ফাঁদ ( ২য় পর্ব )

সুমনের গল্পে বাজিমাত করলেন জলিল সাহেব! টুং টুং ফেসবুক নোটিফিকেশনের শব্দ তার হৃদকম্পন বাড়িয়ে দিতে লাগলো। মুগ্ধ পাঠকদের প্রশংসাবাণী পড়তে পড়তে তৃপ্ত ক্লান্তিতে ভুগতে শুরু করলেন তিনি। একে একে সব কমেন্টদাতার উত্তর দিতে থাকলেন দিনভর। তার ধুলোপড়া ম্যাসেঞ্জারে পাঠকদের স্তুতিবাক্য উপচে পড়লো। তরুণীদের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট জমতে লাগলো। লেখক হিসেবে ঠিক এমন এক দিনের জন্য কত অপেক্ষা করেছেন জলিল সাহেব! এক তরুণী মেসেজ পাঠিয়েছে জলিল খন্দকার নামটা নাকি খুবই পুরোনো ধরণের। মেসেজটা পাওয়ার পরে জলিল সাহেব নিজের নাম পরিবর্তন করার কথা ভাবছেন। মূর্ধন্য জলিল নাকি নির্ঝর জলিল , কোন নাম নেয়া যায় তাই নিয়ে দ্বিধায় পড়লেন তিনি।

নীলিমা দুপুরে খাবার টেবিলে বসে ফোন ঘাটতে ঘাটতে হঠাৎ বাবার লেখা গল্পটা দেখলো। গল্প পড়ে আনন্দে বাবার ঘরে ছুটে গেলো সে। চিৎকার করে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললো, “তুমি এত ভালো গল্প লিখতে পারো বাবা! কই , আমাকে আগে পড়তে দিলে না কেন? দেখো কত মানুষ তোমার গল্প পড়ে কত ভালো বলেছে! আমি কালকেই কলেজে সবাইকে তোমার গল্প পড়তে দেবো। মা, দেখো এসে , বাবা গল্প লিখেছে।” জলিল সাহেবের স্ত্রী শায়লা টিভি দেখছিলেন। মেয়ের চিৎকার শুনে বেড রুমে এলেন। নীলিমা আগ্রহ নিয়ে ফোনে চোখ বোলালেন। গল্প পড়ে তার গম্ভীর মুখে হাসি ফুটলো। জলিল সাহেবের দিকে মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে বললেন, “এত বিদ্যা পেটে নিয়ে বসে ছিলে এতদিন? এত ভালো লিখতে পারো তো এতদিন লেখনি কেন?”
“দেখলি নীলিমা, লেখা নিয়েও তোর মায়ের অভিযোগ! একটা ভালো লেখার জন্য কোথায় আমাকে এক কাপ গরম চা করে খাওয়াবে, প্রশংসা করবে, তা না !” শায়লা মুচকি হেসে চা বানাতে গেলেন। স্ত্রীর চোখে সমীহ দেখতে পেয়ে জলিল সাহেব আত্মতৃপ্তিতে চোখ বুজলেন। গল্পের কোলে লাইক আর কমেন্টের পাহাড় জমলো।

সে রাতেই পরের গল্প পোস্ট করলেন জলিল সাহেব। গল্পের প্রধান চরিত্র ব্ল্যাক ম্যাজিকের মাধ্যমে অল্প সময়ে নানান সাফল্য লাভ করে। কিন্তু একসময় সে সম্পূর্ণ একা হয়ে পরে এবং ধীরে ধীরে নিজের মধ্যে অদ্ভুত সব ক্ষমতা আবিষ্কার করে। সম্পূর্ণ ভিন্ন ধর্মী প্লট টুইস্ট। আগের চেয়ে বেশি লাইক কমেন্ট শেয়ারের জোয়ার এলো। জলিল সাহেব নিজেকে সেলেব্রিটি ভাবতে শুরু করলেন। নীলিমা আর শায়লা তার গুণমুগ্ধ পাঠক। এভাবে সুমনের গল্পে বিখ্যাত লেখক হয়ে যাচ্ছিলেন জলিল সাহেব। বেশ কয়েকমাস “থ্রিলার পাঠকদের আসর” গ্রুপের পাশাপাশি আরো কিছু লেখালিখির গ্রুপে গল্প পোস্ট করে বেশ হৈচৈ ফেলে দিচ্ছিলেন। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আর প্রাইভেট মেসেজের পাশাপাশি ফলোয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিলো।

দু’ তিনদিন বেশ ঘোরের মধ্যেই কেটে গেলো জলিল সাহেবের। কাজ কর্ম ফেলে ফোনের দিকেই মনোযোগ দিয়ে রাখলেন। শায়লা খেয়াল করলেন, ফোনের দিকে তাকিয়ে জলিল সাহেব কখনো মিটমিটিয়ে হাসছেন আবার কখনো বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে আছেন। জলিল সাহেবের ছেলেমানুষি দেখে শায়লা মনে মনে হাসেন, কিছু বলেন না। স্বামীর এক লেখাতেই কুপোকাত মুগ্ধ শায়লা।লাইক কমেন্টের ঝড় শান্ত হতেই জলিল সাহেবের অস্থির লাগতে লাগলো। সুমনকে গল্প পোস্ট করার ব্যাপারে কিছুই বললেন না কিন্তু সুমনের আরেকটা গল্প তার দরকার। অবশ্য প্রতি সপ্তাহে নতুন গল্প দেয়ার কথা সুমনের। সাত দিন পার হতেই খুব সাধারণ ভাবে সুমনকে বললেন, “নতুন কোনো থ্রিলার গল্প লিখেছো নাকি? তোমাকে তো বলেছিলাম প্রতি সপ্তাহে নতুন লেখা দেয়ার জন্য।” সুমন আমতা আমতা করে বললো, “জ্বি স্যার, কালকে রাইতেই একটা লিখলাম। তেমন ভালো হয় নাই তাই লজ্জায় কিছু বলতে পারতেছিলাম না। “
জলিল সাহেবের বুকের ড্রাম বাজতে লাগলো। চোখ মুখ যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে বললেন, “কই ? আমাকে পড়তে দাও। ” সুমন পেন ড্রাইভ এগিয়ে দিলো। জলিল সাহেব মানিব্যাগ বের করে এক হাজার টাকার একটা নোট সুমনের দিকে এগিয়ে দিলেন।
সুমনের সাথে তাড়াহুড়ো করে কাজ শেষ করে বেড রুমে এসে নিজের কম্পিউটারের উপর ঝাঁপিয়ে পরলেন জলিল সাহেব। গল্প পড়ে স্তম্ভিত হয়ে কিছুক্ষন বসে থাকলেন। ছেলেটা জিনিয়াস! কি দারুন থ্রিলার লিখেছে মফস্বলের এই ছেলে! হঠাৎ সুমন কোথায় যেন ডুব দিলো, জলিল সাহেবের কাছে আসে না, ফোন বন্ধ। এদিকে দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেলো, নতুন গল্পের পাত্তা নেই। জলিল সাহেব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। পাঠক মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু থেকে টলতে চান না মোটেই।

কয়েক সপ্তাহ পরে হঠাৎ একদিন সকালে সুমন উদয় হলো। জলিল সাহেব তাকে দেখে ভিমরি খেলেন। সুমনের গায়ে দামি শার্ট, পায়ে চকচকে নতুন জুতো, চুলে নতুন হেয়ারকাট। এক বাক্স মিষ্টি জলিল সাহেবের দিকে এগিয়ে দিয়ে সুমন বললো একটা বিদেশী ফাইনান্সিয়াল কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছে, ডলারে বেতন! জলিল সাহেব শুকনো হাসি হেসে মিষ্টির বাক্স হাতে নিলেন। এমন গাঁইয়া ছেলে এমন চাকরি কি করে বাগালো ভেবে পেলেন না। তার হতভম্ব চেহারা দেখে সুমন নিজেই বললো, রীতিমতো পরীক্ষা দিয়ে চাকরির জন্য নির্বাচিত হয়েছে। বেশ কিছু এনালাইসিস ছিল সে পরীক্ষায়। জলিল সাহেবের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালো সুমন, তার কাছে কাজ করতে করতে প্রতিষ্ঠানে ফাইনান্সিয়াল এনালাইসিস ভালোই রপ্ত করেছে সুমন।

জলিল সাহেব হাসি মুখে সুমনের গেঁয়ো টানে বলা চাকরি প্রাপ্তির গল্প শুনছিলেন আর মনে মনে ভাবছিলেন সুমন তার জন্য গল্প লিখবে তো? তবে কথাটা জিজ্ঞেস করতে পারলেন না। খালি জিজ্ঞেস করলেন সুমনের ফোন বন্ধ ছিল কেন। সুমন বললো, তার ফোন চুরি হয়েছে, এখন নতুন স্মার্ট ফোন কিনেছে সে। জলিল সাহেব ভাবলেন কয়েকদিন পরে না হয় সুমনকে নতুন গল্প দিতে বলবেন, এখন সে নতুন চাকরির উত্তেজনায় বিভোর।

কিন্তু এক সকালে জলিল সাহেব অবাক হয়ে দেখলেন গ্রুপে নতুন গল্প পোস্ট করেছে সুমন নিজেই! সে গল্পে স্বাভাবিক ভাবেই প্রচুর পাঠকদের সমাগম। জলিল সাহেব রাগে কাঁপতে শুরু করলেন। কাঁপা হাতে ফোন করলেন সুমনকে। বেশ কড়া গলাতেই বললেন,” তুমি নিজেই গল্প পোস্ট করলে কেন? তোমার না আমার জন্য গল্প লেখার কথা?” জলিল সাহেব ভেবেছিলেন তার ক্রোধ টের পেয়ে সুমন মিইয়ে যাবে। কিন্তু সুমন শক্ত কণ্ঠে বললো, “স্যার, আমার লেখা গল্প আপনি পোস্ট করে ফেমাস হই যাইবেন, এইটা কি ঠিক? এইটা তো এক ধরনের চুরি। আমার এতদিন টাকাটা দরকার ছিল তাই আমি কিছু বলি নাই। কিন্তু এখন তো আর টাকার দরকার নাই। এখন আর গল্প দিতে পারবো না। “জলিল সাহেবের ইচ্ছা করছে সুমনের গালে কষে একটা চড় মারেন! কত বড় সাহস ! তার মুখের উপর এতো বড় কথা বললো! এর একটা বিহিত তিনি করবেনই । এবার তিনি নিজেই এমন থ্রিলার গল্প লিখবেন যে সুমনের গল্প তার সামনে নস্যি। জলিল সাহেব কিছুই বললেন না। শুধু “ওহ আচ্ছা,ঠিক আছে” বলে ফোনটা রেখে দিলেন। তারপর শুরু হলো তার গল্প লেখার সাধনা। কিন্তু তিনি সফল হতে পারলেন না। কিছুতেই শব্দের বুননে গল্প ফুটে ওঠে না। এদিকে একেরপর এক দারুন সব গল্প পোস্ট করে গ্রূপের হিরোতে পরিণত হচ্ছে সুমন । পাঠকদের লাইক আর কমেন্টের তোড়ে গ্রুপে টেকা দায়।

জলিল সাহেবের অনুগত পাঠকরা বারবার মেসেজ করছে নতুন গল্প পোস্ট করার জন্য। তড়িঘড়ি করে নিজের লেখা একটা থ্রিলার গল্প পোস্ট করলেন জলিল সাহেব। কিন্তু সুমনের লেখার সামনে তার লেখা রীতিমতো শিশু। পাঠকরা নানা সমালোচনায় জর্জরিত করলো। নীলিমা এইচ এস সি পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় বাবার লেখা এই গল্পটা তার চোখ এড়িয়ে গেলো, ঘরে অন্তত মানহানী হলো না জলিল সাহেবের। আচমকা এক পাঠক সুমনের গল্পে কমেন্ট করে বসলো, “এই গল্প পড়ে কিন্তু জলিল খন্দকারের গল্পের মতো লাগছে। আপনি কি আসলে জলিল খন্দরকার?”
এই কমেন্টের উত্তরে সুমন লিখলো, “জলিল খন্দকার আমার বস ছিলেন। টাকার লোভ দেখিয়ে এতদিন আমার কাছ থেকে গল্প লিখিয়ে নিয়েছেন। ব্যাপারটা অন্যায় ছিল। এখন আমি নিজেই গল্পগুলো নিজের নাম পোস্ট করছি।” এই কমেন্টে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়লো, যা তা বলে গেলো লেখক জলিল খন্দকারকে, ছিঃ ছিঃ বাণীতে ভরে গেলো জলিল সাহেবের ইনবক্স।আর সহ্য করতে পারলেন না তিনি, সরাসরি ফোন করলেন সুমনকে। সুমন তার ফোনই ধরলো না! জলিল সাহেব আরো খেপে গেলেন! দুদিন আগেও যে ছেলে তার পায়ের কাছে বেড়ালের মতো চুক চুক করতো আজ তার এত তেজ!

নীলিমার পরীক্ষা শেষ, ফেসবুকে বেশ সময় কাটায়। হটাৎ করেই সুমনের গল্প আর কমেন্ট চোখে পরে যায়। ঘেটে ঘুটে কিছুদিন আগে জলিল সাহেবের পোস্ট করা গল্পটা পড়ে বুঝতে পারে মিথ্যা কমেন্ট করেনি সুমন। চমৎকার গল্পগুলো আসলে তার বাবার লেখা নয়, স্রেফ পয়সা দিয়ে কেনা। নীলিমা আর শায়লা ব্যাপারটা জেনে খুব কষ্ট পেলেও এ নিয়ে জলিল সাহেবের মুখোমুখি হলো না। বাবার প্রতি নীলিমার অগাধ বিশ্বাসের ভিতটা কেমন নড়বড়ে হয়ে গেলো। জলিল সাহেব খেয়াল করলেন তিনি দিনরাত গল্প লেখার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন। সেই সাথে সুমনের নতুন গল্পের অপেক্ষায় থাকছেন হরদম। একটু পর পর গ্রূপে ঢুকে দেখেন সুমনের নতুন গল্প আছে কিনা। নতুন গল্পে এলেই প্রবল হিংসা আর তার সাথে মেশানো অদ্ভুত কৌতুহল নিয়ে গল্পটা বারবার পড়েন, খুঁত ধরতে চান। কয়েকটা ফেক একাউন্ট খুলে নানা রকম নেতিবাচক সমালোচনা করে লেখকের সম্মানহানি করতে চান কিন্তু সুমনের মুগ্ধ পাঠকরা তার সমালোচনার পাল্টা জবাব দিতে একটুও দেরি করে না। এসব সমালোচনা আর পাল্টা যুক্তি তর্কে গল্পের প্রতি আগ্রহী পাঠক আরো বেড়ে যায়। জলিল সাহেব বুঝতেও পারলেন না তিনি আসলে সুমনের লেখার প্রতি একধরণের অন্ধ আবেশে জড়িয়ে যাচ্ছেন। বারবার ভাবেন এইসব লেখালিখির চিন্তা বাদ দিয়ে কন্সাল্টেন্সির দিকে মন দেবেন কিন্তু নিজের খ্যাতি হঠাৎ করে সুমনের কুক্ষিগত হতে দেখা তিনি সহ্য করতেই পারছিলেন না। মনে হতে থাকে, সুমনের এই খ্যাতি আসলে তারই প্রাপ্য ছিল। বছর ঘুরে গেলেও জলিল সাহেব কিছুতেই সুমনকে ফলো করা বন্ধ করতে পারলেন না। নিজের অজান্তেই তিনি সুমনের লেখার ভক্ত হয়ে যান।

সুমন তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে তার চাকরিতে আর লেখালিখিতে। সুমনের ফেসবুক প্রোফাইলে সব সময় চোখ রাখেন জলিল সাহেব। সুমনের প্রমোশন হয়েছে, বিদেশে কি একটা কনফারেন্সে গিয়েছে, দেশের নাম করা রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ ডিনার করছে। ছবি দেখে ভেতরে হিংসার ছুরি আরো বেশি আহত করে জলিল সাহেবকে।সুমনের বই প্রকাশ হচ্ছে এই খবরটা জেনে জলিল সাহেব ক্রোধে পাগল হয়ে গেলেন। বইমেলা শুরু হতেই ফেসবুকে শুধু সুমনের থ্রিলার উপন্যাসের খবর। সুমন যখন মেলায় যায় তার চারপাশে বেশ ভিড় জমে যায়। সেই ভীড়ে ভক্তদের অটোগ্রাফ দেয়া অবস্থায় গর্বিত সুমনের ছবি দেখে কেমন জ্বালা ধরে জলিল সাহেবের।। তিনি ফেসবুক ছেড়েই দিলেন। কিন্তু ঠিকই সুমনের বইটা সংগ্রহ করে ফেললেন। বিবমিষা এবং আগ্রহ মেশানো অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে তিনি বইটা খুললেন।

সুমনের উপন্যাসের নায়ক এক সাধারণ ভদ্র যুবক যার মধ্যে বাস করে এক ভয়ংকর দৈত সত্ত্বা। নায়কের কাছের মানুষও বুঝতে পারে না সে আসলে একজন সিরিয়াল কিলার। অনেকটা ডক্টর জ্যাকিল এন্ড মিস্টার হাইডের মতো গল্প আবার এক রকমও নয়। জলিল সাহেব পড়তে শুরু করে শেষ না করে পারলেন না। বইটা শেষ করে তার অন্তর্দাহ দ্বিগুন হলো। ছুড়ে ফেললেন বইটা।এক বিকেলে যখন শায়লা আর নীলিমার সাথে বসে টিভি দেখছিলেন তখন হটাৎ একটা টক শোতে সুমনকে দেখতে পেলেন! শায়লা অবাক হয়ে বললেন, “আরে সুমন না?”জলিল সাহেব বিরক্ত হয়ে চ্যানেল বদলাতে চাইলেন কিন্তু শায়লা দেখতে চাইলেন সুমন কি বলে। জলিল সাহেব অবাক হলেন সুমনের আমূল পরিবর্তন দেখে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত রুচি আর আভিজাত্য মোড়ানো, কথা বলে এখনো কিছুটা গ্রাম্য টান থাকলেও আগের চেয়ে অনেক সুন্দর গুছিয়ে নিজের বইয়ের ব্যাপারে কথা বললো। যে ছেলেটা তার দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারতো না, আজকে টিভিতে কি সুন্দর আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথা বলছে! অনুষ্ঠান সঞ্চালক হঠাৎ করেই জিজ্ঞেস করে বসলেন, “আপনার কিছু পাঠক জানিয়েছে আপনি নাকি আগে জলিল খন্দকার নাম এক ভদ্রলোকের কাছে গল্প বিক্রি করতেন, এটা কি সত্যি?”একটু নড়েচড়ে বসে সুমন বললো, “জ্বী সত্যি। টাকার জোরে উনি আমার গল্প নিয়েছেন। তারপর ফেসবুকে পোস্ট করে বিখ্যাত হতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আমি যখন বিক্রি বন্ধ করে দেই, তখন তিনি নিজেই একটা জঘন্য গল্প লেখেন। তাহলে বুঝতেই পারছেন, গল্প লেখার কোনো যোগ্যতাই উনার নেই। আসলে সবাই তো আর লেখক হতে পারে না। ” প্রায় শুদ্ধ উচ্চারণে বললো সুমন। এতটুকু শুনে জলিল সাহেব টিভি বন্ধ করে দিলেন। রাগে তার চোখমুখ অন্ধকার হয়ে গেছে। নীলিমা আর শায়লার দৃষ্টি থেকে শ্রদ্ধা সমীহ সরে গিয়ে একধরণের ঘৃণা স্পষ্ট হলো। শায়লা থমথমে গলায় বললেন, “তুমি তো মান সম্মান আর কিছু রাখলে না , টাকা দিয়ে লেখক সাজতে গিয়েছিলে ? সুমন এখন পত্রিকা টিভিতে এইসব কথা বলে বেড়াচ্ছে। কয়দিন আগে মামা ফোন করে কত কথা শুনিয়ে দিলো…. ” শায়লার গলা ধরে আসে। নীলিমাও উঠে চলে গেলো। জলিল সাহেব সিদ্ধান্ত নিলেন এই অপমানের শোধ তিনি তুলবেনই, সুমনকে একটা শিক্ষা দেবেন।

(চলবে)

-সালমা সিদ্দিকা