মাই এক্স (৮ম এবং ৯ম পর্ব)

৮ম পর্ব:

ঘটনা এতো দ্রুত ঘটতে শুরু করবে, ভাবিনি। চাকরী নাই দেখে আজ সকালে একটু দেরী করেই ওঠা হয়েছে। ব্রেকফাস্ট সেরে শাহেদ ব্যালকনিতে নিউজপেপার নিয়ে বসেছে। আমি বুয়াকে কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছি। সব সেরে আমিও ব্যালকনিতে গিয়ে বসব। শাহেদের সাথে সবকিছু শেয়ার করা দরকার। গতকাল করিনি। আসলে এতোটাই ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, যে ভালোমত কথাই বলতে পারছিলাম না। শাহেদ যখন আমাকে পানি এনে দিল, সেটা ঢকঢক করে খেয়ে ফেললাম। এরপরে শাহেদের দিকে শূণ্য চোখে তাকিয়ে থাকলাম। ব্যাপারটা লক্ষ্য করে শাহেদই বলল,
— ঘরে চল।
আমিও ব্যাপারটায় সায় দিলাম। এরপরে আমাকে সাথে নিয়ে শাহেদ উঠে দাঁড়াল। ঘাড়ে হাত রেখে আমাকে সহ বেডরুমের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে আমাকে বিছানায় বসাল। এরপরে স্টাডি টেবিলের চেয়ারটায় নিজে বসল। আমার হাতে হাত রেখে শুধু বলল,
— পরিস্থিতি যত খারাপই হোক, উই উইল ফাইট। ওকে?
ভয় ভয় চোখে শাহেদের দিকে তাকালাম। ও এক্সপেক্ট করে আছে, আমি সম্মতি সূচক মাথা নাড়বো। নাড়তে চেষ্টা করলামও। পারলাম না। কেবল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলাম। শাহেদ বুঝতে পারল, আমি প্রচন্ড ভয় পেয়েছি। সাথে এটাও হয়তো বুঝল, এমন কিছু ঘটেছে, যার জন্য আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। আর কথা বাড়াল না। শুধু বলল
— আজ থাক। কাল সব শুনব।
আমি নিজেও শান্ত হতে চাইছিলাম। আমাকে অনেক কিছু হিসেব করতে হবে। পুরো কথা বললে, শাহেদ কি সিদ্ধান্ত নেবে আমি জানি। ও যখন দেখবে, বিপদ আমার না, ওর, তখন শাহেদ এক মুহুর্ত না ভেবে ঝুঁকিটা নেবে। সোজা বলবে
— এরপরে সুমনের সাথে কোন কথা বলার দরকার নেই। যা হওয়ার হবে।
তাই চাইছিলাম একটু ভেবে চিন্তে কথাগুলো বলব। বেশি জরুরী সুমনের সাইকোপ্যাথ চেহারাটা শাহেদকে বোঝান। সুমন যে ভয়ানক ছক কেটেছে, সেটা ওকে বোঝাতে না পারলে, শাহেদ বুঝবে না সুমনের জালে আমরা কতটা আটকে গেছি।
এই প্রতিশোধের নেশায় সুমন কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পার, সে ব্যাপারটা শাহেদকে আগে বোঝানো দরকার। খুব ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সমস্যা আরও একটা আছে। সুমনের কথাগুলো যতটা সম্ভব ভদ্র ভাষায় আমাকে বলতে হবে, নইলে শাহেদ মাথা গরম করে ফেলবে।
রাতে ঘুম আসছিল না দেখে ঘুমের ঔষধ খেয়েছিলাম। বেশ ঝরঝরে একটা ঘুম হয়েছে। সম্ভবত টেনশান রিলিভের প্রপার্টিও ছিল ঔষধটায়। ফিল করলাম, সকালে ততোটা টেনশান লাগছে না। সেই একই ঘটনার কথা ভাবছি, কিন্তু গতকালকের মত ভয় পাচ্ছি না। ঔষদের ইফেক্ট, না সময়ের, জানিনা।
গতকাল যখন কফি হাউজে গিয়েছিলাম, সুমনের হাসি হাসি মুখ দেখেছিলাম, এক মুহুর্তের জন্য মনে হয়েছিল, কোথাও কোন ভুল হচ্ছে। হয়তো সুমন এসবের সাথে জড়িত না। এরপরে যখন সেই পুরনো দিনের মত স্বাভাবিক সুরে কথা বলতে শুরু করেছিল, তখন ভেবেছিলাম, যদি অভিমান করেও থাকে, ওকে বোঝাতে পারব।
এরপরে যখন কথাটা বলল, আমার তখনও বিশ্বাস হচ্ছিল না সুমন কথাগুলো বলছে। যখন জানতে চাইল, ‘স্বামীর প্রাণ বাঁচাতে কি কি করতে রাজী আছো?’ এক মুহুর্তের জন্য মনে হল, আমি বোধহয় ভুল শুনছি। অবাক হয়ে খানিক্ষণ সুমনের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। এরপরে রিফ্লেক্স অ্যাকশানেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল
— মানে?
স্মিত হেসে সুমন উত্তর দিলেও ওর চোখে প্রতিহিংসা জ্বলজ্বল করছিল। ঠান্ডা গলায় বলল
— মানে এই মুহুর্তে আমি যতটা পাওয়ার হোল্ড করি, তোমার স্বামীকে কোন আর্মস বা ড্রাগস কেসে ফাঁসিয়ে ক্রসফায়ারে দেয়া আমার জন্য কোন ব্যাপার না।
মেরুদন্ড বরাবর ঠান্ডা একটা স্রোতের অনুভূতি টের পেলাম। বুঝতে বাকী থাকল না, সুমনকে আমি কিছুই চিনতে পারিনি। এই সুমন আর আগের সুমন নেই। তখন সুমনের ভেতরে ছিল শুধু ষড়যন্ত্র করার মেধা, আর এখন তার সাথে যোগ হয়েছে ক্ষমতা। প্রতিশোধ নেয়ার স্টাইল একই আছে, শুধু বীভৎসতা বেড়েছে।
আমি ভেবেছিলাম, আমার সংসারে ভাঙ্গন কিংবা আমাকে শাহেদের চোখে ছোট করা ওর উদ্দেশ্য। আর তাই আমি অনেকটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলাম, সুমন আমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আমার অতীত সম্পর্কে শাহেদের মন বুঝতে তাই অনেকটাই সাহসী হয়ে উঠেছিলাম।
ওর শেষ কথাগুলো শুনে বুঝতে বাকী থাকলা না, ওর প্ল্যান তা না। ওর প্ল্যান, শাহেদকে জিম্মি করে আমার কাছ থেকে অন্য কিছু আদায় করা। সুমনের যে ছবি মনে ছিল, তাতে এমন প্ল্যান ও করবে, কল্পনাতেও আসেনি। তাই কথাটা যখন বলল তখন কিছুক্ষণের জন্য স্থির দৃষ্টিতে সুমনের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। ধীরে ধীরে বললাম
— আর সেটা যেন তুমি না কর, তার জন্য আমাকে কি করতে হবে?
কথাগুলো ঠান্ডা স্বরে বললেও ফিল করলাম, আমার আত্মবিশ্বাস নড়ে যাচ্ছে। কতক্ষণ নিজেকে শক্ত রাখতে পারব জানি না। আপ্রাণ চেষ্টা করছি, চোখের পলক না ফেলে সোজাসুজি সুমনের দিকে তাকিয়ে থাকতে। সুমনো কিছুক্ষণ আমাকে দেখল। এরপরে বেশ শান্তভাবেই বলল
— সেটাই তো জানতে চাইলাম, হোয়াট ইজ ইয়োর অফার?
ঠোঁটের কোণে বাংলা সিনেমার ভিলেনের মত একটা হাসি। মনে হল সুমনের গালে কষে একটা চড় মেরে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে যাই। পারলাম না। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, হি ইজ সিরিয়াস। শাহেদকে ফাঁসিয়ে দিতে ও এক মুহুর্ত হেজিটেট করবে না। যদিও মনে মনে সন্দেহ করে ফেলেছি, ও কি চাইছে, তারপরও ব্যাপারটা ক্লিয়ারলি জানতে চাইলাম। বললাম
— তোমার চাওয়াটা বুঝতে পারলে, আমার জন্য সুবিধা হত।
সুমন এতোক্ষণ আমার দিকেই তাকিয়ে ছিলো। আমার উত্তরটা শুনে কিছুক্ষণ ভাবল। এরপরে কফিতে শেষ চুমুকটা দিয়ে কফির মগটা পাশে রেখে দিল, এরপরে সরাসরি আমার দিকে তাকাল। এবার অবশ্য সেই ক্রুর হাসি নেই। বেশ সাবলীলভাবেই বলল
— টাকা পয়সা যে চাই না, তা তো বুঝতেই পারছ।
দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কথাবার্তা আর আগাবো? স্পষ্ট বুঝতে পারছি, কথা কোন দিকে নিতে চাইছে। নোংরা কথাটা আমার মুখ দিয়ে বলাতে চাইছে সুমন। মনে হচ্ছে আমি আর শক্ত থাকতে পারব না। নিজেকে যতটা সাহসী ভেবেছিলাম, আমি যে ততটা না, বুঝে গেলাম। স্থির করে ফেললাম, এনাফ ফর টুডে। এ নিয়ে আর কথা বলব না। সুমনের দিকে সরাসরি তাকিয়ে, ওর চোখে চোখ রেখেই বললাম
— থ্যাঙ্কস ফর দ্যা ট্রিট। আই ওয়ান্ট টু গো।
সুমন কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। হয়তো আমাকে বোঝার চেষ্টা করল। ওর অনুচ্চারিত প্রস্তাবে আমি ‘না’ বলছি, না ‘ভেবে দেখব’ বলছি। কি বুঝল, জানি না, তবে স্মিত একটা হাসি দিল। এরপরে বলল
— সিওর?
এক মুহুর্ত দেরী না করে আমি উঠে দাঁড়ালাম। ‘সিওর’ বলার রুচিও আর তখন অবশিষ্ট নেই। আমি দরজার দিকে মুখ করে বসেছিলাম। সুমনের সামনে দিকেই ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। সুমনও বোধহয় প্রস্তুত ছিল। দেখলাম এক ঝটকায় সে ও উঠে দাঁড়িয়েছে। এগোতে গিয়ে বুঝলাম দরজা পর্যন্ত সুমনও পাশে পাশে আসবে। গা ঘিনঘিন করছে, একবার ভাবলাম, মুখের ওপরই বলি, ‘লাগবে না, আমি একাই যেতে পারব।’ বললাম না। ওকে রাগিয়ে দেয়ার ঝুঁকি নিতে পারছি না। এই সাইকোপ্যাথ যে কোন কিছু করতে পারে।
দরজার কাছে পৌঁছে সুমন দরজাটা খুলে ধরল। ‘থ্যাঙ্কস’ দেয়া উচিৎ, অন্য পরিস্থিতি হলে হয়তো দিতামও, কিন্তু এখন কথা বলতেই ঘেন্না লাগছে। চুপ থাকলাম। বাইরে বেরিয়ে এদিক ওদিক তাকালাম। এখানে গাড়ী পার্ক করার জায়গা নেই। ড্রাইভার হয়তো আশে পাশে কোন গলিতে গাড়ীটা রেখেছে। ড্রাইভারকে ফোনটা করে বের হওয়া উচিৎ ছিল। বাট পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে…
— হ্যা, কফি হাউজের সামনে এসো।
সুমনের আওয়াজ। ফোন করে কথাগুলো বলছে। বুঝতে বাকী থাকল না, ও ওর নিজের ড্রাইভারকে ডেকেছে, আমাকে ড্রপ করার জন্য। এবার নিজের ওপর কন্ট্রোল হারালাম। বললাম
— আমি কিভাবে যাবো, সে ব্যাপারে নাক না গলালেই খুশি হব।
আমার দিকে তাকাল সুমন। আমার চোখ দিয়ে তখন আগুন বেরোচ্ছে। না বোঝার কথা না। দেখলাম মাথা ওপর নীচে করে ব্যাপারটায় সায় দিল। এরপরে ছোট্ট করে বলল
— আই নো। তোমার ড্রাইভারকেই ফোন করছিলাম।
এবার রীতিমত চমকে উঠলাম। তারমানে সুমন আমাদেরকে রীতিমত ঘিরে ফেলেছে।কোথায় যাই, কি করি, সব ওর নখদর্পনে? ড্রাইভার থেকে শুরু করে ফ্ল্যাটের কেয়ারটেকার, সবার সাথেই… মাই গড। অনুভব করলাম, পরিস্থিতি যতটা ভয়ানক ভেবেছিলাম, পরিস্থিতি আসলে তারচেয়ে অনেক অনেক বেশি ভয়ঙ্কর।

দ্রুত নিজেকে সংযত করলাম। ঠান্ডা মাথায় ব্যাপারটা ডিল করতে হবে। রাগের মাথায় বলা একটা কথা ওর প্রতিশোধ স্পৃহা অনেক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে না করতে চাইলে, চুপ থাকাটাই বেটার হবে।
বাসায় ফিরেই শাহেদের সাথে দেশ ছাড়ার প্ল্যান শুরু করতে হবে। পরিচিত যারা এ ব্যাপারে হেল্প করতে পারে, দ্রুত তাদের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। সবকিছু তৈরী করতে যে কয়দিন লাগে, সেই ক’দিন যেভাবে হোক ওকে ভুলিয়ে রাখতে হবে।
নিমিষেই গাড়ীটা চলে এল। সম্ভবতঃ একেবারে পাশেরই কোন এক গলিতে ছিল। ফুটপাথে দাঁড়িয়ে ছিলাম। পাশ ঘেঁষেই থামাল। আমি গাড়ীর দরজা খুলতে যাওয়ার সুযোগ পেলাম না। তার আগেই সুমন দরজা খুলে দিল। এবার ‘থাঙ্কস’ দিলাম। সুমনের দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসিও দিলাম। এরপরে গাড়ীতে চড়ে বসলাম।
দরজা লাগাবার আগে শুধু একটা কথা বলল সুমন
— ফ্ল্যাটের ঠিকানা আর সময় আমি ম্যাসেজ করে দেব।

৯ম পর্ব :

ফ্ল্যাটটা ধানমন্ডিতে। রোড নম্বর, বাড়ীর নম্বর, ফ্ল্যাট নম্বর সবই দেয়া ছিলো। নিচে সিকিউরিটিকেও সম্ভবত বলা ছিল। ‘কার কাছে এসেছি’ টাইপ কোন প্রশ্ন করা হল না। সোজা ঢুকে গেলাম। কিছুটা গিয়ে হাতের বামে লিফট। টপ ফ্লোর। লিফট উঠছে। ঝোঁকের মাথায় চলে তো এসেছি, এখন কেমন ভয় ভয় করছে। লিফট যখন চলতে শুরু করল, ফিল করলাম, বুকের আওয়াজটা বাড়ছে। কি করব, কি বলব, কিছুই ভেবে আসিনি।
সুমনের সাথে কফি হাউজে দেখা করেছিলাম গতকাল। আর তার চব্বিশ ঘন্টা না পেরোতেই, আজ সকালে ঘটনাটা ঘটে। ভেবে রেখেছিলাম, ব্রেকফাস্ট সেরে ধীরে সুস্থে কথাগুলো শাহেদকে বলব। শাহেদ যখন ব্যালকনিতে ছিল, আমি তখন এক অর্থে ফ্রি। বুয়া এখন ঘন্টা খানেক থাকবে। কাপড় কাচা, বাসন মাজা, ঘর মোছা, সব সারতে সারতে ওর এগারোটা বাজে। কেন যেন বুয়া বাসায় থাকতে কথাগুলো বলতে মন সায় দিল না। প্রাইভেসী সমস্যা না, সমস্যা শাহেদের রিয়াকশান। যদি চিৎকার করে ওঠে?
বুয়া এখনও বাকী কাজে হাত দেয়নি। কেবল ঘর মোছা শুরু করেছে। বেডরুম গুলো সেরে ফেলেছে, এখন লিভিং রুম করছে। এটা হলে, থালা বাসন ধোবে। কেমন যেন অস্থির লাগছে। মন বলছে, হাতে সময় কম। যা করার দ্রুত করতে হবে।
সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। বুয়াকে বললাম
— আজ আর কাজ করতে হবে না, তুমি যাও।
বুয়া বেশ অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। জানতে চাইল,
— বাইরে যাবেন আপা? পরে আসব?
— না। এমনিই।
বুয়া কেমন একটু দুষ্টামির হাসি দিল। এ নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় এখন নেই। লিভিং রুমে দাঁড়িয়ে থাকলাম। বুয়া বাকী ঘর না মুছে উঠে দাঁড়াল। বালতি নিয়ে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেল। আমি ছটফট করছি। এতো দেরী করছে কেন। ভুল হয়েছে, বুয়াকে আজকে দরজা থেকেই বিদেয় করে দেয়া উচিৎ ছিল।
বুয়া ফিরে এলো। আমি দরজা খুলেই রেখেছিলাম। বুয়া ‘আসি আপা’ বলে বেরোতেই দরজা লাগিয়ে দিলাম। ব্যালকনির দিকে এগোতে যাব, এমন সময় ঘটনাটা ঘটল। বেল বাজল। আমি তখনও লিভিং রুমেই ছিলাম। ইন্টারকমে কোন ফোন আসেনি। এর মানে ফ্ল্যাটের কেয়ারটেকার কিংবা অতি পরিচিত কেউ। মন মানছে না। কেন যেন সুমনের কথাটা মন এল, ‘আমি যে পাওয়ার হোল্ড করি…’ ।
বাট সেটা তো আমি ডিনাই করলে। আমি তো এখনও না বলিনি। আর ও তো বলেছিল, আমাকে ডিটেলস জানাবে, কোথায় যেতে হবে। হয়তো অযথা ভয় পাচ্ছি। হয়তো দেখা যাবে আম্মা কিংবা ভাইয়া এসেছে। কিংবা কেয়ারটেকার সেদিনের মত কোন আর্জেন্ট চিঠি নিয়ে এসেছে।
এমন সময় শাহেদও ব্যালকনি থেকে ঘরে ঢুকল। দরজার দিকে এগিয়ে আসতে গিয়ে আমাকে দেখে থেমে গেল। আমার চেহারা দেখে অবাক হল। হেসে বলল
— সারাক্ষণ এতো ভয় পেলে চলে? দেখো কে।
তারপরও আমার সিক্সথ সেনস বলছে, অশনি সংকেত। আবার বেল বাজল। এবার কেমন যেন ভয় লাগল। আমাকে স্থবির দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শাহেদ এগিয়ে আসতে গেল। ততোক্ষণে আমি নিজেকে সামলে নিয়েছি। ওকে ইশারায় থামতে বলে, আমি নিজেই দরজা খুললাম।
তিনজন লোক দাঁড়িয়ে। অপরিচিত। বেশ স্মার্ট সাজ পোশাক। আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল
— শাহেদ চৌধুরী সাহেব আছেন?
নিজের অজান্তেই কেঁপে উঠলাম। মন বলছে, এটা সুমনের কাজ। ভয়ে ভয়ে জানতে চাইলাম
— কিছু বলতে হবে?
শাহেদ লিভিং রুমে ছিল। লোকগুলোর কথা শুনতে পেয়েছে কি না বুঝতে পারলাম না। লোকগুলোকে ঘরে প্রবেশ করতে দেখে নিজেই এগিয়ে আসল। এরপরে বলল
— কাকে চান?
তিনজনের ভেতর একজনকে লিডার মনে হল। বাকী দুজন সঙ্গী। লিডার সাহেব শাহেদের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল
— আপনিই শাহেদ চৌধুরী?
শাহেদ আড়চোখে আমার দিকে একবার তাকাল। আমার ভীত চেহারা দেখে সম্ভবত কিছু আঁচ করল। এরপরে ‘আপনারা বসুন, আমি আসছি’ বলে ঘুরতে গেল, সুযোগ পেল না। সঙ্গী দুজন দ্রুত এগিয়ে এসে শাহেদকে দুদিক থেকে ধরে ফেলল। শাহেদ নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,
— কি করছেন। ছাড়ুন।
এবার লিডার সাহেব একটা রিভলবার বের করে এগিয়ে এল। শাহেদের দিকে সেটা তাক করে শুধু বলল
— আমাদের সাথে একটু হেডকোয়ার্টারে যেতে হবে। আপনার সাথে কিছু আলাপ আছে।
আমার আর বুঝতে বাকী থাকল না, কি ঘটছে। শাহেদ অবাক হয়ে লোকগুলোর দিকে তাকাল। সবার চেহারাতেই নিষ্ঠুর এক অভিব্যক্তি। শাহেদ এবার আমার দিকে তাকাল। আমি মাথা ওপর নীচে করে ইশারায় বোঝালাম, এটাই তোমাকে বলতে চাচ্ছিলাম। আমার ভীত চেহারা আর ইশারার মানে ও সম্ভবত বুঝল। নিজে ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা থামিয়ে দিল। হয়তো বুঝল, তর্ক করে লাভ নেই। ওরা যা করতে এসেছে, করবেই। এরপরে শান্তভাবে বলল
— বেশ। চলুন।
এবার লিডার সাহেব দেখলাম নরম হলেন। বললেন
— আপনি চাইলে পোশাক পাল্টে নিতে পারেন। তবে আমার লোক পাশে থাকবে।
শাহেদ আর কোন কথা বলল না। একজন লোক সহ আমাদের বেডরুমে গেল। আমি মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকলাম। দেখতে দেখতে ওরা শাহেদকে আমার চোখের সামনে দিয়ে ধরে নিয়ে গেল।
নেহায়েত মানসিক প্রস্তুতি ছিল বলে, নিজেকে সামলে নিতে সময় নিলাম না। দ্রুত দরজা লাগালাম। ঝড়ের বেগে ভাবছি, কার কাছে সাহায্য চাওয়া যায়। পুলিশ, আর্মি, র‍্যাব? না উকিল, টুকিল? না পরিচিত বন্ধু বান্ধব? এমন সময় ফোনটা বেজে উঠল। তিথি করেছে। হঠাৎ? একসময় খুব কাছের মানুষ হলেও, এখন তো না। নেহায়েত দরকার ছাড়া কথা হয় না। এই সময়ে এমন একটা ফোন কার ধরতে ইচ্ছে করে? ধরার কোন ইচ্ছে না থাকলেও ধরলাম।
— কি রে তিথি?
— কেমন আছিস?
অনেক কষ্টে বিরক্তি সামলে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক গলায় বললাম
— এই তো। তোর খবর?
— চলে যাচ্ছে। তোর?
— ঐ। চলে যাচ্ছে টাইপ।
— কি যে বলিস? বর এতো ভাল চাকরী করে…
আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। বলে ফেললাম
— আমি একটু বেরোব রে, কোন কাজে ফোন করেছিলি?
তিথি কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেল মনে হল। এরপরে কিছুটা ইতস্ততঃ করে বলল
— তোকে কি ডিস্টার্ব করছি?
হঠাৎ নিজেরই খারাপ লাগল। কথা ঘোরালাম
— একদিন আয় না বাসায়।
— সেজন্যই ফোন করলাম।
— বেশ তো, কবে আসবি?
এবার তিথির গলা খানিকটা নীচু হল। আমতা আমতা টাইপ গলায় বলল
— আসলে তোকে একটা রিকোয়েষ্ট করার জন্য ফোন করলাম
— বল না, কি রিকোয়েষ্ট?
— আমাদের কলেজটা, মানে, আমার বর যে কলেজে আছে, ওটা… মানে সুমন ভাই বলে দিলেই হয়ে যাবে।
এবার সত্যিই হতভম্ব হয়ে গেলাম। প্রায় চিৎকার করে বলে উঠলাম
— মানে?
গলায় বোধহয় কিছুটা ঝাঁঝ ছিল। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে এবার তিথি কিছুটা নরম গলায় বলল
— আসলে শেলির সাথে সেদিন দেখা হয়েছিল, ও বলল… মানে তোর সাথে তো… আমার খুব খারাপ লাগছে কথাটা বলতে… আসলে সুমন ভাইয়ের কিন্তু এখন অনেক ক্ষমতা। উনি একটা ফোন করলেই সেক্রেটারিরা সাথে সাথে ফাইলে সই করে দিবে।
কিভাবে যে ‘আচ্ছা’ বলে ফোন রাখলাম, বলতে পারব না। এরপরে দ্রুত হাতে শেলিকে ফোন করলাম। ফোন একবার বাজতেই ও ধরল
— কিরে, হঠাৎ?
ভনিতা না করে সরাসরি মূল কথায় আসলাম। বললাম
— আজকে ছুটি নিতে পারবি?
— কেন?
— তোর সাথে একটু আলাপ ছিল।
— ফোনে বলা যায় না?
এক মুহুর্ত ভাবলাম। এরপরে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, বলেই ফেলি।
— আসলে সুমনের বাসার ঠিকানাটা লাগবে। আছে?
— ও এই ব্যাপার? তুই তো ভয় পাইয়ে দিয়েছিলি। তা, শাহেদ ভাই জানে? না লুকিয়ে লুকিয়ে…
ফাজলামির সময় নেই। ওকে শেষ করতে না দিয়ে বললাম
— জানে। ঠিকানাটা আছে?
— অস্থির হচ্ছিস কেন। আমার কাছে নেই, আমার জামাইকে জিজ্ঞেস করে তোকে ম্যাসেজ করছি।
ফোন রেখে দিলাম। কি করব? শেলিকে গিয়ে কি সব খুলে বলব? ওর বরকে দিয়ে রিকোয়েষ্ট করালে কোন লাভ হবে? শেলিই বা তিথিকে আমার কথা কেন বলল? সুমন কি শেলিকে তেমন কোন ইঙ্গিত দিয়েছে?
মাথা একদম কাজ করছে না। কি করা যায় ভাবছি আর পায়চারী করছি। ম্যাসেজ আসলে একটা আওয়াজ হবে জানি, তারপরও কেন যেন পায়চারীর ফাঁকে মাঝে মাঝে মোবাইলটা হাতে নিয়ে চেক করছি। আবার কি ফোন করব শেলিকে? এমন সময় মোবাইলটায় ম্যাসেজ আসবার আওয়াজ হল।
দ্রুত মোবাইলটা হাতে তুলে নিলাম। লক স্ক্রিনেই, ছোট্ট চৌকনা বক্সে ম্যাসেজটা লেখা আছে। না, শেলি না, ম্যাসেজটা পাঠিয়েছে সুমন। ধানমন্ডির একটা ফ্ল্যাটের ঠিকানা। আর নীচে ইংরেজীতে একটাই শব্দ লেখা, ‘নাও’।
কোন কিছু ভাববার মত অবস্থা আমার তখন ছিল না। মনে তখন একটাই শব্দ বাজছে, ‘ক্রসফায়ার’। যে করেই হোক ওটা আটকাতে হবে। এক মুহুর্ত দেরী না করে সেই পোশাকেই রওনা দিলাম।
লিফট একসময় থামল। করিডোরে বেরিয়ে এলাম। হাতের ডানদিকে ‘সি’। এগিয়ে গেলাম। কলিং বেল টিপলাম। মনে হল অনন্ত সময় ধরে দাঁড়িয়ে আছি। অপেক্ষা সহ্য হচ্ছে না। তারপরেও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। কেউ খুলছে না দেখে ফ্ল্যাটের নম্বরটা আবার চেক করলাম। ঠিক আছে। দেরী করে ফেললাম কি? অস্থির লাগছে। কানে তিথির কথাটা বাজছে, ‘সুমন ভাই একটা ফোন করে দিলে…’। আবার বেল বাজালাম। এবার দরজা খুলে গেল। সুমন নিজেই খুলল। ঠোঁটে সেই স্মিত হাসি। শুধু বলল
— এসো।

চলবে…..

-রাজিয়া সুলতানা জেনি