বোকা মেয়ের গল্প ( ৩য় পর্ব )

‘তুমি একটা বোকা মাইয়া।

‘কেন মা?

‘হয় পড়াশোনা বন্ধ করো নইলে বাচ্চা নষ্ট করো।
দুইডা এক লগে করবা কেমনে?

কেকা অবাক হয়, সজলের প্রথম সন্তান, যে আসছে সে এই পরিবারের বংশধর, তাকে এত অবলীলায় কী করে নষ্ট করতে বলছেন মায়া বেগম।
কেকার কিছু না ভেবেই উত্তর দেয় – না মা, এই সন্তান আমি কিছুতেই নষ্ট করবো না। আর পরীক্ষা দেওয়াও বন্ধ করবো না, আমি আগে থেকেই পড়াশোনা করে রাখবো, পরীক্ষা দিতে কোন অসুবিধা হবে না।
অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা আর কেকার অনাগত সন্তানের জন্মের সময়টা ঠিক একই সময়ে ডাক্তার নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু তাই বলে দুটোর একটা বেছে নেওয়া কেকার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব না, সজল যে সন্তানের আগমন সংবাদ শুনে খুশিতে আত্মহারা, সেই সন্তানকে কিছুতেই হত্যা করতে পারবে না কেকা। আর হত্যা করার প্রশ্নই বা আসে কোথা থেকে?
এই কথা বলার অর্থ কী? কেকা মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থাকে কিছুতেই সে মায়া বেগমের কথা শুনবে না, মনে মনে প্রচন্ড আঘাত পায় কেকা। কিন্তু সজল কে কথাটা বলবে কি না বুঝে উঠতে পারে না, শেষ পর্যন্ত ঠিক করে – না কথাটা সজলকে না জানালেও চলবে।

রাত প্রায় নয়টা বাজে, কেকা বেড সাইট সোফাটায় বসে বসে ঝিমাচ্ছিলো। এত তাড়াতাড়ি কেকার ঘুম আসার কথা না, কিন্তু সেই সকাল পাঁচটায় ঘুম থেকে ওঠে তারপর আর বিছানায় যেতে সাহসে কুলায় না, যে কারণে একনাগাড়ে জেগে থাকতে থাকতে ঝিমুনি আসে কেকার। তাছাড়া সন্ধ্যা সাতটা বেজে গেলেই ঘরের সবাই স্টার জলসা আর জি বাংলা নিয়ে বসে যায়। কেকার টিভি দেখতে ভালো লাগে না, আর এসব সিরিয়াল তো একেবারেই না, বরং কেকার মনে হয় মায়া বেগম এসব সিরিয়াল দেখে দেখেই নিত্য নতুন ঘটনা সাজাতে উৎসাহ পান।
কাল যেমন বললেন- আমার ছেলেরে আমি কোন দিনই আলাদা কইরা দিমু না, আলাদা কইররা দিলে বউরা জামাই লইয়া সুখে থাকবো, এত সহজে আমি সেই সুখ তোমারে পাইতে দিমু না।

কেকা বেশ অবাক হয়েছিলো। আলাদা হওয়ার প্রশ্নই বা আসে কোথা থেকে, হয়তো মায়া বেগম এসব সিরিয়াল দেখে দেখেই এধরণের চিন্তা ভাবনা করতে শুরু করেছেন।

কলিং বেলের আওয়াজ হয়, কেকা উঠে যাওয়ার আগেই কেউ একজন দরজা খুলে দেয়, কেকা আবার সোফাতেই বসে পড়ে, হাতে বই নিয়ে পড়ার চেষ্টা করে কিন্তু ঘুমের কারণে লেখা গুলো ঝাপসা হয়ে থাকে।

সজল বাসায় এসে সারাসরি বেড রুমে চলে আসে। হেলমেটটা এগিয়ে ধরে কেকাকে বলে, নাও এটা।

কেকা অবাক হয়ে বলে,হেলমেটের ভিতরে কি?

সজল মুচকি হেসে বলে, আগে দেখোই না।

কেকা উঠে দাঁড়ায়, হেলমেটের ভিতরে একটা প্যাকেট , প্যাকেটটা হাত বাড়িয়ে নিয়ে খুলে দেখে আরও অবাক হয়, সেকী! এটা তো বার্গার!

সজল হা হা করে হেসে বলে,হুম, তুমি না সেদিন বার্গার খেতে চেয়েছিলে।

কেকা লজ্জিত হয়ে বলে,তাই বলে এমন চোরের মতো লুকিয়ে বার্গার আনতে হবে? কেউ যদি দেখে ফেলে তখন? আর ঘরের সবাইকে না দিয়ে কী করে আমি একা একা খাবো ?

‘ তোমার অতো চিন্তা করতে হবে না তো, যাও কেউ দেখার আগেই বারান্দায় বসে চুপচাপ খেয়ে নাও, তুমি মা হতে চলছো , তোমার এখন কিছু জিনিস খাওয়ার শখ হতেই পারে। যাও খেয়ে নাও।

মাঝে মাঝে সজল আসলেই লজ্জায় ফেলে দেয়, এভাবে লুকিয়ে খাওয়াটা কী লজ্জার বিষয়!

কেকা একা একা বারান্দা বসে বার্গার খাচ্ছে। সজল হাত মুখ ধুয়ে গা মুছতে মুছতে কেকার পাশে চেয়ার টেনে বসে বলে, জানো কক্সবাজার যাওয়ার জন্য বাসের টিকেট, হোটেল সব বুকিং দিয়ে এসেছি। আগামী বৃহস্পতিবার আমরা রওনা হবো।

কেকা ভয় পায়-এই অবস্থায় এত জার্নি করা কী ঠিক হবে?

সজল আশ্বস্ত করে – কোন ভয় নাই, আমি আছি না। বিয়ের পর তো তোমাকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাওয়া হলো না। চলো, এবার ঘুরে আসি।

সজলই ঘরের সবাইকে রাতের খাবার খেতে বসে কক্সবাজার যাওয়ার কথাটা জানায়। এই খবর শোনার পর থেকেই ঘরের সবার মুখ গম্ভীর হয়ে যায়। কেকা যেন মস্ত বড় একটা অপরাধ করে ফেলেছে,সমস্ত কিছুর জন্য সে – ই দায়ী। পরবর্তী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ঘরের অন্যান্য সবাই যথারীতি কেকার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। কেকার শাস্তি শুরু হয়ে যায়।
কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার সময় কেকা শশুর শাশুড়িকে সালাম করে বিদায় নেয়, কিন্তু দুজনের একজনও কোন কথা বলেন না। গম্ভীর থমথমে মুখে দুজনকে বিদায় জানান তারা।

বাস ছাড়তে বেশ কিছুক্ষণ বাকী, সজল কেকাকে বসিয়ে রেখে বাইরে গেছে। কিছুক্ষণ পরে সে হাত ভর্তি করে ব্যাগে করে চিপস, বিস্কিট, স্যান্ডুইচ, কোক, জুস সহ নানান খাবার নিয়ে ফিরে এলো।
কেকা দেখে হাসতে থাকে- এতো খাবার কেন? তুমি কী সাথে করে কোন বাচ্চাকে নিয়ে যাচ্ছো না কি?
সজল কেকার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে – হুম, তুমিই তো একটা বাচ্চা,যে দুএদিন পর আমার বাচ্চার মা হবে। সারা পথে তোমার খিদে লাগতে পারে, সেজন্যই এসব নিয়ে এসেছি, কুমিল্লায় অবশ্য থামবে। কিন্তু তবুও।

বাস চলে এসেছে, দুজনে মালপত্র বুঝিয়ে দিয়ে বাসে উঠে বসলো, কক্সবাজার গামী বাস চলতে শুরু করেছে, কেকা সজলের কাঁধে মাথা রেখে শুয়ে আছে। জীবনে বোধ হয় এত সুখ আর কিছুতেই নাই। এরকম হাজারও সুখ আছে বলেই কেকারা জীবনের যুদ্ধটা চালিয়ে নিয়ে যেতে পারে, ছোট ছোট সুখ গুলো জীবনের চলার পথে শক্তি যুগিয়ে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়।
সারা পথ সজল কেকাকে আগলে রাখলো যেন একটা বাচ্চা মেয়ে সে।
কক্সবাজার পৌঁছে হোটেলে ওঠার পর দুজনে নাস্তা খেয়ে সমুদ্র সৈকতে এসে দাঁড়ালো। বিশাল সমুদ্রের সামনে দুজন ক্ষুদ্র মানুষ, একটা জীবন একসাথে পাড়ি দেওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে দাড়িয়ে আছে। এর আগে বা পরে ভবিষ্যতেও জীবনে হয়তো বহুবার সমুদ্র সৈকতে এসে দাঁড়াবে কেকা, কিন্তু আজকে সজলের সাথে জীবনের শুরুতে এই যে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখা এই দেখার সাথে হয়তো অন্য কোন দিনের সমুদ্র দেখার সাথে কোন মিল থাকবে না, এই রকম অদ্ভুত ভালোলাগার অনুভূতি হয়তো আর কখনই হবে না । এরকম নিবিড় করে দুজন দুজনের পাশে থাকার এবং দুজনের সঙ্গ উপভোগ করার সুযোগ আর কী জীবনে আসবে ?
তবে একটা কথা কিন্তু ঠিক,তারা কিন্তু এই সমুদ্র সৈকতে শুধু দুজনই দাঁড়িয়ে নেই । তাদের সাথে আছে আরও একজন, তাদের অনাগত সন্তান, যাকে কেকা গর্ভে ধারণ করে আছে। যেই সন্তানই রচনা করে দুজন মানুষের মধ্যে প্রকৃত সেতু বন্ধন।
পরবর্তী দিন গুলো কেটে যায় অনাবিল আনন্দের জোয়ারে ভেসে, সজলকে এত আপন করে কাছে পাবার সুযোগ এর আগে আর হয়নি কেকার।চিন্তা ভাবনা হীন কিছুটা অবসর দুজন মানুষকে আরও কাছে নিয়ে আসে, আরও ভালোবাসতে শেখায়।
সপ্তাহ শেষে আাবারও ফিরে আসা সেই জীবনে, আবারও শুরু হয় ব্যস্ততা। এরই মধ্যে কেকার ননদ জামাই ঠিক করে শিপাকে নিয়ে হানিমুনে যাবে ইন্ডিয়া। মায়া বেগমের তখন ভীষণ আনন্দ হয়। দেশের বাইরে যাওয়ার আগে শিপা মার সাথে দেখা করতে আসে, মায়া বেগম তখন খুশিতে আটখানা, শিপার যা যা লাগবে গুছিয়ে দিতে ব্যস্ত। এক ফাঁকে এসে কেকার কাছ থেকে কেকার বিউটি বক্সটা চেয়ে যান, বলেন- কেকা, তোমার বিউটি বক্সটা দিও তো, শিপা চাইছে,ওর নাকি লাগবে।
কেকা বিউটিবক্সটা শাশুড়িকে এগিয়ে দিতে দিতে দিতে ভাবে – মানুষের ভাবনা গুলো এমন কেন? ক্ষণে ক্ষণে বদলায়?

-শামীমা হক ঝর্ণা