মাই এক্স (৩য় পর্ব)

শাহেদ বেরিয়ে গেছে। এবার অনেকটা নিশ্চিন্ত। অন্ততঃ আমাকে কেউ স্টেয়ার করছে না। মুখের ভাব ভঙ্গি নরমাল রাখবার কোন প্রেসার নেই। প্রথমবারের মত পুর ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে বসার সুযোগ পেলাম। গতকাল রাতে ম্যাসেজটা দেখবার পরে এক মুহুর্তের জন্য মনে হয়েছিল, আমার সুখের জীবনটা বোধহয় শেষ। কিছুক্ষণ হতভম্বের মত মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। এরপরে একসময় আবিষ্কার করলাম, কেমন স্বাভাবিক হয়ে আসছি।

মোবাইলটা বালিশের নীচে রেখে দিলাম। ভয়েরও বোধহয় একটা লিমিট আছে। তাই ম্যাসেজটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকবার পরে দেখলাম, ঘাবড়ানোর পরিমাণ কমে আসছে। ফিল করলাম, কেমন একটা ডেসপারেট ভাব গজাচ্ছে। যা হবার হবে, দেখা যাবে। পাশ ফিরে শুলাম।
কি করব, এখনও সিদ্ধান্ত নিই নি। বড়জোর কি করবে? আমাদের প্রেম কাহিনী শাহেদকে জানিয়ে দেবে। এই তো? দিক। শাহেদকে আগে বলিনি আমাদের ব্যাপারটা। এবার বলব। অমন প্রেম প্রত্যেক মেয়ের জীবনে একটা থাকেই। আজকালকার হাজব্যান্ডরা ব্যাপারটা জেনেই বিয়ে করে। এই শাহেদই তো বিয়ের আগে যখন একা কথা বলার সুযোগ পেয়েছিল, তখন জানতে চেয়েছিল। তখন অবশ্য সুমনের কথা বলিনি। এখন কিভাবে বলব, সেটা একটা সমস্যা।
সমস্যা সেখানে না। সুমনকে দেখে মনে হল, ও কিছু একটা চাইছে। প্রতিশোধ? মনে হচ্ছে। কিভাবে নেবে? আমার সংসারে আগুন লাগিয়ে? অসম্ভব না। কফি হাউজে কেন ডেকেছে? সাধারণ আলাপ? না স্পেসিফিক কিছু বলবে? পোষাক আর চেহারা দেখে মনে হল, বেশ ভাল অবস্থায় আছে। আচ্ছা, শেলিকে ফোন করলে হয় না?
মোবাইলটা সামনেই ছিল। হাতে নিয়ে একটু ভাবলাম। ওর অফিস টাইম, ডিস্টার্ব হবে? হলে হবে। আমার সমস্যাটা বেশি বড়। শেলিকে ফোন করলাম। বেশ কয়েকবার রিং হল। ধরল না। ঘড়ির দিকে তাকালাম। দশটা বাজেনি। তার মানে রাস্তায় আছে। কিসে যায় ও অফিসে? সিএনজি হলে অনেক সময় রিং টোনের আওয়াজ শোনা যায় না। ঠিক করলাম কিছুক্ষণ পরে আবার ফোন করব।
বুয়া আসার সময় হয়ে গেছে। ডাইনিং টেবিল গুটিয়ে নিলাম। সকালের ব্রেকফার্স্টটা দুজনে একসাথেই করি। যদিও খেতে ইচ্ছে করছিল না, তারপরও চুপচাপ খেলাম। শাহেদ বার দুয়েক আড়চোখে তাকিয়েছিল। হয়তো বোঝার চেষ্টা করছিল, আমি ঠিক আছি কি না। এবার সুন্দর অভিনয় করলাম। হাসি মুখেই ওর সাথে কথা বললাম। অফিস সম্পর্কে দুএকটা কথা জানতেও চাইলাম। অভিনয় কতটা কাজে দিল জানি না, তবে শাহেদ আর তেমন প্রশ্ন করল না।
বেল বাজল। বুয়া এসেছে মনে হয়। এগিয়ে গিয়ে দরজা খুললাম। না বুয়া না। ফ্ল্যাটের কেয়ারটেকার। একটা চিঠি। কুরিয়ারে এসেছে। কুরিয়ারগুলো নিচের অফিসে রিসিভ করে। এরপরে লেটার বক্সে রেখে দেয়। ফ্ল্যাট ওনাররা আসবার সময় নিচের লেটার বক্স থেকে নিজের চিঠি ফিটি কিছু থাকলে নিয়ে আসে। ইউজুয়ালি এভাবে চিঠি ফ্ল্যাটে দিয়ে যায় না।
অবাক হলেও হাত বাড়িয়ে কুরিয়ারটা নিলাম। এমন সময় কেয়ারটেকার নিজে থেকেই বলল
— এটা নাকি আর্জেন্ট, তাই দিতে আসলাম।
— ঠিক আছে।
কথা আর বাড়ালাম না। আমার কুরিয়ার আসবার কথা না। হলে শাহেদেরই হবে। তাই প্যাকেটটা নিয়ে বেডরুমে আসলাম। বেডসাইড টেবিলে রাখতে গিয়ে নজরে পড়ল প্রাপকের নামটা। সানজিদা ইসলাম। আমার ভাল নাম। ভ্রু কুচকে গেল। আমার কুরিয়ার? কে পাঠাবে? একটা সম্ভাবনা মাথায় আসল। এক মুহুর্তের জন্য ভয়টা আবার ফিরে আসল। বুঝতে পারলাম, সুমনের ভয় পুরোপুরি যায়নি।
কাঁপা কাঁপা হাতে কুরিয়ারের প্যাকেটটা খুলতে যাব, এমন সময় মোবাইলটা বেজে উঠল। শেলি করেছে। ফোনটা রিসিভ করলাম।
— কি রে? ফোন দিয়েছিলি?
— হ্যা
— সরি, রাস্তায় ছিলাম, টের পাইনি।
দ্রুত ভাবছি। কিভাবে কথাটা বলব। সুমনের ম্যাসেজের ব্যাপারটা বলব? না কেবল সুমন সম্পর্কে জানতে চাইব?
এমন সময় আবার শেলির গলা
— কিছু কাজ ছিল?
— নাহ এমনি। আচ্ছা শোন… তুই কি বিজি?
— এখনও না, একটু পরে হব। কিছু বলবি?
— না, মানে, আসলে তোর বরের সাথে সুমনের কিভাবে পরিচয়?
— পুরনো প্রেম জেগে উঠেছে?
স্পষ্ট বুঝতে পারছি, শেলি মজা পাচ্ছে। কথা বলার মুড নষ্ট হয়ে গেল। ওর কাছ থেকে আর কিছু জানতে চাইলে, ফাজলামি করবে।
— আচ্ছা রাখি। তুই কাজ কর।
গলার আওয়াজ নিজের কন্ট্রোলে রাখতে পারলাম না। রাগ স্পষ্ট বোঝা গেল। ব্যাপারটা শেলিও বুঝতে পারল। সাথে সাথেই উত্তর দিল
— আচ্ছা সরি। বল, কি বলবি।
— কিছু না। রাখি।
— সুমন ভাই কিন্তু এখন বেশ পাওয়ারফুল। প্রাইম মিনিষ্টারের অফিসে আছে।
— আচ্ছা রাখি।
উত্তরের জন্য আর অপেক্ষা না করে রেখে দিলাম। শেলির শেষ কথাটা এখনও কানে বাজছে। প্রাইম মিনিস্টারের অফিসে কাজ করে। সুমন পলিটিকস করত। ওর পার্টিই এখন ক্ষমতায়। সো, এধরনের পলিটিক্যাল পোষ্ট পাওয়া অসম্ভব কিছু না।
কুরিয়ারের প্যাকেটটার দিকে নজর পড়ল। মন বলছে, ভয়ানক কিছু আছে ওতে। একটা কথা ভেবে নিশ্চিন্ত লাগছে, প্যাকেটটা শাহেদের হাতে পড়েনি। ও অবশ্য খুলত না, তবে জানতে চাইত, কে পাঠিয়েছে। সেখানেই সমস্যা হত। পারত পক্ষে ওকে মিথ্যে বলি না।
প্যাকেটটা খুললাম। একটা মোবাইল। আর একটা চিঠি। ভয়ে ভয়ে চিঠিটা খুললাম। তেমন কিছু লেখা নেই। একটাই কথা লেখা ‘মোবাইলটাতে নতুন সিম আছে। ফোনটা কাছে রেখ’
মোবাইলটা হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখলাম। মাঝারি দামের একটা অ্যন্ড্রয়েড সেট। কি চাইছে সুমন? কেবল মাঝে মাঝে কথা বলবে? ক্ষতি কি? বললাম না হয় কিছুক্ষণ কথা। কেমন একটা রিলিভ ভাব ফিল করলাম। শুধু শুধু এতো ভয় পাচ্ছিলাম। নিজের মনেই হাসলাম।
মোবাইলটা পেয়ে অবশ্য অন্য একটা সুবিধা হল। ম্যাসেজটা পেয়ে যে ভয়টা পেয়েছিলাম, যখন তখন আমার মোবাইলে ফোন করতে পারে, সেটা কেটে গেল। তেমন হলে আমিই নাহয় মাঝে মাঝে ফোন করব। বেশ ফুরফুরে মেজাজে মোবাইলটা অন করলাম। অন হল। চার্জ করেই পাঠিয়েছে তার মানে।
ফোনের লোগো ঘুরছে। ঘুরুক। কুরিয়ারের কাগজগুলোর একটা গতি করা দরকার। পুড়িয়ে ফেলব? থাক বুয়াকে দিয়ে দিলেই হবে, ও নিয়ে গিয়ে পুড়াবে। সব গুছিয়ে রান্নাঘরের এক কোনে রাখলাম। এমন সময় বেল বাজল। এবার নিশ্চিত বুয়া। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে দরজা খুললাম।
বুয়াকে দ্রুত কাজ বুঝিয়ে দিলাম। প্যাকেটটা নিয়ে যেতে বললাম। বুয়ার খুব একটা ইচ্ছে দেখলাম না। এখান থেকে অন্য বাসায় যাবে, এসব নিয়ে ঘোরার ইচ্ছে নেই। কথা বাড়ালাম না। অন্য ব্যাবস্থা করতে হবে।
রান্নাটা আমিই করি। আজকে ভাল কিছু রান্না করব ঠিক করলাম। ফ্রিজ থেকে চিকেন আর চিংড়ি বের করলাম। মশলা ডিপে ছিল, ওগুলো বের করলাম। ছাড়ুক তারপর রান্না করব। বুয়াকে বললাম, থালা বাসন ধোয়া হয়ে গেলে, পেঁয়াজটা কাটতে। বুয়া কাপড় কাচে কমন বাথরুমটায়। বেডরুমের বাথরুমে গিয়ে গতদিনের কাপড়গুলো বের করে কমন বাথরুমের দিকে যাচ্ছি এমন সময় নতুন মোবাইলটায় ম্যাসেজ আসল।
স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। লক স্ক্রিনের ছবিটা দেখে বুকটা ধক করে উঠল। আমার আর সুমনের অন্তরঙ্গ একটা ছবি। ফোন পাঠানোর আসল উদ্দেশ্যটা আর বুঝতে বাকী থাকল না। ব্যাপারটা যতটা সহজ ভেবেছিলাম, ততটা সহজ হচ্ছে না। শুধু ফোনে গল্প করার জন্য এটা পাঠায়নি। সর্ট অফ থ্রেট হিসেবে এটা পাঠানো হয়েছে। ছবিটা কি ব্ল্যাকমেইলিংয়ের জন্য ইউজ করবে? স্পস্ট বুঝতে পারছি, ভয়ানক বিপদ এগিয়ে আসছে। পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যেতে শুরু করেছে।
হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। বুয়ার আওয়াজে সম্বিত ফিরল।
— আপা আজকে কাপড় নাই?
ফোনটা লক করে স্ক্রিনটা ব্ল্যাঙ্ক করে দিলাম। এরপরে উঠে দাঁড়ালাম। কাপড়গুলো বুয়াকে দিয়ে দ্রুত ফিরে এলাম। আমার ধারণা ও জিনিসটা কুরিয়ারে ও পাঠায়নি। কোন কুরিয়ারের সিল লাগিয়ে নিজের পরিচিত কাউকে দিয়ে এখানে পাঠিয়েছে। কেয়ারটেকারকে কনভিন্স করেছে, এক্ষুনি যেন আমার হাতে দিয়ে আসে। অন্য কারো হাতে যেন না পড়ে তাই, গল্প ফেঁদেছে, এটা আর্জেন্ট। এর মানে হচ্ছে, আমার মোবাইল নম্বর, আমার বাসার ঠিকানা সবই ওর জানা।
ম্যাসেজটা ফোন কোম্পানীর হতে পারে। আবার অন্য কারোরও হতে পারে। অন্য কারো বলতে তো শুধু সুমনেরই হতে পারে। এই নম্বর তো ও ছাড়া আর কেউ জানে না। ম্যাসেজটা কি এখনই দেখব?
মন বলছে, ম্যাসেজটা সুমনের। কফি হাউজে যাওয়ার তাগাদা হবে। কি করব ভাবতে ভাবতে মোবাইলটা হাতে তুলে নিলাম। স্ক্রিন ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গিয়েছিল, অন করলাম। চৌকোণা একটা বক্সে ম্যাসেজটা ভেসে আছে। ছোট্ট একলাইনের একটা ম্যাসেজ
‘মেমোরি কার্ডটা চেক কর।’

চলবে…

রাজিয়া সুলতানা জেনী