বোকা মেয়ের গল্প ( ৯ম পর্ব )


মায়া বেগম চিল্লায় -এই কালকের রুটি বাচছে কেন?রোমানা- বাচলে আমি কী করবো। -এই রুটি অখন তুই খাবি। বলেই মায়া বেগম শুকনো খটখটা রুটি গুলো রোমানার থালায় ছুঁড়ে মারেন। রমজান মাস, সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতারির প্লেট সামনে নিয়ে বসে আছে ঘরের সবাই। তাহমিনার বিয়ে হয়ে গেছে। রোমানা এই ঘরের নতুন গৃহপরিচারিকা। এতদিন তাহমিনার উপর যেভাবে অত্যাচার করেছেন মায়া বেগম ভেবেছেন রোমানার সাথেও সেই একই রকম ব্যবহার করবেন। রমজান মাসটা কেকার খুব ভালো লাগে । নিজ হাতে ইফতারি বানাতে কেকার আনন্দ হয়। ঘরের সবাই যখন অফিস থেকে ফিরে দিন শেষে একসাথে তার হাতের বানানো ইফতার খায় কেকার মনটা তখন তৃপ্তিতে ভরে যায়। সবার জন্য খাবার প্লেটে বেড়ে রেখে ওজু করতে করতেই মায়া বেগমের কথা গুলো কানে পৌঁছলো কেকার । ওজু শেষে ঘোমটা দিয়ে এসে বসতেই মাগরিবের আজান দিলো। শরবতের গ্লাসে চুমুক দিয়ে শেষ করে গ্লাসটা নামিয়ে রেখে কেকা খেয়াল করলো রোমানার দুগাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে আর সে শুকনো খটখটে রুটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে মুখে দিয়ে চিবিচে চিবিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করছে। কেকা নিজে অনেক কিছু সহ্য করেছে সেসব শুধু সংসারকে অশান্তির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য, সজলের মুখের দিকে তাকিয়ে। কিন্তু অন্য কাউকে অসহায় অবস্থায় দেখলে কেকা তা সহ্য করতে পারে না। কেকা এই মুহূর্তে রোমানার রুটি চিবিয়ে খাওয়ার দৃশ্যটা দেখে নিজেকে সামলাতে পারলো না।

জোরে ধমক দিয়ে উঠলো – রাখ, এই মুহূর্তে তুই রুটি ফেলে দে। মায়া বেগম খেঁকিয়ে উঠলেন – রুটি বেশি হইছে, ও খাইবো না তো কী করবো? কেকা এবার কঠিন স্বরে বললো – সারাদিন রোজা রেখে একটা মানুষ এই শুকনো বাসী রুটি কেন খাবে? বলেই রোমানাকে আবার ইশারা করলো – ফেল, রুটি ফেলে তোর ইফতারি খা। রোমানা বাসী রুটি গুলো রেখে যেন স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়লো, আস্তে আস্তে ইফতারির প্লেটটা নিজের দিকে এগিয়ে নিয়ে খেতে শুরু করলো।
মায়া বেগম এখন আর কোন উচ্চবাচ্য করতে পারলেন না, কেকার কথার উপর এখন কথা বলতে গেলে তিনি বুঝে শুনেই বলেন। মায়া বেগমের সংসারে এখন তিন বউ , তিন ভিন্ন ভিন্ন পরিবার থেকে আসা তিন জন মানুষ। বড় বউ কেকা – যার সম্পর্কে একটা কথা এতদিন বলা হয় নি, সজলকে ভালোবেসেই সে এসেছিলো এই সংসারে। কিন্তু শুরু থেকেই তার একটাই চাওয়া ছিলো, পরিবারের সবাইকে নিয়ে পারিবারিক ভাবে সজলকে তাকে বিয়ে করতে হবে এবং সবাইকে নিয়ে মিলেমিশে থাকতে চায় সে। কেকার চাওয়া গুলো কী করে পূর্ণ হলো তাতো এই কয় পর্বে ফুটেই উঠেছে। আপনারা যারা সাথে ছিলেন দেখেছেন। মেজ বউ – যে বাদলের হাত ধরে শুধু বাদলকে ভালোবেসেই এই সংসারে এসেছে, সে কাউকেই পরোয়া করে না। ছোট বউ – মায়া বেগমের নিজের পছন্দ করা একমাত্র ছেলের বউ।

শুরু থেকেই কেকা এত কিছু সহ্য করেছিলো কেন হয়তো তা তো আপনারা এখন বুঝতে পেরেছেন, সজলের ভালোবাসার জন্যই। সজলকে ভালোবেসে এই সংসারে সবাইকে নিয়ে থাকতে চায় বলেই অনেক অন্যায় এতদিন সে সহ্য করে এসেছিলো, কিন্তু ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারছে সংসারে যে সয় তাকেই সব সহ্য করতে হয় । তাই এখন অন্যায় গুলো নিরবে আর সহ্য করে না কেকা, মাঝে মাঝে সরাসরি উত্তর দিয়ে দেয় সে। তিন বউকে সামলাতে এখন বেশ বেগ পেতে হয় মায়া বেগমের। হয়তো টুনি এসেছে, মায়া বেগম ডাক দিলেন – এই টুনি, এই খানে আসো আমার কথা আছে। টুনি তখন মাত্র গোসল করে বের হয়েছে – দূর থেকেই সে তখন চিৎকার করে বলে – মাত্র গোসল করে বের হয়েছি মা, গা শুকিয়ে যাওয়ার আগে গায়ে লোশন দিতে হবে, অপেক্ষা করেন, আসছি হাতের কাজটা শেষ করে তারপর।
কেকা আর ছোট বউ দোলা হাসে, এতদিন হুকুম করতেই দৌঁড়ে যেতো তারা, এভাবে বলার সাহস কখনওই পায়নি। তারা হাসে কিন্তু শেখেও কিছু। একজনের ভুল হলে অন্য জন সেটা আড়াল করে আর এভাবেই এগিয়ে যায় সংসারের আরও কয়েকটা বছর। টুনি সংসারের তোয়াক্কা করে না, ইচ্ছে হলে শশুড়বাড়ি আসে ইচ্ছে না হলে আসে না। মায়া বেগম যদি দু’কথা শোনায় তাহলে সে এবাড়িতে আসাও বন্ধ করে দেয়। এবং সব কথাই বাদলের কাছে সাথে সাথেই ফোন করে জানিয়ে দেয়। শশুড় বাড়ি বেড়াতে এলে সরাসরি ঘরে ঢুকে শশুড় শাশুড়িকে কোন মতে সালাম দিয়ে কেকার ঘরে এসে ঢোকে টুনি। যে দুএক দিন এখানে থাকে রুদ্রর সাথে গল্প করে খেলা করে আর কেকার পিছু পিছু ঘুরেই কাটিয়ে দেয় সে, কেকা রেধে বেড়ে দিলে খায়। তারপর আবার চলে যায় নিজের মায়ের কাছে। কেকা চেষ্টা করে টুনিকে বিপদ আপদ থেকে সব সময় রক্ষা করতে। মূলত টুনির এই বাড়িতে একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়ই হয়ে ওঠে কেকা। ছোট বউয়ের সাথে কেকার বেশি একটা মেলামেশা মায়া বেগম পছন্দ করেন না, রান্না ঘরে বসে কেকা আর ছোটবউ দোলা যখন গল্প করতে করতে খিল খিল করে হেসে ওঠে মায়া বেগমের তখন পিত্তি জ্বলে যায়, মাঝে মাঝে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কান পেতে শোনার চেষ্টাও করেন তাদের কথোপকথন, কিন্তু অনেকটাই বুঝতে না পেরে রাগটা যেন আরও দ্বিগুণ বেড়ে যায়।
শিপা এলে তার কাছে নালিশ জানায় মায়া বেগম – হেরা দুইজন, সারাদিন গুজুর গুজুর করে।
শিপাও এবার ধমক দেয় – আহ মা, ওরা তো কথা বলতেই পারে, আপনার এত মাথা ব্যাথা ক্যান সেসব নিয়ে। দোলা মাঝে মাঝে বলে – ভাবী, মা এত জ্বালায়, আমি যখন আলাদা সংসারে যাবো ওনার এসব নিয়ম কানুন কিছুই মানবো না, আমি আমার মতো চলবো।সংসরটা এখন অন্য রকম, রুদ্রকে স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে। নিজের জন্য একটা চাকরী খুঁজে নিয়েছে কেকা, সারাদিন সেসব নিয়েই ব্যস্ত থাকে। মায়া বেগমের ছোটোখাটো কথা উপেক্ষা করতে এখন শিখে গেছে কেকা। নিজের জগতেই এখন সে ডুবে থাকে।
আগের মতো কেকার পিছনে এখন আর লেগে থাকতে পারেন না মায়া বেগম, রুদ্রর পড়াশোনা, বন্ধুবান্ধব এসবের অজুহাতেই নিজেকে কিছুটা হলেও আলাদা করে রাখে কেকা। এতদিন কেকা স্বপ্নেও ভাবেনি শশুড় শাশুড়ি রেখে বাবার বাড়িতে গিয়ে ঈদ করা যায়, কিন্তু যখন ছোট বউ বাপের বাড়ি ঈদ করতে যায় তখন কেকারও সুযোগ হয় পরের ঈদটা নিজের বাবা মায়ের সাথে করার। ১লা বৈশাখে ঈদে ছোট বউ চলে যায় বাপের বাড়ি, শিপাও আসে বাবা মার সাথে দেখা করতে। সারাদিন ধরে কেকা যখন রান্না বান্না করে শিপা আর তার বরের জন্য অপেক্ষা করে তাদের আপ্যায়ন করে বিষয়টা শিপার বর মাহফুজেরও চোখে লাগে। বেশ দৃঢ়তার সাথেই সে কেকাকে মায়া বেগম আর শিপার সামনেই জানিয়ে দেয় – ভাবি ঘরের কাজটুকু গুছিয়ে দিয়ে আপনি আপনার মতো চলে যাবেন,ছোট বউ, শিপা সবাই যখন সবার বাবা মায়ের সাথে বিশেষ দিনগুলো কাটাতে পারে তখন আপনি কেন বসে থাকবেন? মা আছে, আপনি কাজ গুলো গুছিয়ে দিয়ে চলে যাবেন, বাকীটা তিনিই দেখবেন। মায়া বেগম চুপচাপ দেখেন শোনেন কিন্তু কিছু বলতেও পারেন না আবার সইতেও পারেন না। কেকা মনে মনে শিপার বরের প্রতি কৃতজ্ঞ হয়, সংসারে এমন কিছু মানুষ আছে বলেই সংসারটা বোধ হয় এখনও অসহ্য হয়ে ওঠেনি। সংসারের কঠোর নিয়ম গুলো ক্রমশই শিথিল হতে থাকে, এই শিথিলতা কিন্তু চাইলেই একদিনে অর্জন করা যেতো না, বরং একদিনে স্বাধীনতা অর্জন করতে গেলে হিতে বিপরীতই হতো এবং সেটাই স্বাভাবিক।
আমরা সহজেই সব কিছু পেতে চাই কিন্তু ভুলে যাই সহজে সব কিছু পেতে গেলে সেখানে ভালোর চেয়ে মন্দই বেশি হয়। কেকার ছোট বোনের বিয়ে হয় বেশ ধুমধাম করে, মায়া বেগম, রফিক সাহেব,বাড়ির সবাই। শিপা – শিপার শশুড় বাড়ির সবাই গিয়ে দাওয়াত খেয়ে আসেন। বিয়ের একমাস বাদে কেকা তার ছোট বোনের শশুড় বাড়ির সবাইকে বাসায় দাওয়াত দেয়। সকাল সকাল রোমানাকে নিয়ে রান্না বান্নার কাজ গুলো সেরে নিয়ে অপেক্ষায় থাকে কেকা। ছোট বোনের শশুড় বাড়ির অতিথিরা যখন আসতে শুরু করেন ঠিক সেই মুহূর্তে মায়া বেগম এক আশ্চর্য কান্ড ঘটান, তিনি তার শোবার ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে বসে থাকেন। অনেকক্ষণ দেখার পর সজল দরজায় টোকা দিয়ে মায়া বেগমকে দরজা খুলতে বলে। মায়া বেগম দরজা খোলেন ঠিকই কিন্তু সারাটা দিন থমথমে মুখে হাসি আর দেখা যায় না। অতিথিরা বিদায় নিলে সেই দিন কেকা বিষয়টি নিয়ে আর কথা বলে না। পরের দিন সন্ধ্যায় সজল বাসায় ফিরলে মায়া বেগম আর রফিক সাহেব যখন ড্রয়িংরুমে বসে টিভি দেখছিলেন কেকা তখন সরাসরি বিষয়টি নিয়ে জানতে চায়। এতদিনে ড্রয়িংরুমে কেকার বিচার হয়ে এসেছে, যে বিচারকে কেকা শুরু থেকে ভয় করে এসেছে এখন সেটাই কেকার কাছে নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, কথায় আছে দড়ি বেশি টানলে ছিঁড়ে যায়। অতিরিক্ত শাসন ধীরে ধীরে মানুষের ভয়টাকে কাটিয়ে দিতে বাধ্য করে, চিৎকার চ্যাঁচামেচি বিষয় গুলো কেকা এতদিন অপছন্দ করে আসতো এখন সেসব গা সওয়া হয়ে এসেছে। ভুল হোক না হোক চিৎকার চ্যাঁচামেচি করা যাদের স্বভাব সেখানে আর কতদিন চুপ করে থাকা যায়?
কেকা এখন এসব আর ভয় পায় না। মায়া বেগমের সামনে বসে বেশ ধীর স্থির ভাবেই কেকা জানতে চান – কালকে অতিথিদের সাথে এমন আচরণ কেন করলেন? দরজা বন্ধ করে রাখার কারণ কী? যদিও রফিক সাহেব অতিথিদের সাথে সুন্দর আচরণই করেছেন, কেকা তার উদ্দেশ্য বললো- বাবা, বলুন কাল মা যে আচরণটা করলেন তাতে কী আপনাদের পরিবারের সম্মান বাড়লো না কমলো? এই মেহমানরা কি আপনার বাসায় সব সময় আসবে, তাদের সামনে এরকম আচররণ করায় আমার চেয়ে সজলেরই তো সন্মান নষ্ট হলো বেশি। রফিক সাহেব কেকার সাথে একমত হন – না, তোমার মা কাজটা ঠিক করেনি।সজলও জানতে চাইলো – মা, এমন কাজ তুমি কেন করলে? মায়া বেগম এবার আমতা আমতা করে বললেন- কেন, তুইই তো কইলি, চুপচাপ বইসা থাকতে। সজল বলে – হ্যা মা, আমি বলেছি, আপনাকে কোন কাজ করতে হবে না, চুপচাপ বসে থাকেন। তার মানে এই না যে আপনি দরজা দিয়ে বসে থাকবেন।

মায়া বেগম বুঝলেন তিনি সব দিক দিয়েই আক্রমণের স্বীকার হয়েছেন। এবং শেষ পর্যন্ত নিজের দোষ স্বীকার করতে বাধ্য হলেন। বললেন – কী করমু ক, আমি তো এত কিছু বুঝি নাই। মায়া বেগমরা সত্যিই অনেক কিছু বুঝেও বোঝেন না।

-শামীমা হক ঝর্ণা