বোকা মেয়ের গল্প ( ২য় পর্ব )


চড় খেয়ে তাহমিনা মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে।
কেকা বড় বড় চোখ করে তাহমিনার দিকে তাকিয়ে আছে, অবশ্য এই দৃশ্য কেকার কাছে এখন আর নতুন কিছু না, এই দুইমাসে কেকার এসব দৃশ্য দেখে দেখে অভ্যেস হয়ে যাওয়ার কথা।

ঘটনা দেখার জন্য রুম থেকে কেকার ননদ শিপা দৌঁড়ে বেড়িয়ে এসেছে।
জোড়ে জোড়ে হাততালি দিয়ে শিপা হাসছে আর বলছে- মা,মা, দ্যাখো দ্যাখো, তাহমিনা মুইততা দিছে! হি হি হি হি,,,,

কেকা অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলো ঘটনা সত্যি। মার খেয়ে তাহমিনা কাপড় ভিজিয়ে ফেলেছে। তাহমিনার চেয়ে শিপা বছরে তিন চার বছরে বড়। ভার্সিটিতে পড়া একটা মেয়ের মধ্যে মায়া- মমতা- মানবিকতার-বিষয় গুলো থাকার কথা, একটা শিক্ষিত মেয়ের কাছে এটুকু আশা করাই যায় কিন্তু কেকার শাশুড়ি মায়া বেগম নামে যতটাই মায়া বহন করুন না কেন অন্তরে তার বিন্দু মাত্র মায়া আছে বলে কেকার মনে হয়নি। এবং সম্ভবত তিনি তার সন্তানদের মধ্যে এই জিনিসটা ঢুকিয়ে দিতেও পারেন নি।
মায়া বেগম নিয়মিত তাহমিনার উপর চড়াও হন,
আজকে যে ঘটনা নিয়ে তাহমিনার উপর তিনি চড়াও হয়েছেন সেটা কেকার কাছে তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে হয়নি যে কারণে এভাবে ওকে মারতে হবে।
ঘটনা হচ্ছে -রুটি। সকাল বেলা তাহমিনা আর কেকা দুজনে মিলে রুটি বানায়। একজন রুটি বেলে দিলে অন্য জন তাওয়ায় সেঁকে তোলে। কেকা যেহেতু নতুন, রুটির আটা তাহমিনাই করে দেয়। কোন দিন হয়তো রুটি কম হয় কোন দিন বেশি, এই ঘরে একটা জিনিস কেকা সব সময় লক্ষ্য করেছে গরুর মাংস অথবা ভাজাভুজি ভালো হলে সেদিন রুটি সবাই একটু বেশিই খায় আবার যেদিন রুটি দিয়ে খাওয়ার জন্য ভালো কিছু থাকে না সেদিন রুটি খাওয়াও কম হয়। আজকের রুটির সাথে খাওয়ার জন্য ছিলো ভাজি, আর সেই ভাজি সম্ভবত খুব একটা স্বাদের হয়নি আর সে কারণেই রুটি একটু কম খাওয়া হয়েছে । যেহেতু রুটি কম খাওয়া হয়েছে সেহেতু রুটি কিছু বেশি রয়ে গেছে।আর একারণেই প্রতিদিনেরর মতো তাহমিনার উপর চড়াও হলেন তিনি।
বাজখাঁই গলায় ডাক দিলেন – এই তাহমিনা, এই দিকে আয়। রুটি বেশি হইলো কেন?

(তাহমিনাকে ছোট রেখে ওর মা মারা যান, তার কিছুদিন পর ও বাবাকেও হারায়। এতিম তাহমিনা এরপর থেকে দূর সম্পর্কের কাকা রফিক সাহেব ( কেকার শশুড়ের) আর মায়া বেগমের কাছেই মানুষ হচ্ছে দুবেলা দুমুঠো বাসী খাবার আর নিয়মিত দুবেলা কিলঘুষি খেয়ে।
তাহমিনা তাই সব সময়ই ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে থাকে)

মায়া বেগমের ডাকে রান্না ঘর থেকে হাতের কাজ ফেলে দৌঁড়ে এসে তার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলো তাহমিনা, ওকে চুপ থাকতে দেখে মায়া বেগমের মেজাজ যেন দ্বিগুণ চড়ে যায়। তিনি প্রথমে তার হাতির মতো শরীরটা নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে এক চড় বসান তাহমিনার গালে, সেই চড় খেয়ে তাহমিনা মাটিতে পড়ে গেলে মায়া বেগম দুই পায়ে তাহমিনার শীর্ণ দেহের উপর দুই পা দিয়ে লাথি চালাতে থাকেন ক্রমাগত । মাটিতে লুটিয়ে থাকা তাহমিনা আহ শব্দ টুকুও করে না। যেন এটা খুবই স্বাভাবিক বিষয়, হয়তো সে এভাবেই দিনের পর দিন মার খেতে খেতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, মা- বাবা হীনা একটা মেয়ে কার কাছেই বা অভিযোগ করবে?
মায়া বেগমের চিৎকার চ্যাঁচামেচি শুনে রফিক সাহেবও দৌঁড়ে এসেছেন, কিন্তু ঘরের পরিবেশ অনুকূল নয় বুঝতে পেরে চুপ করে আছেন। দুকথা বলতে গেলে তাকেও যে ঝড়ের সম্মুখীন হতে হবে তা বুঝেই হয়তো আর তিনি কথা বাড়ালেন না।
এই দুমাসেই তাহমিনা বেশ বুঝতে পেরেছে এই ঘরে এতদিন সমস্ত বিচার শালিসের কেন্দ্র বিন্দু ছিলো তাহমিনা আর এখন সেই সাথে যোগ হয়েছে কেকা। কেকার ভাগ্য ভালো তার গায়ে হাত ওঠে না, কিন্তু তাহমিনা তার চেয়েও দুর্ভাগা। রোজই তাকে দুবেলা কিলঘুষি খেতে হয় আর ঘরের সবার কাছে তখন সেটা একটা মস্ত বড় বিনোদনের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কেকাও বোঝে এই ঘরে সে আর তাহমিনা দুজনই পর।
সজলের মানসিকতা তাই ই হয়তো এমন, এসব দেখে দেখে তার অভ্যাস হয়ে গেছে, নিজের বউকে অপমানিত হতে দেখলেও তাই তার গায়ে লাগে না। পারিবারিক শিক্ষা বলতে একটা ব্যাপার তো আছে!
কেকা ছোট বেলা থেকেই শুনে এসেছে ঘরের ভিতরের অশান্তির কথা যেন বাইরের কারও কান পর্যন্ত না পৌঁছায়, চিৎকার চ্যাঁচামেচি বাইরের লোকের কানে যাবে এটা ভীষণ লজ্জার বিষয়। তাই এতদিন লজ্জায় মুখ ফুঁটে কথা বলতে পারে নি কেকা।
কিন্তু আজকে তাহমিনাকে এমন অবস্থায় দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না সে। বেশ খানিকটা উচু গলায় বলেই বসলো – রুটি কম বেশি হওয়া কী ওর দোষ, আপনারা কম বেশি খান বলেই তো রুটি কম বেশি হয়,রুটি তো তাহমিনা গুনে গুনেই বানায়। যেদিন গরু ভুনা বা মজাদার কোন আইটেম থাকে সেদিন তো সব রুটি আপনারাই খেয়ে ফেলেন, তখন তো আর একবারও জানতে চান না তাহমিনা খেয়েছে কি না? সেদিন তো ওর না খেয়েই থাকতে হয়। আর যেদিন বেশি হয় সেদিন ওকে ইচ্ছে মতন মারেন, কেন? বাসী খাবার গুলো তো আর আপনারা খান না, সেগুলোও তো ওকেই খেতে হয়।

কেকার এই কথা শুনে মায়া বেগমের প্রেসার হাই হয়ে যায়, তিনি চিৎকার চ্যাঁচামেচি করে সারা ঘর মাথায় তোলেন। সব শেষে এই বলে শাসান- আজ সন্ধ্যায় সজল ঘরে ফিরুক।

সন্ধ্যায় সজল ঘরে এলে যথারীতি বিচার বসে, এবং পরবর্তীতে বেশ কিছু দিন কেকার সাথে সবার কথা বলা বন্ধ হয়ে যায় ।
কেকার এখন আর তাতে কিছুই যায় আসে না, কারণ কেকা জানে সে একা, জীবনের এই যুদ্ধটা তাকে একাই করতে হবে। কারও সাথে কথা বলা না বলায় কিছু এসে যায় না। আর সে তো নিজের জন্য কিছু বলেনি সে শুধু অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে।

ডানপেটে বেশ কিছুদিন ধরে চাকার মতো কিছু একটা অনুভব করে কেকা, কথাটা একদিন শাশুড়িকে বলতেই, মায়াবেগম আর শিপা দুজনে মিলে দুকথা শুনিয়ে দেয় কেকাকে- ওহ! তোমার তাহলে আগে থেকেই অসুখ ছিলো, পেটে টিউমার জানায় নাই তোমার বাপ মায় তোমারে আমাগো ঘাড়ে চাপাইয়া দিছে, এহন অপারেশনের যতো ঝামেলা সব আমাগো ভুগতে হইবো। আমি আইজকাই তোমার বাপরে ফোন দিতাছি।
সব শুনে সজল কেকাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়, সমস্ত পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষ করে সুখবরটা সজলকেই শোনান ডাক্তার, সজল বাবা হতে চলেছে।
সংবাদটা যথাসময়ে মায়াবেগমের কানে পৌঁছায়। এবং তিনি যথারীতি কথা শোনাতে ছাড়েন না – হ, রান্না বান্না ঘর সংসার কিছুই তো শিইখা আসো নাই, খালি শিখছো জামাইর লগে ঘুমাইতে, আর পোলাপান হওয়াইতে।

মাস শেষে মায়ের বাড়ি বেড়াতে গেলে কেকার বান্ধবী লিসা দেখা করতে এলো, কথায় কথায় মায়া বেগমের কথাগুলো লিসাকে খুলে বলতেই ভীষণ রেগে যায় লিসা- কেন? জামাইর সাথে শোয়া যদি ভালোভাবেই তোর শেখা থাকতো তাহলে তো আর তোর এত তাড়াতাড়ি বাচ্চা আসতো না, বরং কেমনে এসব সামলাইতে হয় তুই তা ভালো করেই বুঝতি, গিয়া তোর শাশুড়িরে সেই কথা শুনাইয়া দিবি।
কেকা হাসে, কুকুর কামড় দিলেই কী কুকুরকে মানুষের কামড়ানো শোভা পায়?

সময় গড়ায়। শিপার বিয়ে ঠিক হয়। মায়া বেগমের মায়ার সংসার ছেড়ে তার একমাত্র মেয়ে চলে যায় শ্বশুর বাড়ি।
নতুন এক পারিবারের সাথে নতুন এক বন্ধন। এই পরিবারের এত দিনের বদ্ধতাকে কিছুটা হলেও দূর করে দেয়। শিপার শ্বশুর শাশুড়ি, দেবর ননদের সাথে খুব ভাব হয়ে যায় কেকার।এই সংসারে যেন প্রাণের সঞ্চার হয় । হাসি আর আনন্দের নতুন বাতাস লাগে। দুপক্ষের আসা যাওয়া, হলুদ, বিয়ে ফিরনি সব মিলিয়ে কেকার প্রতিটা ক্ষেত্রে আন্তরিকতার ছোয়া দেখে মুগ্ধ হয় দুপক্ষই।

এবার ঈদ আবারও, নিজ হাতে পোলাও,মাংস,চটপটি পায়েস, পছন্দের সব খাবার রান্না করে কেকা । পাতলা খিচুড়ি আর শুধু মাংসের দিন শেষ হয়। দল বেঁধে শিপা তার বরসহ ননদ দেবরদের নিয়ে বেড়াতে আসে। এবার সবাই এসে চটপটির বাটিটার উপরেই চড়াও হয়,বলে ভাবী আপনার হাতের চটপটি এত মজার হয়েছে, আমরা আর কিছুই খাবো না। আরও চটপটি নিয়ে আসুন।
মুহূর্তেই চটপটির বাটি শেষ। খালি বাটি হাতে মায়া বেগম ছোটেন রান্না ঘরের দিকে, কেকাও যায় পিছন পিছন, হাঁড়ির ঢাকনা খুলে মায়া বেগম আহত চোখে তাকিয়ে বলেন – সে কী, চটপটি তো শেষ, আরও বেশি করে রাধলা না?

কেকা এবার মনে মনে হাসে,কেকার মুখ ফসকে কথাটা এবার বেরিয়েই যায় – কেন মা, আমি না হা ভাইত্তা?

মায়া বেগম বিস্ফোরিত চোখে কেকার দিকে তাকিয়ে থাকেন, তার মুখ থেকে কথা বের হয় না।

শামীমা হক ঝর্না


চলবে…..

https://m.facebook.com/groups/1749042645384412?view=permalink&id=2117423651879641