ফাঁদ ( ১ম পর্ব )

জলিল সাহেবের বড় শখ থ্রিলার গল্প লিখবেন। সম্প্রতি তিনি ফেসবুকে “থ্রিলার পাঠকদের আসর” নামে একটি গ্রুপে যোগ দিয়েছেন। সেখানে দেশি বিদেশী চমৎকার সব থ্রিলার গল্প পড়ে তার সুপ্ত বাসনা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। কলেজ জীবন থেকেই লেখালিখির পোকাটা মাথার ভেতর পাকাপোক্ত বাসস্থান গড়েছিল । তরুণ বয়সে পাশের বাড়ির এক সুন্দরী তরুণীর প্রতি আগ্রহ থেকে রোমান্টিক কবিতা গল্প লেখার চেষ্টা করেছেন কিন্তু ঠিকঠাক লেখাটা ভেতর থেকে প্রকাশ করতে পারেননি । গল্পের মানচিত্রটা কেমন দুর্বোধ্য হয়ে মাথার ভেতর তালগোল পাকিয়ে যায়। নিজের লেখার অলিগলিতে নিজেই খেই হারিয়ে ফেলেন। গল্পে রোমান্টিকতার তিল মাত্র খুঁজে পাওয়া যায় না। ইউনিভার্সিটির এক রুমমেটের মাধ্যমে থ্রিলার গল্পের সাথে প্রথম পরিচয়,ধীরে ধীরে প্রেম। ব্রাম স্টোকার,আগাথা ক্রিস্টি, স্টিফেন কিং এর অনুবাদ পড়তে পড়তে নেশা ধরে গিয়েছিলো। বন্ধুর সংগ্রহের বই গোগ্রাসে গিলে প্রায়ই নিউ মার্কেটের পুরোনো বইয়ের দোকানগুলোতে ঢু মারতেন নতুন গল্পের আশায়। তার বাবার আর্থিক অবস্থা ভালো হওয়ায় বই কেনার টাকার অভাব হয়নি। তাই থ্রিলার গল্পের নেশা পুষতে খুব সমস্যা ছিল না।
পরীক্ষার পরে ছুটিতে একবার পত্রিকায় গল্প লেখার প্রতিযোগীতার খবর দেখলেন। বেশ সময় নিয়ে নানা চেষ্টা চরিত্র করে লিখে ফেললেন একটা থ্রিলার গল্প । গল্পটা কেমন হলো তা যাচাই করার জন্য রুমমেট শাহীনকে পড়তে দিলেন। গল্প পড়ে শাহীন মিটমিট করে হাসতে লাগলো। জলিল সাহেব আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলেন, “কেমন হয়েছে?” শাহীন হাসতে হাসতে বললো, “এটা তো হাসির গল্প হয়েছে, কোনো থ্রিলার তো পেলাম না।”
জলিল সাহেব হতাশ হলেন না, গল্প লেখার চেষ্টা চালিয়ে গেলেন। চেপে চুপে গল্পের শুরু হলেও শেষ হয়না, শেষ হলেও গল্প পড়ে নিজেরই ভালো লাগেনা। এর মধ্যে মাস্টার্স শেষে ব্যাংকে চাকরিতে ঢুকে পড়লেন, বিয়ে করলেন। জাগতিক বৈষয়িক আড়ম্বরের আড়ালে গল্প লেখার সময় হারিয়ে গেলো, চাকরীর পদোন্নতির ইঁদুর দৌঁড়ে থ্রিলার প্লট মাথা থেকে মুছে গেলো, সাংসারিক দায়িত্বে নতুন গল্প পড়ার নেশা উবে গেলো। মাঝে মাঝে হরর কিংবা থ্রিলার মুভি দেখেই দুধের সাধ ঘোলে মেটান।

সরকারি ব্যাংকের পরিচালক হিসাবে অবসর গ্রহণ করার পরে ফেসবুকে বেশ সময় কাটান জলিল সাহেব। কত লেখক আর কত রকম লেখা আর কত মতামত! জলিল সাহেব চুপচাপ পড়েন, লাইক কমেন্টে যান না। মজার মজার ভিডিও দেখতেও তার ভালো লাগে। তার মেয়ে নীলিমা এই থ্রিলার পাঠকদের গ্রুপে যোগ করিয়ে দিয়েছে, বাবার থ্রিলার গল্পের প্রতি দুর্বলতার কথা তার জানা আছে। জলিল সাহেবও গ্রুপে যোগ দিয়ে ভীষণ খুশি। যখন খুশি ফোন খুলে নানা রকম গল্প পড়া যায়। এখানে অনেক লেখক বেশ জনপ্রিয়, গল্প পোস্ট করলেই হাজার হাজার লাইক কমেন্ট! অল্প বয়সী মেয়ে পাঠকরা উচ্ছসিত প্রশংসার বন্যা বইয়ে দেয়। এসব দেখে অবসরের জড়তায় হঠাৎ করেই আবার থ্রিলার গল্প লেখার ইচ্ছাটা জেগে উঠলো। মনে হলো, হাজার হাজার লাইক কমেন্ট তিনিও পেতে পারেন। একসময় তো বেশ কিছু গল্প লিখেছিলেন, সবই কি খারাপ ছিলো? কম্পিউটারে বসে মাথা ঘামিয়ে একটা গল্প লিখে ফেললেন । ঢিপঢিপ বুকে গল্পটা পোস্ট করে দিলেন গ্রুপে, এবার অ্যাডমিন এপ্রুভালের অপেক্ষা। সময় যেন পার হয়না। কয়েক ঘন্টা পরে গল্প এপ্রুভ হলো। জলিল সাহেব মহা উত্তেজনায় একটু পরপর ফেসবুক নোটিফিকেশন চেক করেন, কয়টা লাইক পড়লো আর কে কে কমেন্ট করলো! সময় গড়ায়, তেমন কোনো লাইক কমেন্ট নেই। তিনটা লাইক, দুইটা হাহা রিএক্ট! সারারাত ঘুমাতে পারলেন না জলিল সাহেব। একটু পর পর নোটিফিকেশন দেখতেই থাকলেন। সকালে দেখলেন হাহা রিএক্ট হয়েছে তিনটা, আর সেই তিনটা লাইক। একজন কমেন্ট করেছে, “আংকেল, থ্রিলার না লিখে কমেডি নাটক লেখেন, কাজে দিবে। যা ইচ্ছা লিখলেই থ্রিলার হয়না।” জলিল সাহেবের মেজাজ বিগড়ে গেলো। ঠিক মতো নাস্তা খেতে পারলেন না। চা খেতে খেতে গল্পটা গ্রুপ থেকে মুছে দিলেন। তিনি যে পরিমান থ্রিলার গল্প পড়েছেন, বাংলাদেশের কয়টা লোক তেমন পড়েছে? তারপরও নাকি তার লেখা থ্রিলার গল্প কমেডি হয়ে যায়!
ফোন রেখে কপাল কুঁচকে যখন পত্রিকায় মন দিলেন জলিল সাহেব তখন নীলিমা বারান্দায় এসে বললো সুমন এসেছে। জলিল সাহেবের মেজাজ আবার খারাপ হয়ে গেলো। সুমনের সাথে আজকে আর কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। অনিচ্ছায় উঠে বসার ঘরে সুমনের সাথে দেখা করতে গেলেন।

সুমন সদ্য বিএ পাশ করা বেকার। এক বন্ধুর ভাগ্নে। সুমনের বাবা নেই, তার দায় দায়িত্ব অনেকটাই সেই বন্ধুর ঘাড়ে। কোনো রকমে মফস্বলের একটা অখ্যাত কলেজ থেকে বিএ পাশ করা ভাগ্নের চাকরির জন্য জলিল সাহেবকে চেপে ধরলেন। জলিল সাহেব কিছুতেই বোঝাতে পারলেন না যে অবসরপ্রাপ্তির পরে চাকরি পাইয়ে দেয়ার ক্ষমতা অনেকটাই দূর হয়েছে। বন্ধুর প্রবল অনুরোধে সুমনকে নিজের সহকারী হিসেবে চাকরি দিয়েছেন। কাজটাকে ঠিক চাকরি বলা যাবে না। নাছোড়বান্দা বন্ধুর ঘ্যানঘ্যানানি থেকে মুক্তির জন্য সামান্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে সুমন সপ্তাহে তিন চারদিন জলিল সাহেবের কাছে এসে বিভিন্ন কাজ করে।

চাকরীরত অবস্থায় জলিল সাহেবের আয় বেশ ভালোই ছিলো। বাংলাদেশের বেশ কিছু বড় শিল্পপতিদের জন্য বড় অংকের লোনের সুযোগ করে দিয়ে পকেট ভারী করেছেন। অবসরের পরেও সেই সূত্র আঁকড়ে রেখেছেন জলিল সাহেব। সরকারি বেশ কিছু ফান্ড পাওয়ার জন্য কয়েকটি বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কনসালট্যান্ট হিসাবে কাজ করেছেন। ফান্ড পাওয়ার আবেদনপত্র তৈরী করতে এই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে মোটা অংকের অর্থ প্রাপ্তি হয়। হবেই না কেন, ফান্ড পাওয়ার জন্য কম কাগজ পত্র তৈরী করতে হয়, কম সময় ব্যয় করতে হয়?
সুমনকে দিয়ে এ বিষয়ে বেশ কিছু কাজ করিয়ে নেন জলিল সাহেব। কোম্পানির নানা রকম ফাইনান্সিয়াল কাগজ পত্রের গাদা সুমনের হাতে ধরিয়ে দেন। সুমন সেসব ঘেটেঘুটে ইনফরমেশন নিয়ে এক্সেল ফাইল তৈরী করে দেয়। একটা পুরোনো ল্যাপটপ সুমনকে দেয়া হয়েছে। তাছাড়া ফটোকপি করা, কোথাও গিয়ে কোনো জরুরি কাগজপত্র আদান প্রদান করা, ডকুমেন্ট টাইপ করা, এপ্লিকেশন লেটার লেখা,এইধরণের কাজগুলো সুমন মোটামুটি ভালোই করে। ছেলেটা ভালো জায়গায় লেখাপড়া না করলেও মাথায় বুদ্ধি খারাপ না। অনেক বানান ভুল করে অবশ্য, সেটা জলিল সাহেব ঠিক করে দেন। এক্সেল ফাইলের ডাটা এন্ট্রি গুলো জলিল সাহেব দেখে দেন। তবুও নিজের মাথায় কাজের বোঝাটা একটু কমেছে। ছেলেটা কাজকর্ম এত দ্রুত ধরতে পারবে ধারণা করেনি জলিল সাহেব। এখন মনে হয় ছেলেটাকে রেখে ভালোই হয়েছে। অনুরোধে ঢেকি গিলে খারাপ হয়নি।
সুমন জলিল সাহেবকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দিয়ে বললো, “স্যারের কি আজকে শরীল খারাপ ন্যাকি”
সুমনের মুখে এই গ্রাম্য টানে কথা শুনলে জলিল সাহেবের মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে যায়, আজকেও হলো , তাছাড়া মাঝে মাঝেই সুমনের গা থেকে বিদঘুটে গন্ধ আসে। ছেলেটার গায়ের কাপড় মলিন এবং নোংরা। সরাসরি কিছু বলতে পারেন না জলিল সাহেব। হুম জাতীয় একটা শব্দ করে একটু দূরের সোফায় বসলেন।
“স্যার , আপনার জন্যি এক্সসেল ফাইল তৈরী করে আনিছি। এই যে নেন। ” বা হাত দিয়ে ডান হাতের কনুই ছুঁয়ে পেন ড্রাইভ এগিয়ে দিলো সুমন, গ্রাম্য ভদ্রতার নিদর্শন।
জলিল সাহেব পেন ড্রাইভ হাতে নিয়ে বললেন,” আজকে যাও সুমন, শরীরটা ভালো না। ”
“আপনে যে কিছু কাজ দিবেন বলেছিলেন……..”
“আরে বাবা বললাম তো, আজকে বসবো না তোমার সাথে। পরশুদিন এসো। ”
কপাল কুঁচকে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। সুমন আর কথা বাড়ালো না, চুপচাপ বেরিয়ে গেলো।

সন্ধ্যায় পেন ড্রাইভে খুলে বসলেন জলিল সাহেব। গল্প ফ্লপ করেছে বলে কাজ বন্ধ করে তো আর বসে থাকা যাবে না। তাই মনে মনে নিজেকে সান্তনা দিয়ে কম্পিউটারের কি বোর্ডে হাত রাখলেন তিনি। নির্দেশ মতো পেনড্রাইভে বেশ কিছু ফাইল দিয়েছে সুমন। সাথে একটা ওয়ার্ড ফাইল। কি ভেবে ওয়ার্ড ফাইলটা খুললেন জলিল সাহেব, বাংলায় টাইপ করা একটা গল্প!
গল্পটা পড়তে শুরু করলেন তিনি। গল্পের নায়ক একজন ফরেনসিক ইনভেস্টিগেটর, ভালোবেসে পালিয়ে বিয়ে করে। বিয়ের পরদিনই খুন হয় তার স্ত্রী। খুনের প্রধান সাস্পেক্ট নায়ক। গল্প পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিলো নায়ক মিথ্যা মামলায় ফেঁসে যাচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায় নায়কই আসল খুনি কিন্তু দারুন সব কৌশলে ঠিকই খুনের দায় মেয়ের বাবার উপর চাপিয়ে দেয়। একেবারে জমজমাট থ্রিলার গল্প! জলিল সাহেব পড়তে শুরু করে শেষ পর্যন্ত না গিয়ে পারলেনই না! গল্পটা সুমন লিখেছে বলে তার বিশ্বাস হলো না। সুমনের মতো একটা গাঁইয়া ভূত এই গল্প লিখতে পারেনা। এমন একটা গল্প লেখার কত চেষ্টাই না করেছেন তিনি। জলিল সাহেব সুমনকে ফোন করে পরের দিনই আসতে বললেন।

পরদিন সকালে আগ্রহ নিয়ে সুমনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলেন তিনি। সুমনকে দেখে আজকে প্রবল উচ্ছাসে বললেন, “তোমার সব ফাইল ঠিকই আছে, খুব ভালো কাজ করেছো। আচ্ছা শোনো, পেনড্রাইভে একটা গল্প দেখলাম। কার লেখা?” সুমন ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে বললো, “ওই গল্প পেনড্রাইভে ক্যামনে গেলো! মনে হয় স্যার ভুলে পেস্ট হই গেছে। কিছু মনে কইরেন না স্যার। আমি মাঝে মাঝে লেখি। ল্যাপটপ পাইয়া টাইপ কইরা ফেলছি। এমন ভালো কিছু না।” “না না ঠিক আছে, আমি কিছু মনে করিনি। তা, তুমি গল্প লেখো, বলো নাই তো কোনোদিন! কোথায় লিখো? পত্রিকায়, ব্লগে নাকি ফেসবুকে? সুমন জিভ কেটে বললো, “কি যে বলেন স্যার! এইসব গাঁজাখুরি লেখা কে পড়বে? আমি এমনেই মাঝে মধ্যে লেখি। দুই একবার পত্রিকায় পাঠাইছি বেনামে, ছাপাইছে কিনা বলতে পারি না, আমি খুঁজ নেই নাই।” জলিল সাহেব মনে মনে অবাক হলেন। ছেলেটা এত ভালো লেখে অথচ কোথাও ছাপে না বা পোস্ট করে না! আশ্চর্য! “হুম , তোমার লেখা মোটামুটি খারাপ না। আচ্ছা শোনো, তোমার তো টাকা পয়সার দরকার। এক কাজ করো, প্রতি সপ্তাহে তুমি আমাকে একটা নতুন থ্রিলার গল্প লিখে দাও। প্রতি গল্পের জন্য তোমাকে এক হাজার টাকা দেব। মাসে চার পাঁচ হাজার টাকা এক্সট্রা ইনকাম হবে, তোমার কাজে দিবে তবে গল্পের মালিকানা হবে আমার। তুমি যে আসল লেখক সেটা কাউকে বলা যাবে না। কি? পারবে না?” সুমন গোলগোল চোখে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে বললো, “এ কি বলতিছেন স্যার? আমার গল্প আপনি কিনি নিবেন?” জলিল সাহেব নিজেকে সামলে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “তুমি না চাইলে তো নিবো না। আমার মনে হলো কিছু টাকা পেলে তোমার উপকার হবে তাই বললাম। ”

সুমন কিছুক্ষন মাথা নিচু করে কি যেন ভাবলো। তারপর বললো, “স্যার আপনাকে না বলার প্রশ্নই আসে না। আমি গল্প লিখি দেবো , আমার কোনো আপত্তি নাই। টাকাটা আমার আসলেও দরকার। আমি দুইদিনের মদ্ধি আপনারে একটা নতুন গল্প লিখি দিচ্ছি।”

সুমন কথা রাখলো। দুদিন পরেই একটা চমৎকার থ্রিলার গল্প লিখে ইমেইল করে দিলো জলিল সাহেবকে। তিনিও আর দেরি না করে ঝটপট “থ্রিলার পাঠকদের আসর” গ্রুপে পোস্ট করে দিলেন। এবার অপেক্ষার পালা। অ্যাডমিন এপ্রুভাল পেলেই দেখা যাবে সমালোচনাকারী গুলোর চাঁদমুখের কি হাল হয়! কিশোরদের মতো একটা ছেলেমানুষি উত্তেজনায় জলিল সাহেব অপেক্ষা করতে থাকেন।

(চলবে)

-সালমা সিদ্দিকা