বোকা মেয়ের গল্প ( ৭ম পর্ব )

বাসায় কেউ নেই, রুদ্র বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। চারদিক অন্ধকার করে মেঘ করেছে। ড্রয়িংরুমের সুইচটা খুঁজে বের করে আলো জ্বালাতেই কলিংবেলটা বেজে উঠলো টুংটাং করে, কেকা দরজা খুলতেই অবাক হলো – কে, বাদল?

একগাল হাসি দিয়ে কেকার সামনে বাদল দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে কেকা দরজা ছেড়ে দাঁড়ালেও বাদল ভিতরে ঢুকছে না। এতক্ষণে কেকার সন্দেহ হলো, কিছু একটা সমস্যা আছে! বাদলের পিছনে কি যেন নড়াচড়া করছে , কেকা একটু ভালো করে লক্ষ্য করেই বুঝতে পারলো শাড়ি পরা কেউ বাদলের দেহের পিছনে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে ব্যস্ত।
হঠাৎ করেই একটা সম্ভাবনার কথা কেকার মাথায় বিদ্যুৎ চমকের মতো খেলা করে গেলো, অনেকদিন ধরেই কেকা শুনে এসেছিলো বাদল লুকিয়ে বিয়ে করেছে, কাউকে কিছু না বলেই নিজের পছন্দে বিয়ে করেছে কেকার মেজ দেবর বাদল, কথাটা তাহলে সত্যি।
কেকা এবার হেসে এগিয়ে গেলো – কী বউ নিয়ে এসেছো?
বাদল হাসছে, ফর্সা গাল গুলো লজ্জায় লাল হয়ে আছে।
বাদলকে সরিয়ে ছোট ভীতু বউটাকে হাত দিয়ে টেনে ঘরে ঢুকালো কেকা ।
ড্রয়িং রুমে নিয়ে বসালো। ছোটখাটো ফর্সা মেয়েটা ভয়ে অস্থির হয়ে আছে। কেকা কথা বলার চেষ্টা করে মেয়েটার ভয় কাটানোর চেষ্টা করছে।
কেকা জিজ্ঞেস করলো -তোমার নাম কি?
ফর্সা মেয়েটা মাথা নিচু করে প্রায় অস্পষ্ট স্বরে উত্তর দিলো – টুনি। বেশিক্ষণ লাগলো না নতুন বউয়ের মুখে কথা ফুটতে, আধা ঘন্টা যেতে না যেতেই কেকা বুঝতে পারলো টুনি শুধু নামেই টুনি নয় স্বভাবে অনেকটাই টুনটুনির মতো। ফাঁকা বাসা দেখে সে টুনটুনি পাখির মতো এদিক সেদিক দৌঁড়ে বেড়াতে লাগলো।
বাসায় কেউ নেই বলে কেকা তেমন একটা রান্নার জোগাড় করে নি, বাদল যে হঠাৎ করে এভাবে কাউকে কিছু না জানিয়ে বিদেশ থেকে এসে বউ নিয়ে চলে আসবে এটা কেকার চিন্তার বাইরে ছিলো।
কেকা তাই আবার ভাত বসায়, টুকটাক রান্না করে দুজনকে খেতে দেয়, বাদল ঝটপট খেয়ে দেয়ে চলে গেলেও টুনটুনির এবার গলা শুকায়। এক লোকমা ভাত খেয়ে পানি দিয়ে কোন মতে সেটা পেটে চালান করে। টুনির এই অবস্থা দেখে কেকার হাসি আসে -কী ব্যাপার? খেতে পারছো না?

— ভাবী ভয় করছে।

-কেন টুনি?

-সবাই এলে কী হবে তাই ভেবে।

সত্যিই তো, এবার কেকার কপালেও চিন্তার ছাপ পড়ে, মায়া বেগম আর রফিক সাহেব এক আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে গেছেন, ফিরতে ফিরতে রাত হবে, আটটা নাগাদ ফিরতে পারেন। ঘরে এসে যখন দেখবেন, বাদল কাউকে কিছু না জানিয়ে নিজের পছন্দের বিয়ে করা বউ নিয়ে এসে বাসায় উঠেছে, তখন দুজনকে কী করবে? ভাবতেই ভয় করছে।
তবুও কেকা অভয় দেয় -কিছু হবে না টুনি , দেখি কী করা যায়।
খাওয়া দাওয়া পর্ব শেষ হলে কেকা শিপার বরকে ফোন করে সমস্ত ঘটনা জানিয়ে অনুরোধ করে রাতে যেন তিনি শিপাকে নিয়ে এখানে চলে আসেন। ফোন রেখে রাতের খাবারের আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে কেকা। এক ফাকে সজলকে ফোন করে সব বুঝিয়ে বলে, সজল প্রথমে আপত্তি তুললেও পরে সব কিছু কেকার উপর ছেড়ে দেয়।
সন্ধ্যা আটটার আগেই রফিক সাহেব আর মায়া বেগম ফিরে আসেন। তারা আসার আগেই কেকা টুনিকে তার ঘরে নিয়ে বারান্দায় লুকিয়ে রাখে, চঞ্চল টুনি বারান্দার মধ্যে ঝিম মেরে বসে থাকে। শিপা তার বর মাহফুজকে নিয়ে অল্প কিছুক্ষণের ভিতরে চলে আসে, রফিক সাহেব আর মায়া বেগম মেঝো ছেলে আর মেয়ে,মেয়ে জামাইকে পাশে পেয়ে মহা খুশি। রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ হলে রফিক সাহেব আর মায়া বেগমকে ঘিরে বসে সবাই। তারপর সুযোগ বুঝে কেকা আর মাহফুজ দুজনে মিলে সমস্ত ঘটনা রফিক সাহেবকে খুলে বলে। সব শুনে রফিক সাহেব রেগে অস্থির হন, কিন্তু কেকা জানে রফিক সাহেব কেকা আর মাহফুজের কথা ফেলতে পারবেন না, তাই দুজনে অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে রফিক সাহেবের সম্মতি আদায় করে বাদলের বিয়েটা মেনে নিতে বাধ্য করেন।
মায়া বেগমের সংসারে যুক্ত হয় নতুন এক সদস্য।
ছুটি শেষে বাদল আবার বিদেশে চলে যায়। কিন্তু নিজ স্ত্রীকে শ্বশুর বাড়িতে না রেখে তার মায়ের কাছেই রেখে যায় সে। যাওয়ার আগে কেকাকে বলে যায়- আমার মা কেমন আমি জানি ভাবি,তাই টুনিকে এখানে রেখে যেতে সাহস পেলাম না।
মায়া বেগমের সংসারটা ক্রমশই বোধ হয় আর আগের মতো থাকে না। বদলে যেতে শুরু করে এতদিনের চেনা সংসারের দৃশ্যপট। আপন মানুষ পর হতে থাকে, আর পরই হয় আপন।

চলবে…..

-শামীমা হক ঝর্ণা