প্রতীক্ষা

কফিহাউজে বসে আছি। প্রখ্যাত শিল্পী মান্না দে’র গানের সেই বিখ্যাত কফি হাউজ। আমার পাশের টেবিলগুলোতে তিন-চারজন করে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। কিন্তু আমি একা। নিজেকে কেমন জানি অসহায় লাগছে। সময় কাটানোর জন্য এক ওয়েটারকে ডেকে বললাম, “আমাকে এককাপ রং চা দেন, কড়া লিকারের এককাপ রং চা।” সে জানালো এখানে নাকি রং চায়ের ব্যবস্থা নেই। হয় দুধ চা নয়তো কফি, ব্ল্যাক কফি। আমি দুধ চায়েরই অর্ডার করলাম।

বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি। জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছি। বৃষ্টির মধ্যে অচেনা মানুষ রেইনকোট পরে রাস্তায় হাঁটছে। এই কফিহাউজে আজ অরশি আসার কথা। অরশি সেনগুপ্ত। আরও কয়েকবার এই কফি হাউজে আমার সাথে দেখা করার কথা ছিল তার, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আসেনি। আজ আসবে কি না কে জানে। হয়তো একটু পরেই আমার মেসেঞ্জারে লিখবে, ‘সরি আসতে পারিনি’। আমি হয়তো মলিন মুখে বুকভরা হতাশা নিয়ে দেশের পথে পা বাড়াব।

কফি হাউজের সাউন্ড সিস্টেমে একটা গান বেজে চলছে, ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না..’। অর্ণবের কণ্ঠ। অসাধারণ তাঁর গায়কি। বিদেশে বসে দেশের শিল্পীর গান শোনা কতটা গৌরবের তা বলে বোঝানো যাবে না। রবি ঠাকুরের কীর্তনাঙ্গিকের এই গান যখনই শুনি তখনই মনের মধ্যে উদাসীনতা ভর করে। বৈরাগ্যভাব ঝাঁপটি মেরে ধরে। রবি ঠাকুর নাকি ২৪ বছর বয়সেই এই গানটি রচনা করেছিলেন। এই অল্পবয়সে তাঁর হৃদয়ে কেমন করে বৈরাগ্যভাব বাসা বেঁধেছিল তা ভেবে কূল পাই না।

অরশি এই গানটা খুব পছন্দ করত। যখন একসাথে কলেজে পড়তাম তখন সে-ই আমাকে রবি ঠাকুরের এই গানটির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। তখন ফিতাযুক্ত ক্যাসেটের প্রচলন ছিল। একদিন অরশি ক্লাস শেষে সবার অগোচরে আমাকে ডেকে নিয়ে হাতে ক্যাসেটটা তুলে দিয়ে বলেছিল, “গানগুলো শুনবে, আমার ভীষণ প্রিয় এই গানগুলো।”

ওইদিন ছিল আমার জন্মদিন। কাগজে-কলমের জন্মদিন। অর্থাৎ ডেট অব বার্থ বাই সার্টিফিকেট। তবে অরশির এই গিফট ছাড়া আমার জন্মদিনের আর কোনো বিশেষত্ব ছিল না, গুরুত্ব ছিল না। ওর কাছ থেকে পাওয়া ক্যাসেটটি মেসে গিয়ে কতবার যে রিপিট করে শুনেছি তা এই মুহূর্তে হিসেব করা সম্ভব নয়। ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না’ গানটি তখন থেকেই আমার হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে।

অরশির সঙ্গে তখন থেকেই আমার হৃদয়ের লেনদেন শুরু হয়। ও আমার স্নায়ুতন্ত্রের নিউরনে এমন একটা প্রভাব ফেলেছিল যে, আমার একমুহূর্ত তাকে ছাড়া অন্যকিছু কল্পনা করার ক্ষমতা ছিল না। অনেকটা ‘কানু বিনে গীত নাই’ এই ছিল আমার দশা। সত্যি বলতে কী, আমি ওর প্রেমে তখন অন্ধের মতো আচ্ছন্ন ছিলাম, নিমগ্ন ছিলাম, এই মুহূর্তে এই কথাটি অস্বীকার করতে আর দ্বিধা নেই।

বেশ ক’দিন চুটিয়ে প্রেম করার পর পরিবারের অসম্মতিতে ছাত্রাবস্থায় আমরা বিয়ে করি। নতুন সংসার। যেদিকে হাত দিই সে দিকেই টানাপোড়েন। ও গানে মনোযোগ দেয় আর আমি ব্যবসায়ে। বন্ধুবান্ধব আর অরশির বাবার কাছ থেকে ধার নিয়ে গড়ে তোলা আমার ব্যাবসার পরিধি তরতর করে বাড়তে থাকে। দুবছর পর জন্ম নেয় ফুটফুটে এক মেয়ে। নাম রাখি অরণি। অরশির মেয়ে অরণি। অপূর্ব, অরশি, অরণি। পরিচিতজনরা আমাদের নাম নিয়ে বাহবা দেয়। আমরা তখন মিষ্টি হেসে তাদের প্রতিত্তোর দিই।

একসময়ের টানাপোড়েনের এই সংসারে ক্রমে ক্রমে আভিজাত্যের ছোঁয়া লাগতে শুরু করে। আমার ব্যাবসায়িক কর্মকাণ্ড দ্রুতবেগে বাড়তে থাকে। দুহাতে টাকা কামাতে শুরু করি। কালো টাকা, সাদা টাকা। অরশির দুচোখে শিল্পী হওয়ার রঙিন স্বপ্ন। খ্যাতির আশায় এদিক-ওদিক ছুটতে থাকে সে। সংসারধর্ম আমাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার কাছে নগণ্য হয়ে পড়ে। অরশি গান করে বিভিন্ন স্টেজে, দেশে-বিদেশে।

অন্য দিকে আমি ! পরনারী, পরদেশ, আমার কাছে সহজলভ্য হয়ে ওঠে। হন্য হয়ে দৌড়াতে থাকি সামনের দিকে। পেছনে ফিরে তাকানোর সময় নেই। আয়নায় নিজের চেহারা দেখার সময় নেই। কোথায় পৌঁছতে হবে তা জানা নেই। কোথায় থামতে হবে তাও জানা নেই। এর ফলস্বরূপ ভাঙে আমাদের সংসার, ভাঙে মন।

ক’দিন পর খবর পেলাম অরশি বিয়ে করছে। দেশে নয়, বিদেশে। মানে কলকাতায়। ওর হবু বর দারুণ সেলিব্রেটি। সিনেমার লোক। দেশে-বিদেশে অনেক নাম। খবরটা পেয়ে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। যদিও আমরা ক’মাস ধরেই আলাদাভাবে বসবাস শুরু করেছি তবুও এই খবরটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল আমার। আমার ভালোবাসার মানুষের কোমল হাতদুটি ধরবে অন্য কোনো পুরুষ, তা কিছুতেই মানতে পারছিলাম না। আমার শীতল শরীরের লোমকূপ তখন শিউরে ওঠে।

ওর ঘর বাঁধার খবরে আমার ঘরহারা হওয়ার উপক্রম। বন্ধুরা বলল আইনের আশ্রয় নিতে। ইচ্ছে হলো না। তবে একমাত্র মেয়ে অরণির জন্য এজলাসে দাঁড়াতে হলো। জানি পারব না। সম্ভবও নয়। সিদ্ধান্ত হলো অরণি তার মায়ের কাছেই থাকবে। মায়ের কাছে মানে কলকতায়। আমিও তা মেনে নিলাম। মেনে নিতে হলো। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম বছরে অন্তত একবার আমি অরণির সঙ্গে তার জন্মদিনে দেখা করব। অরশিও তখন মাথা নাড়িয়ে তাতে সম্মতি দেয়।

আজ অরণির জন্ম দিন। তাই বাংলাদেশ থেকে আমার এখানে আসা। নিজের মেয়ে অন্য একটা পরিবারে বেড়ে উঠবে—এ যে কত কষ্টের, কত বেদনার, তা প্রকাশের ক্ষমতা কোনো কবি, সাহিত্যিকের আছে কি না তা আমার জানা নেই।

কফিহাউজের সদর দরজায় আমার চোখজোড়া থিতু হয়ে আছে। অরশি আসবে। অরণি আসবে। আদৌ কি আসবে ? আদৌ কি দেখা হবে ? না কি তাদের পরিবর্তে মেসেঞ্জারে আসবে একটা করুণ বাক্য, “সরি অপূর্ব, আজও আমার আসা হলো না!”