বহুরুপী

তমাল অফিসে কাজ করছে এমন সময় একটা অচেনা নাম্বার থেকে কল এলো।  কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে বলল “তমাল সাহেব বলছেন?
আমরা আপনার স্ত্রীকে গ্রেফতার করেছি । দয়া করে একবার খিলগাঁও থানায় আসবেন “? ফোনের ওপাশ থেকে বলা কথাগুলো শুনে তলাম খুব বড়সড় একটা ধাক্কা খেলো। সে কাঁপা কাঁপা গলায় জানতে চাইলো” আমার স্ত্রীর মানে? কি করেছে আমার স্ত্রী? এবার ওপাশ থেকে উত্তর এলো “সেটা থানায় আসলেই জানতে পারবেন “।  টুট টুট শব্দ করে লাইনটা কেটে গেলো।

অফিসে কাউকে কিছু না বলেই তমাল বেড়িয়ে পড়লো।  অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সিএনজিতে উঠেই বলল ” খিলগাঁও থানায় নিয়ে চলো”।  রাস্তায় সিএনজি ছুটে চলছে । সেই সাথে একেক পর এক স্মৃতি উঁকি দিচ্ছে তমালের মনে। আজ তিন বছর হচ্ছে ওর সাথে মেঘলার বিয়ে হয়েছে। তিন বছর! অথচ মেঘলা ঠিকমতো কোনোদিন তমালের সাথে কথা বলেনি।  এখনো বাসর রাতের কথা মনে হলে তমালের বুক কেঁপে উঠে।  কোনো এক অজানা কারণে সেই রাতে মেঘলা তমালকে বলেছিল, খবরদার আপনি আমাকে ছোঁবেন না।  নাহলে আমি চিৎকার চেঁচামেচি করবো।  সেই রাতে তমাল মেঘলাকে ছুঁয়ে দেখেনি।  সারারাত একা একা কাটিয়েছে নানান চিন্তা করে।  মেঘলা মনে হয় ওর সাথে বিয়েতে রাজি ছিল না।  ও অন্য কাউকে ভালবাসে।  সেইজন্য ওকে দূরে সরিয়ে দিলো।

বিয়ের কিছুদিন পরেই তমালের সেই ভুল ভেঙ্গে গেলো।  কারণ তমাল ততক্ষণে জেনে গেছে মেঘলার অন্য কোনো ছেলের সাথে সম্পর্ক ছিল না।  ওর সব থেকে কাছের বান্ধবী আয়না তমালকে বলেছে মেঘলা সব সময় ছেলেদের থেকে দূরে থাকতো।  কিন্তু কি কারণ সেটা ও জানে না। তাই বিয়ের পর থেকে তমাল আর মেঘলা কে ঘাটতে যায়নি।  তমালও মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছে মেঘলা না চাইলে ও কখনো ওর কাছে জোর করে স্বামীর অধিকার চাইবে না।  তিন বছর একিই ছাদের নিচে দুইজন বাস করলেও খুব প্রয়োজন ছাড়া একজন আরেকজনার সাথে কথা বলেনি । তমাল খুব চাপা স্বভাবের ছেলে।  নিজের বুকের মধ্যে অগ্নুৎপাত হলেও ও বাইরে সেটা প্রকাশ করে না।  তাই তিন বছরের অগ্নুৎপাত বাইরে থেকে কেউ দেখেনি।

সিএনজি চালকের ডাকে তমাল স্মৃতির পাতা থেকে বর্তমানে ফিরে এলো।  ভাড়া মিটিয়ে দৌড়ে সে থানায় প্রবেশ করলো । খোঁজ নিতেই জানতে পারলো ঘন্টাখানেক আগে মেঘলা বাবার বয়সী একজনকে বিনা অপরাধে বাজারে সবার সামনে একের পর এক চড়থাপ্পড় মেরেছে।  সেখানেই পুলিশের দুইজন পাহারাদার মেঘলাকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে আসে। কিন্তু এর মাঝে মেঘলা একটা কথাও বলেনি ।কেনো বা কি কারণে লোকটাকে এভাবে থাপ্পড় মেরেছে সেটা পুলিশ বারবার ওর কাছে জানতে চাইলেও সে মুখ খোলেনি।

পুলিশের এক বড় কর্মকর্তা তমালের মামার বন্ধু হওয়ায় মেঘলাকে ছাড়াতে বেশি ঝামেলা হলো না।  সেই সাথে যে ব্যাক্তিকে থাপ্পড় মেরেছে তিনিও থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ করেনি।  তাই খুব সহজে ওরা মেঘলা কে ছেড়ে দিলো । থানা থেকে বের হবার সময় ওসি তমালকে ডেকে বলল “আপনি আপনার বউয়ের চিকিৎসা করান।  আমার মনে হচ্ছে উনার কোনো মানসিক সমস্যা আছে। আজ একজনার গায়ে হাত তুলছে, কাল তুলবে না সেটার কোনো নিশ্চয়তা আছে? তমাল হুঁ হাঁ কিছু না বলে মেঘলাকে নিয়ে চলে এলো ।

তমাল আর মেঘলা মুখোমুখি দুজন বসে আছে।  তমালের মুখ দেখলেই বোঝা যায় ওর মনের মধ্যে হাজার প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।  কিন্তু মুখফুঁটে কিছু বলতে পারছে না।  মেঘলা মেঝের দিকে মুখ করে বসে আছে। হঠাৎ বিদ্যুৎ বেগে মেঘলা ছুটে গিয়ে তমালের বুকে ঝাপিয়ে পড়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।  তমাল যারপরনাই বিস্ময় হয়ে গেলো ।যে মানুষ তাকে কোনোদিন ছুঁয়ে দেখেনি সেই মানুষটা এখন ওর বুকের মধ্যে হাউমাউ করে কাঁদছে।  এখন ওর কি করা উচিৎ? সেটা তমাল ভেবে পাচ্ছে না।  ও কি মেঘলা কে ডাকবে? নাকি ওকে ওর মতন কাঁদতে দিবে? আচ্ছা কিছুক্ষণ কাঁদুক। কাঁদলে মন হালকা হয়।  হঠাৎই মেঘলা কাঁদোকাঁদো স্বরে বলে উঠলো” ঐ লোকটাকে আজ আমি খুঁজে পেয়েছি।  যে আমার জীবনটাকে শেষ করে দিয়েছে। মেঘলার কথা শুনে তমাল যেন চমকে উঠলো। কোন লোকটা? কি হয়েছে? এবার আর তলাম নিজের হাতকে আটকাতে পারলো না। কখন যে ওর হাত মেঘলাকে জড়িয়ে ধরেছে। তমাল আবার প্রশ্ন করলো “কোন লোক মেঘলা”? বলো আমাকে কি হয়েছে? আমাকে সব খুলে বলো।  আমি সব সময় তোমার পাশে আছি। কথা গুলো এক নিশ্বাসে বলে তমাল শ্বাস নেওয়ার জন্য দম নিলো ।

তমালের বুকের মধ্যে মুখ গুজিয়ে মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো।  বক্তা যেমন বক্তৃতা দেওয়ার আগে মনে মনে কথা গুছিয়ে নেয়, ঠিক তেমনি মেঘলাও মনে মনে নিজের কথা গুলো গুছিয়ে নিলো।  তারপর বলা শুরু করলো। তখন আমি সেভেনে পড়ি।  বাবা সব সময় ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকতেন ।রাত ছাড়া কখনো বাসায় আসতেন না। আবার খুব ভোরবেলায় বেড়িয়ে যেতো। আমাদের যৌথ পরিবার সেটাতো তুমি দেখছ। মা সব সময় রান্নাবান্না আর পরিবার নিয়ে ব্যস্ত থাকতো।  এতো লোকের রান্নাবান্না আর সংসার চালাতে চালাতে মার মেজাজ সব সময় খারাপ থাকতো। একটুতেই আমাদের উপর রেগে যেতেন। কখনো উঁচু গলা ছাড়া আমাদের সাথে কথা বলতো না। একবার ক্লাসে বই হারিয়ে ফেলেছিলাম।  মা আমাকে ঘরে আটকে রেখে পিটিয়েছিলো। আস্তে আস্তে মায়ের সাথে আমার দূরত্ব বাড়তে লাগলো। খুব প্রয়োজন ছাড়া মার সাথে আমার কথা হতো না। বাবা কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় উনার সাথেও তেমন ভালো সম্পর্ক ছিল না। এভাবে যতো বড় হচ্ছি ততো মায়ের মেজাজ আরো খারাপ হতে থাকে। এমন সময় আমার পড়ার জন্য বাসায় একটা মাস্টার রাখা হয়। উনি শুক্রবার ছাড়া প্রত্যেকদিন আমাকে পড়াতে আসতেন।  আমার পড়ার ঘরে সচরাচর কেউ আসতো না । মা আবার পড়াশুনা নিয়ে একবিন্দুও ছাড় দিতেন না। মাকেও সবাই ভয় পেতো।

মাস্টারের বয়স তখন ত্রিশ বত্রিশ হবে। দেখতে বেশ ভালো ।খুব গুছিয়ে কথা বলতো।  আর খুব ভালো পড়াত। একদিন উনি পড়ানোর সময় প্রথম আমার ঘাড়ে হাত দেয়। আমি তখন মেয়েদের স্কুলে পড়তাম।  ছেলেদের সাথে তেমন মিশবার সুযোগ হয়নি। তাই ছেলেদের সম্পর্কে আমার মনে তখনো কোনো ধারনা ছিল না। উনার হাতের স্পর্শে আমার খুব অস্বস্তি লাগছিল । উনি ব্যাপারটা বুঝতে পেরে উনার হাত সরিয়ে নিলেন। তারপর সব আগের মতন চলতে লাগলো।  আমিও দিনে দিনে ব্যাপারটা ভুলে গিয়েছিলাম । এভাবে কিছুদিন যাবার পর উনি আবার সেই একই কাজ করলেন।  এবার আর হাত দিয়ে চুপচাপ থাকলেন না। উনার রাক্ষসের মতন হাত দিয়ে আমার ঘাড় টিপতে লাগলেন । প্রথমে আস্তে তারপর জোরে জোরে।  খুব ভয় করছিল তখন আমার। কারণ এভাবে কখনো আমার গায়ে কেউ হাত দেয়নি।  উনাকে বললাম আমার শরীর থেকে হাত সরিয়ে নিতে।  উনি আমার শরীর থেকে হাত সরিয়ে নিলেন।

এরমধ্যে প্রথম সাময়িক পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়ে দিয়েছে।  অংকে ফেল করেছি।  মা রেজাল্ট শুনে ইচ্ছেমত মারলো।  কিন্তু আমার বিশ্বাস আমি ফেল করিনি।  কোথাও একটা কিছু ভুল হয়েছে।  কিন্তু ততদিনে মা আমাকে অবিশ্বাস করা শুরু করে দিয়েছে।  আমি যেটাই বলি না কেন মা সেটা বিশ্বাস করে না।  সেইদিন ইচ্ছেমতো আমার গায়ে হাত তুললো।  আর বিচ্ছিরি সব ভাষাল গালাগাল দিতে লাগলো।

এরমধ্যে আবার একদিন সেই মাস্টার আমার শরীরে হাত দিলো।  এবার ভাবলাম মাকে বলে দিবো।  কিন্তু ইতিমধ্যে মাস্টার মায়ের মন জয় করে ফেলেছে।  আমি যদি মাকে বলি তাহলে মা আমার কথা বিশ্বাস করবে না।  তাছাড়া এসব কথা মাকে বলার সাহসও হচ্ছিল না। কারণ মা বলতে পারে আমি পড়াশুনা করতে চাইছি না বলে মাস্টারের নামে অপবাদ দিচ্ছি। সামান্য রেজাল্ট খারাপ নিয়ে যে কুকুরের মতন মারতে পারে।  সে এইসব কথা শুনলে কি করবে সেটা ভেবে আমার বুক কেঁপে উঠেছিল।  তাই চুপ করে গেলাম।

এভাবে মাঝেমধ্যে উনি আমার শরীরে হাত দিতে লাগলেন । দিনকে দিন উনার মাত্র বেড়ে যেতে লাগল।  এক সময় উনি আমার বুকে পর্যন্ত হাত দিলেন।  আমি চুপচাপ থাকি আর উনি আমার শরীরে হাত দিলে আমি সেটা সরিয়ে দেই।  হঠাৎ একদিন উনি আমাকে পড়ানোর সময় মুখে পাগলের মতন চুমো খেতে লাগলেন।  আমি দু’হাত দিয়ে উনাকে সরিয়ে দিতে লাগলাম।  কিন্তু উনার পৈশাচিক শক্তির সাথে পেরে উঠিতে পারছিলাম না। উনি উনার শক্ত এক হাত দিয়ে আমার দু হাত আটকে ধরে রাখলেন।  আর উনার অন্য হাত তখন আমার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে একের পর এক ছোবল দিয়ে যাচ্ছে।  এরমধ্যে উনি আমার পায়জামার ফিতা খুলে আমার গোপন অঙ্গ ছুঁতে লাগলেন।  আমি কাঁন্না শুরু করলে উনি আমাকে ছেড়ে দেন৷ আর বলেন, তাড়াতাড়ি কান্না থামিয়ে পড়তে নাহলে মাকে আমার নামে বিচার দিবে । আমি ভয়ে কান্না থামিয়ে দিলাম।

উনি সেইদিন আর কিচ্ছু না করলেও কয়েকদিন পর একদিন বাসায় কেউ না থাকায় উনি সুযোগ পেয়ে বসলেন। সেইদিন আমি দরজা খুলে দিলে উনি স্বাভাবিক দিনের মতন পড়াশুনা শুরু করলেন । তারপর কথায় কথায় বললেন, তোমার আম্মাকে দেখলাম না যে। আমি বললাম, স্যার আজ বাসায় কেউ নেই। সবাই মিলে এক অসুস্থ আত্মীয়কে দেখতে গেছে। উনি আমার কথা শেষ হবার সাথে সাথে হিংস্র হায়েনার মতন আমার শরীরে লাফিয়ে পড়লেন।  আমাকে জোর করে বিছানায় শুয়ে দিয়ে আমার শরীর নিয়ে খেলতে লাগলেন।  আমি আর সহ্য করতে না পেরে চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠলাম।  উনি এক হাত দিয়ে আমার মুখ চেপে ধরে রইলেন।  অন্য হাত দিয়ে আমার পায়জামা খুলে ফেলে দিলেন । তারপর উনি হিংস্রতার আর কোনো সীমা রাখলেন না। আমার যোনীপথ দিয়ে রক্ত বের হতে লাগলো।  উনি এটা দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন।  আমাকে ছেড়ে দিয়ে উনি ঘর থেকে দৌড়ে বের হয়ে গেলেন।  আমি ততক্ষণা চিৎকার করে কাঁদছি।  তাড়াতাড়ি করে আমার পায়জামা পরে নিয়ে বাথরুম গিয়ে দেখি আমার দুপা দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।  মায়ের ভয়ে তাড়াতাড়ি রক্ত পরিস্কার করে নিলাম।  কিন্তু তখনো রক্ত বন্ধ হচ্ছিল না। তাই একটা কাপড় পেঁচিয়ে নিলাম । কারণ এর আগেই আমার ঋতুস্রাব শুরু হয়ে গিয়েছিল।  তাই আমি জানতাম কিভাবে রক্তপাত আটকে রাখতে হয়।

সেইদিন ভয়ে মাকে আর কিছু বলিনি।  এই ঘটনা জানলে মা আমাকে খুন করে ফেলতো। কিন্তু মাকে বললাম ,আমি আর বাসায় পড়তে চাইনা। সবাই মিলে স্কুলের স্যারের কাছে পড়ে। স্কুলের স্যারের কাছে না পড়লে পরীক্ষায় ভালো নাম্বার দেয় না। মা প্রথমে রাজি না হলেও পরে অনেক কষ্টে উনাকে রাজি করালাম।  কিন্তু নিজের মন কে আর ঠিক করতে পারিনি।  সেইদিন রাতে ভীষণ জ্বর এলো।  সেই সাথে ওখানে প্রচন্ড ব্যথা।  কাউকে কিছু বলতেও পারিনা।  নিজের কাছে নিজেকে খুব ছোট মনে হতে লাগলো। ছেলেদের প্রতি এক ধরনের ঘৃণা এলো।  হ্যাঁ, ঘৃণা করতে লাগলাম পৃথিবীর সব ছেলেকে। নিজের মনের মধ্যে নিজের দুঃখ গুলো পুষে রাখতে লাগলাম । কিন্তু আজ বাজার করতে গিয়ে হঠাৎ করে সেই জানোয়ারকে দেখতে পাই। এতদিনেও ওর চেহারা আমি ভুলে যাইনি। মাঝেমধ্যে স্বপ্নে ওই জানোয়ার কে দেখতাম আমি। এতো সহজে ওকে ভুলি কিভাবে।  তাই নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি।  ইচ্ছেমতো চড়থাপ্পড় মেরেছি জানোয়ার টাকে।  আমার কাছে যদি একটা চাকু থাকতো।  ওই জানোয়ারকে আমি জবাই করে ফেলতাম। বলতে বলতেই মেঘলা আবার ঢুকরে কেঁদে উঠলো।  তমাল নিজের কানকে যেন বিস্বাদ করতে পারছিলো না। এতক্ষণ ও কি শুনলো। তমালের নিজের অজান্তেই ওর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগলো।  মেঘলা আবার বলতে লাগলো, ঐ জানোয়ারটার জন্য আমি তোমাকে দূরে সরিয়ে রেখেছি।  তুমি আমাকে মাফ করে দিয়ো।  তমাল আরো শক্ত করে মেঘলাকে জড়িয়ে ধরে বললো ,তুমি তো কোনো দোষ করনি।  এই দোষ তোমার না, এই দোষ মানুষরূপী জানোয়ার গুলোর।

-রিফাত আহমেদ