মাই এক্স (১১তম পর্ব)

আজ বিকেলে সুমন আসবে। পুরোনো দিন সিম্যুলেট করতে চায়। আগের মত একসাথে রিক্সা করে ঘুরবে। সেদিন ওর বাসা থেকে ফিরে আসবার সময় সুমন প্রস্তাবটা দেয়। তার আগে বেশ অনেক্ষণই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সুমনের আলাপ হয়। এখন কি করছে, কি কি বিষয় আশয় করেছে, সব বলল। পার্টী বিরোধী দলে থাকবার সময় যেহেতু অত্যাচারিত হয়েছিল, তাই প্রাইম মিনিস্টার ওকে স্পেশাল ভাবে ট্রিট করে। ওকে তিঁনি প্রাইম মিনিস্টারের অফিসে নিয়ে নেন।

সুমনের বিভিন্ন গল্প শুনে ততোক্ষণে বুঝে গেছি, এই মানুষটি এখন অসীম ক্ষমতাধর। চাইলে যাকে খুশি, নিমিষেই গায়েব করতে পারে। থানা পুলিশ কারোরই ক্ষমতা নেই টিকির আশে পাশে আসে। সেই সুমন যখন আমকে কাছে পেয়েও কিছু করল না, তখন সত্যিই অবাক হয়েছিলাম। ঘুরতে যাওয়ার অফারেই বরং অবাক হওয়া উচিৎ ছিল। তবে সেটা হইনি। আসলে এতো বাজে কিছু ভেবে গিয়েছিলাম যে এমন রিক্সা করে ঘুরতে যাওয়ার অফার শুনে কেমন রিলিভড ফিল করেছিলাম।
শুধু একটা ব্যাপার বুঝে উঠতে পারছিলাম না। যে সুমনকে চিনতাম, ও তো এমন ইডিয়ট ছিলো না। এভাবে, জোর করে, আর যাই হোক, কোন মেয়ের মন পাওয়া যায় না, একথাটা না বোঝার মত গাধা তো ও না। জেলে কি খুব টর্চার করেছিল ওকে? মানসিক ভারসাম্য কি হারিয়ে ফেলেছে?

সেদিন একটা লাভ হয়েছিল। শাহেদ জীবিত, এই তথ্যটা পেয়ে গিয়েছিলাম। অন্তত সুমনের কথা যদি বিশ্বাস করি… একবার ভেবেছিলাম, প্রমাণ চাইব। পরে মত পাল্টাই। আগে ওকে খানিকটা বুঝে নিই। কি চাইছে, সেটা পরিস্কার হওয়ার আগে, এমন কোন কথা বলা যাবে না, যা শুনে ও বিগড়ে যেতে পারে।
আরও একটা ব্যাপার ভেবে ভাল লেগেছিল, ও রিভেঞ্জ নিতে চাইছে না। কেবল একটা সুযোগ চাইছে। যে অবস্থার কারণে আমাদের বিচ্ছেদ হয়েছিল, সেই অবস্থাটাকে মুছে দিয়ে আরেকবার চেষ্টা করতে চাইছে। মাঝের দেড়টা বছর মন থেকে মুছে ফেলতে বলছে। বাট… এটা কি সম্ভব? প্রেমিককে ভোলা আর স্বামীকে ভোলা কি এক? আর সেটাও এভাবে? মাথায় বন্দুক রেখে?
ঠিক করেছি, আগামী কিছুদিন, ওর কোন কথায় অমত করার ঝুঁকি নেয়া যাবে না। ইডিয়ট হোক আর ম্যানিয়াকই হোক, ওকে সহ্য করা ছাড়া এ মূহুর্তে আর কোন উপায় দেখছি না। কখন যে ও কি করে বসবে, কে জানে? শাহেদের জীবন ঝুঁকির ভেতরে ফেলা যাবে না।
বিছানা ছেড়ে উঠলাম। ব্রেকফাস্ট করতে মন চাইছে না। ডাইনিং টেবিল দেখলেই শাহেদের কথা মনে পড়ছে। ও কি খেয়েছে আজকে? জেলে রেখেছে, না কোন সেফ হাউজে? পিছমোড়া করে বেঁধে রেখেছে? শত চেষ্টা করেও শাহেদকে ভুলতে পারছি না। কারো কাছে কি হেল্প চাইবো? সাহস পাচ্ছি না। ও যেভাবে ওর গোয়েন্দা ছড়িয়ে রেখেছে, আমার ধারণা আমার প্রতিটা পদক্ষেপের ওপর ওর নজর আছে। ফোনও হয়তো ট্যাপ করছে। কে জানে?

হতাশ লাগছে। কি করব বুঝে উঠতে পারছি না। নিজেকে শক্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছি। মনকে বলছি, ‘যতক্ষণ ডেফিনিট কোন খবর না পাচ্ছি, ততোক্ষণ এটা বিশ্বাস করে চলতে হবে শাহেদ বেঁচে আছে। তা নইলে আরও ভেঙ্গে পড়ব। হতাশা পেয়ে বসবে।’ গতকাল থেকে এটাই বিশ্বাস করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আজকে অনুভব করলাম, হচ্ছে না। মন কেবল চাইছে, তথ্যটা ভেরিফাই করতে।

এ ব্যাপারটা নিয়ে যতই ভাবছি, ঘুরে ফিরে একজনের কথাই মাথায় আসছে। শেলি। যদি কেউ হেল্প করতে পারে, শেলিই পারবে। শেলিকে কি জিজ্ঞেস করব? তার আগে জানা দরকার, ওর হাজব্যান্ড সুমনের কেমন বন্ধু? ক্লোজ কেউ? ইউনিভার্সিটিতে কখনও দেখেছি বলে তো মনে হল না। যেভাবেই হোক, সমস্যাটা খুলে বললে, শেলি কি উনাকে দিয়ে সুমনকে একবার অন্তত রিকোয়েস্ট করাতে পারবে না? রিকোয়েস্ট যদি না ও করে, অ্যাটলিস্ট ডেফিনিট খবরটা কি জেনে দেবে না? কিংবা এ ব্যাপারে ওর বরের ধারণা তো জানা যাবে।
ফোন করলাম। শেলিই ধরল। বাসায়ই আছে এখনও। জানতে চাইল
— কি রে? সকাল সকাল?
— হ্যাঁ রে… আসলে একটু সমস্যায় পড়ে ফোন করলাম।
— কি ব্যাপার?
— তোর সাথে একটু দেখা করা যাবে?
— যাবে না কেন? ব্যাংকে আয়। চিনিস তো?
জানালাম চিনি। এগারোটার দিকে যেতে বলল। কথা শেষ করে ঘড়ি দেখলাম, দশটা বাজতে দেরী আছে। এসময়ে আপাতত কিছু করার নেই। কিছু রান্না করতে মন চাইছে না। ফ্রিজে পাউরুটি ছিল, ওটা দিয়েই ব্রেকফাস্ট সারলাম। সময় কাটাতে শাওয়ার নিলাম। আলমিরা থেকে পোশাক নিতে গিয়ে শাহেদের পোশাক গুলোর দিকে নজর পড়ল। মনটা হু হু করে উঠল।
দ্রুত পোশাক পাল্টালাম। ইউজুয়ালি বান্ধবীদের কারো বাসায় গেলে, একটু গর্জিয়াস পোশাক পড়ে যেতাম। নিজের স্ট্যাটাস দেখানোর কোন সুযোগ ছাড়তাম না। আজ তেমন কিছু করা যাবে না। এমন কিছু করা যাবে না, যা দেখে শেলি ভাবতে পারে, শো অফ করতে গেছি। নিজেকে যতটা সম্ভব লো প্রোফাইল রাখতে হবে। সাধারণ একটা শাড়ী পড়লাম। সাজগোজও তেমন করলাম না। গাড়ীও সঙ্গে নিলাম না।
ট্যাক্সি ক্যাব নিতে গিয়েও নিলাম না। কেন যেন সেই ইউনিভার্সিটি লাইফের মত রিক্সা নিলাম। কতদিন পরে উঠলাম? বাবার বাসায় আমার গাড়ী ছিল না, রিক্সা করেই স্টুডেন্ট লাইফ কাটিয়েছি। শাহেদের সাথে বিয়ের পর থেকে গাড়ী আসে জীবনে। এরপর থেকে আর রিক্সায় চড়া হয়নি। শাহেদের সাথে যখন বিয়ে হয়ে, তখনই ও অফিসে থেকে গাড়ী পেয়ে গেছে। যে ক’জন বান্ধবীর তখন বিয়ে হয়েছিল তাদের কারো হাজব্যান্ডের তখন গাড়ী ছিল না। মাস্টার্স তখনও শেষ হয়নি। পরীক্ষার আর তখন মাস ছ’য়েক বাকী। এ বাসা থেকেই বাকীটা সেরেছিলাম। প্রথম কিছুদিন তো সবাইকে দেখানোর জন্য গাড়ী চড়ে ইউনিভার্সিটি গিয়েছিলাম। ব্যাপারটায় শাহেদের অসুবিধা হচ্ছিল। ও ব্যাপারটা অন্যভাবে ম্যানেজ করে। আমার জন্য ও আরেকটা গাড়ী কেনে।
শেলি ব্যাংকেই ছিল। আমাকে দেখে ইশারায় বসতে বলল। কাস্টমারদের জন্য নির্ধারিত স্থানে বসলাম। এদিক ওদিক তাকাচ্ছি। বেশ অনেক কজন মেয়েই কাজ করছে। আমারও একসময় স্বপ্ন ছিল, চাকরী করার। ব্যাংকে না অবশ্য, ইউনিভার্সিটিতে। সুমনের সাথে তখন প্রেম চলছে। অনেকটাই সিওর, ওর রেজাল্টের পরই ও লেকচারার হিসেবে জয়েন করবে। সারাক্ষণ সুমন উৎসাহ দিত, তোমাকেও টপ করতে হবে। একসাথে চাকরী করব। অনার্সের রেজাল্ট ভাল ছিল। মাস্টার্সেও ফার্স্ট ক্লাস পাই। এরপরে তো… পুরোপুরি মিসেস শাহেদ…
— সরি, একটু দেরী হয়ে গেল।
শেলি প্রথম কথাটা আমার দিকে না তাকিয়েই বলেছিল। এবার আমার দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠল। বলল
— একি অবস্থা তোর?
আমিও অবাক হলাম। সকালে তৈরি হওয়ার সময় লক্ষ্য করেছিলাম চেহারা কিছুটা মলিন লাগছে। বাট আঁতকে ওঠার মত মনে হয়নি। স্মিত হেসে বললাম
— কৈ? কিছু না।
শেলি ভ্রু কুচকে কিছুক্ষণ তাকাল। এরপরে বুঝতে পেরেছে এমন ভঙ্গি করে বলল
— সুমন ভাই, রাইট? তোর বর সুমন ভাইকে নিয়ে সন্দেহ করছে, তাই না?
শেলির দিকে তাকালাম। ফ্যাকাশে একটা হাসি দিয়ে বললাম
— শাহেদকে সাদা পোশাকের পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে।
— হোয়াট?
শেলি প্রায় আঁতকে উঠল। আশেপাশের কিছু লোক আমাদের দিকে তাকাল। ব্যাপারটা লক্ষ্য করে শেলি গলার স্বর নামাল। ফিসফিস করে বলল
— কি বলছিস? কেন?
— জানি না।
শেলি অস্থির হয়ে এদিক ওদিক তাকাল। এরপরে জানতে চাইল
— থানায় গিয়েছিলি?
মাথা দুদিকে নেড়ে জানালাম ‘না’। শেলির দিকে তাকালাম। চোখের পানি আটকে রাখতে পারছি না। ও দ্রুত নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বুঝলাম পরিচিত কাউকে ফোন করতে চাইছে। জানতে চাইলাম
— কাকে করছিস?
ফোনের দিকে তাকিয়েই উত্তর দিল
— সুমন ভাইকে। উনার অনেক জানাশোনা। একটা ফোন করে দিলে, এক্ষুনি বাপ বাপ বলে…
ওকে কথা শেষ করতে না দিয়ে ওর হাত চেপে ধরলাম। শেলি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। কি ভাবল জানি না, বলতে শুরু করল
— এমন বিপদের সময়, কে কি ভাবল, তা নিয়ে ভাবলে চলে না।
কান্নার দমকে গলা থেকে কথা বেরোচ্ছে না। মাথা দুদিকে নেড়ে শুধু বোঝালাম ব্যাপারটা চাইছি না। শেলি তখনও বুঝে উঠতে পারছে না কেন আমি বাঁধা দিচ্ছি। ও অন্য হাত দিয়ে আমার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করছি কিছু বলার। অনেক কষ্টে কেবল বলতে পারলাম
— সুমনই করিয়েছে।
কথাটা খুব জোরে বলতে পারিনি। তারপরও শেলির মুখ দেখে মনে হল ও শুনতে পেয়েছে। অবাক হলেও, ‘হোয়াট’ বলে আঁতকে উঠল না। স্তব্ধ হয়ে গেল। এরপরে ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে নিল। এরপরে বলল
— তুই সিওর?
আমি কিছুটা সামলে নিয়েছি। শেলির ব্যবহারে মনে হল, যেন ও এমন কিছু আন্দাজ করেছিল। শেলির দিকে তাকিয়ে অনুনয় করে বললাম
— একটু হেল্প করতে পারবি?
— কি?
— একটু জেনে দিতে পারবি, শাহেদ বেঁচে আছে কি না?
শেলি আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকাল। কি যেন ভাবল। এরপরে বলল
— মনে হয় না।
মনে হল, এক ঝটকায় আমার মুখ থেকে সব রক্ত সরে গেল। প্রায় চিৎকার করে বললাম
— কি বলছিস?
শেলি আমার দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকাল। এরপরে বলল
— তুই কি জানিস, তোর বিয়ের আগে শাহেদ ভাই সুমনের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। জেলে।
— কি?… শাহেদ?… জেলে?
সম্মতি জানাল শেলি। এরপরে বলল
— তোর সম্পর্কে খোঁজ খবর করতে গিয়ে সুমনের ব্যাপারটা জানতে পারেন শাহেদ ভাই।
— সেটা জানি। আমার সম্পর্কে যে খোঁজ খবর করেছিল, সেটা শাহেদ আমাকে বলেছে।
— শুধু খোঁজ খবর না। রীতিমত সুমন ভাইয়ের কাছে ডিটেলস জানতে চায় তোদের সম্পর্ক নিয়ে।
অবাক হয়ে শেলির দিকে তাকিয়ে থাকলাম। চোখে একরাশ অবিশ্বাস নিয়ে বললাম
— তুই কিভাবে জানলি?
— ও বলেছে। ওরা একই পার্টি করে। সেসময় দুজন একসাথেই জেলে ছিল। তখন থেকেই ওদের ফ্রেন্ডশীপ।
— কি বলছিস তুই?
শেলি ইশারায় বোঝাল, যা বলছে সত্যি। এরপরে বলল
— ভেতরে ভেতরে তখন সরকারের সাথে নেগোসিয়েশান চলছিল।
— তারপর?
— তারপরে সিদ্ধান্ত হয়, ওকে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলবে।
ভয়ে ভয়ে ঢোক গিললাম। কোন রকমে শুধু বলতে পারলাম
— কি বলছিস এসব?
— সেজন্যই তোকে বারণ করেছিল, তুই যেন আর না যাস ওখানে। নাহলে তুই ও ঝামেলায় পড়তিস।
আমি অবাক হয়ে তখনও শেলির দিকে তাকিয়ে আছি। ও বলে চলল
— তারপর অবশ্য ঘটনাটা ঘটেনি। সেনাবাহিনী ক্ষমতা হাতে নেয় দেখে… নেহাত কপাল ভাল ছিল সুমন ভাইয়ের।
এবার শেলি ভয়ানক কথাটা বলল। শুনে মনে হল, সব আশা শেষ। শাহেদকে সুমন কখনই ক্ষমা করবে না। শেলি বলল
— সেদিন শাহেদ ভাইকে সব কথা খুলে বলে সুমন ভাই। রিকোয়েস্ট করেছিল, বিয়েটা সম্ভব হলে যেন কিছুদিন পিছিয়ে দেয়। বলে যদি মেরে ফেলে, তাহলে তো আর কোন বাঁধা থাকছে না। আর যদি ছেড়ে দেয় তাহলে যেন…। রিকোয়েস্টটা রাখেনি শাহেদ ভাই। শুধু তা ই না, ফিরে এসে শাহেদ ভাই আরও দ্রুত বিয়েটা সেরে ফেলে।

চলবে….

-রাজিয়া সুলতানা জেনি