্রীতম আশ্বস্ত করল তাকে।

এই বাংলোটির মূল কাঠামো পুরনো ধাঁচের। বেশ বড় বড় রুম, কাঠের পাল্লা দেওয়া দরজা। ঢোকার মুখে বৈঠকখানা, একপাশ দিয়ে চওড়া বারান্দা পেরিয়ে পরপর দুটো বেডরুম, লাগোয়া বাথরুমসহ। আরেকপাশে ডাইনিং রুম, সাথে লাগোয়া রান্নাঘর। রান্নাঘরে কাঠের চুল্লি। মালিক কাঠের চুল্লির রান্না খেতে পছন্দ করেন। এস্টেটের মালিক আর তার ছেলে এখানে নিয়মিত আসেন তদারকির জন্য। এছাড়া আত্মীয় বন্ধুরাও প্রায়ই বেড়াতে আসেন। বাংলোতে মোটামুটি আধুনিক সব ব্যবস্থা রয়েছে।

কদিন আগে থেকে গেছে। আগের সেই রুমটাতে ঝোলাসমেত আস্তানা গাড়ল প্রীতম, একরাতের জন্য। কাজ হয়ে গেলে কালই ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা।

ঢাকায় খুপরি ফ্ল্যাটে থেকে অভ্যস্ত প্রীতমের এই খোলামেলা পরিবেশে এসে নিজেকে মুক্ত বিহঙ্গের মত মনে হয়। ঘরময় এক চক্কর ঘুরে এসে খাটে একপ্রস্ত গড়াগড়ি খেল প্রীতম। খাটটাও ঘরের সাথে মানানসই, মনে হয় একসঙ্গে চারজন শোওয়া যাবে। এসির ঠাণ্ডা হাওয়ায় চোখ লেগে আসার আগ মুহূর্তে প্রীতম উঠে বসল। এখন ঘুমলে চলবে না।

ওয়াশরুমে ঢুকল সে। বাড়িটার মান রেখে ওয়াশরুমটাও বেশ বড়। ঢাকায় ওর ফ্ল্যাটের গেস্ট রুমের সমান হবে, একদিকে বড় বাথটাব। ফ্রেশ হয়ে বাইরে এলো সে।

প্রীতমকে দেখে দৌড়ে এলো কার্তিক, এখানকার বাবুর্চি। – স্যার, চায়ের সাথে কী দিব?

চা বাগানে এসে চা খাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এখনই একবার বাগান থেকে ঘুরে আসতে চায় প্রীতম। এখন চা খাওয়া মানে আরো দশ মিনিট সময় নষ্ট। সকালে ভারি নাস্তা করেছে সে। এখন এগারোটা বাজে। একদম ক্ষুধা নেই। নিষেধ করল সে।না, এখন আর চা নয় কার্তিক। একবারে দুপুরে খাওয়ার পরে।

দুপুরে কী খাবেন স্যার?

কী খাওয়াবে?

স্যার, বনমোরগ আছে। ঝাল দিয়ে ঝোল ঝোল করে রাঁধব। সাথে বেগুন আর পটল ভাজা, রুই মাছের কোপ্তা। এ বেলায় চলবে স্যার?

চলবে মানে? রীতিমত দৌড়বে। তুমি যেভাবে খাবারের বর্ণনা দিচ্ছ, আমার তো এখনই খিদে চাগাড় দিয়ে উঠছে হে!

প্রীতমের কথায় কার্তিক একগাল হাসল। – স্যার যে কী বলেন! হুট করে আসবেন বললেন, কোনো আয়োজনই তো করতে পারলাম না।

আর কোনো আয়োজনের দরকার নেই কার্তিক। তোমার হাতের উচ্ছেও অমৃত।

কার্তিক বিগলিত হাসল। প্রীতম মোটেই বাড়িয়ে বলে নি। পনের বছর ধরে এই বাগানে বাবুর্চি হিসাবে আছে ও। ওর রান্না একবার যে খেয়েছে, সে বহুদিন সেটা মনে রাখতে বাধ্য। মালিক মাঝেমধ্যে রসিকতা করে বলেন, ‘আমার বাগানের টানে না হোক, কার্তিকের রান্নার টানে এখানে কেউ একবার এলে নির্ঘাত আবার আসবেই।‘

প্রীতম বাংলোর বাইরে এসে দাঁড়াল। বেশ বড় বড় কয়েকটা সেগুন গাছ। নাম-না-জানা আরো অনেক গাছ আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেখেই বোঝা যায় অনেক দিনের পুরানো। একপাশে একটা দোলনা আছে। এখানে দাঁড়ালে খানিক দূরের খোয়াই নদী দেখা যায়। ওপাড়ে সারি সারি গাছ আকাশের বুকে জড়াজড়ি করে রয়েছে।

বিমল বাবু প্রীতমকে দেখে এগিয়ে এলেন।

এবার আসল কথাটা পাড়ল প্রীতম। – বিমল বাবু, সঙ্গীতাকে এখন কোথায় পাওয়া যাবে বলতে পারেন? সঙ্গীতা? কে সঙ্গীতা?

সেই যে সেবার এসে যে মেয়েটাকে চা বাগানে দেখেছিলাম। আপনার মনে নেই, আমি ওর ছবি তুলেছিলাম?

সঙ্গীতার কথা বলতে বলতে প্রীতম যে কিছুটা উত্তেজিত, তার চোখেমুখে যে অন্যরকম এক দীপ্তি ছড়িয়ে পড়েছে, সেটা বিমল বাবুর চোখ এড়াল না।

তিনি বিস্মিত এবং বিরক্ত হয়েছেন তো বটেই, সেই সাথে চিন্তিতও। কাল রাতে মালিকের ছেলের বন্ধু প্রীতম বিমল বাবুকে ফোনে জানিয়েছিল জরুরি প্রয়োজনে আজ আসবে। এই তাহলে তার প্রয়োজন? ঢাকা থেকে একশো সত্তর কিলোমিটার দূরে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের এই চা বাগানে প্রীতম এসেছে সঙ্গীতা নামের কোনো এক কামিনের খোঁজে? দীর্ঘ আঠার বছর চা বাগানে কাটিয়েছেন তিনি। আগে যদিও অন্য বাগানে ছিলেন, তবুও সব চা বাগানের স্বরূপ এক। আঠার বছরে চা বাগানের ছোট্ট ভুবনে তিনি যেমন অনেক ঘটনা, রটনা, কাহিনীর চাক্ষুষ সাক্ষী, নিজেও তেমনি অনেক কিছুতে জড়িয়েছেন। ছয় মাস পরে সঙ্গীতা নামের সেই কামিনকে হঠাৎ কী এমন জরুরি প্রয়োজন পড়ল প্রীতমের? না, ব্যাপারটা তার কাছে বিশেষ সুবিধার ঠেকছে না। বিমল বাবু সাবধান হলেন।

বিমল বাবুকে নিরুত্তর দেখে প্রীতম আবারও জিজ্ঞেস করল, ‘কী হল? সঙ্গীতাকে আপনি চিনতে পারছেন না?’

প্রীতমের কণ্ঠে এবার কিছুটা অসহিষ্ণুতা।

বিমল বাবু, প্রীতমের চোখে চোখ রেখে বললেন, এই চা বাগানে কুলি কামিন মিলিয়ে মোট সাতশো জনের মত রয়েছে। এদের মধ্য থেকে আপনি কার খোঁজ করছেন সেটা তো আমি বুঝতে পারছি না।

তাই তো! এ ব্যাপারটা তো প্রীতমের মাথায় আসে নি! প্রীতম এখন বিমল বাবুর কাছে সঙ্গীতার কী বর্ণনা দিবে? চাইলেই ও এখন বিমল বাবুকে সঙ্গীতার ছবিটা দেখাতে পারে। ছবি দেখে বিমল বাবু না চিনুক, কেউ না কেউ নিশ্চয়ই সঙ্গীতাকে ঠিক চিনতে পারবে। কুলি-কামিনদের বেতন দেওয়া থেকে শুরু করে কাজকর্ম তদারকি, এসবের জন্য ম্যানেজার ছাড়া অন্য বাবুরাও রয়েছেন। বিমল বাবুর পক্ষে সকলকে না চেনাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাবুদের কেউ না কেউ নিশ্চয়ই সঙ্গীতাকে চিনেন।

কিন্তু প্রীতমের তোলা ছবি, যেটা প্যারিসে প্রথম পুরষ্কার পেয়েছে, সেই ছবিটা সে আগেই অন্য কাউকে দেখাতে চায় না। প্রীতম চায় ছবিটা প্রথম সঙ্গীতার হাতেই তুলে দেবে সে।

প্রীতম আরো একবার বিমল বাবুর কাছে সঙ্গীতার বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা করল। – সেই যে বিমল বাবু, গতবার আপনি আমাকে ঘুরে ঘুরে চা বাগান দেখাচ্ছিলেন। সে সময় বাগানে যেসব মেয়ে চা পাতা তুলছিল, আমি তাদের ছবি তুলেছিলাম। তাদেরই একজন। ঐ যে মেয়েটা, শ্যামলা মত, উসকোখুসকো চুল, পিঠে ঝোলা নিয়ে তাতে পাতা ভরে রাখছিল। আমি ছবি তুলতে যেতেই কী সুন্দর করে হাসল।

প্রীতম আগ্রহ নিয়ে তাকাল বিমল বাবুর দিকে।

বিমল বাবু নিঃস্পৃহ গলায় বললেন, ‘স্যার, আপনি যা বললেন, শ্যামলা রঙ, উসকোখুসকো চুল, পিঠের ঝোলায় পাতা ভরছে, চা বাগানের সব মেয়েই তো এরকমই।‘

প্রীতম বিমল বাবুর কথায় বিরক্ত হল। বিমল বাবুর কোনো ধারণাই নেই উনি কার সম্পর্কে কী বলছেন। সঙ্গীতার ছবি প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে। ও মোটেই আর সব মেয়েদের মত নয়, হতেই পারে না।

মরিয়া হয়ে প্রীতম বলল, না না, এই মেয়েটা আলাদা। ওর হাসিটা খুব সুন্দর, মানে নির্মল আর কী!

বিমল বাবু প্রীতমের দিকে বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালেন। প্রীতম বুঝল ভদ্রলোক বিরক্ত হচ্ছেন। ওর সম্পর্কে কী ভাবছেন কে জানে? কিন্তু উনার ভাবনাকে পাত্তা দিলে চলবে না। যে করেই হোক সঙ্গীতাকে খুঁজে বের করতে হবে।

প্রীতম মরিয়া হয়ে বলল, ‘একটু দেখেন না দাদা, অন্য কেউ হয়তো চিনবে। এখানকার বাবুদের তো সবার সাথে চেনাজানা থাকে।’

বিমল বাবু প্রীতমকে পুরোপুরি উপেক্ষাও করতে পারছেন না। তার কারণ প্রীতম এস্টেটের মালিকের খাস মেহমান। আগের বার প্রীতম এখানে আসার আগে মালিকের ছেলে ফোন করে বলে দিয়েছিল, ওর যেন কোনোরূপ অযত্ন না হয়। সভ্য সমাজের কিছু অলিখিত নিয়মকানুন থাকে। সেই নিয়মের কারণেই বিমল বাবু প্রীতমকে জিজ্ঞেস করতে পারলেন না, সঙ্গীতাকে আসলে তার ঠিক কী কারণে প্রয়োজন। বিমল বাবুর দৃষ্টিতে ধরা পড়েছে এখানে কোনো একটা ‘কিন্তু’ আছে। তাঁর অভিজ্ঞ মন কিংবা মস্তিষ্ক যদিও তাকে সাবধান করে দিচ্ছে যে সঙ্গীতাকে খুঁজে না দেওয়াটাই সমীচীন, তথাপি তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা অনুসন্ধিৎসু মন বলছে দেখাই যাক না ‘কিন্তু’টা কী। তিনি বাংলোর দিকে এগোতে এগোতে প্রীতমকে কিছুটা আশ্বস্ত করলেন, ‘ঠিক আছে, দেখি কী করা যায়।’

ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে বিমল বাবু কয়েকজনের সঙ্গে ফোনে কথা বললেন। মিনিট দশেক পর প্রীতমকে বললেন, ‘চলেন যাই, স্যার। আপনার সঙ্গীতাকে খুঁজে বের করি।’

‘আপনার সঙ্গীতা’ শব্দ দুটো কানে লাগলেও প্রীতম কিছু বলল না। প্রয়োজনের খাতিরে মাঝে মধ্যে এমন দু একটা ঘা সহ্য করে নিতে হয়। প্রীতম ব্যাপারটা উপেক্ষা করল।

মিনিট বিশেক চলার পর বাগানের মাঝামাঝি এক জায়গায় জীপ থামল। জীপ থেকে নামার পর সহকারী ম্যানেজার নির্মল বাবু আর বাগানের বড়বাবু প্রীতমকে যে মেয়েটির কাছে নিয়ে গেলেন, সে নিবিষ্টমনে অভ্যস্ত দ্রুত হাতে পাতা তুলে যাচ্ছে। কোনোদিকে তার ভ্রূক্ষেপ নেই।

কিন্তু এ সঙ্গীতা নয়।

প্রীতম সে কথাটা ওদেরকে বলার আগে পাতা তুলতে তুলতেই একটু মুখ তুলে মেয়েটি হঠাৎ বলে উঠল, ‘কী বাবু, আইজ আবার ফোটো উঠাবে?’

প্রীতম তৎক্ষণাৎ মেয়েটিকে চিনতে পারল। এই মেয়েটির ছবিও তার ক্যামেরায় রয়েছে। প্রীতমের স্পষ্ট মনে আছে, ছয়মাস আগে সেবার যখন ও এই বাগান ঘুরে দেখছিল, সে সময় নির্মল বাবুকে বলেছিল সে বাগানের মেয়েদের কিছু ছবি তুলতে চায়। নির্মল বাবু তখন এই মেয়েটির কাছে এসে বলেছিল, ‘এই, এদিকে আয়। এই স্যার তোদের ছবি তুলবেন।‘ কিন্তু ব্যাপারটি মেয়েটির পছন্দ হয় নি। সরাসরি না-ও করে নি। নিতান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও চোখমুখ শক্ত করে দাঁড়িয়েছিল। প্রীতমেরও ব্যাপারটা পছন্দ হয় নি। প্রীতম চেয়েছিল, পাতা তোলারত মেয়েদের স্বাভাবিক ছবি তুলতে, ওদের বলে কয়ে পোজ দেওয়া ছবি নয়। এই মেয়েটার কয়েকটা ছবি তোলার পর প্রীতমের চোখ পড়েছিল অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির দিকে। পাতা তোলা থামিয়ে রেখে কৌতূহলী চোখে এদিকে তাকিয়ে ছিল মেয়েটি। ক্যামেরার শাটার টিপতে আর এক মুহূর্ত দেরি করে নি প্রীতম।

কি যেন নাম এই মেয়েটির? হ্যাঁ, মনে পড়েছে। স্বপ্না। প্রীতম স্বপ্নাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি নিশ্চয়ই সঙ্গীতাকে চেনো?’ স্বপ্না চোখমুখ কুঁচকে দাঁড়িয়ে রইল, কোনো উত্তর দিল না। প্রীতম লক্ষ করেছে এই মেয়েটা কোনো কিছুকে সহজভাবে নেয় না। এর আগেরবার ছবি তুলতে বলার পরেও সে ঠিক এরকমভাবে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে ছিল। অথচ সঙ্গীতা একেবারে অন্যরকম। হাসিহাসি মুখ করে আগ্রহ নিয়ে ছবি তুলতে দিয়েছিল। ছবি তোলা শেষে প্রীতম ওর সাথে গল্পও করেছিল খানিক। সঙ্গীতার বয়স বড়জোর পনের ষোলো হবে। তার দুচোখে যেন পৃথিবীর সবকিছুর প্রতি মুগ্ধতা আর সারল্য মাখা অপার বিস্ময়। স্বপ্না বয়সে আরো বড়। সাতাশ আটাশ কিংবা তারও বেশি হতে পারে। হয়তো সঙ্গীতার চাইতে সে জীবনকে অনেক বেশি দেখেছে। বিস্ময়ের বদলে সবকিছুতে তাই তার সন্দেহ আর প্রশ্নবোধক। হয়তোবা বয়সের সাথে সাথে নিজের অজান্তেই মানুষ তার সহজাত সারল্য আর বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতাটুকু হারিয়ে ফেলে।

স্বপ্না প্রীতমের কথার কোনো উত্তর দিচ্ছে না দেখে বড়বাবু তার দিকে এগিয়ে গেলেন। ধমকের সুরে বললেন, ‘কীরে কথা কানে যায় না? সাহেব কী জিজ্ঞেস করছেন? সঙ্গীতা কোথায়?’

পলকের জন্য প্রীতমের দিকে অগ্নিদৃষ্টি হানল স্বপ্না। যেন দৃষ্টি দিয়েই বলতে চাইল, ‘তোমাদের শহুরে বাবুদের আমাদেরকে নিয়ে এত আদিখ্যেতা কেন বাপু?’ তারপর বড়বাবুর দিকে ফিরে বলল, ‘কাঁহে বাবু আইজ না জানো তোঁহে ওগোর বিয়া?’
প্রীতম চমকে উঠল। পলকের জন্য বুকের গভীরে কোথায় বুঝি চিনচিন করে উঠল। সঙ্গীতার সাথে কি তবে দেখা হবে না?

বড়বাবু প্রীতমের দিকে ফিরে বললেন, ও হ্যাঁ, যে মেয়েটার আজ বিয়ে হচ্ছে, ওর নামই তো সঙ্গীতা। আপনি তাকেই খুঁজছেন তো?

কথা বলতে গিয়ে প্রীতম বুঝল গলা বসে গেছে। কেশে গলা পরিষ্কার করে বলল, ওর নাম তো সঙ্গীতাই। মনে হচ্ছে ও-ই। কিন্তু আজ ওর বিয়ে হলে কি ওর সাথে দেখা করা যাবে না?
প্রীতম লক্ষ করল স্বপ্না কাজে ফিরে যায় নি। দাঁড়িয়ে থেকে ওদের কথা শুনছে।

স্বপ্নার মতনই সন্দিগ্ধ চোখে তাকালেন বড়বাবু। – ওকে কি আপনার খুব জরুরি দরকার, স্যার?

বড়বাবুর দৃষ্টিকে পাত্তা দিল না প্রীতম। মরিয়া হয়ে বলল, ‘ হ্যাঁ, ভীষণ জরুরি।’

বড়বাবু কিংবা বিমল বাবু কিছু বলার আগে স্বপ্না কড়া গলায় বলে উঠল, ‘না বাবু, আইজ দেখা করন না যায়।‘

প্রীতম ওর দিকে সরাসরি তাকাল। যতটুকু সম্ভব স্বর কোমল করে বলল, ‘কেন দেখা করা যাবে না? আমি শুধু ওর সাথে এক মিনিট কথা বলেই চলে আসব। ওর জন্য আমি একটা উপহার নিয়ে এসেছি।’

উপহার? তার মানে কি প্রীতম আগে থেকেই জানত আজ সঙ্গীতার বিয়ে? না, তা কী করে হয়? বিমল বাবু, বড়বাবু দুজনেই কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকালেন। কিন্তু প্রীতম এখন তাদের কৌতূহল নিবৃত্ত করতে অপারগ। সঙ্গীতার ছবিটা যে এত বড় একটা আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে, প্রীতম সেটা সঙ্গীতাকেই বলতে চায়, ওর তোলা ছবিটা সঙ্গীতার হাতে দিয়ে।

সঙ্গীতার সঙ্গে কেন দেখা করা যাবে না বড়বাবু সেটা বুঝিয়ে বললেন। সঙ্গীতাকে একপ্রকার জোর করে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই চা বাগানেরই এক কুলি রতনের সাথে ওর মন দেয়ানেয়া চলছিল। কদিন আগে সেটা জানাজানি হয়ে পড়ে। রতন জাতে উঁচুতে, সুতরাং ভিন্ন জাতের এই দুই তরুণ-তরুণীর মধ্যকার প্রেম কোনো পক্ষই মেনে নেয় নি। সঙ্গীতার পরিবার অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ওর বিয়ে ঠিক করে ফেলে মৌলভীবাজারে এক চা বাগানের কুলির সাথে। রতন নাকি দা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল হবু বরকে দেখলেই এক কোপে তাকে দুই টুকরা করে ফেলবে। আপাতত রতনের পরিবার তাকে তালাবদ্ধ করে রেখেছে। পুরো চাবাগানে এ নিয়ে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। এরকম অবস্থায় বলা নেই কওয়া নেই, শহুরে বাবু হঠাৎ সঙ্গীতার সঙ্গে কেন দেখা করতে আসবে? ব্যাপারটাকে কেউ সহজভাবে নিবে না, এটাই স্বাভাবিক।

অবন্তী সাথে থাকলে পরিস্থিতি আরো সহজ হত। কিন্তু অবন্তীকে সে কী করে ওর সাথে আনে? প্রীতমের সাথে একা এখানে আসার প্রস্তাবে অবন্তী নিজেই রাজী হতো না। ইস! আর কয়েকটা মাস পর যদি হতো! অবন্তীর সাথে ওর বিয়ে হয়ে গেলে তখন ওকে নিয়েই আসা যেত। প্রীতমের আফসোস হল।

কিন্তু এখন এসব ভেবে লাভ নেই। বড়বাবুর কথা শুনে প্রীতমের মনে নতুন চিন্তার উদয় হল। বিয়ের পর আজই নিশ্চয়ই সঙ্গীতা ওর বরের বাড়ি চলে যাবে। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, আজ না পারলে আর কোনোদিন সঙ্গীতার সঙ্গে দেখা করতে পারবে না প্রীতম। বোধ করি আর কয়েকটা ঘণ্টা মাত্র। এর মাঝে যে কোনো মূল্যে সঙ্গীতার সঙ্গে দেখা করতেই হবে।

বিমল বাবুকে সেকথা বলতেই তার মুখে চিন্তার ছাপ দেখতে পেল প্রীতম। স্পষ্টতই তিনি বিরক্ত হচ্ছেন। কিন্তু প্রীতম নাছোড়বান্দার মত তাকে অনুরোধ করতেই লাগল। শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে প্রীতমের সাহায্যে এগিয়ে এল স্বপ্না। বলল, ‘চল তো বাবু, হাম তোঁহে লেকে যাই।’

প্রীতম যারপরনাই বিস্মিত এবং আনন্দিত হল। আবার কী গোলমাল হয় সে ভেবে প্রীতমকে নিরস্ত করতে চাইলেন বিমল বাবু। কিন্তু প্রীতম যাবেই। স্বপ্নার দেখানো পথ ধরে সঙ্গীতার বাড়ীর উদ্দেশে চলতে লাগলো প্রীতম। বিমল বাবু, নির্মল বাবু আর বড়বাবুও সাথে চললেন। যতটা না প্রীতমের জেদের কারণে, তার চাইতে বেশি তাদের কৌতূহল নিবৃত্ত করতে।

সঙ্গীতার বাড়িতে পৌঁছে মিনিট দশেক ধরে জেরা, পাল্টা জেরা চলল। কথাবার্তায় বোঝা গেল, বাগানের ম্যানেজার, সহকারী ম্যানেজার, বড়বাবু সকলে এলেও কনের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি মিলত না, যদি স্বপ্না না থাকত। প্রীতমকে ভেতরের ঘরে নিয়ে গেল স্বপ্না। রঙ্গিন কাগজ আর ঝালর দিয়ে রুমটা সাজানো। বধূ বেশে সঙ্গীতা বসে আছে লাল-হলুদ নকশা করা পাটিতে। ওর পরনে গাঢ় ম্যাজেন্টা রঙ এর জরির কাজ করা শাড়ি। কপালে, গালে চন্দনের ফোঁটা। ছয় মাসে মেয়েটির বয়স যেন কয়েক বছর বেড়ে গেছে। প্রীতমের দিকে ভাষাহীন দুচোখ মেলে চাইল সে। মেয়েটির চোখের সেই অবারিত কৌতূহল, নিষ্পাপ সারল্য মাখা সেই হাসি কোথায় হারিয়ে গেছে!

সঙ্গীতার ছবিটা পোস্টার সাইজে বাঁধাই করে এনেছিল প্রীতম। চঞ্চলা কিশোরী মেয়েটি যখন জানতে পারবে যে তার এই ছবিটা পৃথিবীর কত শত ছবির ভিড়ে শ্রেষ্ঠ হয়েছে, সে যে কতটা খুশি হবে সেটা ভেবে ভেতরে ভেতরে পুলক অনুভব করছিল প্রীতম। সঙ্গীতাকে দেখে সেসব ভুলে গেল। প্রীতমের মনে হল এর চাইতে বুঝি ভালো ছিল সঙ্গীতার সাথে যদি ওর আর দেখা না হত।

নিশ্চল নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল সে। মিনিটেরও কম সময়, কিন্তু প্রীতমের মনে হল যেন অনন্তকাল। স্বপ্নার ডাকে ফিরল সে। – বাবু, সঙ্গীতাক তোঁহু কাঁহে খোঁজত ডালা?

প্রীতমের একবার মনে হল ফিরে যায়। তার সামনে বধুবেশে যে মেয়েটি বসে আছে, সে প্রীতমের হাতে ধরে রাখা “প্রকৃতির মুখ” নয়। কিন্তু এত কাঠখড় পুড়িয়ে এতদূর এসে চাইলেই কি ফিরে যাওয়া যায়? প্রীতম তাকিয়ে দেখে সকলের চোখেমুখেই কৌতূহল। শহুরে বাবুর হঠাৎ করে কেন এভাবে সঙ্গীতার খোঁজ করা, তাও কিনা তার বিয়ের দিনে, তার ব্যাখ্যা শোনার জন্য সকলে উৎসুক প্রতীক্ষায়। বধুবেশী সঙ্গীতার সামনে ধীরে ধীরে হাঁটু মুড়ে বসলো প্রীতম। কাগজে মোড়ানো বাঁধাই করা ছবিটি তার সামনে রাখল।

সঙ্গীতার চোখে একই সাথে কৌতূহল আর বিস্ময় খেলে গেল। তবে সেটা মুহূর্তের জন্য মাত্র। হাত বাড়িয়ে ছবিটা নেওয়ার জন্য কোনো আগ্রহ দেখা গেল না। কাগজের মোড়ক খুলে ছবিটি বের করে সেটির দিকে বিস্ময়বিমুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল স্বপ্না। তারপর সঙ্গীতাকে দেখিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগলো, ‘দ্যাখ সঙ্গীতা, বাবু তোর কী সোন্দর ফোটো উঠাক আনলে।‘ প্রীতম উৎসাহী কণ্ঠে বলল, ‘জানো সঙ্গীতা, তোমার এই ছবিটা বিদেশের এক প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে। অর্থাৎ যত ফটো ওখানে দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে তোমার ফটোটাই সবচেয়ে সুন্দর।’

কিন্তু সঙ্গীতার কোনো ভাবান্তর নেই। এক লহমায় কেউ যেন তার ভেতর থেকে সমস্ত আবেগ উচ্ছ্বাস শুষে নিয়েছে। কয়েক সেকেন্ড নীরবতা, তারপর ধীর পায়ে সেখান থেকে বেরিয়ে এলো প্রীতম।

সঙ্গীতার বাড়ি থেকে বেরিয়ে বিমল বাবু প্রথম কথা বললেন, ‘এই ফটো দেওয়ার জন্য আপনি এত কষ্ট করে সঙ্গীতার বাড়ি অব্দি এলেন স্যার? আমার কাছে দিলে লোক পাঠিয়ে আমিই পৌঁছে দিতে পারতাম। আপনার এত কষ্ট করে ঢাকা থেকে আসারও দরকার ছিল না। পোস্টে পাঠিয়ে দিলেই তো হত।‘ – বিমল বাবুর কণ্ঠে রাজ্যের হতাশা।

ততোধিক হতাশা এবং বিরক্তি নিয়ে বড়বাবু বলে উঠলেন, ‘ফটোটা ওকে দেওয়ারই বা কী দরকার ছিল স্যার? এইসব ছোটলোকের কাছে ফটোই বা কী, আর পুরস্কারই বা কী?’

যেন খুব মজার কোনো কথা বলেছেন, নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে উঠলেন বড়বাবু। তার সাথে যোগ দিলেন বাকিরাও।

প্রীতম উত্তরে কিছু বলল না। বাঁকের মুখে এসে স্বপ্না যখন অন্য পথ ধরছে, প্রীতম অনুচ্চ কণ্ঠে তাকে শুধু বলল, ‘তোমার উপকারের জন্য অনেক ধন্যবাদ স্বপ্না।’

স্বপ্না থমকে দাঁড়াল। আটাশ বছরের জীবনে কম মরদ তো আর দেখে নি। প্রথমটায় সে ভেবেছিল এ বুঝি আর সব মরদের মতনই। আগ বাড়িয়ে কথা বলবে, ফটো তুলে খাতির জমাবে, তারপর সুযোগমত গায়ে হাত দিবে। তবে এই বাবুটা কেমন যেন। আলাভোলা, পাগলা কিসিমের। তবে এমন কিছু পাগলা কিসিমের মরদ আছে বলেই দুনিয়া টিকে আছে, ভালোবাসা টিকে আছে।

পথের বাঁক ঘুরতে ঘুরতে প্রীতম দেখল, স্বপ্না ওকে হাসিমুখে হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছে। প্রীতম অবাক হয়ে লক্ষ করল, এই মেয়েটির চোখ দুটো আজ আশ্চর্য রকমের উজ্জ্বল।

দুমাস পর সঙ্গীতার সাথে আবার দেখা হল প্রীতমের, প্যারিসের আগাথে গেইলার্ড গ্যালারিতে। নয় দিনব্যাপী ফটোগ্রাফি প্রদর্শনীতে অংশ নিতে এখানে এসেছে প্রীতম, সাথে নবপরিণীতা। প্রদর্শনীর শেষ দিনে প্রথম পুরস্কারের সন্মাননা নিতে গিয়ে ফটো আর ফটোর মেয়েটি সম্পর্কে কিছু বলতে বলা হল প্রীতমকে। আগে থেকে ইংরেজিতে কী বলবে ঠিক করে রেখেছিল প্রীতম। কিন্তু মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে ছবির দিকে তাকাল যখন, সেসব কিছুই আর মনে রইল না। ওর দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো। কেশে গলা পরিষ্কার করে কোনোমতে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে শুধু সে বলতে পারল, ‘প্রকৃতি ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলায়। এই বসুমতীর একই অঙ্গে কত রূপ। আমাদের সাধ্য কী সেই রূপকে আবিষ্কার করি? তবে এই সহজ সরল বালিকার মুখে আমি প্রকৃতিকে দেখেছি। ক্ষণিকের সেই মুহূর্তটি আমার ক্যামেরায় ধরে রাখার চেষ্টা করেছি মাত্র।’

পুরস্কার বাবদ প্রীতম পেয়েছে বাংলাদেশী টাকায় প্রায় তিন লক্ষ টাকার মত। হোটেলে ফিরেই অবন্তী বলল, এই টাকাটা সঙ্গীতার পাওনা। প্রীতম মনে মনে এরকম কিছুই ভাবছিল, অবন্তীর কথায় ভরসা পেল।

প্যারিস থেকে ফিরে কাজের চাপে ব্যস্ত হয়ে পড়ল প্রীতম। মাস খানেক পর সব গুছিয়ে এক সকালে প্রীতম রওয়ানা হল রেমা চা বাগানের পথে। এবার আর একা নয়, অবন্তীও আছে ওর সঙ্গে। প্রীতম জানে ওরা সঙ্গীতার দেখা পাবে না। নিশ্চয়ই সে এখন তার শ্বশুর বাড়িতে। ওদের আসার উদ্দেশ্য টাকাগুলো সঙ্গীতার বাবামায়ের হাতে তুলে দেওয়া, সেই সাথে সঙ্গীতা কেমন আছে সেটাও জানা যাবে।

বাংলোতে পৌঁছে এক মুহূর্ত দেরী করল না অবন্তী। এখুনি চা বাগান ঘুরে আসতে চায় ও। সদ্য বিয়ে হয়েছে। প্রীতমের সাথে যদিও আগে থেকে পরিচয়, তবে এভাবে একসাথে ঘোরা হয় নি কখনও। ঘোরাঘুরিটা সেই রেস্টুরেন্ট, পার্ক আর ক্যাম্পাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কদিন ধরে অবন্তী যেন শিশুর মত উচ্ছল হয়ে উঠেছে। প্রীতমও বেশ উপভোগ করছে। এই চা বাগানে এর আগে ও আরো দুবার এসেছে। অথচ এবারের মত ভালো এর আগে লাগে নি।

বাগানের মাঝামাঝি জীপ থেকে নেমে প্রীতম আর অবন্তী বিভিন্ন পোজে বেশ কিছু ছবি তুলল। চা বাগানের সবুজের পটভূমিকায় লাল শাড়ি পরিহিতা অবন্তী যেন সূর্যের মত জ্বলজ্বল করছে।

এখন বারোটা। মেয়েরা এতক্ষণ ইতস্তত পাতা তুলছিল। এখন ওদের মধ্যাহ্নভোজের সময়। একপাশে পাঁচ সাতজন কামিন ঘটিবাটি নিয়ে বসেছে। অবন্তী সেদিকে এগিয়ে গেল।

কী গো, কী করছ তোমরা?- অবন্তীর গলায় কৌতূহল।

বয়স্ক একজন মহিলা লজ্জা পেয়ে ঘোমটার আড়ালে মুখ ঢেকে ফেলল। দুজন কৌতূহলী চোখে তাকাল। যে যুবতী মেয়েটি বাটিতে খাবার মাখছিল, সে একবার শুধু চোখ তুলে তাকিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গীতে কাজ করতে লাগল। বাকি তিনজন কিশোরী মেয়ে নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করতে করতে হাসতে হাসতে এ ওর গায়ে ঢলে পড়তে লাগল। বড়বাবু কাছে এসে ধমক লাগালেন, ‘কী, কথা কানে যায় না? ম্যাডাম কী জিজ্ঞেস করছেন?’

তারপর নিজেই বলতে লাগলেন, ‘ম্যাডাম, ওরা এখন লাঞ্চ করবে।’

ও তাই বুঝি? তোমরা বাসা থেকে খাবার নিয়ে আস? ভাত নাকি রুটি?

মেয়ে তিনটি আবারও খিলখিল করে হাসতে লাগল। হাসির দমকে ওদের পিঠ ফুলে ফুলে উঠছে। প্রীতমের মনে পড়ল সংগীতার কথা। ওর মন খারাপ হয়ে গেল।

মেয়ে তিনটির দিকে বিরক্ত চোখে তাকিয়ে বড়বাবু উত্তর দিলেন, না ম্যাডাম। দুপুরে ওরা ভাত বা রুটি খায় না। ঐ যে দেখছেন ঐ মেয়েটি বানাচ্ছে, এই খাবারটাই ওরা খাবে। চা পাতা কুঁড়ি আর সেই সাথে চানাচুর, আলুসেদ্ধ, চাল ভাজা, সরিষার তেল, এসব মিশিয়ে এক ধরণের ভর্তা। এর নাম পাতিচকা।

অবন্তী বেশ উৎসাহিত হয়ে এগিয়ে গেল। যে মেয়েটি পাতিচকা বানাচ্ছে, তার কাছে গিয়ে মিষ্টি গলায় বলল, কী গো, আমাকে একটু দেবে নাকি তোমাদের এই ভর্তা?

প্রীতম দেখল দু’চার মিনিটের মধ্যেই অবন্তী বেশ ভাব জমিয়ে ফেলেছে এই মেয়েগুলোর সাথে। ঘোমটা টেনে যে মহিলাটি মুখ আড়াল করে রেখেছিল, সেও এখন ঘোমটা সরিয়ে অবন্তীর সাথে বেশ হেসে হেসে কথা বলছে। যে কিশোরী তিনটি হাসাহাসি করছিল, ওরা এখন হাসি থামিয়ে আগ্রহ নিয়ে অবন্তীর কথা শুনছে। আর অবন্তী ওদের পাতিচকা নিয়ে একটু একটু করে মুখে পুরছে। এত দূর থেকেও অবন্তীর মুখের ভাব দেখে প্রীতম বেশ বুঝতে পারছে জোর করেই অবন্তী এই খাবার খাচ্ছে। উফ! মেয়েটা পারেও বটে!

দশ মিনিট হয়ে গেল, অবন্তীর ওঠার নাম নেই। প্রীতম জোর করে অবন্তীকে নিয়ে এলো। বাংলোতে ফিরে ওদেরও ফ্রেশ হয়ে খাওয়া দাওয়া সারতে হবে। কিন্তু অবন্তী আরেকটু ঘুরতে চায়। দুজন চা বাগানের মাঝখানে হাঁটতে লাগল। রেমা টি এস্টেট ভারত সীমান্ত ঘেঁষে, ওপাশে ত্রিপুরা রাজ্য। কাঁটাতারের বেড়া আর সীমানা চিহ্ন দিয়ে আলাদা করা। এখানকার কুলি কামিনদের অনেকেই ওপার থেকে এসে বসত গড়েছে, জানালেন বড়বাবু।

কিছুদূর এগিয়ে ওরা দেখল ওপাশে দুতিন জন মেয়ে পাতা তুলছে। অবন্তী ওদের পাশে দাঁড়িয়ে পাতা তুলবে। প্রতিটি ডালের অগ্রভাগে দুটি কচি পাতা আর একটি কুঁড়ি তুলে নিতে হয়। দেখে মনে হয় খুব সহজ, কিন্তু অবন্তীর পাতা তুলতে বেশ সময় লাগছে। অথচ মেয়েগুলো কী দ্রুততার সাথে পাতা তুলে ঝুড়িতে ভরছে। এদের বেশিরভাগ স্থায়ী কর্মী, বাঁধা মজুরী পায়। আর অস্থায়ী যে কজন, ওদের মজুরি হয় পাতার পরিমাণের উপর। অবন্তী বায়না ধরল কামিনদের সঙ্গে ওর ছবি তুলে দিতে হবে। ক্যামেরা লেন্সের মধ্য দিয়ে সামনে তাকিয়ে স্থির হয়ে গেল প্রীতম, শাটার টিপতে পারল না। এ কাকে দেখছে সে?

অবন্তীর পাশে যে মেয়েটি দাঁড়িয়ে একমনে চায়ের পাতা তুলছে, যে কেউ দেখে বলে দিতে পারবে মেয়েটি সন্তানসম্ভবা। কিন্তু ও এখানে কেন?

অবন্তী তাড়া দিচ্ছে। – কী হল? ছবি তুলছ না যে!

প্রীতম কোনো জবাব না দিয়ে এগিয়ে গেল। – সঙ্গীতা, তুমি এখানে? কবে এসেছ শ্বশুর বাড়ি থেকে?

সঙ্গীতা প্রীতমের কথার কোনো জবাব দিল না। ও যেন কিছু শুনতে পায় নি। প্রীতমকে যেন ও কোনোদিন দেখে নি।

অবন্তী অবাক হয়ে একবার প্রীতমকে দেখছে, আরেকবার সঙ্গীতার দিকে তাকাচ্ছে। এ-ই তাহলে সঙ্গীতা? কিন্তু ও শরীরের এই অবস্থায় কেন এভাবে কাজ করছে? এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে কাজ করলে ওর শরীর খারাপ করবে যে!
কিন্তু সঙ্গীতা যেন কথা বলতে ভুলে গেছে। অথবা ও পণ করেছে এদের কোনো প্রশ্নের উত্তর দিবে না।

বাংলোতে ফিরে বিমল বাবুর কাছ থেকে সব জানা গেল। বিয়ের পর থেকেই সঙ্গীতার স্বামী আর শ্বশুর বাড়ির সকলে মিলে যৌতুকের জন্য সঙ্গীতার উপর অনেক অত্যাচার করে আসছিল। সঙ্গীতার গরীব বাবামা সমস্ত সঞ্চয় ব্যয় করে মেয়ের বিয়েতে যতটুকু সম্ভব দিয়েছেন। এরপরেও ধারদেনা করে জামাইকে কিছু টাকা পয়সা দিয়েছেন। কিন্তু তাতে স্বামী শ্বশুর শাশুড়ি কারো মনই ভরে নি। সঙ্গীতার স্বামী ব্যবসার নাম করে এক লক্ষ টাকা দাবী করে কিছুদিন আগে সঙ্গীতাকে রেখে গেছে। এই টাকা দিতে না পারলে সঙ্গীতাকে ওরা আর নিবে না। ওর গরীব বাবামা এত টাকা কোথা থেকে জোগাড় করবে?

সব শুনে অবন্তী অস্থির হয়ে বলল, কিন্তু শরীরের এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে থেকে ওর এই কাজ করা তো একদম উচিত নয়। ও কি কাজ করে টাকা জমাচ্ছে ওর হাজবেন্ডের যৌতুকের লোভ মিটাতে?

অবন্তীর প্রশ্নের উত্তর বিমল বাবু দিলেন। – ম্যাডাম, চাপাতা তুলে ও আর কয় টাকা পাবে? যৌতুকের বিষয় তো পরে। ওর নিজের খাওয়া-পরার জন্যই তো ওকে কাজ করতে হচ্ছে। এখন ওর পরিবারের একটাই চিন্তা, বাচ্চাটার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত ওর স্বামী নিবে কিনা।

বিমল বাবুর কথায় অবন্তী বিরক্ত হল। – এরকম স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার কোনো মানে আছে? অবন্তীর উচিত এই পাষণ্ড স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে ফিরে আসা।

তাই কী হয় ম্যাডাম? আপনি যে কথাটা এত সহজে বললেন, সঙ্গীতা বা তার পরিবার সেটা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারে না।

প্রীতমের মনে হল এই কথাটা বিমল বাবু ঠিক বলেছেন।

অবন্তী খানিক কী যেন ভাবল। তারপর হঠাৎ উৎসাহী গলায় বলল, আচ্ছা, সেই যে ছেলেটা সঙ্গীতাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল, সে কোথায়? সে নিশ্চয়ই মেয়েটাকে এই অবস্থায় আর ফিরে যেতে দিবে না। আপনারা সবাই মিলে ওকে আর ওর পরিবারকে বোঝান না।

বিমল বাবু আবারও হাসলেন। – আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে ম্যাডাম? সেই ছেলে এখন সঙ্গীতাকে গ্রহণ করবে? একে তো বিয়ে হয়ে হয়ে গেছে, তার উপর ক’দিন পরে বাচ্চা হবে।

কিন্তু সে তো মেয়েটাকে ভালোবাসে!

আর ভালোবাসা! ম্যাডাম, শুনুন। সেই ছেলে এর মধ্যেই নতুন একজনের সাথে ভাব ভালোবাসা করে নিয়েছে। এবার নিজের গোত্রের মধ্যেই। ওদের পরিবারও বিয়েতে রাজি।

অবন্তীর মুখ অন্ধকার হয়ে গেল। বোঝা যায় ও বেশ কষ্ট পেয়েছে। আজকের আগে সঙ্গীতার সঙ্গে অবন্তীর কখনো দেখা হয় নি। কিন্তু ওর ছবি দেখে, প্রীতমের মুখে ওর গল্প শুনে মেয়েটার উপর কেমন যেন একটা মায়া পড়ে গেছে। প্রীতম জানে, অবন্তী খুব অনুভূতিপ্রবণ। প্রসঙ্গ ঘোরানোর জন্য বিমল বাবুকে বলল ও, আমরা সঙ্গীতার জন্য কিছু টাকা নিয়ে এসেছিলাম। ওকে কীভাবে দেওয়া যায় বলতে পারেন?

সাহায্য করতে চাচ্ছেন? কত টাকা? স্যার, এরা গরীব হলেও আত্নসন্মানবোধ কিন্তু প্রবল। আপনার দেওয়া টাকা ওরা নিবে কিনা সেটা জিজ্ঞেস করতে হবে।

অতএব প্রীতম সংক্ষেপে বিমল বাবুকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলল। এটা কোনো সাহায্য বা দয়া নয়। সঙ্গীতার ফটো প্রথম পুরস্কার পেয়েছে। প্রীতম এবং অবন্তী মনে করে, সে অর্থ সঙ্গীতারই প্রাপ্য। প্রীতম স্পষ্ট দেখল পুরস্কারের অংক শুনে বিমল বাবুর চোখ বড় বড় হয়ে গেল। একবার প্রীতমের দিকে, আরেকবার অবন্তীর দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালেন তিনি। সে দৃষ্টিতে পরিষ্কার লেখা আছে, মানুষ এত বোকাও হয়?

বিকালে বিমল বাবু আর বড়বাবু ওদের নিয়ে গেলেন সঙ্গীতার বাসায়। এখানে আগেও একবার এসেছিল প্রীতম। আগের মতই সবকিছু আছে। শুধু ব্যতিক্রম হল, এবার তাদের খাতির যত্ন করে বসানো হল। মুড়ির মোয়া, নাড়ু আর চা দিয়ে আপ্যায়ন করা হল। সঙ্গীতার বাবা মোড়া পেতে বসেছেন। দরজার কাছে মাদুর পেতে সঙ্গীতাকে নিয়ে ওর মা। এদিকে ওদিকে বেশ কয়েকজন ছোট ছোট ছেলেমেয়ে, পাশে বাড়ির বৌ-ঝিদের কৌতূহলী চোখ উঁকিঝুঁকি মারছে।

বিমল বাবু প্রীতমদের আসার কারণ জানালেন। কিছু বুঝে ওঠার আগে প্রীতম আবিষ্কার করল, সঙ্গীতার বাবা তার পায়ের কাছে এসে উপুড় হয়ে পড়েছে। – ‘বাবু তোঁহু দেওতা আছে। হামারা বেটিকো বাঁচা লে।’ বিব্রতভাব কাটিয়ে প্রীতম অনেক কষ্টে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে বসিয়ে দিল। অদূরে সঙ্গীতার মা চোখে আঁচল চেপে শব্দ করে কেঁদে উঠলেন। প্রীতম দেখল শুধু সঙ্গীতার চোখেমুখেই কোনো অভিব্যক্তি নেই। নির্লিপ্ত ভঙ্গীতে বসে আছে সে।

সকলেই একবাক্যে রায় দিলেন, হ্যাঁ, সঙ্গীতার বাবার কথাই ঠিক। এই দুঃসময়ে প্রীতম এই পরিবারে দেবতা রূপেই এসেছে বটে। সঙ্গীতার বরের যৌতুকের চাহিদা মেটানো যাবে। আদর করেই বৌকে ঘরে তুলবে এখন ওর বর আর শাশুড়ি। মেয়েরা এর ওর গা টেপাটেপি করতে লাগল। কপাল একটা নিয়ে এসেছিল বটে এই মেয়ে। নয়তো কথা নাই বার্তা নাই, কোথাকার কোন সাহেব এসে এতগুলো টাকা এমনি এমনি দিয়ে যাবে? কেউ কেউ আবার এ-ও বলল, ‘উঁহার কপাল না আছে। দেখ লে, উঁহাক বেটা রাজার কপাল লেকে আয়ে!

ছেলে? ওরা কি জেনে গেছে সঙ্গীতার ছেলে হবে?

না, সেটা কেউ জানে না। তবে ধরেই নিয়েছে এ নিশ্চয়ই ছেলে।

আধঘণ্টা পর ওরা উঠল। যাওয়ার আগে অবন্তী সঙ্গীতার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। – ভালো থেকো সঙ্গীতা।

স্নেহের স্পর্শে একটু যেন কেঁপে উঠল মেয়েটা।

ঘরের চৌকাঠ পেরোনোর মুহূর্তে অবন্তী ডাক শুনতে পেল, দিদি!

থমকে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরল সে। শান্ত ধীর কণ্ঠ শুনতে পেল, ‘দিদি, হাম আওর উসকা ঘর না যাই।‘

এ কোনো অনুনয় নয়, অনুরোধ নয়। এ যেন এক রায় ঘোষণা। এ কণ্ঠ সঙ্গীতার।

সিদ্ধান্ত তো হয়েই গেছে, এখন আবার এ কথা কেন? যার জীবন নিয়ে রায় ঘোষিত হল, তাকে কেউ জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন মনে করে নি। কেনই বা করবে? এ তো জানা কথাই, স্বামীর ঘর করতেই তো সে যাবে। এখানে আবার মতামতের কী আছে? অতএব যারপরনাই বিরক্ত হলেও সকলকে ফিরে এসে আবার বসতে হল।

আর এক দফা বোঝানো হল, মা কাঁদলেন, বাবা রেগে গেলেন। কিন্তু যাকে উদ্দেশ্য করে এত কথা তার কোনো বিকার নেই। ভাবলেশহীন মুখে সে তার সিদ্ধান্তেই অটল রইল। স্বামীর ঘর সে আর করবে না। সাহেবের টাকা দিয়ে সে তার সন্তানকে মানুষ করবে।

প্রীতম দেখল, অবন্তীর মুখ খুশিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। সঙ্গীতাকে জড়িয়ে ধরে সে বলল, তুমি ঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছো সঙ্গীতা। আমার ঠিকানা আর ফোন নাম্বারটা রাখো। কোনো প্রয়োজনে এই দিদির সাথে যোগাযোগ করবে।

খোয়াই নদীটি বড্ড বেশি খরস্রোতা। পারাপারের নৌকায় বসার ব্যবস্থা নেই। দাঁড়িয়ে টাল সামলাতে পারছে না অবন্তী। প্রীতম একহাতে ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। বাতাসে ওর শ্যাম্পু করা চুল এলোমেলো উড়ছে। মুগ্ধ চোখে অবন্তীর দিকে তাকাল প্রীতম। অবন্তীর চোখ দূরে কী যেন দেখছে। সেদিকে অনুসরণ করে প্রীতম দেখতে পেল পারে কড়ই গাছ ধরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি নিঃসঙ্গ নারীমূর্তি। শেষ বিকেলের গোধূলির রঙ ছুঁয়ে দিয়েছে মেয়েটিকে। ওর চোখ ছলছল, কিন্তু মুখে এক অদ্ভুত কাঠিন্য। আশ্চর্য! সেদিনের সেই উচ্ছল কিশোরী মেয়েটি কখন এত পরিণত হয়ে গেল?

প্রীতম তাকিয়ে রইল। এ-ও তো প্রকৃতিরই আরেক মুখ। এ মুখ নারীর, এ মুখ মায়ের। শক্তিময়ী, সর্বংসহা, কোমল-কঠিনে মেশানো এ মুখ তো প্রকৃতিরই রূপ। ফটোগ্রাফার প্রীতম ক্যামেরার কথা ভুলে গেল, হৃদয়ে ধারণ করে নীল প্রকৃতির সে রূপ।

লুৎফুন্নাহার পিকি