যখন আঁধার ঘনিয়ে আসে

অভিজাত এলাকার গেইটের কাছে আসার আগেই ঝমঝম করে বড় বড় ফোঁটার বৃষ্টি নামলো । কাজরী একবার ভাবে সিক্যুরিটি গার্ডের ছাউনির নিচে যাবার জন্য দৌঁড় দেয় । কাজরীর লজ্জা লাগে। সে বরং একটু জোর পায়ে হাঁটে , আর তাতেই পরনের শাড়িটা বেশ ভিজে যায় ।

সিক্যুরিটি গার্ডের কমান্ডার সাবুল মিয়া মেয়েটাকে দেখে বিব্রত বোধ করে । গতকাল মেয়েটার মুখে কড়া , সস্তা রংচঙ লাগানো ছিলো । এখন বৃষ্টিতে মুছে গেছে । মেয়েটারে আজকে অন্যরকম সুন্দর লাগতেছে । মিষ্টি চেহারার ভদ্র ঘরের লাজুক মেয়ে । সাবুল মিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে । মনে মনে ভাবে , এই রকম একটা মেয়েরে সে বিয়ে করবে ।
রাত প্রায় একটা । তুমুল বৃষ্টির মাঝে কাজরীর অস্বস্তি লাগে । সাবুল মিয়া মানুষ ভালো । দুইদিন আগে পরিচয় , তাতেই লোকটাকে কেমন আপন মানুষ লাগে । এই লাইনে কাজরী নতুন । তার একটা পোশাকি নাম আছে । কারিনা । কিন্তু সাবুল মিয়াকে সে তার আসল নামটা বলেছে । একত্রিশ বত্রিশ বছর বয়সের সাবুল মিয়া শক্তপোক্ত , বিশ্বাসী মানুষ । এলাকার সবাই তাকে চিনে ।
একটু ঠান্ডা ঠান্ডা লাগে কাজরীর । সাবুল মিয়া খেয়াল করে। একটা সিগারেট ধরিয়ে কাজরীকে বলে ; ভিতরে সইরা আসো, নইলে পুরা ভিজা যাইবা ।
কাজরী তার একুশ বছরের ছিপছিপে শরীরের ভরাট অংশটুকু আঁচলে ঢাকতে গিয়ে আঁড় চোখে সাবুল মিয়াকে দেখে ।

দামী বিশাল গাড়ীটা নি:শব্দে এসে গেটে থামে । সাবুল মিয়া চকিতে এগিয়ে গেট পুরো খুলে দেয় । মাঝ বয়সী মানুষটাকে সে চেনে । এলাকার খুব প্রভাবশালী । সাবুল মিয়া ভেবে পায়না এইলোক নিজে কেন গাড়ী চালায় । অবশ্য সে জানে গাড়ীর মালিক নিজের বন্দুকও নিজে চালায় । একবার দিনের বেলা বের করতে দেখেছে । এলাকায় আরো দুই জন আছেন বন্দুকওয়ালা , তবে সেই বন্দুক অন্য লোকের হাতে থাকে ।
সাবুল মিয়ার জানা নেই ভদ্রলোক যে ক্লাবে আড্ডা দেন , সেখানে সেলফ ড্রিভেন গাড়ী ছাড়া কাউকে এলাও করা হয় না ।
গাড়ীটা গেট পেরিয়ে দাঁড়িয়ে যায় । চালক ঝাপসা কাঁচ নামিয়ে খুব মোলায়েম কন্ঠে জিজ্ঞেস করেন ; মেয়েটা যাবে নাকি সাবুল মিয়া ?
সাবুল মিয়া একটু মাথা নীচু করে বলে ; নতুন আসছে স্যার ।
চালক মৃদু হাসেন ।
সাবুল মিয়া কাজরীকে জিজ্ঞেস করে ; স্যার তোমারে নিতে চাইতেছেন ।
কাজরী এক ঝলক দেখেই বলে ; বড়লোক মানুষ খারাপ হয় ।
সাবুল মিয়া আশ্বাস দিয়ে বলে ; উনারে আমি চিনি , দিলদরিয়া মানুষ ।

এতো দামী গাড়ীর কোন কাস্টমার আজ পর্যন্ত কাজরীকে তুলে নাই । সে খুব জড়সড় হয়ে বসে থাকে । গাড়ীটায় কি মিষ্টি ঘ্রাণ ! চালক মাঝ বয়সী হলেও দেখতে খুব সুন্দর । উনি কাজরীর সাথে আপনি আপনি করে কথা বলছেন ।
; আপনিতো বেশ ভিজে গেছেন ।
প্রতিনিয়ত লজ্জা ঝেড়ে ফেল্লেও কাজরীর মাঝে একটু সামাজিকতা রয়ে গেছে । সেই সাবলীলতার জোরে কাজরী ঠাস করে বলে বসে ; এক কাপ গরম চা খেলে ঠিক হয়ে যাবো ।
ভদ্রলোক হাসতে হাসতে বলেন ; সমস্যা নেই , আমি নিজে বানিয়ে খাওয়াবো ।

দু’দিন পর । পত্রিকার ভেতরের পাতায় ছোট্ট একটা খবর ছাপা হয় । ” ডোবা থেকে ২০/ ২১ বছরের যুবতীর লাশ উদ্ধার ” ! একটু ডিটেলসে ছিলো , পুলিশের ধারনা মেয়েটাকে শারীরিক নির্যাতন করার পর হত্যা করা হয়েছে ।
ওই থানার জানা নেই , বিগত ছয়টি খুন একইভাবে করা হয়েছে । ভিক্টিমের হাত পায়ে চামড়ার স্ট্র‍্যাপের গভীর দাগ ছিলো ।

প্রবল বৃষ্টির মাঝে দামী গাড়ীটা নি:শব্দে দাঁড়ায় । সাবুল মিয়া বৃষ্টি উপেক্ষা করে গেট খুলে দেয় ।
চালক ঝাপসা কাঁচ নামিয়ে মৃদু কন্ঠে বলে ; মেয়েটা একেবারে নতুন ছিলো সাবুল মিয়া ।
সাবুল মিয়া হাত কচলে বলে ; এরে আর দেখিনি স্যার । সাবুল মিয়ার মুখে দেঁতো হাসি দেখে চালক ভরাট কন্ঠে বলেন ; নিজের জায়গায় থাকো সাবুল মিয়া , আজকাল সময় বড় খারাপ ।
সাবুল মিয়ার কলিজা ঠান্ডা হয়ে আসে । জানালার কাঁচ উঠার আগে চালক পাঁচটে চকচকে একহাজার টাকার নোট নিতান্ত অবহেলায় এগিয়ে দেন ।
সাবুল মিয়া নোটগুলো নাকের কাছে নিয়ে বুক ভরে শ্বাস নেয় । একটু কড়া সস্তা সেন্টের ঘ্রাণ পায় সাবুল মিয়া ।

জানুয়ারির মাঝামাঝি । কনকনে ঠান্ডার মধ্যেও আস্তে আস্তে হাঁটছে শিউলি । তার ধারনা জোরে হাঁটলে কেউ সন্দেহ করবে । এদিকে রাত প্রায় পৌনে একটা । তার একটু ভয় ভয় লাগে , যদি সাবুল মিয়াকে না পায় । সাবুল মিয়াকে পেয়ে বড় আশ্বস্ত হয় মেয়েটা । এই লাইনে নতুন মেয়েটার কাছে সাবুল মিয়াকে খুব ভালো লেগেছে । যদিও পরিচয় হয়েছে মাত্র দুইদিন আগে ।

-কামরান চৌধুরী